Alapon

একটি আচমকা আহত অনুভূতি...

স্টকহোম (Capital of Scandinavia/Sweden) শহরের ভাসা পার্কের ধার ঘেঁষে হাঁটছি। রাত এখন অনেক। কয়টা বাজে এটা দেখার কোন ইচ্ছা নেই আমার। উদ্দেশ্যহীন ভাবে হেঁটেই চলছি। কিছুক্ষণ আগে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি যেনো শহরটাকে ধুয়ে আরো চাকচিক্য করে তুলেছে। সোডিয়ামের আলোতে পুরো শহরটাই পরিস্কার এখন। বিশাল বিশাল অট্টালিকা, ফ্লাইওভার, ছোট ছোট দোকানের শাটার নামানোর শব্দ, পুলিশের গাড়ির সাইরেন এসবই দেখছি আর উপলব্ধি করার চেষ্টা করছি। 
-
এ শহরে একটা কুকুরও নাই রাস্তাঘাটে। তারা অনেক সভ্য আর বিলাসবহুল মনমানসিকতার। আমাদের দেশের কুকুরদের মতো মূর্খ আর আনকালচার না। আমি মাঝে মাঝে দেশে থাকতেও রাতে বের হতাম। কুকুরদের সাথে সময় কাটাতে পারতাম। একটা সাহস থাকতো মনে যে, আমি একা নই। এখানে এমন না। আমি আর সোডিয়ামের আলোতে রাস্তায় প্রতিফলিত আমার ছায়া মোট দুজন আছি। এমনটাই ভাবছি আপাতত। মাঝে মাঝে দু’একটি গাড়ি সাই করে পাশ কেটে যায়। কোথায় যাচ্ছি, জীবন কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, কেনো যাচ্ছি আপাতত এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানিনা, গন্তব্য জানা নেই। এই মুহূর্তে অনুভূতিতে বড্ড আহত আমি।
.
কিছু ঘটনার পুনরাবৃত্ত না হওয়াটাই ভালো, জানেন? অতীত ঘেটে স্মৃতিচারণ আমি করিনা কখনো। নিতে পারিনা একদম, কেমন যেন দূর্বল হয়ে পরি। অসহায় লাগে, অস্বস্তি লাগে। তাও আজকে কিছু স্মৃতি মনে পরে যাচ্ছে;
-
ইকরি মেয়েটাকে আমি হুট করেই দশ বছর আগে একদিন প্রপোজ করে বসেছিলাম। পুরো শহরের মানুষের সামনে একগুচ্ছ ফুল হাতে নিয়ে হাটু গেড়ে বসে। শহরের চৌরাস্তায় সেদিন জ্যাম লেগে গিয়েছিলো। কারো কোন অভিযোগ ছিলো না। সবাই যেনো ওই মুহৃর্তটাকে খুব বেশি উপভোগ করেছিলো চারপাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে। যখন ইকরি ফুল হাতে নেয় তখন করতালিতে মুখরিত হয়ে গিয়েছিলো চারপাশ। ওই সুন্দর মুহূর্ত মনে করলে নিজের উপর প্রচন্ড ঘৃণা হয় আমার। কেনো জানেন? 
কারণ প্রপোজটা আমি বন্ধুদের সাথে এক হাজার টাকা বাজি ধরে করেছিলাম। এক হাজার টাকার লোভে আমি এতো পাক্কা অভিনেতা বনে গিয়েছিলাম যে আমি নিজেকেই বিশ্বাস করতে পারিনি। ইকরি মেয়েটা শ্যাম বর্ণের লম্বা করে দেখতে। চুল তার ঘন কালো মেঘের ন্যায়। চোখজোড়া এতো পবিত্র আর মায়াবী সেটা ভুলার নয়। ও ছিলো আমাদের এলাকার ওসির মেয়ে। ওর বাবা ওকে আনা নেয়া করতো কলেজে। বোধকরি অনেকটা ভয়েই এলাকার পোলাপান ওরে ডিস্টার্ব করতো না। ইকরিকে আমি যেদিন প্রপোজ করি সেদিন আমাদের কলেজের শেষ দিন ছিলো। 
.
কলেজ লাইফে আমি এতটাই ডানপিটে স্বভাবের ছিলাম যে ক্লাসের কোন নাম গন্ধ'ই আমায় নাগাল পেতো না। ইকরি ছিলো আর্টস গ্রুপের আর আমি কমার্স। মূলত এর কারণেই ওর সাথে পূর্বে কখনো পরিচয় কিংবা খুব একটা দেখা হয়নি। শেষ ক্লাসে সব গ্রুপ অডিটরিয়ামে একত্রিত হয়ে ছিলাম। বন্ধুরা আমাকে মশকরা করে বলেছিল; "শালা দুটো বছর কাটিয়ে দিলি প্রেম ভালবাসা আর জুটেনি তর কপালে।" সেদিন গর্ব করেই বলেছিলাম, "এটা এখনো দুই মিনিটের ব্যাপার, চাইলেই পারি। কিন্তু এতে আমার রুচি নাই বিশেষ।" সেদিন আসিফ বলে উঠেছিল, "তুই বাপের বেটা হলে ইকরিকে প্রপোজ করে দেখা। দেখি কেমন কলিজা। খুব তো ফাউ বকছিস, এক হাজার টাকা বাজি।" বাজির কথাটা শুনে আর সাত পাঁচ না ভেবেই ক্লাস থেকে বের হয়ে ফুল কিনতে চলে গিয়েছিলাম। ছেলেবেলার আবেগ বলে কথা।
-
সেদিন কলেজ শেষে আমি ফুল নিয়ে রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম আর ইকরি ছিলো রাস্তার এপাশে। বন্ধুরা ঠেলাঠেলি করছিলো আমায়। ইকরি কিছু একটা আঁচ করে থ'হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বুকে ফুঁ দিয়ে খুব সাহস করেই সামনে এসে বসে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে টলমল চোখ নিয়ে বলেছিলাম; "ইকরি আমি তোমাকে ভালোবাসি, তোমার সাথে বৃদ্ধ হতে চাই। আমাকে ফিরিয়ে দিয়ো না প্লিজ।" ইকরি কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকালো একবার, তারপর হাত থেকে ফুলের তোড়া'টি নিয়ে হনহন করে চলে গিয়েছিল। সেদিন হৈ হুল্লোড় করে এক হাজার টাকা আদায় করে ছোটখাটো পার্টি দিয়েছিলাম বন্ধুদের নিয়ে। 
.
পরের দিন সকালে ইকরি এই ব্যাপারটা জানতে পারে যে, আমি তাকে বাজি ধরে প্রপোজ করেছিলাম। কোত্থেকে আমার নাম্বার কালেক্ট করে কল করে বলেছিলো; "রবিন তুমি একটু সময়ের জন্য ক্যান্টিনে আসবা এখন?" আমি গিয়েছিলাম। ইকরি সেদিন বেগুনী রঙের ওড়না আর কালো একটা জামা পরে এসেছিল। সেদিন এটাও টের পেয়েছিলাম, ইকরিকে দেখে বুকের ভেতর কোথায় একটা যেন ধুকপুক করেছিলো। খুব ঠান্ডা কন্ঠে আমাকে বলেছিলো; "আমাকে ভালোবাসো রবিন?" আমি ক্যাবলার মতো দাঁত কেলিয়ে হেসে বলেছিলাম; "আরে ধুর এমনি বাজি ধরে এটা করেছিলাম। তুমি তো কিছু শুনলা'ই না, শুনো কি হয়েছিলো..." ইকরি কিছু না শুনেই বলেছিলো; আসি আমি। বলে চলে গিয়েছিলো। তারপর আর দীর্ঘদিন দেখা হয়নি আমাদের।
-
ফাইনাল পরীক্ষার আরো কিছুদিন পর একদিন ইকরি ফোন করে বলেছিলো; "আগামীকাল বাসার নিচে ভোর ছয়টায় একটু আসবা?" আমি গিয়েছিলাম। সেদিন ওড়না দিয়ে মোড়ানো শুকনো মলিন চেহারা নিয়ে নিচে নেমে একটা খাবারের বাটি আর একটা চিরকুট ধরিয়ে বলেছিলো, "কেমন আছো রবিন? খুব শুকিয়ে গেছো, নিজের যত্ন নিও। চুলের একি অবস্থা? দেখি কাছে আসো" এটা বলে আমার চুল হাত দিয়ে আচঁড়ে দিয়েছিলো সেদিন, তারপর চিরকুটের ব্যাপারে বললো, "এটা বাসায় গিয়ে খুইলো।" সেদিন খুব মায়া হচ্ছিল ইকরির প্রতি। আমি বাসায় এসে চিরকুট'টা মানিব্যাগে পুরে রেখে ইচ্ছেমতো বাটি ভরা ভুনা খিচুড়ি গিলে ঘুমিয়ে পরেছিলাম। আমি এমনটাই ছিলাম, বিশ্বাস করেন। একটুও অনুভূতি কিংবা নূন্যতম ভাবনা জ্ঞানটুকুও আমার ছিল না। দায়িত্ববোধ কি সেটা তো দূরের কথা।
.
তারো কিছুদিন পর আমার মনে পরে তার চিরকুটের কথা। বের করে দেখি অনেক লম্বা করে চিঠির মতো করে কিছু লিখা;
-
প্রিয় রবিন,
আমি চিঠি লিখতে জানিনা। এটা চিঠি কিনা তাও জানিনা। কথাগুলো কিভাবে বলবো তাও বুঝে উঠতে পারিনি। অবশেষে চিঠির মতো করেই কিছু বলছি; পরীক্ষাটা আমার ভালো হয়নি, জানো? আমার কি হয়েছে আমি নিজেও জানিনা সেদিন থেকে। প্রতিটা মুহূর্ত আমি তোমাকেই ভেবেছিলাম। ভয় নেই, না এখানে কোন দাবী কিংবা কোন অধিকার কাটানোর ইংগিত আমি দিচ্ছিনা, বিশ্বাস করো। সেদিনের ব্যাপারটা নিতান্তই একটা মজার ঘটনা ছিলো। আমি কতটা বোকা দেখো, একটুও বুঝতে পারিনি সেটা মিথ্যা অভিনয় ছিলো। তোমার ছলছল চোখ দুটো এতো মাথাল করে দিয়েছিলো আমাকে যে, আমি কাঁপতেছিলাম। যেনো মাথা ঘুরে পরে যাবো। খুব করে চাইছিলাম তোমাকে জড়িয়ে ধরি কিংবা তুমিই আমাকে জড়িয়ে ধরো। সেদিন এতো মায়া করে অভিনয় কিভাবে করেছিলে রবিন? জানো আমি সারারাত ঘুমাইনি। আয়নার সামনে বউ সেজে দেখছিলাম নিজেকে। কি পাগলামি'টাই না করলাম মুহূর্তের মধ্যে। আব্বুর ভয়ে আমি ভুলেই গিয়েছিলাম আমার মধ্যেও কিছু আবেগ কিছু ভালবাসা সৃষ্টিকর্থা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেদিন আমি সব ভুলে গিয়ে তোমাকেই ভেবেছিলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে যখন শুনলাম এটা মিথ্যা অভিনয় ছিলো। তখন কেনো জানি মনে হয়েছিলো, "আমি হয়তো মরে যাচ্ছি" এতো সুন্দর মুহূর্ত এতো পবিত্র অনুভূতি কী করে মিথ্যা হয় আমি মানতে পারিনি। আমি তখনই তোমার সাথে দেখা করতে এসেছিলাম। তুমি একটুও দ্বিধাবোধ করো নাই এটা বলতে যে, "এটা মিথ্যা ছিলো।" আমি সেদিন দড়জা বন্ধ করে সারাদিন কেঁদেছিলাম রবিন। তোমাকে ধন্যবাদ এমন একটা মুহূর্ত আমাকে দেয়ার জন্য। হোক মিথ্যে, আমি সেই মুহূর্তটাই আগলে রাখবো আজীবন। আর হ্যাঁ খবরদার রবিন, আর কারো ইমোশন নিয়ে এভাবে খেলবানা আল্লাহর দোহাই লাগে। আজকে আমরা দেশের বাড়ি চলে যাচ্ছি। আব্বুর রিটায়ার্টমেন্ট হয়ে গিয়েছে। ভালোই হলো। আর হয়তো আমাদের দেখা নাও হতে পারে। ভালো থেকো।
ইতি,
'ইকরি'
.
আমি চিঠিটা পড়ে নিজের অজান্তেই কেঁদেছিলাম। আমি তখনো জানতাম না আমার কী করা উচিত। কিছুটা বোধোদয় হয়েছিলো। ফোনটা বের করে কল দিলাম। নাম্বার সুইচড অফ। দৌড়ে পাগলের মতো ছুটে এসেছিলাম ওর বাসার কাছে। ইকরি'রা সেদিনই চলে গিয়েছিল বাসা ছেড়ে। আর পাইনি। আমি সেদিন থেকেই ইকরিকে খুঁজে বেরিয়েছিলাম। আমার জীবনেও ভালোবাসা এসেছিলো কিংবা মনে ভালোবাসা জন্মেছিলো। আমি সেদিন থেকেই ইকরিকে ভালোবাসি। তার হাসি তার কথা বলা তার ছবি কল্পনায় আঁকা, সারাক্ষণ ওরে নিয়েই স্বপ্ন দেখতাম। আমার কষ্ট হতো খুব বেশি। প্রতিজ্ঞা করেছিলাম ওকে খুঁজে বের করবোই এবং আর কক্ষনো আমাকে ছেড়ে চলে যেতে দিবো না। কিন্তু না আর পাইনি ইকরিকে, সময়ের স্রোতে অদ্ভুত ভাবে সবকিছু ভুলে গিয়ে আবার নতুন করে চলতে লাগলাম।
-
অনার্স ফাইনাল ইয়ারে পড়ি। আমাকে আমার একটা কাজিনের সাথে সেবার রংপুর যেতে হয়েছিলো। কাজিন একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির অডিট অফিসার। তখন আমার মোটামুটি ফেসবুকে ভালোই পরিচিতি ছিলো। আমি একটা পোস্ট করেছিলাম, "হ্যালো রংপুর ইউ আর সো বিউটিফুল।" সেদিন একটা আইডি থেকে টেক্সট এসেছিলো;
- ভাইয়া আপনি কি রংপুরে?
- জ্বি।
- কোথায় উঠেছেন? 
- এইতো অমুক হোটেলে।
- আমি আপনার অনেক বড় ফ্যান। আগামীকাল কাইন্ডলি ভোর ছয়টায় নিচে নামবেন? আমি আসবো। জাস্ট এক মিনিটের জন্য আপনাকে দেখবো প্লিজ।
-
আমি নিচে গিয়েছিলাম। একটা মেয়ে বোরকা পরে রিকশা থেকে নেমে একটা ব্যাগ হাতে ধরিয়ে আবার রিকশায় উঠে চলে গিয়েছিলো। আমি অবাক হয়েছিলাম। কিছুই বললো না। উপরে ব্যাগ নিয়ে এসে দেখি অনেক খাবার। চালের গুঁড়ো দিয়ে বানানো রুটি, গরুর মাংস ভূনা, নুডলস সহ অনেক খাবার। ছোট একটা কাগজে মোড়ানো লবন। আমি কাঁচা লবন খাই না। জানালা দিয়ে বাইরে ওটা ফেলে দিয়ে ইচ্ছে মতো খাইলাম। কাজিনকে গর্ব করে বলেছিলাম; কি'ইবা উল্টাইলা অফিসার হয়ে? দেখছো আমার অবস্থান?" তারপর আর মেয়েটাকে ধন্যবাদ জানানোর'ও সুযোগ পাইনি। আইডিটা ডিএক্টিভেটেড করে দিয়েছিলো।
.
অনার্স শেষ করে চলে আসি সুইডেনে। এমবিএ করলাম। একটা কাজ জোটালাম, এটাতেই লেগে আছি। এভাবেই এখানে থাকছি অনেকদিন। আজকে সকালে স্টকহোম আসি ব্যাবসায়ের কাজে। কাজ শেষ করতে করতে রাত হয়ে গেছে তারউপর অনেক বৃষ্টি নেমেছে। কোনরকম একটা সুপার শপে দৌড়ে ঢুকলাম। খামোখাই কর্ণফ্লেক্স আর এটা সেটা কিনলাম। ক্যাশ কাউন্টারে এসে আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। কাছে যেতেই সেই শান্তশিষ্ট কন্ঠ, "স্যার ইওর নেম?"
কিছু না ভেবেই বললাম;
- কেমন আছো ইকরি?
-
ইকরি মাথা তুলে তাকিয়ে আর কিছু বলতে পারছিলো না। পেমেন্ট শেষ করে আউটসাইডে এসে দাঁড়ালাম। অনেকক্ষণ পর ইকরি বের হয়ে আসলো। নো চেঞ্জ, দশ বছর আগের ইকরি আর এখনের ইকরি একই আছে। ইকরি মলিন একটা হাসি দিয়ে বললো চলো হাটি, কাছেই আমার বাসা। ইকরি এখন খুব স্বাভাবিক। আমিও চেষ্টা করছি প্রাণপণে স্বাভাবিক থাকার। রাস্তায় এখন ইকরি আর আমি'ই হাটছি;
- কবে থেকে এদেশে আছো রবিন? চিনতেই পারছিলাম না। খুব মোটিয়ে গেছো।
- এইতো অনেকদিন হলো।
- কোন এরিয়াতে?
- ম্যারিনাসিটি গেট, এখান থেকে ভালোই দূরে। একটা কাজে এসেছিলাম। তুমি কবে থেকে?
- এইতো বছর চারেক।
- পালিয়ে এদেশে চলে আসলে ইকরি? কতো খুঁজেছি তোমাকে জানো?
- হাহাহা তাই নাকি? জানতাম নাতো।
- হাসতেছো কেনো ইকরি? সত্যিই আমি তোমাকে অনেক খুঁজেছি, সেদিনের চিঠিটা পড়ার পর থেকেই। আমি কতটা লজ্জিত আমি বুঝাতে পারবো না ইকরি। কতটাদিন আমি নির্ঘুম রাত কাটিয়েছি তার ইয়ত্তা নেই। খুব অভাগা তাই খুঁজে পাইনি তোমায়। আমি খুব বোকা ছিলাম তখন। যখন আমার থেকে দূরে সরে গেলে তখন আমি তোমার ভালবাসাটাকে ফিল করতে শিখি। এবং তখন থেকেই তোমাকে ভালোবেসেছি ইকরি। আমি হয়তো কিছুই বোঝাতে পারছি না। 
- নাইস জোক। এখনো এসব'ই করছো? পাক্কা অভিনেতা তুমি। আজকেও কাঁদতেছো! সেদিন যে আসতে বলেছিলাম, কই আসলে নাতো। 
- কবে? 
- যেদিন রংপুর এসেছিলে। ভোরে তোমাকে খাবার দিলাম। একটা লবনে মোড়ানো চিরকুটে বলেছিলাম সন্ধ্যায় একটা কফিশপে দেখা করবো। আমি ছিলাম তো অনেক্ষণ ওখানে। এসেছিলে? আসোনি। ফেসবুকে বলিনি, ভেবেছিলাম হঠাৎ আমাকে দেখে তোমার রিএক্ট কেমন হয় সেটা দেখবো। নাহ্, আমার সব আশাই মিথ্যে হয়েছিলো। সবকিছু মিথ্যে করে দিয়েছিলে। বেহায়ার মতো আমার প্রথম অনুভূতি আর ভালোবাসাটাকে বারবার পেতে চেয়েছি। তুমি দিব্যি অনেক ভালোই ছিলে রবিন। আমি ভালো ছিলাম না। পরে আইডিটা ডিএক্টিভেটেড করে ফেলেছিলাম। শেষ আশাটুকুও আর পূর্ণ হয়নি। হাহাহা আমিও কম অভাগা ছিলাম না। তারপর বিয়ে করে সুখে সংসার করছি। দেশে দম বন্ধ হয়ে আসায় স্বামীসহ এখানে আছি। 
- অহ্...
- আমার বাসার কাছে চলে এসেছি। তুমি কোথায় যাবা? অনেক রাত হলো তো।
- সামনে যাবো। সমস্যা নেই, তুমি যাও।
- আচ্ছা বিয়ে করেছো?
- উঁহু, ইচ্ছে নেই। 
- তুমি এভাবেই বেশ। ঠিক আছে গেলাম। ভালো থেকো।
- তুমিও।
.
ইকরি এতো স্বাভাবিক হওয়ার পরও বারবার ওর কন্ঠস্বর ভারি হয়ে আসছিলো। চোখ মুছে একরকম দৌড়ে চলে গেল আমার কাছ থেকে। ভালবাসা পাওয়ার মতো এতো কঠিন যোগ্যতা আমার হয়নি, হবেওনা। সবার সব কিছু পাওয়ার যোগ্যতা থাকে না। আমি জানিনা আমার মতো এমন হতভাগা কিংবা এমন এলোমেলো প্রাণী আর দ্বিতীয়টা আছে কিনা। মানুষ তার আবেগগুলো এতো কঠিন করে প্রকাশ কেনো করে বলেন তো? লবনে মোড়ানো কেনো থাকবে চিরকুট? ওটা বোঝার ক্ষমতা কেনো আমার ছিলো না? চিরকুট'টা জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দিয়েছিলাম এই কথাটি বলার সাহস হয়নি ইকরিকে। ওর অনুভূতিকে আর কতবার ছুড়ে ফেলবো?

আচ্ছা আমার আর কি করার ছিলো? আমিতো এমনই ছিলাম। তাও তো ভালোবেসেছি। দোষ ছিলো? এখানে কে হেরেছে কে জিতেছে? জীবন এমন কেনো? এতোদিন পর আবার এই মুহুর্তটা কেনো আসবে? এতো অদ্ভুত কেনো? এই বিদেশের মাটিতে কেনো আমাদের দেখা হবে? ভালোই তো জীবনটাকে গুছিয়ে নিয়েছিলো ইকরি। কেনো মেয়েটাকে আবার কাঁদতে হলো? মাথাটা ঝিম মেরে আছে। একা একাই হাঁটছি উদ্দেশ্যহীন ভাবে। নাহ্ অন্যকিছু বরং ভাবি;

এ শহরে একটা কুকুরও নাই রাস্তাঘাটে। তারা অনেক সভ্য আর বিলাসবহুল মনমানসিকতার। আমাদের দেশের কুকুরদের মতো মূর্খ আর আনকালচার না। আমি মাঝে মাঝে দেশে থাকতেও রাতে বের হতাম। কুকুরদের সাথে সময় কাটাতে পারতাম। একটা সাহস থাকতো মনে যে, আমি একা নই। এখানে এমন না। আমি আর সোডিয়ামের আলোতে রাস্তায় প্রতিফলিত আমার ছায়া মোট দুজন আছি। এমনটাই ভাবছি আপাতত। মাঝে মাঝে দু’একটি গাড়ি সাই করে পাশ কেটে যায়। কোথায় যাচ্ছি, জীবন কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, কেনো যাচ্ছি আপাতত এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানিনা, গন্তব্য জানা নেই। এই মুহূর্তে অনুভূতিতে বড্ড আহত আমি।



লিখাঃ Bablu Ahmed Robin

পঠিত : ২০৯৩ বার

মন্তব্য: ০