Alapon

বাংলায় আফগানীদের শাসন



শের শাহ সুর ১৫৩৮ সালে ৬ এপ্রিল সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহকে পরাজিত করে বাংলা দখল করে নেন। সেই থেকে বাংলায় স্বাধীন সুলতানী আমলের পরিসমাপ্তি ঘটে এবং একই সাথে বাংলায় আফগানদের শাসন শুরু হয়। সেই থেকে শুরু করে ১৫৭৬ সালে দাউদ খান কররানী মোগলদের হাতে পরাজিত হওয়া পর্যন্ত বাংলায় আফগানীদের শাসন জারি থাকে। শের শাহ ছিলেন বাবরের একজন সেনানায়ক। তিনি ১৫২২ সালে মোগল শাসনের অধীনের বিহারের গভর্নর নিযুক্ত হন।

১৫৩৮ সালে নতুন মুঘল সম্রাট হুমায়ুন যখন অন্যত্র অভিযানে ব্যস্ত ছিলেন, সেই সময় শের শাহ সুরি বাংলা জয় করে সুরি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিজেকে নতুন সম্রাট ঘোষণা করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে মোগল সম্রাট হুমায়ুন বাংলা অভিমুখে অগ্রসর হলে শের শাহ বাংলা ত্যাগ করেন। ১৫৩৯ খ্রিস্টাব্দে চৌসার যুদ্ধে (বক্সারের নিকটে) হুমায়ুনকে পরাভূত করে তিনি ‘শাহ’ উপাধি গ্রহণ করেন এবং বাংলা পুনর্দখল করে খিজির খানকে এর শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। পরবর্তী বছর পুনরায় হুমায়ুনকে পরাজিত ও ভারতবর্ষ থেকে বিতাড়িত করে তিনি দিল্লির সিংহাসন অধিকার করেন।

হিন্দুস্তানের শাসনক্ষমতা লাভের পর নিজের ক্ষমতা সুসংহত করার কাজে মনোযোগ দিলেন শের শাহ। তার শাসন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিলো নিজেকে কেন্দ্র করে, অর্থাৎ, সম্রাটই ছিলেন শাসন ব্যবস্থার মূলে। শাসনব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য তিনি বেশ কয়েকজন মন্ত্রীকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। আর প্রশাসনিক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে পরামর্শের জন্য অভিজাত আর বিজ্ঞদের নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন একটি পরামর্শক কাউন্সিল।

দিউয়ান-ই-ওয়াজির, দিউয়ান-ই-আরীজ, দিউয়ান-ই-রসলত আর দিউয়ান-ই-ইনশাহ, এই চারটি পদ নিয়ে গঠিত হয়েছিলো শের শাহের মন্ত্রীসভা। দিউয়ান-ই-ওয়াজির বা উজির সাম্রাজ্যের সকল বিষয়ই দেখাশোনা করতেন। মন্ত্রীসভার কাজ তদারক করাও তার দায়িত্বের মাঝে অন্তর্ভূক্ত ছিলো। দিউয়ান-ই-আরীজ বা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাজ ছিলো সেনাবাহিনীকে নিয়ে। সেনাবাহিনীকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রদান, অস্ত্র-শস্ত্র জোগান দেয়া, যুদ্ধপরিকল্পনা করা, নতুন সৈন্য ভর্তি, সেনাবাহিনীর রসদ জোগান ইত্যাদি বিষয় তদারক করতো এই মন্ত্রণালয়। শের শাহ প্রায়ই এই মন্ত্রণালয়ের কাজ নিজে ব্যক্তিগতভাবে তদারক করতেন।

দিউয়ান-ই-রসলত পররাষ্ট্র সংক্রান্ত বিষয়গুলো দেখতো আর রাষ্ট্রীয় বার্তা, ঘোষণা ইত্যাদি প্রচারের দায়িত্ব ছিলো দিউয়ান-ই-ইনশাহ এর। শের শাহ তার পুরো সাম্রাজ্যকে ৬৬টি সরকারে ভাগ করে দিয়েছিলেন। সরকার আবার কতগুলো পরগণায় এবং পরগণা কতগুলো গ্রামে বিভক্ত থাকতো। প্রতিটি পর্যায়েই প্রশাসনিক কাজকর্ম দেখাশোনার জন্য একজন করে প্রধান নিয়োগপ্রাপ্ত হতেন। সরকার বা পরগণা বা গ্রামের সমস্ত দায়িত্ব সেই প্রধানের উপরই বর্তাতো।



শেরশাহ মুদ্রা ব্যবস্থার সংস্কার সাধন এবং হয়রানিমূলক কর রহিত করে ব্যবসা বাণিজ্যের উন্নতি বিধান করেন। সাম্রাজ্যের প্রত্যন্ত এলাকার সঙ্গে রাজধানী আগ্রার চমৎকার সংযোগ-সড়ক নির্মাণ করে এবং এই সড়কের ধারে নির্দিষ্ট দূরত্বে সরাইখানা, মসজিদ ও মন্দির প্রতিষ্ঠা করে তিনি যোগাযোগ ব্যবস্থার অভিনব উন্নতি সাধন করেন। তাঁর নির্মিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ছিল সড়ক-ই-আযম (মহাসড়ক)। তিন হাজার মাইল দীর্ঘ এই মহাসড়ক আরাকান থেকে আগ্রা, দিল্লি ও লাহোর হয়ে মুলতান পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এবং এর দুপাশে ছিল ছায়াদানকারী বৃক্ষশ্রেণি। ইংরেজ আমলে এই সড়ক গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড নামে পরিচিতি লাভ করে। রাজধানী থেকে সাম্রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এবং বাইরে থেকে রাজধানীতে সহজে ও দ্রুত সরকারি নির্দেশ ও সংবাদ আদান প্রদানের জন্য যাত্রাপথে পর্যায়ক্রমে সংবাদ-বাহকের ঘোড়া বদল করার এক অভিনব পদ্ধতি তিনি চালু করেন। পথের পাশের সরাইখানাগুলি সংবাদবাহী ঘোড়া বদলের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

ন্যায়বিচার ছাড়া কোনো সাম্রাজ্য, রাজ্য বা দেশ টিকে থাকতে পারে না। শের শাহ তাই তার সাম্রাজ্যে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেছিলেন। প্রশাসন পরিচালনা কিংবা বিচারকার্যে শের শাহ ছিলেন সম্পূর্ণরুপে নিরপেক্ষ। দুর্নীতি করলে বা অন্য কোনো অপরাধ করলে তিনি কাউকে ছাড় দিতেন না। এক্ষেত্রে তিনি কে আমির আর কে প্রজা, কে আমিরের ছেলে আর কে মুচির ছেলে এসব কিছুই দেখতেন না। সবার জন্যই একই আইন ছিলো। বিচারের শাস্তি দেয়া হলে তা বাস্তবায়নেও তিনি কখনো পিছপা হননি।



ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সাম্রাজ্যজুড়ে তিনি নিয়োগ দিয়েছিলেন অসংখ্য বিচারক। ‘কাজী’ আর ‘মুনসিফ’রা দিউয়ানী মামলার বিচার করতেন। ফৌজদারি মামলার বিচার করতেন ‘শিকদার’রা। গ্রামাঞ্চলে বিচারের জন্য গ্রাম পঞ্চায়েত গঠিত হয়েছিলো। গ্রাম পঞ্চায়েত দিউয়ানি আর ফৌজদারি দুই ধরনের মামলারই বিচার করতে পারতো। তাছাড়া সাম্রাজ্যের রাজস্ব সম্পর্কিত বিচারের জন্য আলাদা বিচার ব্যবস্থা ছিলো। বিচার ব্যবস্থায় শের শাহ তেমন নতুন কিছু যোগ করেননি। পূর্বের বিচার কাঠামোর মাঝেই তিনি মূলত জোর দিয়েছিলেন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রতি।

শের শাহের জনহিতকর কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত ছিল দাতব্য প্রতিষ্ঠানে মুক্ত হস্তে অর্থদান, দরিদ্রদের জন্য লঙ্গরখানা স্থাপন, মাদ্রাসা, মসজিদ, গুরুত্বপূর্ণ ইমারত, বাগবাগিচা, হাসপাতাল ও সরাইখানা নির্মাণ। সাসারামে নিজের অনুপম সমাধিসৌধ, নির্মাতা হিসেবে তাঁর উন্নত রুচির পরিচায়ক। শেরশাহ ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান। হিন্দুদের প্রতি তিনি ছিলেন খুবই সহনশীল। তাঁর মধ্যে একজন সমরনেতা, একজন বিচক্ষণ নৃপতি এবং একজন যোগ্য ও দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়কের গুণাবলীর সমন্বয় ঘটেছিল।

১৫৪৫ সালে চান্দেল রাজপুতদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় কালিঞ্জর দুর্গে বারুদের বিস্ফোরণে শের শাহ সুরির মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র জালাল খান ইসলাম শাহ সুরি নাম গ্রহণ করে সুরি সাম্রাজ্যের সিংহাসনে বসেন। সাসারামে একটি কৃত্রিম হ্রদের মাঝখানে তাঁর ১২২ ফুট উঁচু নয়নাভিরাম সমাধিসৌধটি আজও বিদ্যমান। তাঁর মৃত্যুর পর হুমায়ুনের নেতৃত্বে ভারতে মোগল সাম্রাজ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। তবে সুরি শাসন অব্যাহত থাকে।

ইসলাম শাহ সুরি সাম্রাজ্যের ২য় শাসক। তিনিও তাঁর পিতার মতো দক্ষতার সাথে শাসন করেন। তবে তার সময়ে হুমায়ুন দিল্লির সিংহাসন দখল করেন। ১৫৫৪ সালে তিনি প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে নিহত হন। তারপরে ফিরোজ শাহ সুরি ক্ষমতায় আসেন। কিন্তু বাংলায় যিনি গভর্নর ছিলেন তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করে বাংলার শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। তিনি ছিলেন মুহাম্মদ খান সুর। তিনি বছর দুয়েকের মাথায় সুরি শাসক আদিল শাহের সাথে যুদ্ধে নিহত হন। এরপর তার ছেলে গিয়াস উদ্দিন বাহাদুর শাহ ক্ষমতায় আসেন। তিনি ১৫৬১ সাল পর্যন্ত বাংলার শাসক ছিলেন। তার মৃত্যুর পর তার ভাই গিয়াসউদ্দিন জালাল শাহ ক্ষমতায় আসেন এবং ১৫৬৩ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। ১৫৬৩ সালে তৃতীয় গিয়াসউদ্দিন শাহ ক্ষমতায় আসেন। তিনি ছিলেন জালাল শাহের পুত্র।

১৫৬২ সালে শুরুতে আফগান কররানী রাজবংশের তাজ খান কররানি বাংলার একটি বড় অংশ দখল করে নেন। ১৫৬৪ সালে তৃতীয় গিয়াসউদ্দিনকে পরাজিত করে তাজ খান কররানী নতুন রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। তাজখান কররানী ছিলেন শেরশাহের অন্যতম উচ্চপদস্থ কর্মচারী। তিনি শেরশাহের পুত্র ইসলাম শাহের সময়ে দক্ষিণ বিহারের শাসনকর্তা ছিলেন। আদিল শাহের শাসনামলে তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমীর। গোয়ালিয়রে আদিলশাহের দরবারে রাজনৈতিক অরাজকতার কারণে তাজখান সেখান থেকে পলায়ন করেন এবং গাঙ্গেয় দোয়াব অঞ্চলে নিজের কতৃর্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।

১৫৫৪ খ্রিস্টাব্দে আদিলশাহের সেনাপতি হিমুর নেতৃত্বাধীন বাহিনীর নিকট তারা পরাস্ত হন। তাজ খান ও সুলায়মান কররানী বাংলায় পালিয়ে যান। বাংলার আফগান দলপতিদের অন্তর্দ্বন্দ্বের ফলে বিরাজমান বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থাপনার সুযোগ নিয়ে নানা উপায়ে তাজখান ও সুলায়মান নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করেন। অবশেষে তাজখান সুলতান তৃতীয় গিয়াসউদ্দীন বাহাদুর শাহকে হত্যা করে বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং ১৫৬৪ সালে কররানী শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু তাজ খান বেশিদিন তাঁর সুফল ভোগ করতে পারেন নি। ১৫৬৪ সালে তার মৃত্যু হয়।

তাঁর ভাই সুলায়মান কররানী তার উত্তরাধিকারী হন এবং গৌড় থেকে তান্ডায় রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। মোগলগণ উত্তর ভারত দখল করার পর সেখান থেকে এসে তার রাজধানীতে একত্রিত হওয়া আফগানদের নিয়ে তিনি একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন। একজন বিচক্ষণ কুটনীতিবিদ সুলায়মান কররানী সব সময়ই আকবরের সাথে প্রকাশ্য বিরোধিতা এড়িয়ে চলেন। তিনি মোগল রাজদরবারে নিয়মিত উপহার পাঠাতেন এবং কখনোই প্রকাশ্যে স্বাধীনতা দাবি করেন নি। তিনি আকবরের নামে খুৎবা পাঠ করান ও মুদ্রা প্রচলন করেন। বাহ্যত সুলায়মান কররানী মুগলদের আধিপত্য স্বীকার করলেও তিনি হযরত-ই-আলা উপাধি নেন। এতে প্রমাণিত হয় যে, কার্যত তিনি একজন স্বাধীন শাসক ছিলেন।

পশ্চিম সীমান্তে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সুলায়মান কররানী উড়িষ্যা জয় করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তাঁর পুত্র বায়েজীদ কররানীকে ১৫৬৭-৬৮ খ্রিস্টাব্দে একটি শক্তিশালী সৈন্যদলসহ ওই দেশের বিরুদ্ধে পাঠান। যুদ্ধে বায়েজীদ উড়িষ্যার রাজাকে পরাজিত ও হত্যা করেন। ইতোমধ্যে সুলায়মান কররানী স্বয়ং উড়িষ্যার দিকে অগ্রসর হন এবং এর রাজধানী তাজপুর দখল করেন। সুলায়মান কররানীর নির্ভীক সেনাপতি কালাপাহাড় পুরী পর্যন্ত অগ্রসর হন এবং প্রত্যন্ত এলাকাসমূহ দখল করেন। এভাবে উড়িষ্যা সরাসরি কররানী শাসনাধীনে আসে।

সুলায়মান কররানী আট বছর বাংলা শাসন করেন। তাঁর রাজ্য উত্তরে কোচবিহার থেকে দক্ষিণে পুরী পর্যন্ত এবং পশ্চিমে শোন নদী থেকে পূর্বে ব্রহ্মপুত্র নদ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ১৫৭২ খ্রিস্টাব্দের ১১ অক্টোবর সুলায়মান কররানীর মৃত্যু হয়। সুলায়মান কররানীর জ্যেষ্ঠ পুত্র বায়েজীদ কররানী তাঁর উত্তরাধিকারী হন। তিনি তাঁর পিতার নীতি পরিহার করে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তিনি নিজের নামে খুৎবা পাঠ এবং মুদ্রা প্রচলন করেন।

বায়েজীদ কররানী মাত্র অল্প কয়েকমাস বাংলা শাসন করেন। তাঁর চাচাত ভাই এবং ভগ্নীপতি হান্সু তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে তাঁকে হত্যা করেন এবং ক্ষমতা দখল করেন। কিন্তু শীঘ্রই সুলায়মান কররানীর বিশ্বস্ত উজির লোদী খান কিছু সংখ্যক আমীরের সহায়তায় হান্সুকে ক্ষমতাচ্যুত করে তাঁকে হত্যা করেন। অতঃপর তারা ১৫৭৩ সালে বায়েজীদের কনিষ্ঠ ভ্রাতা দাউদ খান কররানীকে বাংলার সিংহাসনে অভিষিক্ত করেন। দাউদ তাঁর ভাইয়ের স্বাধীন নীতি অনুসরণ করে নিজের নামে খুৎবা পাঠ ও মুদ্রা প্রচলন করেন।

দাউদ কররানী উত্তরাধিকারসূত্রে একটি বিশাল সৈন্য বাহিনী ও বিপুল ধন সম্পদ লাভ করেন। এর সাহায্যে তিনি আকবরের বিরুদ্ধাচরণ করেন এবং গাজীপুরের নিকট জামানিয়া অবরোধ করেন। বাদশাহ আকবর জৌনপুরের শাসক মুনিম খানকে দাউদ কররানীর বিরুদ্ধে অগ্রসর হওয়ার জন্য আদেশ দেন। মুনিম খান পাটনায় পৌঁছে লোদীখানের মুখোমুখি হন এবং সহজ শর্তে সন্ধি সম্পাদন করে সন্তুষ্ট হন। আকবর অথবা দাউদ কেউই এ সন্ধিতে খুশী হন নি। দাউদ তাঁর প্রধানমন্ত্রীকে হত্যা করে তাঁর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেন। অপর দিকে বাদশাহ মুনিম খানকে আবার বাংলা ও বিহার আক্রমণের আদেশ দেন। তদানুসারে মুনিম খান বিহারে পৌঁছান এবং পাটনা অবরোধ করেন। এ অবস্থায় ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দে আকবর স্বয়ং দাউদ খানের বিরুদ্ধে অগ্রসর হন। তিনি সরাসরি হাজীপুর আক্রমণ করে সহজেই তা দখল করেন। সম্রাট পাটনা দখল করে মুনিম খানকে বিহার ও বাংলার শাসক নিযুক্ত করেন এবং দাউদ কররানীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ অব্যহত রাখার নির্দেশ দিয়ে দিল্লি অভিমুখে রওনা হন।

মুনিম খান বাংলার বিরুদ্ধে তার অভিযান চালু রাখেন। তিনি তান্ডা ও সাতগাঁও দখল করে নেন। দাউদ খান উড়িষ্যায় পালিয়ে যান। মুনিম খান ও টোডরমল দাউদের পশ্চাদ্ধাবন করে উড়িষ্যার অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। বালাশোর জেলার তুকারয়ে সংঘটিত যুদ্ধে দাউদ খান পরাজিত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করেন (১৫৭৫ খ্রি.)। দাউদ কররানী ও মুগলদের মধ্যে অতঃপর কটকে একটি শান্তি চুক্তি সম্পাদিত হয়। দাউদ কররানী বাংলা ও বিহার মোগলদেরকে ছেড়ে দেন এবং শুধু উড়িষ্যা নিজের দখলে রাখেন।

১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবরে মুনিম খানের আকস্মিক মৃত্যুর সুযোগ নিয়ে, দাউদ কররানী বাংলা অভিমুখে অগ্রসর হন এবং তেলিয়াগড়ি গিরিপথ পর্যন্ত দখল করেন। এ পরিস্থিতিতে আকবর হোসেন কুলী বেগকে খানজাহান উপাধি দিয়ে বাংলার শাসক নিযুক্ত করেন ও দাউদ কররানীকে আক্রমণ করার আদেশ দেন। খানজাহান টোডরমলকে সঙ্গে নিয়ে দাউদের রাজধানী তান্ডা অভিমুখে যাত্রা করেন। উত্তর-পশ্চিমে গঙ্গা এবং দক্ষিণ-পূর্বে পাহাড়ের মধ্যবর্তী রাজমহল এর সংকীর্ণ প্রবেশ পথে কররানী তাদের পথ অবরোধ করেন। খান জাহান প্রথমে তেলিয়াগড়িতে আফগানদের সম্মুখীন হন এবং যুদ্ধের পর এটি অধিকার করেন। ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দের ১২ জুলাই রাজমহলের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধে দাউদ খান পরাজিত ও নিহত হন। দাউদ কররানীর মৃত্যুদন্ডের ফলে বাংলায় আফগান শাসনের অবসান ও মোগল শাসনের সূচনা হয়।

পঠিত : ১৫০ বার

ads

মন্তব্য: ১

২০১৯-০৯-২১ ১৯:০৩

User
rabiul islam1

তথ্য সমৃদ্ধ, ভাল লাগল, ধন্যবাদ লেখককে ।

submit