Alapon

ড. আলীয়া আলী ইজেতভেগোভিচ: এক বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবী মানস...


বসনিয়া এন্ড হার্জেগোভিনা।নব্বইয়ের দশকে স্বাধীন হওয়া বলকান অঞ্চলের একটি দেশ।সাবেক যোগোশ্লোভিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর মতো এটি স্বাধীনতা অর্জন করলেও ইউরোপের ইতিহাসে মুসলিম নির্যাতনের কালের সাক্ষী হয়ে আছে এই দেশটি।২য় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কমিউনিস্ট নেতা মার্শাল যোশেফ টিটোর একনায়কতন্ত্রের কবল থেকে এই ছোট্ট দেশ বসনিয়া এন্ড হার্জেগোভিনাকে স্বাধীন করতে বড় ধরনের নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ নিতে হয়েছিলো।একদিকে বহুদিন ধরে কমিনিস্ট শাসনের ফলে বসনিয়ার মুসলিমদের আদর্শিক জাতিসত্তা বিকাশের চ্যালেঞ্জ অন্যদিকে স্বাধীনতা অর্জনের আতীব্র সাধ।এই উভয় সংকটে বলকান মুসলিমদের পুনর্জাগরণ সহ স্বাধীনতা আন্দোলনের হাল ধরেন বিশ শতকের দার্শনিক ও বিপ্লবী নেতা ড.আলীয়া আলী ইজেতভেগোভিচ।

ড.আলীয়া আলী ইজেতভেগোভিচের জন্ম ১৯২৫ সালে,বলকান ইউরোপে।তার পূর্বপুরুষেরা এসেছে বেলগ্রেডের সামাক অঞ্চল থেকে।যদিও ইউরোপে জন্মগ্রহন করেন তবুও আলীয়ার পূর্বপুরুষেরা ছিলো মুসলিম সংখ্যালঘু। তুর্কী খলিফা আঃআজীজ তাদেরকে সাভা ও বসনা নদীর তীরে বসবাস করার জন্য কিছু জমি ওয়াকফ দেন।কালক্রমে ধীরে ধীরে সেখানেই তারা তাদের বসতি গড়ে তুলে।আলীয়া সারায়েভোতে বড় হন এবং সেখানেই আইন অধ্যাপনা,ধর্ম ও ইউরোপীয় দর্শন চর্চায় ব্রত থাকেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্নায়ুযুদ্ধের পটভূমিতে প্রাক্তন যোগোশ্লোভিয়া ফেডারেশন দূর্বল হতে শুরু করে।আবার এই মূহুর্তেই গোটা ইউরোপ জুড়ে ফ্যাসিজমের প্রতিক্রিয়া হিসেবে যোগোশ্লোভিয়ায় কমিউনিস্ট শাসন প্রবল হয়ে উঠে।১৯৪৫ সালের শুরুর দিকে কমিউনিস্টরা মার্শাল টিটোর নেতৃত্বে সারায়েভোতে কমিউনিস্ট অভিযান চালায়।স্কুল,কলেজে জোর করে কমিউনিজমের সিলেবাস চাপিয়ে দেয়া থেকে শুরু করে তাদের সামরিক বাহিনীতে প্রকৃত মুসলিমদের চিহ্নিত করতে শুকরের মাংস ভক্ষনের পরীক্ষা করানো হতো।এই সময়টা মুসলিমদের জন্য ছিলো খুবই ভয়াবহ।আলীয়ার আত্মজীবনীতে তিনি উল্লেখ করেনঃ Red totalitarianism arose to confront black totalitarianism.এ যেনো নাৎসি বাহিনীকে সরিয়ে আরেক লাল বাহিনীর আগমন!

১৯৪৩ সালে আলীয়া বসনিয়ার একদল মুসলিম যুবকদের দ্বারা গঠিত Young Muslim Association এ যোগ দেন।মূলতঃ এর থেকেই আলীয়া ইসলাম ও আগামী বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে ভাবতে শুরু করেন।বলা যায় এটাই হলো তার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। এভাবেই তার চিন্তার গতি বৃদ্ধি পেতে থাকে।১৯৭০ সালে তার বিখ্যাত বই Islamic Declaration বইটি প্রকাশ পায়।এই বইটি তিনি আগামী বিশ্বব্যবস্থাপনায় পাশ্চাত্য পুজিবাদ ও দ্বান্দিক বস্তুবাদের সংকীর্ণতার বাইরে এসে তৃতীয় বিকল্প হিসেবে ইসলামের মূল আদর্শকে মডেল হিসেবে তুলে ধরেন।অবশ্য পশ্চিম বিশ্বে তার এই Declaration কে কার্ল মার্ক্সের Das Capital এর সমান্তরালে চিন্তা করা হয়।এর পর থেকেই আলীয়ার উপর নানা অপবাদের অভিযোগ ও নির্যাতন শুরু হতে থাকে।তার এ বইকে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ এনে বইটি নিষিদ্ধ করা সহ তাকে কারাবরন করতে হয়।

আলীয়া ইজেতবেগোভিচকে বিপ্লবীর বাইরে একজন মুসলিম দার্শনিক হিসেবে বেশি পরিচিত হোন।তার চিন্তায় তিনি একজন সমন্বয়বাদী।দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের ব্যর্থতা ও বিশ্বব্যাপী সাম্য সাধনে অসফল পুঁজিবাদের বাইরে এসে তৃতীয় ধারার মডেল হিসেবে ইসলামী জীবন ব্যবস্থাকে তুলে ধরেন।স্নায়ুযুদ্ধোত্তর অস্থির সময়ে জগৎ ও জীবনের ক্যানভাসে ধর্মের আবশ্যম্ভাবিকতা নির্মাণ করেন।তার মতে,বিশ্ব ধরানার ৩ টি ধারা।যথাঃধর্মীয়,বস্তুবাদী এবং ইসলামিক।যেহেতু ঐতিহাসিক বস্তুবাদের চলন ধারায় তৃতীয় সমন্বয়তাকে বেছে নেয়(thesis>antithesis>synthesis),তাই এর গতিশীল চিন্তাধারায় তৃতীয় পর্যায়ের সমন্বয়তার উপসংহারে এসে পৌছে।কুরআনের বর্ণনায় প্রতিটি জীবসত্তাকেই আল্লাহ যুগল করে সৃষ্টি করেছেন।মানব জীবনের এ দুটি সত্য ও ঘটনা পাশাপাশি বিরাজমান ও বিকাশমান।কাজেই দার্শনিক রেনে দেকার্তের চিন্তার মতো মানুষও একটা complete synthesis (body and soul).শরীর আত্মার বাহক।শরীরের উত্থান হয়।এটা ইতিহাসের অংশ,যা বিজ্ঞানের প্রতিপাদ্য।অন্যদিকে আত্মারও বিকাশ হয় ঐশীস্পর্শে।যা ধর্ম,কলা ও নৈতিকতার প্রতিপাদ্য বিষয়।পাশ্চাত্য দর্শন চিন্তায় এ দুটি ধারা পৃথক কিন্তু একত্রে বসবাস করে চার্লস ডারউইন ও মাইকেল এঞ্জেলোর সভ্যতা ও সংস্কৃতির দ্বান্দ্বিক সূত্র ধরে।তাই পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সভ্যতার বিবেচ্য।এটি মানুষের প্রয়োজনের বিকাশ(how do I live) যার ফলে এখান থেকেই ঐশী সত্যের অস্বীকৃতি শুরু হয়।অন্যদিকে সংস্কৃতি জীবনের আকাঙ্খার প্রতিপাদ্য(why do I live).যা মানুষের অন্তর্মুখী নৈতিকতার সাথে দায়বদ্ধ।তাই পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির দ্বন্দ্ব প্রতিফলিত হয় ড্রামা ও ইউটোপিয়ার দ্বন্দ্ব হিসেবে।যার একটির মাঝে আরেকটির সারবেত্তা খুঁজে পাওয়া যায় না।আলীয়ার মতে,মানব প্রকৃতি ও ইসলাম অভিন্ন।কারন ইসলামই একমাত্র বহির্মুখী জড় ও অন্তর্মুখী আত্মার এই দ্বৈততার সমন্বয়ক স্বীকৃতি দেয়।ইসলাম নিয়ে আলীয়ার মন্তব্য হলো The matter of responsibility.অর্থাৎ দায়িত্বের দায়বদ্ধতার অনুভূতি থাকা।যার ফলে শাসক থেকে প্রজা সকলের মাঝেই এর শৈল্পিক সৌন্দর্য ফুটে উঠবে।

নব্বইয়ের দশকে সার্ব ও কোয়েট(সার্বিয়া ও ক্রোয়েশিয়া) বাহিনীর নিষ্পেষণের হাত থেকে ঐতিহাসিক ডেটন চুক্তির মাধ্যমে বসনিয়া স্বাধীনতা অর্জন করে।আলীয়া আলী ইজেতভেগোভিচ প্রথম বসনিয়ার নেতৃত্বের হাল ধরেন।যদিও তখনো ইউরোপিয় হস্তক্ষেপের কারনে পূর্ণ স্বাধীনতার ব্যাপারটি অধরা রয়ে যায়। সার্ব বাহিনীর "সেব্রিনিস্কো গণহত্যা", পক্ষপাত মূলক "ভেনস-ওয়েন চুক্তি"র অসারতা সকল কিছু ছাপিয়ে ইউরোপের চাপিয়ে দেওয়া অনেক অন্যায্য হিসেব নিকেশও বসনিয়াকে মেনে নিতে হয়।২০০৩ সালে এই মহান ব্যক্তি পরলোকগমন করেন।

যাহোক ড.আলীয়া আলী ইজেতভেগোভিচ একটি জাতির আত্মসংকটের পাশাপাশি স্বাধীনতার নেতৃত্বদান সহ এমন প্রতিকূল পরিবেশে দর্শন চিন্তার স্ফুরন সত্যিই একবিংশ শতাব্দির এক বিরল নমুনা।মুসলিম বিশ্বের এই যুগান্তকারী দার্শনিকের চিন্তার মধ্য দিয়ে শতাব্দির ঘোর তমাশার ভাজ কেটে আলো উদ্ভাসিত হোক।

অবশেষে ১৯৯৭ সালে ইরানের তেহরানে OIC সম্মেলনে মুসলিমদের উদ্দেশ্যে দেওয়া এক বক্তব্যের দুটি লাইন দিয়ে শেষ করলামঃ
" Islam is the best but this is the truth that we are not the best.Those who are different things and we always switch them,instead of hating the West,we should compete with it.Didn't the Quran order us: strive the virtues of deeds to achieve"?

-হোসাইন কামাল

পঠিত : ১২০ বার

ads

মন্তব্য: ০