Alapon

ভাষা চলে জনগণের মত করে; কারও সেবাদাষ হয়ে নয়...


কিছু কথা স্ট্রেইটকাট বলাই ভাল, যদিও তাতে থাকে নানামুখী বিপদের ভয়, কেননা এই কথাগুলি স্ট্রেইট না বললে কথাগুলি তাদের লক্ষ্যে পৌছায় না। এমন একটা কথা হল- তথাকথিত আধুনিক বাংলা সাহিত্য ও বাংলা একাডেমী উভয়েই যথাক্রমে একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী, সুনির্দিষ্ট কৃষ্টি ও সুনির্দিষ্ট রাজনীতির বাহক। এই গোষ্ঠী হচ্ছে কোলকাতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়, যারা দেশে সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের প্রবক্তা।

জমিদারী প্রথা বিলোপ পেলেও এরা নিজেদের কালচারাল জমিদার বলে মনে করেন এবং জমিদারদের মতই, ভিনদেশী প্রভুদের ধামাধরা রাজনীতি ও সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার মাধ্যমে দেশের সাধারন মানুষের, বিশেষভাবে ইসলাম ও মুসলিম সংশ্লিষ্ট যাবতীয় পরিচয় ও প্রতীকের বিরুদ্ধে তাদের গোষ্ঠীস্বার্থ টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেন।
এটা কিভাবে হয় তা একটু বলি।

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ভাষারীতি তৈরি করেছে কোলকাতার পন্ডিতরা, বাংলা ভাষাকে একেবারে ভেতর থেকে পাল্টে দিয়ে। উনিশ শতকের আগ তক প্রচুর আরবী-ফারসী শব্দ মিশ্রির যে বাংলাটা সুবে বাঙ্গালার সর্বত্র চালু ছিল, যা বাংলাদেশের সোনালী যুগ সুলতানী আমলে বাংলার সুলতানদের প্রচেষ্টায় সমৃদ্ধ হয়েছে ও মুঘল-নবাবী আমলেও নিজের স্বকীয়তা বজায় রেখেছে সেই বাংলাটাকে খুব যত্ন করে কোলকাতার পন্ডিতদের মাধ্যমে ব্যাপ্টাইজ/শুদ্ধি করা হয়। এই বাংলাটাকে বামুনেরা ঘেন্না করতেন যবনের ভাষা হিসেবে, কিন্তু কোটি কোটি মানুষের মুখে তো আর তারা সংস্কৃত ধরিয়ে দিতে পারেন না, তাই বরঞ্চ ভাষাটাকেই ভেতর থেকে বদলে দিলেন।
এই পুরো কাজের তত্ত্বাবধানে ছিল ব্রিটিশ সরকার।
সেই থেকে আজতক বাঙ্গালি মুসলমানের মুখের ভাষা আর তার লিখিত ভাষার সাথে মেলে না।

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের গোড়া ইংরেজের মদদে কোলকাতার পন্ডিতেরা এমনভাবে কিছু খুটিতে বেধে দিয়েছেন যার ফলে প্রায় এক শতাব্দী বাংলার মুসলমান আর সাহিত্যের রাজসভায় পা রাখতে পারে নাই। কাগজপত্রের বাংলা তার কাছে হয়ে গেছে অচেনা।
এই অচলায়তন প্রথম ভেঙ্গে দেন কাজী নজরুল ইসলাম। মীর মশাররফ হোসেন অত্যন্ত জনপ্রিয় হলেও এই তথাকথিত আধুনিক বাংলার বিরুদ্ধে নিজেদের ঐতিহ্যবাহী যবানী বাংলাকে সাহিত্যের মূলস্রোতে প্রথম জায়গা করে দিতে পেরেছিলেন কাজী নজরুল ইসলামই। এরপর সচেতন/অবচেতনভাবে বহু মুসলিম লেখক ও সাহিত্যিক এই চর্চাটাকে একটু একটু করে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। খেয়াল করলে দেখবেন, এই দলে আল মাহমুদ-হুমায়ুন আহমেদও আছেন।

আবুল মনসুর আহমদের বাংলাদেশের কালচার এবং ফাহমিদ উর রহমানের আ মরি বাংলা ভাষা, আহমদ ছফার যদ্যপি আমার গুরুর মত বইগুলি পড়লে পরিষ্কার হয় আমাদের শেকড় থেকে কি পরিকল্পিত উপায়ে আমাদের বিচ্ছিন্ন করে সাহিত্য ও সংস্কৃতি/কৃষ্টির রাজপথ থেকে আমাদের জাতিকে কানাগলিতে ঢুকিয়ে রাখা হয়েছে। এই কোলকাতাইয়া পন্ডিতরাই নিজেরা ভারতে যোগ দিয়ে হিন্দির আধিপত্য মেনে নিয়ে আমাদের আরো বেশি করে কিভাবে বাঙ্গালি হওয়া যায় সেই সবক দিতে চেষ্টা করেন।

ফোর্ট উইলিয়াম কলেজকে ব্রিটিশ সরকার দায়িত্ব দিয়েছিল আধুনিক বাংলা ভাষা নামের শেকড়বিচ্যুতিকরণ প্রকল্পের বাস্তবায়ন করতে, এই একই ভুমিকা বাংলাদেশে পালন করছে বাংলা একাডেমী।

তাদের কাছে ঈদ, নবী, শহীদ এগুলিকে বিদেশী শব্দ মনে হয়, তাই এরা এই শব্দগুলির বানান বদলে দিয়ে এগুলির ব্রাক্ষ্মনীকরন করতে চায়। আরে ভাই আরবী-ফারসী শব্দ যা সাত আটশো বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে চলছে সেগুলি এখন আর বিদেশী থাকে কি করে?? চেয়ার কি এখন আর ইংরেজী শব্দ আছে?? পিরিচকে কি বিদেশী শব্দ বলা যাবে?? কুরবানী বা নামায তাইলে বিদেশী কেন হবে?? ঈদকে আমি কেন জোর কইরা ইদ লিখবো??
বাংলা একাডেমীর সাহিত্য পুরস্কার থেকে শুরু করে অমর একুশে বইমেলার স্টলবিন্যাস, সর্বত্র চলছে এই কালচারাল জমিদারী। দেশের মুসলমানদের যেভাবে কোলকাতাইয়া জমিদারশ্রেণী ভাবতো অচ্ছুৎ গোমুখ্যু, ঠিক এই মানসিকতাই ধরে রেখেছে বাংলা একাডেমী।

সবখানে একপ্রকার প্রকাশ্য ইসলামবিদ্বেষ ও ইসলামোফোবিয়া জারি রাখাই বাংলা একাডেমীর অঘোষিত মিশন ও ভিশন হিসেবে দাড়িয়ে গেছে। এই কারনেই আমি বাংলা একাডেমীর বানানরীতিকে কিছুক্ষেত্রে স্ট্যান্ডার্ড মানি না। কারন এসব ক্ষেত্রে বাংলা একাডেমী বর্ণবাদী আচরণ করে।

বাংলা একাডেমী অমর একুশে বইমেলাকে দেখাতে চায় একটা সার্বজনীন সাংস্কৃতিক উৎসব হিসাবে। তারা মনে করে এর মাধ্যমে তারা বাংলা ভাষার ওপর সেক্যুলারিজমের মোড়কে যে কোলকাতার আধিপত্য চলে তা টিকায়ে রাখবে।

এই কালচারাল মনোপলির বিরুদ্ধে একটা মারণাঘাত ইতোমধ্যেই হাজির হয়েছে শাপলা চত্বর পরবর্তী লিটারারি রেভলিউশানের পয়লা ঢেউয়ের মাধ্যমে। এই আঘাত ক্রমেই গভীরতর হচ্ছে কারন বই বিক্রি এখন অনলাইনের সুবাদে আর একচেটিয়া বইমেলাকেন্দ্রিক নাই। সর্বশেষ গত ইসলামী বইমেলাও একটা সুস্পষ্ট মেসেজ দিয়েছে যে মানুষ আসলে এখন কি চায়।

বাংলা একাডেমী নিজেকে কালচারাল জমিদারীর মন্দির আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সেবায়েত হিসেবে টিকায়ে রাখতে চায়, কিন্তু ভাষা তো চলে জনগনের মত করে।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য শিগগির তার মূলের দিকে আরো জোরেসোরে রওয়ানা করবে ইনশা আল্লাহ। এনআরসি, কাশ্মীর ও উপমহাদেশের হালের ভুরাজনীতি এই সফরকে আরো জোরকদম করবে, এতে কোন সন্দেহ নাই, কারন প্রতিটি রাজনীতিই সচেতনভাবে কোন না কোন কৃষ্টির প্রস্তাব করে। প্রাসঙ্গিক রাজনৈতিক কৃষ্টি অপ্রাসঙ্গিক/মেয়াদোত্তীর্ণ রাজনৈতিক কৃষ্টিকে প্রতিস্থাপন করে।

বাংলা একাডেমীর এসব খবরদারি-জমিদারিকে আমরা এখন আর গুনি না। বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশ ক্রমেই নিজ মূলে ফেরত আসবে ইনশা আল্লাহ

পঠিত : ১৬৪ বার

ads

মন্তব্য: ০