Alapon

আফগানিস্তানে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে আসল লাভ যুক্তরাষ্ট্রের



যুক্তরাষ্ট্র-তালেবান ‘শান্তি চুক্তি’র পরপরই একটা আন্ত:আফগান সংলাপ হওয়ার কথা ছিল, যেখানে আফগানিস্তানের সবগুলো পক্ষ অংশ নেবে। কিন্তু বাস্তবে যেটা হয়েছে, সেটা হলো প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি এবং তার সাবেক সিইও-থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী বনে যাওয়া আব্দুল্লাহ আব্দুল্লাহর মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্ব।

গত বছরে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ঘানিকে বিজয়ী ঘোষণা করা হলে আব্দুল্লাহ সেই ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেন এবং নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন। একটা সমান্তরাল সরকার গঠনেরও ঘোষণা দেন তিনি।

সে কারণে আফগানিস্তানে এখন তিনটি ক্ষমতার কেন্দ্র সক্রিয় রয়েছে এবং তালেবান, কাবুল ও আব্দুল্লাহর গ্রুপের মধ্যে অসমভাবে ক্ষমতা ভাগ হয়ে গেছে। ক্ষমতার বণ্টন এবং ক্ষমতার জন্য সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এটাও বোঝা গেছে যে বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠির মধ্যে সেখানে গভীর বিভেদ রয়েছে।

ঘানি আর আব্দুল্লাহর মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থেকে বোঝা গেছে, আফগানিস্তান নিয়ন্ত্রণের সংগ্রামের মধ্যে দেশটির দুটো বৃহৎ জাতিগত গ্রুপ – পশতুন আর তাজিকদের মধ্যে বিভেদ রয়েছে। অন্যদিকে ঘানির বিরুদ্ধে তালেবানদের অবস্থান থেকে বোঝা যায় যে, এমনকি পশতুনদের নিজেদের মধ্যেও বিভাজন রয়েছে।

ঘানি প্রথমে তালেবান বন্দীদেরকে ছাড়তে রাজি ছিলেন না। পরে অনাগ্রহের সাথে রাজি হয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন যে, তালেবানদের সাথে রাজনৈতিক ক্ষমতা ভাগাভাগিতে তার কোন আগ্রহ নেই।

এই বিভাজনগুলো সম্মিলিতভাবে গভীর একটা সঙ্ঘাত তৈরি করছে, যেটা সকল রাজনৈতিক পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য একটা রাজনৈতিক সমাধানের জন্য দর কষাকষির প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করবে।

কাবুলের বর্তমান পরিস্থিতি একটা আতঙ্কজনক চিত্র তুলে ধরছে। কাবুলে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের মাত্র অল্প দূরেই সশস্ত্র বন্দুকধারীরা আব্দুল্লাহ আব্দুল্লাহর কম্পাউণ্ড পাহারা দিচ্ছে। রাস্তার ঠিক ওপারেই সাবেক সেনাবাহিনীর জেনারেল এবং এখন আব্দুল্লাহর মিত্র আব্দুর রশিদ দোস্তাম তার আগের ভবনের দখল নিয়েছেন। তিনি একসময় ঘানি সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। দোস্তাম জাতিগতভাবে উজবেক এবং তালেবানদের পুরনো শত্রু, যিনি নর্দার্ন অ্যালায়েন্সের প্রতিনিধিত্ব করছেন।

ঘানি ও আব্দুল্লাহ যেখানে রাজনৈতিক সঙ্ঘাতে লিপ্ত, তালেবানরা সেখানে নিজেদের এমন একটা রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রদর্শন করতে শুরু করেছে, যারা দেশ পরিচালনার সক্ষমতা রাখে। অনলাইনে দেয়া সাম্প্রতিক এক বিবৃতিতে তালেবানরা বলেছে যে, ‘দখলদারিত্বের পরিসমাপ্তি নিয়ে চুক্তির’ পরিপ্রেক্ষিতে যেভাবে উদযাপন শুরু হয়েছে, তাতে বোঝা গেছে যে, জনগণ জানে যে ‘ইসলামি আমীরাত শুধু কোন গেরিলা গ্রুপ নয় বরং তারা দেশ ও জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী শক্তি। কারণ তারা জনগণের বৈষয়িক ও চিরস্থায়ী শান্তির জন্য সংগ্রাম করছে এবং বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষার মুখে যারা দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী দৃঢ়তা ও অধ্যবসায় দেখিয়েছে’।

আফগান রাজনীতিবিদদের মধ্যে রাজনৈতিক সঙ্ঘাতের কারণে কাবুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ তীব্রতর করার জন্য তালেবানরা একটা অজুহাত পেয়ে যাবে। তালেবানরা সামরিকভাবে মাঠ ফাঁকা পেয়ে যাবে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র যেখানে তাদের সেনা প্রত্যাহারের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়ে আছে। সে অবস্থায় কাবুল কোন সাহায্যকারী পাবে না।

অন্যভাবে বললে, যুক্তরাষ্ট্র যখন তাদের সেনা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে চাচ্ছে, সে অবস্থায় আফগানিস্তানের তিনটি ক্ষমতার কেন্দ্রের মধ্যে কোন সঙ্ঘাত সৃষ্টি হলে সেখানে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো খুব বেশি জড়াতে আগ্রহী হবে না।

কাবুলে রাজনীতিবিদদের মধ্যে রাজনৈতিক ভারসাম্য পুনর্বহালের জন্য যুক্তরাষ্ট্র এ যাবত কোন বাস্তবসম্মত ও অর্থপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়নি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যেখানে শুধু ঘানির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছে, এবং তাকে বৈধতা দিয়েছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র আব্দুল্লাহকে এখন পর্যন্ত এটা বোঝাতে পারেনি যে, ‘আন্ত:আফগান’ আলোচনায় তালেবানদের বিপক্ষে একটা ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট হিসেবে দাঁড়ানো উচিত।

এই সঙ্কটের কারণে সাধারণ জনতার চোখে তালেবানদের অবস্থানই শুধু সমুন্নত হয়নি, বরং একই সাথে তাদের বিরোধিতার জায়গাটাকেও স্বীকৃতি দিয়েছে। যেটাকে তালেবানরা ‘ওয়েস্টার্ন স্টুজ’ বা ‘পশ্চিমা ভাঁড়’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে থাকে।

শান্তির উৎস না হয়ে, কাবুল ক্রমাগত শান্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে উঠছে। গত ১৯ বছরের সব ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ও গঠনমূলক রাজনৈতিক ও সামাজিক অর্জনকে উল্টো দিকে চালিত করার হুমকি সৃষ্টি করছে।

বিদ্যমান রাজনৈতিক বিভাজন সামরিক পরিস্থিতির উপরও একটা নেতিবাচক প্রভাব রেখে যেতে পারে। আগে যেমনটা বলা হয়েছে, কাবুল বিভক্ত থাকলে তালেবানরা সামরিকভাবে জায়গা দখলের সুযোগ পেয়ে যাবে। এতে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, সেটা হলো এ রকম:

আফগানিস্তানের গ্রামীণ অঞ্চলে যেখানে আফগান নিরাপত্তা বাহিনী বহু বছর ধরে তালেবানদের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছে, সে সব জায়গায় স্ব-ঘোষিত প্রেসিডেন্ট আব্দুল্লাহ আব্দুল্লাহ নিজেদের মিত্রদের দিয়ে প্রাদেশিক কর্মকর্তাদের বদলে দেয়ার চেষ্টা করছেন। এর মধ্য দিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীকে মূলত তিনি বিভক্ত করে দিচ্ছেন, যারা আসল জাতিগত দায়ের উপর জাতীয় নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দেয়ার ক্ষেত্রে এমনিতেই হিমশিম খেয়ে আসছে।

সাবেক এক আফগান গোয়েন্দা কর্মকর্তার মতে, “পরিস্থিতি যদি আরও জটিল হয়, তাহলে যুদ্ধ আবার শুরু হতে একটা উপলক্ষ্য লাগবে শুধু। আমরা হয়তো দেখবো যে সরকারি সেনারা তালেবানদের সাথে যুদ্ধ করছে। আমরা হয়তো ত্রিমুখী সমঝোতার প্রচেষ্টা দেখবো এবং দেশকে তিন অঞ্চলে বিভক্ত হতে দেখবো”।

শেষ বিচারে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে শুধু তালেবানরাই লাভবান হবে।

গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো: আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র কি এরপরও আফগান শান্তি প্রক্রিয়াকে সমর্থন দেয়া অব্যাহত রাখবে এবং তাদের সেনা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা বদলাবে না?

এটা বিবেচনায় নেয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, এমনকি যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে সেনা প্রত্যাহারের পরেও তাদের মধ্য এশিয়া কৌশলের জন্য আফগানিস্তান গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক থাকবে। বিভক্ত আফগানিস্তান যদি সশস্ত্র সংগ্রামে ডুবে থাকে, তাহলেই কেবল যুক্তরাষ্ট্র এখানে তাদের প্রভাব ধরে রাখতে পারবে। আফগানিস্তানকে একটা ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা অব্যাহত রাখতে পারবে।

পঠিত : ১১২ বার

ads

মন্তব্য: ০