Alapon

কবি, কবিতা এবং এরশাদ

বাংলাদেশের ইতিহাসে একজন কবিই আছেন যার অসাধারণ কবিতাগুলো পত্রিকার ১ম পাতাতেই ছাপানো হতো। এমনকি যে পত্রিকার সম্পাদক আল মাহমুদ এবং শামসুর রাহমানের মতো কবি সেসব পত্রিকায়ও ছাপানো হতো। এমন বিরল সম্মান আর কবির বেলায় ঘটেনি। আপনারা কি সেই কবিকে চিনেন? তিনি আর কেউ নন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি লে. জে. হুসেইন মু. এরশাদ। ক্ষমতা পাওয়ার আগে উনি কবিতা লিখেছেন বলে কেউ জানতো না। আবার ক্ষমতা চলে যাওয়ার সাথে সাথে ওনার কবিত্বও হারিয়ে গেছে।

কবি, সাবেক রাষ্ট্রপতি রাজনীতিবিদ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তার জন্ম ১৯৩০ সালে উত্তরাঞ্চলীয়  জেলা রংপুরে। তাঁর পিতা ছিলেন একজন খ্যাতনামা আইনজীবী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫০ সালে তিনি স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। স্কুলে পড়ার সময়েই নাকি তার প্রথম কবিতা রচনার প্রথম প্রয়াস। বাংলাদেশের প্রকৃতি আর মানুষ কবির সকল মুগ্ধতার মধ্যে একটি একান্ত নিস্বর্গের মতো জন্ম নিয়েছিলো সেই কৈশোর কালেই। এমনটাই তিনি বলেছিলেন।

১৯৮৩ সালের অক্টোবর মাস। জেনারেল এরশাদ তখন বাংলাদেশের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। মাত্র তিনি যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে দেশে ফিরেছেন। সংসদ ভবনে তখন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দফতর (সিএমএলএ)। সেখানে রীতি অনুযায়ী এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। জেনারেল এরশাদ কথা বলবেন তার যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়ে।

"সংবাদ সম্মেলনটি হচ্ছিল পার্লামেন্ট ভবনের দোতলায় এক নম্বর কমিটি রুমে। জেনারেল এরশাদকে প্রচুর রাজনৈতিক প্রশ্ন করা হচ্ছিল, কারণ তিনি রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে ডেকেছিলেন। কিন্তু কোন দল তার ডাকে সাড়া দিচ্ছিল না। কেউ তার সঙ্গে কথা বলতে আসছিল না। বিরক্ত হয়ে জেনারেল এরশাদ বলেছিলেন, আমি কি রেড লাইট এলাকায় থাকি যে আমার সঙ্গে কেউ কথা বলবে না?"

সংবাদ সম্মেলনের এই পর্যায়ে জাহাঙ্গীর হোসেন নামে বাসসের সাংবাদিক উঠে দাঁড়িয়ে জেনারেল এরশাদকে বললেন, "মে আই আস্ক ইউ এ নন-পলিটিক্যাল কোয়েশ্চেন"- অর্থাৎ আমি কি আপনাকে একটি অরাজনৈতিক প্রশ্ন করতে পারি?

জেনারেল এরশাদ বেশ খুশি হয়ে গেলেন। কিন্তু জাহাঙ্গীর হোসেন যে প্রশ্নটি তাকে ছুঁড়ে দিলেন, সেটির জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না। একজন প্রবল ক্ষমতাধর সামরিক শাসক আর এক সাংবাদিকের মধ্যে এই প্রশ্নোত্তর পর্ব বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় প্রবাদতুল্য হয়ে আছে। ইংরেজীতে তিনি যে প্রশ্নটি ছুঁড়ে দিয়েছিলেন তার বাংলা তর্জমা এরকম: "আপনি ক্ষমতায় আসার আগে কেউ জানতো না আপনি একজন কবি। এখন সব পত্রিকার প্রথম পাতায় আপনার কবিতা ছাপা হয়। পত্রিকার প্রথম পাতা তো খবরের জন্য, কবিতার জন্য নয়। বাংলাদেশের প্রধানতম কবি শামসুর রাহমানেরও তো এই ভাগ্য হয়নি। আমার প্রশ্ন হচ্ছে আপনার কবিতা প্রথম পাতায় ছাপানোর জন্য কী কোন নির্দেশ জারি করা হয়েছে?"

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত সবাই হতচকিত। বিব্রত জেনারেল এরশাদ  প্রশ্নকারী সাংবাদিককে বললেন, আমি দেশের জন্য এত করি, এটুকু কি আপনি দেবেন না আমাকে?

"তখন আমি বললাম, ওয়েল জেনারেল, আস্কিং কোয়েশ্চেন ইজ মাই প্রিরোগেটিভ, আনসারিং ইজ ইয়োর্স। ইউ হ্যাভ নট আনসার্ড মাই কোয়েশ্চেন। মাই কোয়েশ্চেন ইজ....
জাহাঙ্গীর হোসেন এরপর তার প্রশ্নটি আবার করলেন।

এবার জেনারেল এরশাদ বললেন, "আপনি যদি চান, আর ছাপা হবে না।" এরপর পত্রিকার প্রথম পাতায় জেনারেল এরশাদের কবিতা ছাপা অনেকটাই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তার কবিতা প্রথম পাতা থেকে চলে গিয়েছিল ভেতরের পাতায়। তবে এর পরিণাম ভোগ করতে হয়েছিল জাহাঙ্গীর হোসেনকে।

এরশাদ কি সত্যি কবিতা লিখতেন এ ও এক রহস্য। জোর গুজব রয়েছে এরশাদের কবিতা লিখে দিতেন সৈয়দ আলী আহসান। সৈয়দ আলী আহসান অস্বীকার করেছেন যে ‘এরশাদের কবিতা তিনি লেখেননি। এসব নিছকই মিথ্যাচার। ’তবে কে লেখতেন তার কবিতা? আরেকজনকে নিয়ে রয়েছে তুমুল গুঞ্জন। তিনি হলেন ফজল শাহাবুদ্দীন। কিন্তু কবি ফজল শাহাবুদ্দীন যদিও তার লেখা ‘মৌমাছি দিনে ঘুঘু ডাকা রাতে’ বইতে বলেছেন, ‘ আমার বিরুদ্ধে যদিও ফিসফাস শুনি যে এরশাদের কবিতা আমি লিখে দেই কিন্তু তা সত্য নয়। এরশাদের সঙ্গে আমার ব্যাক্তিগত ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। বহুবার দেখা হয়েছে। আমি তার সাথে কবিতা নিয়ে আলাপ করেছি। এরশাদের কবিতা লিখে দিয়েছেন এমন তালিকায় আরো একজনের নাম আসে তিনি কবি ও সাবেক আমলা আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। কিন্তু তিনি জীবিতাবস্থায় কখনো এ বিষয়ে মুখ খোলেননি।

যাই হোক  তার কবিতা ভাবনা ও কাব্য জীবনের প্রতি তীব্র আগ্রহ ও ভালোবাসার বিষয়টি বিবেচনা করলে অনেকের মনে হতে পারে রাজনীতিবিদ কিংবা সেনাপ্রধান নয়, তার একান্ত তীব্র ইচ্ছে ছিলো কবি হওয়ার। মানব জীবনে এমনই লোভনীয় ‘কবি’ উপাধি। তাই তো জীবনের শেষ পর্যন্ত তিনি কবিতা ভালোবেসে এসেছেন। তার সেসব কাব্য সাধনার জন্যে আলোচিত ও সমালোচিত হয়েছেন।

কবি এরশাদের কবিতায় দেশের রুপ, সৌন্দর্য ও প্রকৃতির পাশাপাশি প্রেমের তীব্র আহ্বান লক্ষণীয়। তার একটি জনপ্রিয় কবিতা ‘প্রেমগীতি’। যেখানে কবি এরশাদ লিখেছেন- ‘ক্লান্ত বিকেলে অবশ পায়ে/ ঘুরেছি যখন এই পথে। শান্ত নদীর নিরব কিনারে/ দেখা হয়েছিলো তোমার সাথে।’ কবিতাটিতে তিনি প্রেমের তীব্র আহ্বানের কথা ব্যক্ত করেছেন এভাবে- ‘তোমার নয়নে নয়ন রাখিয়া/ বলেছিনু এসো প্রিয়া/ তাপিত হৃদয়ে ঝরনা ঝরাও/ প্রেমের অঞ্জলি দিয়া।’ এরকম বহু কবিতায় প্রতিফলিত হয়েছে কবি এরশাদের বাংলার রুপ, লাবণ্য, প্রকৃতিপ্রেম, মানবপ্রেমের মতো বিষয়গুলো।

প্রেমিক ও কবি এরশাদের জীবনে বহু সংখ্যক প্রেম আসা সত্ত্বেও তারা কারো থেকেই চিরস্থায়ী মানসিক সঙ্গ তিনি ঠিকভাবে পাননি। এছাড়া রাজনৈতিক জীবনেও ছিলো নানা ব্যর্থতা। এসব নিয়ে তাকে বেশ নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করতে হয়েছে। তাই তো জাপার এক সভায় প্রস্থানরত স্ত্রী রওশনের হাত ধরে থামিয়ে তিনি তাকে শোনান তারই লেখা একটি কবিতার কয়েকটি পঙক্তি- ‘নিঃসঙ্গ ধূসর বিশাল এক অন্ধকারে/ আমি জেগে আছি/ কোথায় উষার জ্যোতি/ কতদূর আলোর মৌমাছি?’ এবং তার স্ত্রীকে বলেন, রওশন তুমি আমার আলোর মৌমাছি।

কবিতার পাশাপাশি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সাহিত্যের অন্যান্য শাখা নিয়েও বই লিখেছেন। তবে কবিতার তার অপার প্রেম ছিলো। এখন অবধি তার লেখা ২৭টিরও বেশি বই বইমেলায় প্রকাশ পেয়েছে। অবশ্য এর মধ্যে মাত্র ৪টি গদ্যগ্রন্থ বাকি সবই কবিতার বই। এসব কবিতার বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘হে আমার দেশ’, ‘ঈদের কবিতা’, ‘বৈশাখের কবিতা’, ‘প্রেমের কবিতা’, ‘একুশের কবিতা’, ‘যে কবিতা সুর পেল’, ‘জীবন যখন যেমন’ ও ‘এক আকাশে সাত তারা’ ইত্যাদি। এছাড়া এরশাদের সকল কবিতা এক মলাটে পাঠকের হাতে পৌছে দিতে আকাশ প্রকাশনী থেকে প্রকাশ ‘এরশাদের কবিতাসমগ্র’ বইটি।

লেজেহুমু এরশাদ নিয়ে এদেশে অনেক সমালোচনা হচ্ছে এবং হবে। তবে এটা সত্য তার সাহিত্যানুরাগের ফলে তার আমলে কবি সাহিত্যিকেরা বিশেষ মর্যাদা পেয়েছেন। তার আনুকূল্য ও পৃষ্ঠপোষকতায় বহু কবি সংগঠন, সাহিত্য সভা ও সাহিত্য পত্রিকা চালু হয়েছে।  

পঠিত : ২৪৭৮ বার

মন্তব্য: ০