Alapon

জীবাণু অস্ত্রের গল্প



করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে পৃথিবী বন্ধ হয়ে গেছে। এটা কি শুধু একটা ভাইরাস নাকি ল্যাবের গবেষণাগারে তৈরি হওয়া ফেব্রিকেটেড ভাইরাস। আমাদের আজকের আলোচনা অবশ্য করোনাভাইরাস নিয়ে নয়। জীবাণু অস্ত্রের ল্যাব নিয়ে কথা। অবাক করা তথ্য হলো জীবাণু অস্ত্রের ১ম ল্যাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ঢাকায়।

১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লব সংঘটিত হয়। তারই হাত ধরে কম্যুনিস্ট আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। ১ম ও ২য় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একত্রে যুদ্ধ করে জয়ী হয়ে কম্যুনিস্টরা পৃথিবীতে আরো বেশি ছড়িয়ে পড়ে।

বিশ্বযুদ্ধে হেরে যাওয়া দেশগুলোর ভাগ নিয়ে (যেমন জাপান, কোরিয়া) এবার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের বিরোধ নিয়মিত হয়। আদর্শবাদী কম্যুনিস্টদের উত্থানে শংকিত হয় পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো। সেই সাথে মুসলিম জাতীয়তাবাদের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তানও কম্যুনিস্টদের নিয়ে শংকায় থাকে। কারণ উজবেকিস্তান, তাজাকিস্তানসহ বহু মুসলিম রাষ্ট্র এমনকি আফগানিস্তানেও কম্যুনিস্ট আন্দোলন জমে উঠেছিলো। যদিও পাকিস্তানে কম্যুনিস্ট নিষিদ্ধ ছিল তারপরও আওয়ামীলীগের আড়ালে কম্যুনিস্টরা একটিভ ছিলো।

যাই হোক কোরিয়া নিয়ে চীন ও আমেরিকার দ্বন্দ্বে কোরিয়া দুইভাগ হয়ে গেল। সেই দ্বন্দ্বের সূত্র ধরে আমেরিকা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কম্যুনিস্টদের বিরুদ্ধে ১৯৫৪ সালে একটি সামরিক জোট গঠন করে। এটি Southeast Asia Treaty Organization (SEATO) নামে পরিচিত। সিয়াটো চুক্তি ম্যানিলা চুক্তি নামেও পরিচিত। এই সামরিক চুক্তিটিতে স্বাক্ষর করেছে আটটি রাষ্ট্র। তারা হলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ড।

চুক্তি অনুসারে এই রাষ্ট্রগুলো কম্যুনিস্টদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াই করার প্রস্তুতি নেয়। সিয়োটার নেতৃত্বে জীবাণু অস্ত্র নিয়ে গবেষণার জন্য একটি রিসার্চ সেন্টার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। সদস্য দেশ পাকিস্তানে এই সেন্টার প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়। সেসময় পূর্ব-পাকিস্তানে কলেরার বেশ প্রকোপ দেখা যায়। তাই এই জীবাণু অস্ত্রের রিসার্চ সেন্টার পূর্ব-পাকিস্তানের ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়। সেন্টারটির নাম ছিল পাকিস্তান সিয়োটা কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরি। গিনিপিগ হিসেবে নির্ধারণ করা চাঁদপুরের মতলব উপজেলাকে।

১৯৬০ সালে PSCRL প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই সিয়োটা কম্যুনিস্ট রাষ্ট্র ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। এই যুদ্ধে আমেরিকার বিরুদ্ধে জীবাণু অস্ত্র অর্থাৎ কলেরা ছড়ানোর অভিযোগ ভিয়েতনাম ও চীন করে থাকে। যদিও বলা হয় আমেরিকার সৈন্যদের কলেরা থেকে রক্ষা করার জন্য এই রিচার্স সেন্টারটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে মূল বিষয় ছিলো ভিয়েতনামে জীবাণু অস্ত্রের ব্যবহার। এভাবেই পৃথিবীর ১ম জীবাণু অস্ত্রের ল্যাব প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশে।

১৯৬৩ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত এখানে বিভিন্ন কলেরা টিকার কার্যকারিতার ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়। সে সঙ্গে বিভিন্ন ঔষধ, পুষ্টি এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ওপরও গবেষণা পরিচালনা করা হয়। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙে গেলে এই সেন্টারটির নাম হয় 'কলেরা রিসার্চ ল্যাব'। এই ল্যাবের ব্যায়ভার বহন করতো সিয়াটোর সদস্য রাষ্ট্রগুলো। এর মধ্যে আমেরিকা ২৫%, ইংল্যান্ড ১৬%, ফ্রান্স ও অস্ট্রেলিয়া ১৩.৫% এবং বাকীরা ৮% করে খরচ বহন করতো। ১৯৭৭ সালে সিয়োটা ভেঙে যায়। ফলে ফান্ডিং-এর অভাবে গবেষণাগারটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়।

এমতাবস্থায় আন্তর্জাতিক এবং বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের এক কমিটি ১৯৭৮ সালে কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরিকে একটি আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠান হিসেবে রূপ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের নিকট প্রস্তাব পেশ করে। প্রস্তাবটির অনুকূলে সাড়া দিয়ে সরকার জাতীয় সংসদের এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে CRL কে আন্তর্জাতিক এক গবেষণাগার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং এর নাম দেওয়া হয় International Centre for Diarrhoeal Disease Research, Bangladesh (ICDDR,B)

আইসিডিডিআরবি-এর প্রশাসনিক দায়িত্বভার পালনের জন্য ১৭ সদস্যের একটি বোর্ড অফ ট্রাস্টি (Board of Trustees) রয়েছে। এদের মধ্যে তিনজন বাংলাদেশী বিজ্ঞানীকে বাংলাদেশ সরকার মনোয়ন প্রদান করে। এই বোর্ড তিন বছরের জন্য কেন্দ্রের নির্বাহী প্রশাসক হিসেবে একজন পরিচালক নিযুক্ত করে এবং সাধারণত তার কার্যকাল দ্বিতীয়বার নবায়ন করা হয়। এতে কর্মরত বিজ্ঞানী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বর্তমান সংখ্যা প্রায় ১৪০০। বাৎসরিক বাজেট প্রায় ১২০ লক্ষ মার্কিন ডলার যার শতকরা ৮০ ভাগ বেতনবাবদ ব্যয় হয়।
এই কেন্দ্রের সব গবেষণার মূল্যায়ন করার জন্য "রিসার্চ রিভিউ কমিটি" (Research Review Committee) নামক একটি কমিটি রয়েছে। বর্তমানে এর মূল আয়ের উৎস হল বাংলাদেশ সরকার এবং দেশী-বিদেশী বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠীর অণুদান। প্রধান দাতাগোষ্ঠীর হচ্ছে:- অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, সৌদী আরব, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকার। আর অর্থসংস্থানে অংশগ্রহণককারী আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের মধ্যে রয়েছে:- ইউএনডিপি, ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বিশ্ব ব্যাংক, ফোর্ড ফাউন্ডেশন, রকফেলার ফাউন্ডেশন, সাসাওয়াকা ফাউন্ডেশন এবং আরও কিছু বেসরকারি সংস্থা।

খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও এই প্রতিষ্ঠানের বড় অবদান রয়েছে কলেরা নিরাময়ে। এই সেন্টারের উদ্যোগে ১৯৭১ সালে খাবার স্যালাইনের সবচেয়ে কার্যকর ফর্মুলা আবিষ্কৃত হয়। বিজ্ঞানী ও ডা. রফিকুল ইসলামের সেই ফর্মূলা ব্যবহার করে উপকার পায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও পশ্চিমবঙ্গের শরনার্থী ক্যাম্পে থাকা উদ্বাস্তু বাঙালিরা। পঞ্চাশ বছর আগেও কলেরা ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগ। কলেরা রিসার্চ ল্যাবের আবিষ্কৃত খাবার স্যালাইন কলেরাকে একেবারে সাধারণ রোগ বানিয়ে ছেড়েছে।

বর্তমানে আইসিডিডিআর,বি-এর গবেষণা কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত হয়েছে, এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে যক্ষা, শ্বাসরোগ, যৌনরোগ, এইডস, হেপাটাইটিস, মা ও শিশু স্বাস্থ্য, টিকার কার্যকারিতা পরীক্ষা এবং বিভিন্ন অন্যান্য সংক্রামক রোগ। আমি যখন কারাগারে গিয়েছিলাম তখন দেখেছি এই সংস্থা কারাগারে যক্ষা নিয়ে কাজ করছে। যাদেরই কাশি আছে তাদের কফ পরীক্ষা করছে এবং কারাগারে তাদের আইসোলেশনের ব্যবস্থা করেছে।
যাই হোক আমেরিকার বিরুদ্ধে জীবাণু অস্ত্র ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ এটাই শেষ নয়।

১৯৭৮ থেকে ১৯৮০–৮১ সাল পর্যন্ত কিউবাতে ডেঙ্গু জ্বরে কয়েক লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল। ওই সময় কিউবার নেতা ফিদেল কাস্ত্রো অভিযোগ করেছিলেন, ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল যুক্তরাষ্ট্রের জীবাণু অস্ত্রের আক্রমণে। পেন্টাগন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে অনুদান দিয়ে থাকে জীবাণু অস্ত্র নিয়ে গবেষণা করার জন্য। এমন অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। অভিযোগ রয়েছে অনুদানপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন দেশে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার নামে জীবাণু অস্ত্রের গবেষণাগার গড়ে তোলে। ১৯৮১ সালে প্রকাশিত মার্কিন সামরিক বাহিনীর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পোকামাকড়ের মাধ্যমে জীবাণু অস্ত্র ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের ছিল। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ আ্যালগিপ্টি মশার মাধ্যমে আফ্রিকায় ইয়েলো ফিভার ছড়ানো হয়।

বর্তমানে করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে জীবাণু অস্ত্রের ধারণা একেবারেই বাতিল করে দেওয়া যায় না। অনেক গবেষকই করোনাভাইরাসকে জীবাণু অস্ত্র মনে করলেও নিশ্চিত না এর জন্য দায়ী কে। এ নিয়ে আবার বিভাজন আছে। একটি অংশ মনে করে যুক্তরাষ্ট্র এর পেছনে থাকতে পারে। নিজেদের অস্ত্রের পরীক্ষা এবং বিশ্বকে একটু টলিয়েও দেওয়ার জন্য এই অস্ত্রের প্রয়োগ করেছে। আবার অপর একটি অংশ মনে করছে, চীন নিজেই এর জন্য দায়ী। চীনের ল্যাবরেটরিতে করোনাভাইরাস নিয়ে গবেষণা হচ্ছিল। অসাবধানতাবশত এই জীবাণু পরিবেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং এর বিস্তার ঘটেছে বলে তাদের অভিযোগ।

পঠিত : ২১১ বার

ads

মন্তব্য: ০