Alapon

ইতিহাস বার বার ফিরে আসে...


ঘটনাটি হলো, একটি সওদাগরী কোম্পানীর সামান্য বেতন ভূক্ত কর্মচারী, কেরানী, রবার্ট ক্লাইভ (১৭২৫-১৭৭৪) ইতিহাসে আমরা, এই গোলামরা, যাকে ‘লর্ড ক্লাইভ বলে জানি, তিনি যে রাতে মীরনকে দিয়ে নবাব সিরাজকে হত্যা করিয়েছিলেন, সে রাতে নাকি ঘুমুতে পারেন নি।

না, নবাব সিরাজের শোকে মুহ্যমান হয়ে নয়, বরং তিনি ঘুমুতে পারেননি ভয়ে, আতংকে; না জানি সকাল হলে যখন মুর্শিদাবাদের জনগন জানবে তাদের নবাবকে হত্যা করা হয়েছে, যখন তারা জানবে, সেই সাত সাগর তের নদী পাড়ী দিয়ে আসা এক বেনীয়া ইংরেজ কেরানী তাদের দেশের নবাবকেই হত্যা করেছে, তারা কিভাবে নেবে সংবাদটিকে! তারা বোধ হয় লাখে লাখে, দল বেঁধে ছুটে আসবে ইংরেজ কুঠির পানে, সবাই যদি মাত্র একটা করে ঢিলও ছোঁড়ে, তারপরেও তাদের আক্রোশ থেকে কোনমতেই জীবন বাঁচিয়ে ইংল্যন্ডে ফিরে যাওয়া যাবে না! এই আতংকেই তিনি সারা রাত ঘুমুতে পারেন নি।

সারা রাত তিনি ঘুমুতে না পারলেও লর্ড ক্লাইভ নাকি সকাল হতেই নিশ্চিন্তায়, নিরুপদ্রবে ঘুমিয়েছিলেন, সারাদিন তিনি ঘুমিয়েছিলেন। ঘুমিয়েছিলেন কারন, সারা রাত জেগেছেন, ভয়ে, আতংকে। কিন্তু সকাল হতেই তিনি দেখলেন, মুর্শিদাবাদের জনগন তাদের নবাবের মৃত্যু সংবাদ শুনল বটে কিন্তু সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল যার যার মত নিজের ধান্দায়।

রাখাল বালক প্রতিদিনের মতই গানের সূর তুলে গরুর পাল নিয়ে হাঁটা দিল মাঠ পানে। চাষী তার লাঙ্গল কাঁধে নিয়ে ছুটল জমি চাষে। ব্যবসায়ী, বণীক ছুটল তার সওদা নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ফেরী করতে। গৃহবধূরা ছুটলেন ঘাটে জল নিতে। রাস্তা রাস্তায় শিশুরা মেতে উঠল খেলায়।

মুর্শিদাবাদের দৈনন্দীন জীবন চিত্রের কোন ব্যতয় নেই। কোন উত্তাপও নেই। সবই যেন স্বাভাবিক! রাজনীতি নিয়ে মাথা না ঘামানো বাংলা, বিহার আর মুর্শিদাবাদের জনগন রাজনীতি থেকে সেদিনও মুখ ফিরিয়েই থাকল! লর্ড ক্লাইভ অবাক হয়ে এসব দেখলেন। তাঁর নিজের জবানীতেই তিনি বলেছেন;

‘এসব দেখে আমার মনে এই আশ্বাস জন্মাল যে, যে দেশের জনগন তাদের স্বাধীনতা নিয়ে এতটা উদাসীন, সে দেশে আমার মত ক্লাইভের কোন ভয় নেই। আমি নিরাপদ!’

আসলেই, তিনি নিরাপদই ছিলেন। সেদিন মুর্শিদাবাদের লোকজন প্রত্যেকে যদি মাত্র একটি করে ইটের টুকরা হাতে নিয়ে ছুটে আসত ইংরেজ কুঠির পানে, তা হলে সেদিনই উদ্ধার হতো ভারতীয় মুসলমানদের স্বাধীনতা। কিন্তু না, সেদিন তা হয়নি। জনগন বুঝে উঠতেই পারেনি নবাব সিরাজের হত্যাকান্ড নিছক একটা রাজনৈতি হত্যাকান্ড ছিল না বরং এটা ছিল বাংলার স্বাধীনতাকেই হত্যা করার ঘটনা। এটা ছিল বাংলার স্বাধীনতাকে ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনা!!

এটা নিছক একটা রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ছিল না বরং ছিল দেশটার ভাগ্য বিপর্যয়। জনগনের এই অসচেতনতা আর রাজনীতি বিমূখতাই সেদিনকার বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। জাতীয় ব্যর্থতা। আর এই ব্যর্থতাই ঘটিয়েছে ভারতীয় মুসলমানদের জীবনে এযাবত কালের সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি।

এরপরের ইতিহাস আর শ্রদ্ধেয় পাঠককে মনে করিয়ে দিতে হবে না। দীর্ঘ দুইটি শতাব্দির গোলামীর জিঞ্জির আমাদের কাঁধে। এতাদ্বাঞ্চলের মুসলমানদের হাত থেকে শাসন ক্ষমতা সেই যে গেছে, আজ পর্যন্ত তা আর ফেরেনি। তাদের ভাগ্য আজও ফেরেনি সেই ঘটনার পর থেকে! দুইশত বছর বা তারও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। আমরা আধুনিক (!) হয়েছি, লোকে বলে আলোকিতও হয়েছি !

অথচ এখনও, এই একবিংশ শতাব্দিতেও কোটি কোটি লোকের চোখের সামনে তাদের দেশ লুট হয়, তারা বুঝতেই পারে না, ঠিক তেমনই, সেদিনও যেমনটা বুঝে উঠতে পেরেনি কিছুই! তাদের খোলা হাত পায়ে গোলামির অদৃশ্য শেকল পরিয়ে দেয়া হয়, তারা টের পায় না! কোটি কোটি লোক কি এক চেতনার আবেশে চোখ মুদে কুহকী আবেশে বিভোর, আর ওদিকে পায়ের নীচ থেকে সরে যাচ্ছে তাদের শেষ আশ্রয়স্থলটুকু!

আসলেই ইতিহাস বার বার আসে, ফিরে ফিরে আসে

- Ziaul Huq

পঠিত : ১৪৭ বার

ads

মন্তব্য: ০