Alapon

সূদী মহাজন নয়, দেশ গড়তে চাই মীর কাসেমের মত নির্মোহ দ্বীনদার উদ্যোক্তা

অনেক তো জয়বাংলা হলো। চেতনাব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী কলঙ্কমূক্ত হলো দেশ। সময় এসেছে যোগ বিয়োগ করে মিলিয়ে দেখার। আজকাল টেলিভিশন খুলতেই কানে ভেসে আসে অনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর একটি মুখস্ত বক্তব্য। “বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।” যদিও জনমনে খুব বড় শঙ্কা রয়েছে এই ভেবে যে, আসলে বাংলাদেশ কোনদিকে এগিয়ে যাচ্ছে! আর কোনদিকেই বা এগিয়ে যাবে! যেদিকে এগিয়ে যাচ্ছে সেখান থেকে উঠে আসার কোন পথ বাকী থাকবে তো?

গত ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬ শনিবার দিবাগত রাতে বাংলাদেশের একজন খ্যাতিমান উদ্যোক্তা, ইসলামী অর্থনীতিবিদ, প্রথিতযশা সৎ ব্যবসায়ী মীর কাসেম আলীকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে নির্মমভাবে শহীদ করা হয়েছে। হত্যাকারীদের দাবি মীর কাসেম আলী নাকি ১৯৭১ সালে চট্টগ্রামে হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগের মত ঘৃন্য মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে জড়িত ছিলেন। যদিও রাষ্ট্রপক্ষ কিংবা তদন্তকারী সংস্থা এর কোন প্রকার সুনির্দিষ্ট প্রমাণই আদালতে উপস্থাপন করতে পারেনি। আর এরই প্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহাকে বরাবরের মতই রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবিদের দায়িত্বের বাইরে গিয়ে আগবাড়িয়ে ধমকাতে দেখা গেছে। কিন্তু তাতে ফরমায়েশী রায়ের কোন পরিবর্তন হয়নি। বিচারের নামে অবিচারের যে নজির স্থাপিত হয়েছে তা পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন বলে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক অনেক সংস্থা ও যুদ্ধাপরাধ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। আমি সে বিচার অবিচারের খতিয়ান আলোচনা করতে চাই না। শুধু এতটুকু বলতে চাই, শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লাকে যেভাবে কসাই কাদেরের বদলে হত্যা করা হয়েছে, আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে যেভাবে কুখ্যাত দেলু শিকদারের বদলে সাজা দেয়া হয়েছে, ঠিক একইভাবে মীর কাসেম আলীকে বাঙ্গাল খানের বদলে হত্যা করা হলো। প্রহসনের মাধ্যমে মীরকে করে দেয়া হলো খান, কাসেমকে করে দেয়া হলো বাঙ্গাল। আর এর মাধ্যমে জাতি হারালো এক নির্মোহ, দ্বীনদার, দানবীর উদ্যোক্তাকে।

৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই ছোট্ট দেশটি নিয়ে ষড়যন্ত্রের যেন শেষ নেই। সবাই এখানে আসে স্বার্থ হাসিলের জন্য। প্রাকৃতিক দূর্যোগে বারবার বিপর্যস্ত এই দেশটির দিকে সহযোগিতার নির্মোহ হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন এমন ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের সংখ্যা খুবই কম। অধিকাংশ ব্যক্তি, সংস্থা ও রাষ্ট্র এখান থেকে নেয়ার চেষ্টা করেছে ঢের, দেয়ার চেষ্টা করেছে যৎসামান্যই। যার ফলশ্রুতিতে ইংরেজ উপনিবেশ চলে যাওয়ার ৬৯ বছর পরেও বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল দেশ। অথচ একই সময়ে মালেয়শিয়া বিশ্ব অর্থনীতিতে দাপটের সাথে বিচরণ করছে।

এদেশের মানুষকে কখনো শোষণ করেছে পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী, কখনো রক্ষীবাহিনী, কখনো গণবাহিনী। কখনও দুর্নীতি আর লুটপাট করে দুর্নীতির সূচকের শীর্ষে নিয়ে গেছে কেউ। কেউ করেছে ব্যাংক ডাকাতি, কেউ মানি লন্ডারিং, কেউ শেয়ার বাজার লুট। কেউবা দেশের জনগণের টাকায় আমেরিকা, লন্ডন, কানাডায় গড়ে তুলেছে নিজের রাজ্য। প্রাসাদসম বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আর কত কি! কেউ আবার কোটি কোটি ডলার জমিয়েছে চোরদের ব্যাংক খ্যাত সুইস ব্যাংকে। এদের কারো নাম পানামা পেপার্সে আসে, কারো নাম আসে না। ছোট্ট এই দেশটি যেন লুটপাটের এক স্বর্গরাজ্য।

দেশের টাকায় দেশেই ভালো কিছু করা যায় এমন ধারণা যারা দিয়েছেন তাদের মধ্যে মীর কাসেম আলী অন্যতম। সুদভিত্তিক জুলুমতান্ত্রিক অর্থনীতির বিপরীতে ইসলামী অর্থনীতির আলোকে ইসলামী ব্যাংকিং এর ধারণা তিনিই এদেশের মানুষকে দিয়েছেন। সময়ের ব্যবধানে আজ দেশে অনেকগুলো ইসলামী ব্যাংক কাজ করে যাচ্ছে। এবং সাধারণ জনগণের আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। শুধু তাই নয়, তার অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়া সেই ইসলামী ব্যাংক আজ সারাবিশ্বের অন্যতম সেরা ব্যাংকের খ্যাতি অর্জন করেছে।

স্বাস্থ্যখাতে তার অবদান এদেশের মানুষ যূগ যূগ ধরে স্বীকার করবে। একটা সময় ছিল যখন মোটামুটি দূরারোগ্য ব্যাধি দেখা দিলেই এদেশের মধ্যবিত্তদের ছুটে যেতে হতো মাদ্রাজ, উচ্চবিত্তদের ছুটে যেতে হতো সুদূর সিঙ্গাপুরে। আর নিম্নবিত্তের তো মৃত্যু নিশ্চিত জেনেই হাল ছেড়ে দিতে হতো। মীর কাসেম আলী সে দৃশ্য পাল্টে দেয়ার অন্যতম নায়ক। স্বাস্থ্যসেবায় পথপ্রদর্শকের ভুমিকা পালন করার জন্য তিনি নিজের চিকিৎসক ভাইয়ের সহযোগিতায় তারই ফ্ল্যাট থেকে যাত্রা শুরু করেন ইবনে সিনার। যা আজ বাংলাদেশের আধুনিক চিকিৎসার রোল মডেল। অন্যান্য আধুনিক হাসপাতালগুলোতে যখন রোগী নিয়ে ব্যবসা করা হয়, ইবনে সিনায় তখন সেবাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে দেখা যায়।

পর্যটন শিল্পকেও তিনি দিয়েছেন নতুন মাত্রা। এ শিল্পের মাধ্যমে দেশের জন্য কুড়িয়ে এনেছেন অপার সম্ভাবনা। খুলে দিয়েছেন অবারিত স্বপ্নের দ্বার। অথচ সীমাহীন লুটপাট, ডাকাতি আর ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে একসময় যারা এই বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বানিয়েছিল আজ তারাই তাকে হত্যা করলো মিথ্যা অভিযোগে।

আমাদের দেশে যারা এখন বড় বড় ব্যবসায়ী এদের অধিকাংশই সূদী মহাজন। জনগণের রক্ত শুষে কোটি কোটি টাকা উপার্জন করে ভিনদেশের ব্যাংক ব্যালেন্স ভারী করা এদের নেশা। বড় হওয়ার নেশায় এরা কখনও ভূমিদস্যু, কখনও ঋণখেলাপী, কখনও শেয়ারবাজার লুটকারী, কখনও সূদী মহাজন। ব্যবসায়ী হলেই যেন এসবে জড়িয়ে পড়তে হবে। এর কোন বিকল্প তাদের জানা নেই। মানুষ ও মানবতার কল্যাণে যেন এদের কিছুই করার নেই। 

এরকম একটি উৎকট পরিবেশের বিপরীতে মীর কাসেম আলী দাঁড় করিয়েছিলেন এক Green Economy. মানুষ ও মানবতার কল্যাণে তিনি সৃষ্টি করেছেন নতুন সম্ভাবনার। যুব সমাজকে শিখিয়েছেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে। শিখিয়েছেন কিভাবে সীমিত পুঁজি খাটিয়ে সততা বজায় রেখেই ব্যবসায় লাভবান হওয়া যায়। ৫৬ হাজার বর্গমাইলের প্রতিটি প্রান্তে তিনি পৌঁছে দিয়েছেন মহান রবের সেই বাণী – “আল্লাহ ব্যবসায়কে হালাল করেছেন, সূদকে হারাম করেছেন।” মহান রব্বুল আলামীনের এই বাণীকে বুকে ধারণ করে তিনি একের পর এক দেশের কল্যাণে, মানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন। সফলও হয়েছেন। 

সূদী মহাজনী আর ভূমি দস্যূতা করে যারা বড় হয়েছেন তারা আজ তাকে নিয়ে নানা অপপ্রচারে লিপ্ত। তাকে হত্যা করতে নাস্তিক্যবাদী অবৈধ সরকার যতটুকু ভূমিকা পালন করেছে, তারচেয়ে কয়েকশ গুণ বেশি ভূমিকা পালন করেছে এই ভূমি দস্যু আর সূদী মহাজনদের মালিকানাধীন মিডিয়া। শাহাদাতের পরেও চালিয়ে যাচ্ছে সীমাহীন মিথ্যাচার। কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে চলেছে এই মহান মানুষটির চরিত্র হননের জন্য। কিন্তু তাতে কি? মীর কাসেম আলীর সাথে যারা চলার সুযোগ পেয়েছেন, মীর কাসেম আলীর সাথে যারা ব্যবসায় অংশগ্রহণ করেছেন, মীর কাসেম আলীর বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠান থেকে যারা সেবা নিয়েছেন তারা জানেন মীর কাসেম আলী কেমন মানুষ।

সেন্টমার্টিন নামক নৈসর্গিক দ্বীপটিকে পর্যটকদের কাছে আকর্ষনীয় করার পেছনেও তার রয়েছে অসামান্য অবদান। একসময় সেখানে যাওয়া মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। ট্রলারে করে সেন্টমার্টিন যেতে গিয়ে অনেক মায়ের বুক খালি হয়েছে এককালে। সেখানে কয়েকজন ব্যক্তির সহযোগিতায় মীর কাসেম চালু করেন কেয়ারি সিন্দাবাদ জাহাজ ও বিলাসবহুল প্রমোদতরী। বিপদে দুর্যোগে সহযোগিতায় ত্রাণকর্তার মত বিচ্ছিন্ন সেন্টমার্টিনের মানুষের সাহায্যে এগিয়ে গেছে এই কেয়ারি সিন্দবাদ। এখনও সেন্টমার্টিনের জনগণ ও পর্যটকদের আশা ও নির্ভরতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত হয়ে আছে এই কেয়ারি সিন্দাবাদ।

ছবি: ফাঁসির রায় শোনার পর নির্ভিক চিত্তে জনতার উদ্দেশ্যে হাত নাড়ছেন শহীদ মীর কাসেম আলী

দুনিয়ার মানুষের ঘৃণা, অপবাদ, মিথ্যাচার আর জুলুমে একজন শহীদের কিছুই যায় আসে না। তিনি মহান রব্বুল আলামীনের কাছে বিশেষ মর্যাদা পাচ্ছেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য যে অপার সম্ভাবনা জাগ্রত করে তিনি চলে গেলেন তার ভবিষ্যত কি কেউ একবার ভেবে দেখেছেন? অবৈধ ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে সরকার সরকারী ব্যাংকগুলো প্রায় সাবাড় করে ফেলেছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো আজ ঋণ দিতে ভয় পাচ্ছে। রিজার্ভ চুরি, অর্থকেলেঙ্কারী, লুটপাটের খবরে পত্রিকার পাতা পরিপূর্ণ। সমাধানের রাস্তা কোথায়? দেশটা নাকি কলঙ্কমূক্ত হলো, কিন্তু এত কলঙ্ক তবে কোথা থেকে এলো? এ কলঙ্ক যেভাবে দিন দিন মহীরুহে পরিণত হচ্ছে তাতে দেশ আবারও যে “তলাবিহীন ঝুড়ি” তে পরিনত হবে তা হলফ করে বলা যায়। 

সত্যিকার অর্থেই যদি দেশকে এগিয়ে নিতে হয়, তবে এই লুটেরাবান্ধব অর্থনীতি ত্যাগ করার বিকল্প নেই। সূদের সাথে লেগে থাকে গরীবের কলিজা ছেড়া রক্ত। আর সে রক্তমাখা অর্থনীতি দিয়ে কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণের পাল্লা ভারী হওয়াই স্বাভাবিক। সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে চাইলে তাই এদেশের জন্য সূদী মহাজন নয়, মীর কাসেমের মত অনেক অনেক বেশী দ্বীনদার ও নির্মোহ উদ্যোক্তার প্রয়োজন। যারা দেশের স্বার্থে দেশের মানুষের স্বার্থে রহম দীল নিয়ে ছুটে যাবে। আর্তপীড়িতের সেবায় বিলিয়ে দেবে নিজের জীবন। দুনিয়ার শানশওকতের চেয়ে আখেরাতের মুক্তিই হবে যাদের জীবনের উদ্দেশ্য।

(এই ব্লগটি ২০১৬ সালে শহীদ মীর কাসেম আলী রহিমাহুল্লাহর শাহাদাতের পর লেখা)

পঠিত : ১৭৯৯ বার

মন্তব্য: ০