Alapon

ক্যাসিনো, যুবলীগ ও স্বৈরাচারের খেলা

আমি যখন ঢাকায় নাজিল হয়েছি তখন সেটা ছিলো ২০১৫ সাল এবং সেটা আরামবাগে। তখন দেশ ছিলো রাজনৈতিকভাবে উত্তাল। সেই উত্তাল সময়েও বাফুফে ভবনের আশে পাশে গড়ে ওঠা ক্লাবগুলোকে দেখেছি নিরবিচ্ছিন্নভাবে জুয়া, মদ ও নৃত্যের আসর বসাতে।

কেউ ফুটবলের উন্নতির কথা বললে আমি হাসতাম কারণ চোখের সামনে দেখছি ক্লাবগুলোর সামনে ফুটবলের প্রতিকৃতিটাই আছে শুধু। বাকীটা ইতিহাস। আমি কখনো এই জুয়ার ও মদের ব্যপারটা (দেশের আইনে) অবৈধ মনে করতাম না। আমি ভেবে নিয়েছি এই ক্লাবগুলোর আয়ের উৎসই এটা এবং তারা তা প্রশাসনের অনুমতি নিয়েই করে।

ইয়ংমেন্স ক্লাবের একশ গজের মধ্যেই আছে পুলিশের মতিঝিল মডেল থানা। প্রতিটি ক্লাবের সামনে সন্ধ্যার সময় থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পুলিশ পাহারা থাকতো। আমি ভেবে নিয়েছি বহু টাকার লেনদেন হয় তাই নিরাপত্তার বিষয়টা জোরদার আছে।

জুয়ার বিষয়ে এখানে কোনো রাখঢাক ব্যাপার ছিলো না। প্রতিটি ক্লাবের সামনেই দালালরা একধরনের টিকেট হাতে জুয়া খেলার জন্য আহ্বান করতো। ওয়ান্ডারাস ক্লাবের পাশে একটি দোকানে দারুণ রঙ চা বানায়। ঐ এলাকায় থাকতে আমি প্রায়ই দোকানটিতে রঙ চা খেতাম। সেই চা খাওয়ার সুবাদে কয়েকবার জুয়া খেলার দাওয়াত পেয়েছি।

দালালগুলো অবশ্য সবাইকে দাওয়াত দেয় না। চেহারা দেখে বদখত টাইপের মানুষদের দাওয়াত দেয়। আমার চেহারার রুক্ষভাব তাদেরকে বিভ্রান্ত করেছে। যাই হোক, ক্লাবগুলোর সামনে দিয়েই আমি নিয়মিত বাসায় আসা যাওয়া করতাম। এছাড়া ক্লাবগুলোকে ঘিরে স্ট্রিটফুডের মেলা বসতো সে কারণেও ক্লাবগুলোর আশে পাশে আমার যাতায়াত সবসময় ছিলো। আমি কখনো বুঝতে পারিনি এখানে অবৈধ কাজ হয়।

কারা ক্লাব গুলো নিয়ন্ত্রণ করে যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয় তবে একবাক্যে যার নাম আসবে তিনি হলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক মমিনুল হক সাঈদ। তিনি আরামবাগ-ফকিরাপুলের ডন। বাড়ি ব্রাহ্মনবাড়িয়া হলেও তিনি ঢাকার বড় টেরর।

সর্বশেষ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে তিনি ৯নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হয়েছেন। তিনি সবসময় এখানে দলবল নিয়ে হাঁটেন। জামায়াত-বিএনপি সমর্থিত বাড়িওয়ালাদের এলাকাছাড়া করেছেন। দৈনিক সংগ্রামের বিশাল বিল্ডিংসহ আরো কয়েকটি বিল্ডিং দখলে নিয়ে ভাড়া তোলেন। এলাকারা সকল নাগরিক সুবিধা (নেট, ডিশ, পানি, ময়লা ইত্যাদি) তার ছেলেপেলেরা নিয়ন্ত্রণ করেন। এলাকার সব দোকান ও প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা তোলেন ইত্যাদি নানান কাজ করেন।

তিনি ক্লাবগুলোতে জুয়া খেলেন কিনা বা মদ খান কিনা এই বিষয়ে আমি বলতে পারবো না। তবে ক্লাবগুলোতে তার দলবলসহ আনাগোনা ছিলো চোখে পড়ার মতো। একবার কী একটা বিষয়ে বাফুফের সাথে দ্বন্দ্ব হয়। সেই সূত্রে তিনি বাফুফে ভবনে হামলা চালিয়ে বাফুফের দফারফা করে ছেড়ে দেন। তিনি হাজি সাহেব মানুষ। নির্বাচনে জেতার পর সুন্দর দাঁড়িও রেখেছেন। তার সাদা চুল ও সফেদ দাঁড়ি তাকে পীর আউলিয়ার পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

আর কে নিয়ন্ত্রণ করে? এই প্রশ্ন করলে বলবো আরেকজন আওয়ামী নেতাকে আমি দেখেছি। কিন্তু তার নাম জানা নেই। তিনি প্রায়ই চেয়ার পেতে ক্লাবগুলোর সামনে বসে আড্ডা দিতেন। ওনার কারণে বিভিন্ন সময়ে দেখা যেতো রাস্তা বন্ধ। রিকশা ঘুরে অন্য পথে চলতে হতো।

আর যার কথা না বললেই নয় তিনি হলেন ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট। সম্রাট ভাইকে দেখতে খুবই ভালো লাগে। তার চেহারায় মায়া আছে। সাথে আছে শিবির স্টাইলের দাঁড়ি। আমি ঢাকায় এসে সম্রাট ভাইয়ের ছবি সর্বত্র দেখতাম। আমার অগ্রজদের জিজ্ঞাসা করতাম, ভাই এই লোকটা কে? মনে হয় যেনো জামায়াত নেতা।

সম্রাট ভাই হলেন সবার নেতা। তিনিই সব। তিনি আরামবাগে আসলে পুলিশ রাস্তা ক্লিয়ার করে দেন। সবাই দাঁড়িয়ে ভাইকে স্বাগত জানান। এতদিন থাকার পরও আমি যাকে চিনতাম না তিনি হলেন খালেদ মাহমুদ ওরফে ল্যাংড়া খালেদ। এখন মিডিয়ায় দেখি তিনিই নাকি সব।

আরেকজনের কথা জানি কিন্তু তাকে ক্লাব পাড়ায় খুব একটা দেখা যেতো না। তিনি হলেন এই অঞ্চলের সংসদ সদস্য আমাদের প্রিয় নেতা, মাওলানা ভাসানীর যোগ্য অনুসারী আলহাজ্ব কমরেড রাশেদ খান মেনন। তিনি প্রতিটি ক্লাবের চেয়ারম্যান। মদ জুয়া থেকে আসা টাকার তিনি একজন বৈধ অংশিদার।

যাই হোক এত কথা বলার উদ্দেশ্য হলো এতদিন ধরে পুলিশি নিরাপত্তায় নির্বিঘ্নে চলা একটা বিশাল চেইন মদ-জুয়ার ব্যবসা যা হঠাৎ করে অবৈধ হয়ে পড়লো কেন?

কারণ একটাই কোনো স্বৈরাচার চায় না কেউ নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী হয়ে যাক। সেটা যুবলীগের সভাপতিই হোক বা ছাত্রলীগের সভাপতি হোক। এদেরকে তাই বিভিন্ন সময়ে টাইটে রাখে স্বৈরাচার। অথচ এদের অবৈধ ইনকামের অংশ হাসিনা পর্যন্ত পৌঁছে। এরা তো দলের নেতা-কর্মী মাত্র, স্বৈরাচাররা তাদের পরিবারের লোকজনকেও ক্ষমতার ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র ছাড় দেয় না।

এই যে দেখুন, রব্বানী শয়তানটা আগে যে কাজ করতো নতুন শয়তানগুলা একই কাজ করছে। ভিসির বিরুদ্ধে আন্দোলনরত ছাত্রদের পিটিয়ে আধ্মরা করেছে। সবকিছুই হাসিনার ইঙ্গিতে চলে। সেই সাপ সেই ওঝা। এই করে সে সবকিছু নিজের পদানত রাখতে চায়। কাউকে বাড়তে দেয় না। বাড়তে গেলেই ছাঁটাই করে বনসাই করে রাখে। এটাই স্বৈরাচারের খেলা।

পঠিত : ৮৮৭ বার

মন্তব্য: ০