Alapon

মানুষ কীভাবে মারা যায়...?


ফুসফুসঃ না, আমি এত্ত কষ্ট করতে পারব না, প্রতি বারে ২৫০ মিলিলিটার করে দিনে ২৫ হাজার লিটার অক্সিজেন আমি সারা শরীরে দিয়েছি, কিন্তু কুন সুনাম পাই নি। হার্টের বাচ্চা হার্ট সে এখন ঠিক মত পাঁচ লিটার ব্লাড পাম্প করতে পারে না?

হার্টঃ দেখ ফুসফুস, আমি প্রতিদিন এক লক্ষ বারের অধিক বিট করি, কেউ আমাকে উৎসাহ দিক বা না দিক, আমি নিজের তাগিদে কাজ করেই যাই। প্রতিদিন ৭২ হাজার লিটার রক্ত পরিবহণ করি।

এমনকি যেই ব্রেইন নিজেকে মনে করে সবার কন্ট্রোলার, তাকেও বাঁচিয়ে রাখি আমি।

খুব ক্রাইসিসে পড়লে তুমি ২৫ হাজার লিটারের জায়গায় তিণগুণ কাজ বাড়িয়ে প্রতি দিন ৭৫ হাজার লিটার পর্যন্ত অক্সিজেন বহন করেছ, অথচ আমি ভাদাইম্যা প্রয়োজনে আমি আমার রক্ত পরবহণ বাড়িয়ে দিই সাত গুণ (Cardiac Output increased 7 times in most dangerous hypoxia)

এরপর ও তুমি আজ আমার ক্রাইসিস মোমেন্টে সারা জীবনের সাথী তোমাকে কাছে পাব না, এটা আমার কাছে অকল্পনীয় ছিল। আমি যেকোন মুহূর্তে কাজ স্টপ করে দিব কিন্তু।

তখন দেখব কোন শালা ক্যামনে বাঁচে।

ব্রেইনঃ দেখ হার্ট, মুখ সামলে কথা বল। ১০০ ট্রিলিয়ন সেলের মধ্যে মাত্র ১০০,০০০,০০০,০০০ (একশ বিলিয়ন) সেল আমি ধারণ করি, যা মোট সেল সংখ্যার ১%। অথচ আমার ক্ষমতা এবং কার্যকারিতা তো তোমরা দেখেছ ই। আমার গঠন সবচেয়ে জটিল। এমনি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ আবিষ্কার কম্পিউটারের চেয়ে হাজার হাজার কোটি গুণ জটিল।
বৈজ্ঞানিক প্রণালীতে আমার মত সক্ষমতার একটি বৈদ্যুতিক বা এটমিক মস্তিস্ক তৈরি করতে চাইলে পনের শত কোটি, কোটি টাকারও বেশি প্রয়োজন হবে।

সংখ্যাটিকে অংকে লিখলে দাঁড়ায় ১৫০০,০০০০০০০,০০০০০০০ টাকা।

এই পরিমাণ টাকা দিয়ে বর্তমান সময়ের অত্যাধুনিক প্রায় দশ হাজার কোটি কম্পিউটার কেনা সম্ভব।

এই মস্তিষ্ককে চালাতে এক হাজার কোটি কিলোওয়াট বিদ্যুৎ এর প্রয়োজন হবে।

দৈনিক চালু রাখার জন্যে প্রয়োজন হবে কর্নফুলির কাপ্তাইয়ের মতো ৩২৫০টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সামগ্রিক উৎপাদন।

এই যান্ত্রিক মস্তিস্কের আয়তন হবে আঠারোটি এক’শ তলা বিল্ডিংয়ের সমান।

আমার সবচেয়ে ওপরের সাদা ঢেউ খেলানো অংশ কর্টেক্স। স্তরে স্তরে বিন্যস্ত এই কর্টেক্সকে সমান্তরালভাবে সাজালে এর আয়তন হবে দু’হাজার বর্গমাইলেরও বেশি অর্থাৎ প্রায় ব্রুনাই দেশের সমান।

চৌদ্দশত কোটি নিরপেক্ষ সেল দিয়ে এই কর্টেক্স গঠিত।

প্রতি সেকেন্ডেই শত শত হাজার হাজার নিউরন এসে আমার প্রাথমিক স্তরে জমা হতে থাকে।

এরা একেকটি ইলেক্ট্রনিক সিগনাল যা শরীরের বিভিন্ন অংশের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে এবং মূল নিয়ন্ত্রণের আদেশ অতি দ্রুত হাজার কোটি সেলে ছড়িয়ে দেয়।

অথচ এ সকল প্রতিক্রিয়া আমি ঘটাই সেকেন্ডের দশ লক্ষ ভাগের মাত্র একভাগ সময়ে।

আমি ১% সেল নিয়ে আমি ৯৯% সেলকে নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছি, সার্ভিস দিয়েছি, আজ হার্ট আমাকে কোন মতে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় মাত্র ১৫% ব্লাড দিতে অস্বীকার করতেছ, অতএব তোমরা বেঁচে থাক, আমি মরে যাই। (Brain Death শুরু)

লোহিত কণিকাঃ দেখ ব্রেইন, সবসময় ফাঁফর দিতে দিতে তুমি মস্ত ফাঁফরবাজ হয়ে গেছ।

১০০ ট্রিলিয়ন টোটাল সেলের মধ্যে আমরা একাই ২৫% (দেহে লোহিত কণিকার সংখ্যা ২৫ ট্রিলিয়ন আর টাটাল সেলের সংখ্যা ১০০ ট্রিলিয়ন) সারা জীবন কলুর বলদের মত অক্সিজেন বহন করে গেলাম সবার জন্য, অথচ নিজে এক ফোঁটা অক্সিজেন ও ইউজ করি নাই (RBC তে anaerobic glycolysis হয়) এর পরও ত্যাগ আর সেক্রিফাইস নিয়ে আমার অবদান স্বীকার না করে কেউ যদি বড় বড় লেকচার দেয়, আমি সুইসাইড ই করব। যেখানে ত্যাগীর সম্মান নেই, সেখানে ত্যাগের মহিমা বৃথা (এখন থেকে sepsis induced cell lysis শুরু হয়ে যায়)

কিডনীঃ এক্সকিউজ মি, এতক্ষণ আলোচনায় লগ ইন করি নাই বলে ভাববেন না যে আমি পাসওয়ার্ড ভুলে গেছি। খুব লেকচার তো সবাই দিচ্ছেন, জন্ম থেকেই প্রতদিন আমি যদি ১৮০ লিটার করে ব্লাড ফিল্টারিং না করতাম (কিডনী প্রতিদিন ১৮০ লিটার ব্লাড ফিল্টার করে) তাইলে কই যাইত লোহিত কণিকা আর কই যাইত ব্রেইন।

বর্জ্য পদার্থ ইউরিয়া একটু বেড়ে গেলেই তো
ব্রেইন অস্থিরতা শুরু করে (uremic encepalpathy),
ফুসফুস ঠিকমত গ্যাস এক্সচেঞ্জ করতে পারেনা (uremia induced ARDS)
হার্ট তো হুট হাট বন্ধ হয়ে যায় (cardiac arrest due to uremia/metabolic acidosis),
প্লেইটলেট বেচারা অভিমানে কাজ বন্ধ করে দেয় (uremic thrombocytopathy)

আর প্লেইটলেট অভিমান করলেই সবাই আতঙ্কে থাকে কখন মেজর ব্লিডিং হয়ে কী না কী হয়ে যায় (bleeding diathesis)

এসএ নোডঃ চুপ করো, শয়তান কিডনী! তোমার মত স্বার্থপর প্রাণী পৃথিবীতে দুইটা আছে কিনা সন্দেহ। তোমার ওজন সারা শরীরের ২৫০ ভাগের এক ভাগ, আর তুমি রক্ত খাও সারা শরীরের রক্তের প্রায় ২৫%। (১৫০ গ্রামের দুটা কিডনী শরীরের ২০-২৫% রক্ত ইউজ করে) সবার চেয়ে ১০০০ গুণ বেশি খাদক তুমি।

আর আমাকে দেখ, জন্মের পর থেকে আমি রেস্ট নিই নাই এক মুহূর্তের জন্য। সবাই ঘুমায়, আমি জেগে থাকি। সবার কাজের গতি কম বেশি হয়, আমার রেগুলারিটিতে এটুকু এদিক সেদিক হয় না। আমি সবার ছোট, আমার ওজন সারা শরীরের এল লক্ষ ভাগের এক ভাগ, অথচ আমি না থাকলে প্রত্যেকেই অসহায়।

গত ৮০ বছরে আমি ৩০০ কোটি বার বিট তৈরি করেছি (প্রতিদিন ১ লক্ষ বার করে ৮০ বছর বয়সী কোন ব্যক্তির এসএ নোড ৩০০ কোটি বার বিট তৈরি করে) আজ আমি অক্ষম হয়ে গেছি কিঞ্চিত এই জন্য তোমরা আমার অবদানকে তুচ্ছ জ্ঞান করতেছ। এই নাও আমি স্টপ হয়ে গেলাম। (এসএ নোড স্টপ হয়ে গেলে হার্ট স্টপ হয়ে যায় সাময়িকভাবে)

অতঃপর হার্ট স্টপ, সিপিআর দেওয়া হল, রিস্টার্ট হল না, অনেক দামী ঔষধপত্র দেওয়া হল।

কিন্তু হার্ট আর চালু হল না।

অবশেষে ডেথ সার্টিফিকেট প্রিন্ট হতে লাগল।

হার্ট লাংস, কিডনী, লোহিত কণিকা, এসএ নোড কেউ কারো শত্রু না - সবাই মিলেই দেহ।

সবাইকে সবার দরকার।

কিন্তু মানুষের মৃত্যুর সময় যখন ঘনিয়ে আসে প্রথম প্রথম কোন একটা অর্গান কাজ করে না।

অন্যরা দায় নেওয়ার কথা – কিন্তু আশানুরুপভাবে নিতে পারে না।

এক সময় কেউ কারো দায়িত্ব নিতে না পারলে হুট করে লাংস, হার্ট বা ব্রেইন স্টপ করে দেয় ফাংশান করা।

অতঃপর মৃত্যু।

তেমনি একটি সমাজে সাংবাদিক, পুলিশ, শিক্ষক, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, রাজনীতিবিদ সবাই এসেনশিয়াল; সবাইকে সবার দরকার।

৭১ এর চেয়েও ভয়ংকর সময়ে মুখোমুখি আমরা।

করোনার ভয়াবহ পরিস্থিতিতে, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, পেশা নির্বিশেষে ১৮ কোটি মানুষের মধ্যেই ঐক্য দরকার।

বিভিন্ন পেশাজীবীদের মধ্যে কেউ কারো বিরুদ্ধে আঙ্গুল না তুলে একযোগে কাজ করা দরকার।

দ্রুত অবনতিশীল করোনা পরিস্থিতিতে দেশ ও জাতিকে বাঁচাতে হলে সবাইকে একসাথেই কাজ করতে হবে।

সবাই যার যার ইগো নিয়ে থাকলে, জিততে সবাই ই পারবেন, হেরে যাবে বাংলাদেশ।

লেখা হবে জাতির ডেথ সার্টিফিকেট

বাঁচতে পারবো না আমি আপনি কেউই।

সাবধান!

@Ilias

পঠিত : ৯৫ বার

ads

মন্তব্য: ০