Alapon

ধনী-গরিবের ব্যবধান কেন বাড়ছে?

দেশে অতি ধনী বা ধনকুবেরের সংখ্যা বেড়েছে। ধনীদের আয় বেড়েছে, সঞ্চিত সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে। অপর দিকে যারা গরিব তারা আরও গরিব হচ্ছে, তাদের আয় রোজগার কমেছে। উপরের যাত্রীর যাত্রা উপর দিকে অগ্রসর হচ্ছে আর নিচের যাত্রীর যাত্রা নিচের দিকে ধাবিত হচ্ছে। বিষয়টি সাধারণ নয়।

ব্যাপারটি এই দাঁড়িয়েছে যে, কেউ পাঁচতলায় আর কেউ গাছতলায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যে দেশের শতকরা ২৪ ভাগ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে, সে দেশে ভারসাম্যহীন পরস্পর বিপরীতমুখী অর্থব্যবস্থা সুখকর নয়। সম্প্রতি একটি পত্রিকার রিপোর্টে দেখা গেছে, বাংলাদেশের অতি ধনীদের সংখ্যা বেড়েছে গড়ে ১৭ শতাংশ, যা যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, ভারতসহ ৭৫টি উন্নত দেশের চেয়ে বেশি।

২০১০ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে দেশের সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ পরিবারের আয় প্রায় ৫৭ শতাংশ বেড়েছে। তাদের মাসিক আয় দাঁড়িয়েছে ৮৮ হাজার ৯৪১ টাকায়। বিপরীতে একই সময়ে সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশ পরিবারের আয় কমেছে ৫৯ শতাংশ। তাদের মাসিক আয় দাঁড়িয়েছে ৯৭৩ টাকায়, যা ২০১০ সালে ১ হাজার ৭৯১ টাকা ছিল। অর্থনীতিবিদরা বিষয়টিকে খুবই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন না।

কারণ একটি শ্রেণীর হাতে বড় অংশের সম্পদ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। ধনী-গরিবের মধ্যকার বৈষম্য বাড়ছে। বড় ধরনের ব্যবসা, বিনিয়োগের সুযোগ পাচ্ছে সরকারের কাছের লোকরা। সাধারণ ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের পরিসর ছোট হয়ে আসছে। ফলে পুঁজিপতি বড় ব্যবসায়ীরা আরও পুঁজির মালিক হচ্ছে।

বাংলাদেশে অতি ধনী বা যাদের কাছে ২৫০ কোটি টাকার চেয়ে বেশি সম্পদ রয়েছে তাদের সংখ্যা এতই বেড়েছে যে, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোকেও হার মানিয়েছে। কিন্তু দেশে এত এত পুঁজিপতি থাকা সত্ত্বেও নতুন নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে না, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না, বেকারত্বের হার কমছে না, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দরিদ্রতার গ্লানি মুছে না, ধনী-গরিবের তারতম্য কমছে না।

কিন্তু কেন? কারা কিভাবে রাতারাতি সম্পদের পাহাড় গড়তে সক্ষম হল? এসব প্রশ্ন দেশের সাধারণ মানুষের, নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের।স্বজনতোষী পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কারণে সমাজের কিছু লোক সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে। এ ধরনের অর্থব্যবস্থায় ব্যক্তিমালিকানা ও মুনাফা বণ্টনের ক্ষেত্রে অবাধ স্বাধীনতা রয়েছে। তবে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কল্যাণের প্রতি লক্ষ রাখা হয়নি।

উৎপাদন, মুনাফা অর্জন ইত্যাদির ক্ষেত্রে হালাল-হারাম ও বৈধ-অবৈধের কোনো সীমারেখা চিহ্নিত করা হয়নি। ফলে অবাধ শোষণ ও জুলুমের দ্বার উন্মুক্ত হয়। লুটপাট, সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি, প্রতারণা, ধোঁকা, কালোবাজারি, দ্রব্যে ভেজাল ইত্যাদি বৃদ্ধি পায়। মানুষের মাঝে এক ধরনের অনৈতিক মানসিকতা গড়ে ওঠে, চাহিদা লাগামহীন বেড়ে যায়, বাড়তি চাহিদাসৃষ্ট অভাবের তাড়নায় সমাজের সর্বত্র অবৈধ পন্থা অবলম্বনের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের তৎপরতা শুরু হয়, একশ্রেণীর মানুষের কাছে সম্পদ সঞ্চিত হতে থাকে।

এরকম অর্থব্যবস্থায় ধনী-গরিবের মাঝে একটা ফারাক বা দূরত্ব তৈরি হয়। পুঁজিপতিরা নিজের সঞ্চয়ের ভাণ্ডারকে আরও ভারি করার জন্য অধীনস্থদের ওপর শোষণ-নির্যাতন, অশুভ আচরণ করতেও দ্বিধাবোধ করে না। একক মালিকানার একচেটিয়া প্রভাবে সম্পদ আহরণে পুঁজিবাদীরা কোনো রকমের বাছ-বিচার করে না। যে কোনো পন্থায় চাই সম্পদ আহরণ, কুক্ষিগতকরণ, পুঞ্জীভূতকরণ। এমন দৃষ্টিভঙ্গির ফলে বিশেষ ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাতারাতি সম্পদের পাহাড় গড়তে সক্ষম হয়।

আর এর জের বহন করতে হয় সমাজের অপরাপর মানুষকে। মানবগোষ্ঠীর বিশাল একটি অংশকে সমাজের অর্থনৈতিক দৈন্য ও নিগ্রহের শিকার হতে হয় এবং তারা ন্যূনতম প্রয়োজনগুলোও পূরণ করতে ব্যর্থ হয়। উৎপাদন ও ভোগের মধ্যে সামঞ্জস্যহীনতা দেখা দেয়। এর ফলে সমাজে বেকারত্ব বাড়ে এবং ধনী-গরিবের বিস্তর তারতম্য সৃষ্টি হয়।

সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে যদি ব্যক্তি অবাধ মালিকানার অধিকার লাভ করার পরও শরীয়তের সীমারেখার মধ্যে থেকে আয়-উপার্জন ও ব্যয় করত, সুদ, ঘুষ, জুয়া, প্রতারণা ও সব ধরনের হারাম লেনদেন পরিহার করত, বাজার ব্যবস্থার ওপর দখলদারিত্ব থেকে বিরত থাকত, মানুষের মাঝে সহানুভূতি, সহমর্মিতা ও সদাচরণের মাধ্যমে পরোপকারের চেতনা থাকত, তাহলে ধনী-গরিবের মধ্যে এত তারতম্য সৃষ্টি হতো না।

একশ্রেণী বিপুল সম্পদের মালিক আর আরেক শ্রেণীকে অর্থনৈতিক দৈন্য ও নিগ্রহের শিকার হতে হতো না। ইসলাম সীমিত পর্যায়ে ব্যক্তিমালিকানা মেনে নিয়েছে। আল্লাহতায়ালা সংযত পর্যায়ে ধনী-গরিব উভয়ের মধ্যে পার্থক্য রেখে দিয়েছেন। অন্যের বঞ্চনা ও বিড়ম্বনার কারণ না হয়ে দাঁড়ায়, এজন্য আল্লাহ নির্ধারিত বিধানের আওতায় মানুষকে তার অর্থনৈতিক জীবন নিয়ন্ত্রিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।

রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘দুনিয়াতে এভাবে সীমিত পর্যায়ে জীবনযাপন কর, যেন তুমি ভিনদেশ থেকে আগত কোনো মুসাফির কিংবা পথিক।’ কোনো অবস্থাতেই যাতে ধনী-গরিবের এই পার্থক্য এক শ্রেণীর মানুষকে অসহায়ত্বের পর্যায়ে ঠেলে না দেয়া হয়, এক শ্রেণীর দ্বারা অন্য শ্রেণী শোষিত, নিপীড়িত ও নিগৃহীত না হয় এ ব্যাপারেও তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন।

এক শ্রেণীর উন্নতি অন্য শ্রেণীর দুঃখ-দারিদ্র্যের কারণ হয়ে দাঁড়াবে, এক শ্রেণী অন্য শ্রেণীকে নিজেদের আয়-উন্নতির হাতিয়ারে পরিণত করবে, এক শ্রেণী অন্য শ্রেণীকে অর্থনৈতিক গোলামে পরিণত করবে, এক শ্রেণী মালিক হয়ে অন্য শ্রেণীকে তাদের সেবাদাসে পরিণত করবে, এক শ্রেণী সুখ আর ভোগেই মেতে থাকবে, আরেক শ্রেণী তাদের সুখ ভোগের জন্য দারিদ্র্যের যূপকাষ্ঠে বলি হবে, এক শ্রেণী পাঁচতলায় থাকবে আরেক শ্রেণী গাছতলায় থাকবে- এই ব্যবধান ইসলাম মোটেও সমর্থন করে না।

কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে, ‘আমি দুনিয়ার জীবনে তাদের জীবনোপকরণকে বণ্টন করে দিয়েছি এবং কতিপয়কে কতিপয়ের ওপর মর্যাদাগত প্রাধান্য দিয়েছি, যাতে তারা একে অন্যকে কর্মে নিয়োগ করতে পারে।’ (সূরা যুখরুফ-৩২) অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে, ‘যাদের শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয়েছে তারা তাদের অধীনস্থদের নিজেদের সামগ্রী থেকে কিছুই দিতে চায় না, (তারা আশঙ্কা করে) এ সম্পদে তারা উভয়েই উভয়ের সমান হয়ে যাবে; তবে কি তারা আল্লাহর নেয়ামত অস্বীকার করছে?’ (সূরা নাহল-৭১)

ইসলাম অর্থনৈতিক কাঠামোকে এমনভাবে সাজিয়েছে যে, তাতে রাতারাতি কারও ফুলেফেঁপে বিরাট বৈভবের মালিক হয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ইসলামী অর্থনীতিতে সম্পদের বিন্যাস এভাবে করা হয়েছে যাতে একজন মানুষ যথারীতি পরিশ্রম করলে তার পরিশ্রমলব্ধ অর্থ দিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে নিজের এবং তার পরিবারের ভরণ-পোষণ করতে পারে। বিশাল বৈভবের মালিক বনে যাওয়া সহজে তার জন্য সম্ভব হবে না।

এজন্য ইসলাম উপার্জনের ক্ষেত্রে হালাল-হারামের সীমা চিহ্নিত করে বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে। লুটপাট, ধোঁকা, প্রতারণা ও জুলুমের মাধ্যমে সম্পদ উপার্জনের সব পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে। কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা অন্যায়ভাবে একে অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ কর না।’

অর্জিত সম্পদে বাধ্যতামূলকভাবে জাকাত, সাদাকাহ ইত্যাদি আদায়ের বিধান প্রবর্তন করে দেয়া হয়েছে। কার্পণ্যকে নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। সম্পদ জমা করে রাখা জান্নাত প্রাপ্তির অন্তরায় বলে ঘোষণা করা হয়েছে। নিজের প্রয়োজন পূরণের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তির সম্পদে নিকটাত্মীয়, পাড়া-প্রতিবেশী, সমাজ ও দেশের মানুষের সাহায্য-সহযোগিতাকে নৈতিক কর্তব্য বলে নির্ধারণ করা হয়েছে। এভাবে ইসলাম সম্পদকে বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে ব্যক্তিবিশেষের হাতে সঞ্চিত হওয়ার সব পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে।

যদি ধনকুবেরদের জীবন-ইতিহাস বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে দেখা যাবে তাদের ওইসব বিধি-বিধান অনুসরণের ক্ষেত্রে কোনো না কোনো ক্ষেত্রে ফাঁক-ফোকর রয়েছে, সেই ফাঁক দিয়েই সে বিশাল বৈভবের মালিক হয়েছে এবং অঙ্গুল ফুলে কলাগাছ থেকে বটগাছ বনে গেছে।

ইসলাম যেভাবে সম্পদের সুষম বণ্টনের ব্যবস্থা করে দিয়েছে, আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র যদি তা অনুসরণ করে অর্থনৈতিক কাঠামো ঠিক করত, তবে ধনী-গরিবের মাঝে তারতম্য সৃষ্টি হতো না, ধনীরা আরও ধনী গরিবরা আরও গরিব হতো না, সমাজের বেকারত্বের মাত্রা বৃদ্ধি পেত না, কেউ পাঁচতলায় আর কেউ গাছতলায় থাকত না, সমাজে একটা অর্থনৈতিক ভারসাম্য বিরাজ করত।

পঠিত : ১২৯৭ বার

মন্তব্য: ০