Alapon

ইতিহাস যারা গড়েন, ইতিহাস প্রায়ই তাদের ভুলে যায়।


যেমন করে আমরা ভুলে গেছি, আমাদের কেউ একজন ছিলেন, যার কারনে ব্রিটিশ কলোনিয়াল শাসন ও কলকাতার বাবুদের শোষনে নিষ্পেষিত বাংলার মুসলমানদের, যাদের চাষা-ভুষা বলে হরহামেশাই কলকাতার বাবুরা গালি দিতেন, সেই চাষাভুষারা দুই প্রজন্মের ব্যবধানে একটা স্বাধীন রাষ্ট্র কায়েম করে বসেছিল।

আমরা ভুলে গেছি, ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু কোন একদিন আমাদেরই এক নেতার পিএস ছিলেন। ব্রিটিশ প্রিভি কাউন্সিলে অভিজাত ইংরেজীতে, লাহোর বা লাখনৌতে চোস্ত উর্দুতে আর ভাটির বঙ্গে আমাদের প্রাণের ভাষা বাংলায় যার কণ্ঠে সমানে আগুন ঝরতো।

তার পদভারে প্রকম্পিত হয়ে ইকবাল পার্কের সাধারন সভায় মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহ বলেছিলেন, 'বাঘ যখন আসে, মেষশাবককে তখন পথ ছেড়ে দিতেই হয়।'

আজ তার জন্মদিন।
তিনি শের ই বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক। বাংলাদেশ, পশ্চিম বঙ্গ,আসাম ও কুচবিহারের সাধারন মানুষের হক সাব।

আমাদের এখন শেখানো হয় ইতিহাস শুরু হয়েছে ১৯৭১ সালে। এর আগে ৭১ কিভাবে ৭১ হয়ে উঠলো তা আমাদের কাছ থেকে আড়াল করা হয়। অথচ, ৪৭ না এলে প্রকৃতপক্ষে ৭১ আসতো না, আর ৪৭ এ পাকিস্তান তৈরির পেছনে সবচেয়ে বড় কারিগর ছিলেন এই শের ই বাংলা।

আজকে বাংলাদেশ না শুধু, বরঞ্চ পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পেছনে সবচেয়ে প্রভাবশালী যে তিনজন ব্যক্তির অবদান ছিল, তাদের একজন হলেন এই শের ই বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক।
বাকি দুজন হলেন আল্লামা ইকবাল ও মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহ।

প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তান কায়েম করার জন্য যে বিপুল জনসমর্থন প্রয়োজন ছিল তা আসলে ১৯৩৭ সালেও মুসলিম লীগের ছিল না।

উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে আব্দুল গাফফার খান এবং বাংলায় শের ই বাংলার অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রভাবের সামনে মুসলিম লীগ ছিল কোনঠাসা।
কেবলমাত্র যখন শের ই বাংলা মুসলিম লীগের সাথে
তার কৃষক প্রজা পার্টি নিয়ে বাংলায় যে কোয়ালিশন করেন তার বদৌলতেই মুসলিম লীগ প্রথম ব্যাপক জনসমর্থন লাভ করে।বাংলার প্রায় তিন কোটি মুসলমানের সমর্থন পেয়ে মুসলিম লীগ দ্রুত নিজেদের ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার মুসলমানদের পক্ষে একমাত্র সর্বভারতীয় কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয় যা পাঞ্জাব ও সিন্ধুতে তাদের একটি শক্তিশালী অবস্থান এনে দেয়।

প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তান তার স্বাধীনতার জন্য সবচেয়ে বেশি ঋণী এই ভেতো বাঙ্গালদের কাছেই, বাংলার মুসলমানরা পাকিস্তান আন্দোলনে যা করেছে, তার ধারে কাছে দিয়ে অন্য কেউ যেতে পারে নি।

পাকিস্তান আন্দোলনের সাফল্য ছিল একটা ফসল,যার ধারনা দিয়েছিলেন আল্লামা ইকবাল, বীজ বুনেছিলেন শের ই বাংলা ফজলুল হক আর ফসল কংগ্রেসের লুটের হাত থেকে বাচিয়ে ঘরে তুলেছিলেন জিন্নাহ। পাকিস্তান তাই তার জন্মের জন্য সরাসরি বাঙ্গালিদের কাছে ঋণী।
বাংলার মুসলমানদের বিপুল সমর্থন ছাড়া, একটা লাহোর প্রস্তাব ও একজন আবুল কাশেম ফজলুল হক ছাড়া কোনদিন পাকিস্তান হতে পারতো না।

পাকিস্তান হওয়ার পর যে বাঙ্গালি মধ্যবিত্ত শ্রেণী ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল তাদের পূর্বপুরুষ বাংলার অসহায় কৃষকদেরকে জমিদার-জোতদার-মহাজনদের নির্যাতন থেকে উদ্ধারের অগ্রদূত ছিলেন এই শের ই বাংলাই। ব্রিটিশ আমলের এই কৃষক প্রজন্মের সন্তানেরা পাকিস্তান আমলে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত হয়েছে এই শের ই বাংলা-নওয়াব সলিমুল্লাহদের গড়ে যাওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেই পড়াশোনা করে। আর তাদের আন্দোলনেরই ফসল আজকের বাংলাদেশ।

এভাবে, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ, দুই দুটো স্বাধীন রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন একজন মানুষ, শের ই বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক।খুব সম্ভবত সুযোগ পেলে শের ই বাংলা-সুভাষ বোস আর শরৎ বোস মিলে বাংলা-আসাম-কুচবিহারকে একীভুত করে এক বৃহত্তর স্বাধীন বাংলার অভ্যুদয় ঘটাতেন, কিন্তু সুভাষ বোসের অন্তর্ধান ও শরৎ বোসকে হঠাত ব্রিটিশ সরকার গ্রেফতার করায় তা আর সম্ভব হয়ে ওঠে নি।সেক্ষেত্রে হয়তো ৭১ এর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের কোন দরকার পড়তো না, বাংলাদেশ,পশ্চিম বাংলা,কুচবিহার ও আসাম মিলে হত এক বৃহত্তর বাংলা।

সম্ভবত, বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে পরাক্রান্ত রাজনীতিবিদদের একজন হিসেবেই শুধু নন, বরঞ্চ আজকে প্রায় চল্লিশ কোটি জনসংখ্যার দুটো রাষ্ট্রের জন্মের নেপথ্য নায়কদের একজন হিসেবে গোটা আধুনিক পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী নেতা হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবেন আমাদের হক সাব, শের ই বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক।

শুভ জন্মদিন হক সাব!!
আল্লাহ আপনাকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব করুন।

লিখেছেন: মুহাম্মাদ সজল

পঠিত : ৩৪২ বার

ads

মন্তব্য: ০