Alapon

বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর ব্যক্তি শি জিনপিং এর জীবনকথা...


বিশ্লেষকরা বলে থাকেন, বিংশ শতাব্দী যদি যুক্তরাষ্ট্রের হয়, একবিংশ শতাব্দী হবে চীনের। বিশ বছর আগেও যে চীনকে মনে হয়নি তারা কখনো সুপার পাওয়ার হতে পারে, সেই চীনই এখন যুক্তরাষ্ট্রকে টেক্কা দিচ্ছে। বাণিজ্যযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে জবাব দিচ্ছে চীন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ককে অনেকে দ্বিতীয় স্নায়ুযুদ্ধ বলে থাকেন। চীন যার হাত ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুপার পাওয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখছে, তিনি চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং।

ফোর্বসের তথ্যমতে, শি জিন পিং বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি। ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র ছয় বছরের মধ্যেই তিনি এই অবস্থানে চলে এসেছেন। অর্থাৎ, তিনি পেছনে ফেলেছেন ভ্লাদিমির পুতিন ও ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। শি জিনপিং মাও সে তুং এর পর দ্বিতীয় নেতা, যার আদর্শ ও চিন্তাধারা জীবিত অবস্থায়ই চীনের সংবিধানে লেখা হয়েছে। ২০১৮ সালে চীনের সংসদে প্রেসিডেন্টদের দশ বছর মেয়াদী ক্ষমতায় থাকার আইন তুলে দেয়া হয়। অর্থাৎ, শি জিনপিং এখন আজীবন চীনের প্রেসিডেন্ট থাকতে পারবেন।

শি জিনপিং ১৯৫৩ সালের ১৫ জুন চীনের বেইজিংয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা শি ঝংজুন মাও সে তুং এর অধীনে চায়না কমিউনিস্ট পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। শিন ঝংজুন চীনের গৃহযুদ্ধের সময় মাও সে তুং এর সাথে যুদ্ধ করেছিলেন। ফলে শি জিনপিং পারিবারিকভাবেই কমিউনিস্ট পার্টির সাথে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। প্রভাবশালী পরিবারে জন্ম নেয়ায় বেইজিংয়ে তার শৈশবও তাই ভালো কাটছিল। কিন্তু তার সে সুখ বেশি দিন স্থায়ী হয়নি।

তার বাবা ছিলেন মুক্তমনা ঘরানার। এটাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৬২ সালে তিনি মাও সে তুংকে সমালোচনা করে লেখা একটি বইয়ের পক্ষে কথা বলেন। ফলে মাও সে তুং তাকে জেলে পাঠিয়ে দেন। এর চার বছর পর শুরু হয় চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব। এটি ১৯৬৬-৭৬ দীর্ঘ দশ বছর স্থায়ী ছিল। বাবার জন্য জিনপিংয়ের পরিবারকে অপমানিত হতে হয়। ১৩ বছর বয়সে জিনপিংয়ের স্কুলে যাওয়াও বন্ধ হয়ে যায়। এদিকে ১৯৬৮ সালে মাও সে তুং ডিক্রি জারি করেন, শহুরে তরুণদের গ্রামে গিয়ে গরিব চাষীদের সাথে থেকে জীবন ধারণের শিক্ষা নিয়ে আসতে হবে।
১৫ বছর বয়সী শি জিনপিংকেও তাই বেইজিং ছেড়ে চলে যেতে হলো, চীনের উত্তর-পশ্চিমের শানজি প্রদেশের একটি দরিদ্র গ্রামে। স্বাভাবিকভাবেই তিনি গ্রামের দরিদ্র লোকদের পরিশ্রমী জীবনের সাথে অভ্যস্ত ছিলেন না। তাই তিন মাস পরেই তিনি বেইজিংয়ে পালিয়ে আসেন। কিন্তু এতে তাকে ছয় মাস জেল খাটতে হয়।

এরপর তাকে আবার পাঠানো হয় ইয়ানা’ন শহরের লিয়াংজিয়াহে গ্রামে। এবার তিনি নতুন জীবনধারা মেনে নিলেন। সেখানে তাকে ছয় বছর থাকতে হয়। ষাটের দশকে চীনের গ্রামীণ জীবন ছিল খুবই কঠিন। সেখানে বিদ্যুৎ ছিল না, কোনো মোটর চালিত যান ছিল না, কৃষিকাজের যন্ত্রপাতিও ছিল না। জিনপিং তখন সার বহন করতেন, বাঁধ নির্মাণের কাজ করতেন, রাস্তা সংস্কারের কাজ করতেন। তাকে থাকতে হতো একটি গুহার মধ্যে আরো তিনজনের সাথে। তাদের জাউ, লতাপাতা আর বান খেয়ে থাকতে হতো।

অনেক প্রতিকূলতার মধ্যেও শি জিনপিং গুহায় রাতের বেলা কেরোসিনের ল্যাম্পের আলোয় পড়াশোনা করতেন। তখন প্রত্যেক চাইনিজকেই মাও সে তুং এর ছোট লাল বইটি পড়তে হতো। জিনপিং সেখান থেকে মাও সে তুং এর কিছু বিখ্যাত উক্তি পড়তেন। এছাড়া সংবাদপত্রও নিয়মিত পড়তেন। জিনপিং মনে করেন লিয়াংজিয়াহ গ্রামের জীবনই তাকে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। তিনি সেই সময়ের স্মৃতি নিয়ে বলেন, “আমি লিয়াংজিয়াহ ছেড়ে আসলেও আমার হৃদয় এখনো সেখানে পড়ে আছে। লিয়াংজিয়াহ আমাকে গড়ে তুলেছে। ১৫ বছর বয়সে যখন এখানে আসি, তখন আমি ছিলাম খুবই উদ্বিগ্ন ও বিভ্রান্ত। ২২ বছর বয়সে যখন এই গ্রাম ছেড়ে যাই, তখন আমার লক্ষ্য ছিল সুনির্দিষ্ট। একইসাথে আমি ছিলাম আত্মবিশ্বাসী”।

তিনি গুহায় যাদের সাথে থাকতেন, তাদের একজন ছিলেন চাষী লু হাউশেং। তিনি বলেন, জিনপিং মোটেও রসিক মানুষ ছিলেন না। তিনি অন্যদের মতো জুয়া খেলতেন না বা সমবয়সীদের সাথে ঘুরে বেড়াতেন না। এমনকি মেয়ে বন্ধুদের প্রতিও আগ্রহী ছিলেন না। বরং তার বয়স যখন ১৮, তখন তিনি ঠিক করেন রাজনীতিতে ক্যারিয়ার গড়বেন।
১৯৭৩ সালে তিনি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেয়ার আবেদন করা শুরু করেন। কিন্তু তার বাবার জেলে যাওয়ার ঘটনার কারণে দশবার আবেদন করেও ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত ১৯৭৪ সালে ২১ বছর বয়সে পার্টিতে যোগ দিতে সক্ষম হন। ১৯৭৫ সালে তিনি সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমিকেল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হন। ১৯৭৯ সালে স্নাতক সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনে কাজ করেন সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রী গেং বিয়াও এর সেক্রেটারি হিসেবে।

১৯৭৬ সালে মাও সে তুং মারা যান। এরপর জিনপিং এর বয়স যখন ২৫, তখন তার বাবা জেল থেকে মুক্তি পান। তাকে রাজনৈতিকভাবেও পুনরায় পার্টিতে স্থান দেয়া হয়। তাকে হংকং এর কাছে গুয়াংডং প্রদেশ পরিচালনার জন্য পাঠানো হয়। বাবা মুক্তি পাওয়ায় তার পৃষ্ঠপোষকতায় শি জিনপিং এর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে অনেক উন্নতি হয়। তবে জিনপিং দ্রুতই নিজের অবস্থান তৈরি করা শিখে যান। তিনি বিভিন্ন প্রাদেশিক নেতৃস্থানীয় পদে কাজ করেন এবং পদোন্নতি পেতে থাকেন।

শি জিনপিং ছিলেন অন্তর্মুখী প্রকৃতির এবং সবার সাথে দূরত্ব রেখে চলতেন। এটা তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে সাহায্য করলেও প্রথম বিয়েটা ভেঙে যায় এর কারণে। তিনি একজন কূটনৈতিকের মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন। এরপর ১৯৮৭ সালে দ্বিতীয় বিয়ে করেন পেং লিউয়ানকে। পেং লিউয়ান চীনের জনপ্রিয় লোক সঙ্গীতশিল্পী। তিনি বিভিন্ন প্রোপাগান্ডামূলক গান গেয়ে থাকেন। শি জিনপিং রাজনীতিতে অনেক উন্নতি করলেও তার চল্লিশ এমনকি পঞ্চাশের দশকের বয়স পর্যন্তও লোকচক্ষুর আড়ালেই থাকতেন। তাকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত সবাই পেং লিউয়ানের স্বামী হিসেবেই চিনত। তাদের একমাত্র মেয়ে শি মিংজের জন্ম হয় ১৯৯২ সালে। তার সম্পর্কে খুব বেশি জানা যায় না। ধারণা করা হয়, শি মিংজে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ছদ্মনামে পড়াশোনা করেছে।

শি জিনপিং তার বাবার ঘটনা খুব ছোটবেলায়ই কাছ থেকে দেখেছেন। এটি থেকে তিনি অনেক কিছু শিখতে পেরেছেন। তিনি চাইতেন পার্টির পদোন্নতিতে কারো সাথে যেন তার শত্রুতা না হয়। ২০০২-০৭ সাল পর্যন্ত তিনি ঝেজিয়াং প্রদেশের পার্টি প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় স্থানীয় বেসরকারি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা করেন। এতে ওই প্রদেশে আর্থিকভাবে অনেক উন্নত হয়। ঝেজিয়াংয়ে তার অর্জন প্রভাবশালী নেতাদের সুনজরে আসতে সাহায্য করে।

২০০৬ সালে দুর্নীতির দায়ে শাংহাইয়ের পার্টি প্রধান চেন লিয়াংইউকে পদচ্যুত করা হয়। তার জায়গায় ক্ষমতায় আসেন শি জিনপিং। যদিও তাকে এই পদে বসানো নিয়ে অনেক বিতর্ক ছিল শীর্ষ নেতাদের। জিনপিং শাংহাইয়েও কোনো শত্রুতা সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকেন। শাংহাইয়ে আসার কয়েক মাস পরেই কমিউনিস্ট পার্টির এলিট কমিটি ‘পলিটবুরো স্ট্যান্ডিং কমিটি’তে পদোন্নতি পেয়ে যান জিনপিং। তখন তিনি এলিট কমিটিতে নিজের সমর্থনে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন।

তখনকার প্রেসিডেন্ট হু জিনতাওয়ের উত্তরসূরী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল শি জিনপিং এবং বর্তমান চাইনিজ প্রিমিয়ার লি কেকিয়াংকে। কিন্তু ২০০৮ সালের মার্চ মাসে যখন শি জিনপিং ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পান, তখনই বোঝা যাচ্ছিল তিনিই হতে যাচ্ছেন চীনের ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট। এটা এখনো স্পষ্ট নয় জিনপিংকেই কেন দেয়া হলো এই দায়িত্ব।
ধারণা করা হয়, এর পেছনে রয়েছে তার বাবার অবদান। তার বাবা ত্রিশের দশক থেকেই কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ছিলেন। একইসাথে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় তার বাবার এবং তার নিজেরও অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। চীনের জনগণ এখন সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় ভুক্তভোগীদের প্রতি খুব সহানুভূতিশীল। এসব বিষয়ই শি জিনপিংকে বড় পদে আসতে সাহায্য করেছে মনে করা হয়। এছাড়া তিনি নিজেকে যেকোনো নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির সাথে কাজ করার উপযোগী হিসেবে উপস্থাপন করেন পলিটবুরোর সাবেক ও বর্তমান সদস্যদের কাছে।

২০১২ সালের ১৫ নভেম্বর কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন শি জিনপিং। একইসাথে সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের চেয়ারম্যানও হন। তখনই ক্ষমতাধর হয়ে ওঠার যাত্রা শুরু হয় শি জিনপিংয়ের। ডিসেম্বরে তিনি শুরু করেন দেশব্যাপী দুর্নীতি বিরোধী অভিযান। ২০১৩ সালের ১৪ মার্চ চীনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এতে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক, সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের চেয়ারম্যান, চীনের প্রেসিডেন্ট- এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদেরই অধিকারী হয়ে যান শি জিনপিং, যা তার আগের প্রেসিডেন্টরা হতে পারেননি।
দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম বছরেই প্রায় ২,৬৬,০০০ পার্টি সদস্যদের জেলে পাঠান দুর্নীতির অভিযোগে। এদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন পার্টির প্রভাবশালী নেতা। শি জিনপিংয়ের দুর্নীতি বিরোধী অভিযান চীনের জনগণের মাঝে খুব জনপ্রিয়তা পায়। তবে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি অভিযানের নামে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের সরিয়ে দিয়েছেন। তিনি মূলত সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের সরানোর জন্য এই অভিযান ব্যবহার করেছেন।

২০১৩ সালে দায়িত্ব নেয়ার পর উচ্চাভিলাষী ‘বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্প শুরু করেছেন। এছাড়া দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের বিস্তৃতি বাড়ানোর জন্য কাজ করছেন। ২০১৭ সালে চীনের সংবিধানে তার নাম লেখা হয়। ২০১৮ সালে চীনের সংসদে প্রেসিডেন্টের মেয়াদের নির্দিষ্ট সময়সীমা উঠিয়ে দেয়া হয়। ফলে শি জিনপিং আজীবন প্রেসিডেন্ট থাকতে পারবেন।
শি জিনপিং দুর্নীতি বিরোধী অভিযানের মাধ্যমে জনগণের কাছে জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও এতে তার অনেক শত্রু সৃষ্টি হয়েছে। ফলে তিনি ক্ষমতাহীন হয়ে পড়লে বাকি জীবন হয়তো জেলেই কাটাতে হবে। এছাড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীনের আধিপত্য বিস্তার করতে হলে তার দীর্ঘ সময়ের জন্য ক্ষমতায় থাকার প্রয়োজন। এসব কারণেই হয়তো প্রেসিডেন্টের মেয়াদের সময়সীমা উঠিয়ে দেয়া হয়েছে।

তিনি অনলাইন মাধ্যম খুব কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন। তার নামে কোনো সমালোচনামূলক কথা লেখা বা বলা অনলাইন-অফলাইন উভয় ক্ষেত্রেই নিষিদ্ধ। আন্তর্জাতিক পত্রিকাগুলোর অনলাইন ভার্সন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, টুইটারসহ গুগল, ইউটিউব চীনে নিষিদ্ধ করে রেখেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে জড়িয়ে পড়েছেন বাণিজ্যিক যুদ্ধে, উইঘুরের মুসলমানদের উপর নির্যাতন চালানোর নির্দেশ দেয়ার অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে।

তবে এসব কোনো অভিযোগই গায়ে মাখছেন না তিনি। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৪৯ সালে কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষমতা গ্রহণের শতবার্ষিকীতে চীনের অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের তিন গুণ ছাড়িয়ে যাবে। সেটা পারবে কি না সময়ই বলে দেবে। আর যদি সত্যিই চীন সুপার পাওয়ার হয়ে যায়, সেটা হবে শি জিনপিং এর কারণেই।

cltd

পঠিত : ২৬৬ বার

ads

মন্তব্য: ০