Alapon

দিল্লী ভ্রমণ : লাল কেল্লা পরিদর্শন...


দিল্লী পৃথিবীর অন্যতম শহরগুলোর মাঝে একটি। নতুন দিল্লী ভারতের রাজধানী। আয়তনের দিক দিয়ে দিল্লী ভারতের বৃহত্তম শহর। জন সংখ্যার দিক থেকে মোম্বাইয়ের পরের স্থান দিল্লী। বহু মুসলিম শাসকেরা দীর্ঘ বছর দিল্লীকে শাসন করেছেন। দিল্লীর যেখানেই যাওয়া হোক না কেন, অতীত কালের কোন ঐতিহ্য চোখে পড়বেই। ১২০৬ সালে দাশ বংশ দিয়ে দিল্লী শাসিত হয়ে পরবর্তীতে খিলজী রাজবংশ, তুঘলূগ রাজবংশ, মামলূক রাজবংশ, লোধী রাজবংশ এবং সর্বশেষে মোগল রাজবংশ দিল্লী শাসন করেন। মাঝ খানে মুহাম্মদ বিন তুঘলূগ কয়েক বছর দিল্লী থেকে রাজধানী সরিয়ে দৌলতাবাদে নিয়ে যান। এই ঘটনা ইতিহাসে তুঘলূগি কাণ্ড হিসেবে চিত্রিত হয়েছে। এই সময়ে বিখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতা ভারতে এসে দিল্লীর ভরা যৌবন দেখেছিলেন। অতঃপর দিল্লী থেকে রাজধানী সরে যাবার পরে আবারো দিল্লীকে দেখতে এসেছিলেন! তিনি দেখেন, বিধ্বস্ত জনপদের সকল বাড়ী-ভবনগুলো মাটির সাথে মিশে গেছে! কালের সাক্ষী হয়ে, যত্র তত্র কিছু খুঁটি দাড়িয় থাকা ছাড়া বিরান জনপদে আর কিছুরই অস্তিত্ব ছিলনা। তখন দিল্লীকে বলা হত 'জ্বীনের শহর'। এর পরেও দিল্লী আজ ভারতের রাজধানী! মোগল সম্রাট শাহজাহান দিল্লীকে "শাহজাহানাবাদ" নাম দিয়ে মোগল সাম্রাজ্যের রাজধানী প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৬৪৯ থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ দুইশত বছরের বেশী সময় মোগল সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল দিল্লী। ব্রিটিশ ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি মুসলমানদের হাত থেকে ভারতের ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল। ফলে, মুসলমানদের কৃষ্টি ঐতিহ্য যেখানে ছিল, সেখান থেকে তারা দূরে থাকতে চেষ্টা করেছেন! তারা প্রথমে কলিকাতাকে রাজধানী করে। পরে নিজেদের মত সাজিয়ে এবং মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাকে এড়িয়ে দিল্লীর আরেকটি অংশকে নতুন দিল্লী নাম দিয়ে, ব্রিটিশ রাজ শাসক ১৩ই ফেব্রুয়ারি ১৯৩১ সালে নয়া দিল্লীকে ভারতের নতুন রাজধানী ঘোষণা করেন। এখনও নয়া দিল্লী ভারতের রাজধানী।

দিল্লীতে অনেকগুলো পর্যটন স্পট রয়েছে। সারা শহরেই কোথাও না কোথাও ইতিহাসের নিদর্শন পাওয়া যায়। শুধুমাত্র এক দিল্লী শহর ভ্রমণ করলেই ইতিহাসের সমৃদ্ধশালী আটশত বছরের ঘটনা পঞ্জির সাথে পরিচিত হওয়া যায়। এখানে রয়েছে লাল কেল্লা, পুরাণ কেল্লা, শাহী জামে মসজিদ, কুতুব মিনার, নিযামুদ্দিন, কুতুব উদ্দীন বখতিয়ার কাকীর দরগাহ সহ নানা ধরণের মুসলমানদের নিদর্শন। এসব নিদর্শনই মূলত সারা বিশ্বের পর্যটকদের আকৃষ্ট করে রাখে।

ভারতে ভ্রমণের জন্য প্রথমে অবশ্য দিল্লীকে বাছাই করা হয়। ভারত প্রতি বছর কোটি কোটি রুপী পর্যটন শিল্প থেকেই আয় করে। দিল্লীর বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান ও অবস্থান সম্পর্কে আমি আগেই বিস্তারিত লিখা পড়া করে নিয়েছিলাম। তাই এসব স্থান ভাল করে দেখার জন্য পর্যাপ্ত সময় হাতে রেখেছিলাম। সেজন্য বাংলাদেশ থেকে কোন ট্যুরের সাথে যোগ না দিয়ে একাকী দিল্লী গমন করি। দিল্লীর শহরের স্থায়ী অধিবাসী সুন্দর নগরের বাসিন্দা আমার কলিগ ও বন্ধু ‘মনিন্দর সিং’ বলে দিয়েছিল দিল্লী এয়ারপোর্ট থেকে বের হওয়া মাত্রই, লাগেজ থেকে বাংলাদেশ সম্পর্কিত সকল ট্যাগ যেন খুলে ফেলি। এই পদ্ধতি ব্যবহার করে অনেক উপকৃত হয়েছিলাম। পরিকল্পিত অর্থের চেয়ে অর্ধেকেরও কম অর্থে আমার ভ্রমণ কর্ম সমাধা করতে পেরেছিলাম। দিল্লী জামে মসজিদের ঠিক পিছনের একটি হোটেলে গিয়ে উঠে পড়ি। এলাকাটি বাংলাদেশের চক বাজারের মত। নিম্ন, মধ্য ও ধনিক শ্রেণীর মানুষের খাবার পাওয়া যায়। তাছাড়া এলাকাটি মুসলিম সংখ্যা গরিষ্ঠ তাই অনেক কিছুর সাথে বাংলাদেশী মানুষদের সামঞ্জস্যতা আছে। এখান থেকে পায়ে হেটেই, লাল কেল্লা, দিল্লী জামে মসজিদ ভ্রমণ করা যায়। এখানে অবস্থান করেই আমি আমার দিল্লী ভ্রমণ শুরু করি।

লাল কেল্লা পরিদর্শন:

দিল্লীর প্রধানতম আকর্ষণ লাল কেল্লা। লাল পাথর দিয়ে তৈরি বিশাল দুর্গের নাম, 'লাল কেল্লা'। সম্রাট শাহজাহানের নির্দেশে ১৬৩৮ খৃষ্টাব্দে কেল্লার নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং দশ বছরে সেটির কার্যক্রম শেষ করেন। অপূর্ব সুন্দর, নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ধরন দেখে যে কোন মানুষ তাজ্জব হয়ে চোখ কপালে তুলবে। লাল কেল্লার ভিতরে যেন আলাদা আরেকটি শহর! লাল কেল্লার তিনটি বিশাল ফটক রয়েছে, দেওয়াল গুলো খুবই উঁচু, দেওয়ালের শীর্ষদেশ খুবই প্রশস্ত। চার জন মানুষ অনায়াসে পাশাপাশি একসাথে দৌড়াতে পারবে! কেল্লার সীমানা প্রাচীরের বাহিরে রয়েছে বিশাল গর্ত বা পরিখা। তা যেমনি প্রশস্ত, তেমনি গভীর। কোন অবস্থাতেই শত্রু লাফিয়ে এই পরিখা পার হতে পারবে না। একবার পরিখায় পড়ে গেলে উপরে উঠতে পারবে না। শত চেষ্টায় কোন মাধ্যম দিয়ে যদি একবার উপরে উঠা যায়, তাহলে প্রাচীর ডিঙ্গানো তো দূরের কথা, প্রাচীরের উপরেই উঠতে পারবেনা। অবাক করা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং তার স্থাপত্যশৈলী। আর সদর দরজার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও খুবই নিখুঁত! শত্রু পক্ষের যতজন মানুষ দরজা ভাঙ্গতে আসুক না কেন, তাদের মোকাবেলার জন্য ভিতর থেকে দশ জন মানুষই যথেষ্ট!

কেল্লার ভিতরে রয়েছে বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যালয়। আছে 'দেওয়ানী আম'। দিওয়ান অর্থ রাজ দরবার, আম-অর্থ সাধারণ মানুষ অর্থাৎ সাধারণ মানুষের সাথে সম্রাটের দর্শন স্থল। এখানে সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে সাধারণ নাগরিকেরা সম্রাটের সাথে দেখা করতে পারত। এই ভবনেই স্থাপিত হয়েছিল বিশ্ববিখ্যাত "ময়ূর সিংহাসন"। ভবনটিতে শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়। দূরের একটি শব্দও পরিষ্কার শোনা যায়। আরো রয়েছে, 'দেওয়ানী খাস', খাস অর্থ স্পেশাল মানুষ। আমলা, সচিব, মন্ত্রী, ছোট রাজ্যের রাজাদের সাথে মিলিত হবার স্থান। সম্রাট শাহজাহান লাল কেল্লার জন্য পৃথিবীর বহু দেশ থেকে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ ও সে সব পালনের জন্য মাটি সংগ্রহ করেছিলেন। এখনও প্রচুর বিরল প্রজাতির গাছে ভরপুর 'লাল কেল্লা'।

ঢুকার পথেই গাইড আছে, তাদের স্থানীয় মুদ্রা রুপি দিয়েই সাথে নিতে হয়, তারা প্রতিটি স্থান সুন্দর বিবরণে পর্যটক দের বুঝিয়ে দেন। আমি একাই দেখছি কেননা আমার সম্যক ধারণা আগে থেকেই ছিল। তাছাড়া ইংরেজিতে বিস্তারিত বর্ণনা যথাস্থানেই দেওয়া আছে। কৌতূহল বশত: আমার পাশেই একদল পর্যটককে বোঝাচ্ছেন এমন একজন গাইডের বক্তব্য শোনার আগ্রহ হল। তিনি বোঝাচ্ছেন, লাল কেল্লা প্রতিষ্ঠা করতে পেরে সম্রাট শাহজাহান অনেক বেশী খুশী হয়েছিলেন। তিনি নাকি প্রায়ই মদ খেয়ে বলতেন, “পৃথিবীতে যদি কোন বেহেশত থেকে থাকে, তাহলে সেটি হল লাল কেল্লা। এটিই একমাত্র বেহেশত"! আমি তাজ্জব হয়েছি কেননা ইতিহাসে এ ধরনের উক্তি আমি কোথাও পাইনি। সন্দেহ নেই মোগল সম্রাটেরা বিলাসী ছিলেন, বর্তমান যুগের ক্ষমতাশীলেরাও তার থেকে ব্যতিক্রম নয়। তবে তারা যথেষ্ট সৃষ্টিশীল ছিল এবং সারা দুনিয়ায় নেতৃত্বের আসনে ছিল, এই বাক্যেও সন্দেহ নেই। আমি মূলত সেদিকটিই এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। তবে মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত তথ্য দিয়ে পর্যটকদের বিভ্রান্ত করার কয়েকটি দৃশ্য আমি নিজেই দেখেছি! বুঝতে পারলাম ইতিহাস না জানলে ভুল তথ্য গিলে দেশে ফিরতে হবে।

লাল কেল্লা আসলেই দেখবার মত এক নান্দনিক স্থান। কেল্লার ভিতরে রয়েছে, রং মহল, খাস মহল, মমতাজ মহল, মোতি মহল সহ অনেকগুলো ভবন। সবগুলোর আকার আকৃতি ভিন্ন। সম্রাজ্ঞী মমতাজ এখানকার মমতাজ মহলেই বসবাস করতেন। তার মৃত্যুর বহুবছর পরেই নির্মাণ হয় জগত বিখ্যাত স্থাপনা তাজ মহল। এসব মহলের নিচ দিয়ে রয়েছে পানি চলাচলের মোহনা। বাটিতে মোমবাতি জ্বালিয়ে স্রোতের পানিতে ছেড়ে দিলে সেটা প্রতিটি মহলের নিচ দিয়ে ঘুরে যাবে। শোনা যায় সম্রাট এভাবেই নাকি অন্তঃ-মহলে চিঠি পাঠাতেন। এটি দেখে ঘটনাস্থলে আমার কাছে পবিত্র কোরআনের সেই আয়াত মনে পড়ে গিয়েছিল, "জান্নাতিন তাজরী মিন তাহতিহাল আনহার" অর্থ 'সে সব জান্নাতের তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হবে স্রোতস্বিনী'। এটা আমার অমূলক ধারণা। কেননা এসব সৃষ্টিশীল প্রকৌশলী তদানীন্তন দুনিয়ার শ্রেষ্ঠতম কারিগর ছিলেন। মার্বেল পাথরে নির্মিত গোসল খানা দেখলে, তার শিল্পের প্রশংসা না করে পারা যায়না। গোসল খানার তলদেশে দিয়ে সদা পানি প্রবাহিত হবার জন্য সুন্দর প্রস্রবণের ব্যবস্থা করা হয়েছে, সেটা না দেখা পর্যন্ত লিখে বর্ণনা সম্ভব নয়!

বর্তমানে লাল কেল্লার বৃহৎ অংশ জুড়ে রয়েছে সেনা ক্যাম্প। লাল কেল্লার প্রধান গেইটের সামনে রয়েছে বিশাল ময়দান। এই ময়দানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের যাদুকর, বাজিকর, সওদা পাতি, ভিন দেশের নতুন জিনিষ সহ সবই হাজির হত। এই ময়দান প্রতিদিন কার বাজার ও মেলার মত তেতে উঠত। সম্রাট নিজে কিংবা তাঁর অন্দর মহলের সাথীরা গেইটের উপরে দাড়িয়ে তা দেখা এবং অনুষ্ঠান উপভোগ করতে পারতেন। কেউ দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারলে ভিতরে ঢুকার অনুমতি পেত। এই গেইটের উপরে দাড়িয়ে সম্রাট জনগণের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতেন। বর্তমানেও ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসে এই একই স্থানে দাড়িয়ে ভারতের প্রেসিডেন্ট জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়ে থাকেন। মূলত লাল কেল্লা চিরদিন মনে রাখার মত একটি নিদর্শন।

দিল্লী পৃথিবীর অন্যতম শহরগুলোর মাঝে একটি। নতুন দিল্লী ভারতের রাজধানী। আয়তনের দিক দিয়ে দিল্লী ভারতের বৃহত্তম শহর। জন সংখ্যার দিক থেকে মোম্বাইয়ের পরের স্থান দিল্লী। বহু মুসলিম শাসকেরা দীর্ঘ বছর দিল্লীকে শাসন করেছেন। দিল্লীর যেখানেই যাওয়া হোক না কেন, অতীত কালের কোন ঐতিহ্য চোখে পড়বেই। ১২০৬ সালে দাশ বংশ দিয়ে দিল্লী শাসিত হয়ে পরবর্তীতে খিলজী রাজবংশ, তুঘলূগ রাজবংশ, মামলূক রাজবংশ, লোধী রাজবংশ এবং সর্বশেষে মোগল রাজবংশ দিল্লী শাসন করেন। মাঝ খানে মুহাম্মদ বিন তুঘলূগ কয়েক বছর দিল্লী থেকে রাজধানী সরিয়ে দৌলতাবাদে নিয়ে যান। এই ঘটনা ইতিহাসে তুঘলূগি কাণ্ড হিসেবে চিত্রিত হয়েছে। এই সময়ে বিখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতা ভারতে এসে দিল্লীর ভরা যৌবন দেখেছিলেন। অতঃপর দিল্লী থেকে রাজধানী সরে যাবার পরে আবারো দিল্লীকে দেখতে এসেছিলেন! তিনি দেখেন, বিধ্বস্ত জনপদের সকল বাড়ী-ভবনগুলো মাটির সাথে মিশে গেছে! কালের সাক্ষী হয়ে, যত্র তত্র কিছু খুঁটি দাড়িয় থাকা ছাড়া বিরান জনপদে আর কিছুরই অস্তিত্ব ছিলনা। তখন দিল্লীকে বলা হত 'জ্বীনের শহর'। এর পরেও দিল্লী আজ ভারতের রাজধানী! মোগল সম্রাট শাহজাহান দিল্লীকে "শাহজাহানাবাদ" নাম দিয়ে মোগল সাম্রাজ্যের রাজধানী প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৬৪৯ থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ দুইশত বছরের বেশী সময় মোগল সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল দিল্লী। ব্রিটিশ ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি মুসলমানদের হাত থেকে ভারতের ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল। ফলে, মুসলমানদের কৃষ্টি ঐতিহ্য যেখানে ছিল, সেখান থেকে তারা দূরে থাকতে চেষ্টা করেছেন! তারা প্রথমে কলিকাতাকে রাজধানী করে। পরে নিজেদের মত সাজিয়ে এবং মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাকে এড়িয়ে দিল্লীর আরেকটি অংশকে নতুন দিল্লী নাম দিয়ে, ব্রিটিশ রাজ শাসক ১৩ই ফেব্রুয়ারি ১৯৩১ সালে নয়া দিল্লীকে ভারতের নতুন রাজধানী ঘোষণা করেন। এখনও নয়া দিল্লী ভারতের রাজধানী।

দিল্লীতে অনেকগুলো পর্যটন স্পট রয়েছে। সারা শহরেই কোথাও না কোথাও ইতিহাসের নিদর্শন পাওয়া যায়। শুধুমাত্র এক দিল্লী শহর ভ্রমণ করলেই ইতিহাসের সমৃদ্ধশালী আটশত বছরের ঘটনা পঞ্জির সাথে পরিচিত হওয়া যায়। এখানে রয়েছে লাল কেল্লা, পুরাণ কেল্লা, শাহী জামে মসজিদ, কুতুব মিনার, নিযামুদ্দিন, কুতুব উদ্দীন বখতিয়ার কাকীর দরগাহ সহ নানা ধরণের মুসলমানদের নিদর্শন। এসব নিদর্শনই মূলত সারা বিশ্বের পর্যটকদের আকৃষ্ট করে রাখে।

ভারতে ভ্রমণের জন্য প্রথমে অবশ্য দিল্লীকে বাছাই করা হয়। ভারত প্রতি বছর কোটি কোটি রুপী পর্যটন শিল্প থেকেই আয় করে। দিল্লীর বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান ও অবস্থান সম্পর্কে আমি আগেই বিস্তারিত লিখা পড়া করে নিয়েছিলাম। তাই এসব স্থান ভাল করে দেখার জন্য পর্যাপ্ত সময় হাতে রেখেছিলাম। সেজন্য বাংলাদেশ থেকে কোন ট্যুরের সাথে যোগ না দিয়ে একাকী দিল্লী গমন করি। দিল্লীর শহরের স্থায়ী অধিবাসী সুন্দর নগরের বাসিন্দা আমার কলিগ ও বন্ধু ‘মনিন্দর সিং’ বলে দিয়েছিল দিল্লী এয়ারপোর্ট থেকে বের হওয়া মাত্রই, লাগেজ থেকে বাংলাদেশ সম্পর্কিত সকল ট্যাগ যেন খুলে ফেলি। এই পদ্ধতি ব্যবহার করে অনেক উপকৃত হয়েছিলাম। পরিকল্পিত অর্থের চেয়ে অর্ধেকেরও কম অর্থে আমার ভ্রমণ কর্ম সমাধা করতে পেরেছিলাম। দিল্লী জামে মসজিদের ঠিক পিছনের একটি হোটেলে গিয়ে উঠে পড়ি। এলাকাটি বাংলাদেশের চক বাজারের মত। নিম্ন, মধ্য ও ধনিক শ্রেণীর মানুষের খাবার পাওয়া যায়। তাছাড়া এলাকাটি মুসলিম সংখ্যা গরিষ্ঠ তাই অনেক কিছুর সাথে বাংলাদেশী মানুষদের সামঞ্জস্যতা আছে। এখান থেকে পায়ে হেটেই, লাল কেল্লা, দিল্লী জামে মসজিদ ভ্রমণ করা যায়। এখানে অবস্থান করেই আমি আমার দিল্লী ভ্রমণ শুরু করি।

লাল কেল্লা পরিদর্শন:

দিল্লীর প্রধানতম আকর্ষণ লাল কেল্লা। লাল পাথর দিয়ে তৈরি বিশাল দুর্গের নাম, 'লাল কেল্লা'। সম্রাট শাহজাহানের নির্দেশে ১৬৩৮ খৃষ্টাব্দে কেল্লার নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং দশ বছরে সেটির কার্যক্রম শেষ করেন। অপূর্ব সুন্দর, নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ধরন দেখে যে কোন মানুষ তাজ্জব হয়ে চোখ কপালে তুলবে। লাল কেল্লার ভিতরে যেন আলাদা আরেকটি শহর! লাল কেল্লার তিনটি বিশাল ফটক রয়েছে, দেওয়াল গুলো খুবই উঁচু, দেওয়ালের শীর্ষদেশ খুবই প্রশস্ত। চার জন মানুষ অনায়াসে পাশাপাশি একসাথে দৌড়াতে পারবে! কেল্লার সীমানা প্রাচীরের বাহিরে রয়েছে বিশাল গর্ত বা পরিখা। তা যেমনি প্রশস্ত, তেমনি গভীর। কোন অবস্থাতেই শত্রু লাফিয়ে এই পরিখা পার হতে পারবে না। একবার পরিখায় পড়ে গেলে উপরে উঠতে পারবে না। শত চেষ্টায় কোন মাধ্যম দিয়ে যদি একবার উপরে উঠা যায়, তাহলে প্রাচীর ডিঙ্গানো তো দূরের কথা, প্রাচীরের উপরেই উঠতে পারবেনা। অবাক করা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং তার স্থাপত্যশৈলী। আর সদর দরজার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও খুবই নিখুঁত! শত্রু পক্ষের যতজন মানুষ দরজা ভাঙ্গতে আসুক না কেন, তাদের মোকাবেলার জন্য ভিতর থেকে দশ জন মানুষই যথেষ্ট!

কেল্লার ভিতরে রয়েছে বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যালয়। আছে 'দেওয়ানী আম'। দিওয়ান অর্থ রাজ দরবার, আম-অর্থ সাধারণ মানুষ অর্থাৎ সাধারণ মানুষের সাথে সম্রাটের দর্শন স্থল। এখানে সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে সাধারণ নাগরিকেরা সম্রাটের সাথে দেখা করতে পারত। এই ভবনেই স্থাপিত হয়েছিল বিশ্ববিখ্যাত "ময়ূর সিংহাসন"। ভবনটিতে শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়। দূরের একটি শব্দও পরিষ্কার শোনা যায়। আরো রয়েছে, 'দেওয়ানী খাস', খাস অর্থ স্পেশাল মানুষ। আমলা, সচিব, মন্ত্রী, ছোট রাজ্যের রাজাদের সাথে মিলিত হবার স্থান। সম্রাট শাহজাহান লাল কেল্লার জন্য পৃথিবীর বহু দেশ থেকে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ ও সে সব পালনের জন্য মাটি সংগ্রহ করেছিলেন। এখনও প্রচুর বিরল প্রজাতির গাছে ভরপুর 'লাল কেল্লা'।

ঢুকার পথেই গাইড আছে, তাদের স্থানীয় মুদ্রা রুপি দিয়েই সাথে নিতে হয়, তারা প্রতিটি স্থান সুন্দর বিবরণে পর্যটক দের বুঝিয়ে দেন। আমি একাই দেখছি কেননা আমার সম্যক ধারণা আগে থেকেই ছিল। তাছাড়া ইংরেজিতে বিস্তারিত বর্ণনা যথাস্থানেই দেওয়া আছে। কৌতূহল বশত: আমার পাশেই একদল পর্যটককে বোঝাচ্ছেন এমন একজন গাইডের বক্তব্য শোনার আগ্রহ হল। তিনি বোঝাচ্ছেন, লাল কেল্লা প্রতিষ্ঠা করতে পেরে সম্রাট শাহজাহান অনেক বেশী খুশী হয়েছিলেন। তিনি নাকি প্রায়ই মদ খেয়ে বলতেন, “পৃথিবীতে যদি কোন বেহেশত থেকে থাকে, তাহলে সেটি হল লাল কেল্লা। এটিই একমাত্র বেহেশত"! আমি তাজ্জব হয়েছি কেননা ইতিহাসে এ ধরনের উক্তি আমি কোথাও পাইনি। সন্দেহ নেই মোগল সম্রাটেরা বিলাসী ছিলেন, বর্তমান যুগের ক্ষমতাশীলেরাও তার থেকে ব্যতিক্রম নয়। তবে তারা যথেষ্ট সৃষ্টিশীল ছিল এবং সারা দুনিয়ায় নেতৃত্বের আসনে ছিল, এই বাক্যেও সন্দেহ নেই। আমি মূলত সেদিকটিই এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। তবে মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত তথ্য দিয়ে পর্যটকদের বিভ্রান্ত করার কয়েকটি দৃশ্য আমি নিজেই দেখেছি! বুঝতে পারলাম ইতিহাস না জানলে ভুল তথ্য গিলে দেশে ফিরতে হবে।

লাল কেল্লা আসলেই দেখবার মত এক নান্দনিক স্থান। কেল্লার ভিতরে রয়েছে, রং মহল, খাস মহল, মমতাজ মহল, মোতি মহল সহ অনেকগুলো ভবন। সবগুলোর আকার আকৃতি ভিন্ন। সম্রাজ্ঞী মমতাজ এখানকার মমতাজ মহলেই বসবাস করতেন। তার মৃত্যুর বহুবছর পরেই নির্মাণ হয় জগত বিখ্যাত স্থাপনা তাজ মহল। এসব মহলের নিচ দিয়ে রয়েছে পানি চলাচলের মোহনা। বাটিতে মোমবাতি জ্বালিয়ে স্রোতের পানিতে ছেড়ে দিলে সেটা প্রতিটি মহলের নিচ দিয়ে ঘুরে যাবে। শোনা যায় সম্রাট এভাবেই নাকি অন্তঃ-মহলে চিঠি পাঠাতেন। এটি দেখে ঘটনাস্থলে আমার কাছে পবিত্র কোরআনের সেই আয়াত মনে পড়ে গিয়েছিল, "জান্নাতিন তাজরী মিন তাহতিহাল আনহার" অর্থ 'সে সব জান্নাতের তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হবে স্রোতস্বিনী'। এটা আমার অমূলক ধারণা। কেননা এসব সৃষ্টিশীল প্রকৌশলী তদানীন্তন দুনিয়ার শ্রেষ্ঠতম কারিগর ছিলেন। মার্বেল পাথরে নির্মিত গোসল খানা দেখলে, তার শিল্পের প্রশংসা না করে পারা যায়না। গোসল খানার তলদেশে দিয়ে সদা পানি প্রবাহিত হবার জন্য সুন্দর প্রস্রবণের ব্যবস্থা করা হয়েছে, সেটা না দেখা পর্যন্ত লিখে বর্ণনা সম্ভব নয়!

বর্তমানে লাল কেল্লার বৃহৎ অংশ জুড়ে রয়েছে সেনা ক্যাম্প। লাল কেল্লার প্রধান গেইটের সামনে রয়েছে বিশাল ময়দান। এই ময়দানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের যাদুকর, বাজিকর, সওদা পাতি, ভিন দেশের নতুন জিনিষ সহ সবই হাজির হত। এই ময়দান প্রতিদিন কার বাজার ও মেলার মত তেতে উঠত। সম্রাট নিজে কিংবা তাঁর অন্দর মহলের সাথীরা গেইটের উপরে দাড়িয়ে তা দেখা এবং অনুষ্ঠান উপভোগ করতে পারতেন। কেউ দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারলে ভিতরে ঢুকার অনুমতি পেত। এই গেইটের উপরে দাড়িয়ে সম্রাট জনগণের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতেন। বর্তমানেও ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসে এই একই স্থানে দাড়িয়ে ভারতের প্রেসিডেন্ট জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়ে থাকেন। মূলত লাল কেল্লা চিরদিন মনে রাখার মত একটি নিদর্শন।

লিখেছেন: নজরুল ইসলাম টিপু

পঠিত : ৩৯০ বার

ads

মন্তব্য: ০