Alapon

১৫ই আগষ্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডকে 'ঐতিহাসিক পদক্ষেপ' রূপে সংজ্ঞায়িত করেছিল জাতীয় পত্রিকা গুলো



১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে মুজিব সরকার মাত্র কয়েক মিনিট স্থায়ী অধিবেশনে স্বেচ্ছাচারমূলক চতুর্থ সংশোধনী পাস করে। ওই বিধান বলে দেশের সকল রাজনৈতিক দলের অবলুপ্তি ঘটিয়ে ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠনের মাধ্যমে এক দলীয় প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতির সরকার কায়েম করা হয়। শেখ মুজিব প্রধানমন্ত্রী থেকে প্রেসিডেন্ট পদ গ্রহণ করে সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী হন। ২৫ জানুয়ারি বাকশাল কায়েমের মাত্র দু’দিনের মাথায় ২৭ জানুয়ারি টিপু সুলতান রোডে অবস্থিত গণকণ্ঠ পত্রিকা অফিস পুলিশ দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছিল সরকার। পত্রিকার সম্পাদক আল মাহমুদ জানিয়েছিলেন, এতে পৌনে তিনশ’ সাংবাদিক-কর্মচারী বেকার হয়েছিল।

১৯৭২-১৯৭৫ সালে আওয়ামী শাসনের প্রথম কিস্তিতে অবমাননাকরভাবে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল দৈনিক বাংলার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক প্রতিথযশা সাহিত্যিক আবুল কালাম শামসুদ্দীনকে। মিথ্যার অভিযোগে দীর্ঘদিন যাবত কারা নির্যাতন করা হয় দৈনিক পূর্বদেশ সম্পাদক মাহবুবুল হককে। তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হলেও তাকে ঐ পদে ফিরে যেতে দেয়া হয়নি। ‘সুপ্রীম টেস্ট’ শীর্ষক সম্পাদকীয় লেখায় আওয়ামী লীগ সরকার অন্যায়ভাবে অপসারণ করেছিল ‘বাংলাদেশ অবজারভার’ সম্পাদক এদেশের সাংবাদিক সমাজের কিংবদন্তীতুল্য ব্যক্তিত্ব আব্দুস সালামকে। আওয়ামী অপশাসনের বিরুদ্ধে অকুতোভয়ে কলম চালনার দায়ে দৈনিক গণকণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি আল মাহমুদকে বাস করতে হয়েছিল কারাগারে। বন্ধ করা হয়েছিল ঐ পত্রিকাকে। অত্যন্ত দুঃখজনক ও অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, আওয়ামী লীগ মহলের কিছু লেখক-বুদ্ধিজীবী এসব ঘটনায় উল্লসিত হয়েছিলেন। এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে নেড়েছেন কলকাঠি। সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে হরণ করা হয় দেশের মানুষের বাক ও ব্যক্তিস্বাধীনতাসহ সংবাদপত্রের স্বাধীনতা। দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল একদলীয় শাসন বাকশাল। মাত্র ৪টি সংবাদপত্র সরকারের নিয়ন্ত্রণে রেখে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল বাকি সব দৈনিক পত্রিকা।



ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ তার ‘বাংলাদেশ: শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকাল’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন, সংসদে তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ আইনের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, ‘ব্যাঙের ছাতার মতো সংবাদপত্র গজিয়ে ওঠার প্রবণতা রোধ করতে হবে।’



গণমাধ্যমের উপর পূর্ণাঙ্গ সেন্সরশীপ আরোপের পরেও ১৫ই আগষ্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডকে পত্রিকা গুলো 'ঐতিহাসিক পদক্ষেপ', 'জনতার স্বস্তির নিঃশ্বাস' ইত্যাদি বিশেষণে বিশেষায়িত করেছিল। রাষ্ট্রীয় সকল প্রতিষ্টানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েও শেখ মুজিব বাঁচতে পারেননি। স্বপরিবারে খুব নৃশংস ভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন। কিন্তু কেন এমন নির্মম ভাবে নিহত হয়েছিলেন তা কখনোই তার দল আওয়ামীলীগ স্পষ্ট করেনি। তবে তৎকালীন বেশ কিছু সংবাদপত্র এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে সেদিন যে আর্টিকেল ছাপিয়েছিল তাতে উঠে এসেছে এই প্রশ্নের উত্তর।

হংকং থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক "ফার ইষ্টার্ণ রিভিউ" এর ২৯ অগাষ্ট সংখ্যায় শেখ মুজিবের পতনের কারণ নিয়ে বলা হয়েছে,
"অহং সর্বস্ব কতৃত্ববাদ, ব্যক্তিগত অতিরিক্ত ক্ষমতার মোহ এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমস্যাবলী নিরসনে অক্ষমতা শেখ মুজিবের পতন ডাকিয়া আনে। এছাড়াও আরো উল্লেখ করা হয়, স্বাধীনতা পাওয়ার পর ১৯৭৫ সালের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠল যে শেখ মুজিব যে আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে সে আসনের তিনি উপযুক্ত নন। এছাড়াও পাকিস্থানী শাসনের আড়াই দশকেও এই ধরণের মুদ্রাস্ফীতি, দুর্নীতি, কালোবাজারির সংস্কৃতি দেখা যায়নি।"


১৬ই অগাষ্ট লন্ডন থেকে প্রকাশিত ডেইলী টেলিগ্রাফে মুজিব হত্যা নিয়ে বলা হয়েছিল,
"সেনাবাহিনীর প্রতি শেখ মুজিবের অনাস্থা এবং নিজের ক্ষমতা সংহত করার উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগত বাহিনী পোষণই মুজিবের পতনের কারণ। এছাড়াও শেখ মুজিবকে শোচনীয় রকমের দুর্বল প্রশাসক বলিয়া অভিহিত করেছিলেন ডেইলী টেলিগ্রাফ। মুজিবের পার্শ্বচরদের দেশব্যাপি নৈরাজ্য সৃষ্টি ও চোখের সামনেই এসব দেখে চুপ থাকা মুজিব পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন ব্রিটিশ এই দৈনিক।"




প্রভাবশালী ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান ১৬ই আগষ্ট এই হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে তাদের প্রতিবেদনে লিখেছেন,
"১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১২০০ কোটি পাউন্ড স্টার্লিং বৈদেশিক সাহায্য পাওয়ার পরেও দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেওয়া আর দুর্নীতিবাজ চাটুকারদের দ্বারা পরিবৃত শেখ মুজিব অন্ধভাবে তাদের সমর্থন করায় তার পতন ত্বরান্বিত হয়।"


এছাড়াও প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস 'কিসে ভুল হলো' শিরোনামে লন্ডনের সানডে টাইমস-এ মুজিব হত্যাকান্ড নিয়ে একটি বিস্তারিত আর্টিকেল লিখেন। এই আর্টিকেলের উল্লেখযোগ্য বিষয়বস্তু ছিল,
"মুজিবের ট্র্যাজেডি এই যে, চার বছরের কম সময়ে তিনি বঙ্গবন্ধুর উচ্চতর মর্যাদা হারিয়ে বঙ্গদুশমনে পর্যবসিত হলেন। এছাড়াও মুজিব হত্যার কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি ৫ হাজার দলীয় গুন্ডা বদমাইশকে দিয়ে সেনাবাহিনীর সমান্তরালে আরেকটি বাহিনী খাঁড়া করে সেই কথিত রক্ষীবাহিনীকে অস্ত্রেশস্ত্রে বেতন ভাতায় ব্যয় বরাদ্দে সামরিক বাহিনীর চেয়েও বেশি প্রাধান্য দেওয়া, উভয় বাহিনীর মধ্যে স্বার্থের দ্বন্ধে মুজিবের অন্ধভাবে রক্ষীবাহিনীকে সমর্থন করা, এক বিয়ের অনুষ্টানে মুক্তিবাহিনীর বীর যোদ্ধা মেজর ডালিমের পত্নী তাসমিনকে ঢাকা মহানগর আ'লীগের প্রধান ও মুজিবের বিশ্বস্থ প্রিয়পাত্র গাজী গোলাম মোস্তফার ছেলে কতৃক উঠিয়ে নেওয়ার ন্যাক্কারজনক ঘটনা এবং এর পরবর্তীতে সেনা-রক্ষিবাহিনীর মুখোমুখি সংঘাতের ভয়ঙ্কর আশঙ্কা মুজিবের বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনীকে উত্তেজিত করে তোলে। মেজর ডালিম শেখ মুজিবের কাছে এই হয়রানির বিচার প্রার্থনা করলে বিচার তো পায়নি বরঞ্চ তিরস্কৃত হোন। এছাড়াও এই ঘটনার কয়েকমাস পর নয়জন সুদক্ষ সামরিক অফিসারকে বরখাস্ত, প্রশংসনীয় সার্ভিস রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও মাত্র ২৮ বছর বয়সে মেজর ডালিমকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর বিষয়টি উঠে আসে। এছাড়াও মুজিবের ঘনিষ্ট পার্শ্বচরদের দ্বারা দেশব্যাপী দুর্নীতি, ত্রাস ও নৈরাজ্য সৃষ্টির ফলে সদ্য স্বাধীনতা অর্জন করা একটি দেশের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী ও জনগণের মন থেকে আস্তে আস্তে দূরে সরে যেতে থাকে শেখ মুজিব ও তার দল"


১৫ই আগষ্ট হত্যাকাণ্ডের পর শেখ মুজিবের বিশ্বস্ত গণমাধ্যমের প্রতিক্রিয়াঃ

তৎকালীন বাকশালী সরকারের কঠোর নজরদারির মধ্যে চারটি মাত্র পত্রিকা প্রকাশিত হতো। এর অন্যতম 'ইত্তেফাক' পত্রিকা সেদিন ‘জনসাধারণের স্বস্তির নিঃশ্বাস’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে; সেখানে লেখা হয়, “গতকাল ছিল গতানুগতিক জীবনধারার একটি ব্যতিক্রম। চলার পথে শক্তি সঞ্চয়ের দিন। তাই আমাদের জাতীয় জীবনে একটি ঐতিহাসিক দিন।... মনের ভাব প্রকাশের জন্য রাস্তায় নামিয়া পড়ার অদম্য ইচ্ছা থাকিলেও শান্তিপ্রিয় জনগণ নয়া সরকারের নির্দেশ লঙ্ঘন করে নাই।”



স্বাধীনতার আগে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সম্পাদিত যে ইত্তেফাককে আওয়ামী লীগের মুখপত্র মনে করা হত, বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর সেই ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম ছিল- ‘দুর্নীতি স্বজনপ্রীতি উচ্ছেদ: খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে সশস্ত্র বাহিনীর শাসনক্ষমতা গ্রহণ’।



এমনকী সেই প্রতিবেদনে কেবল ‘শেখ মুজিব নিহত’ হয়েছে বলা হয়, তাকে যে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে, সেই ঘটনা ছিল অনুপস্থিত।

প্রতিবেদনে বলা হয়, “রাষ্ট্রপতি খন্দকার মুশতাক আহমদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনী জাতির বৃহত্তর স্বার্থে গতকাল প্রত্যূষে সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে ক্ষমতাচ্যুত করিয়া দেশের শাসনভার গ্রহণ করিয়াছেন।... শাসনভার গ্রহণকালে সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান স্বীয় বাসভবনে নিহত হইয়াছেন।”

‘ঐতিহাসিক নবযাত্রা’ শিরোনামে একটি সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয় সেদিনের ইত্তেফাকে। সেখানে মুশতাকের ক্ষমতা গ্রহণকে দেশ ও জাতির ‘ঐতিহাসিক প্রয়োজন পূরণ’ হিসেবে দেখানো হয়। প্রথম পৃষ্ঠায় কয়েকটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল- ‘জাতির বৃহত্তর স্বার্থে শাসনভার গ্রহণ’।



দৈনিক বাংলা সেদিন প্রথম পৃষ্ঠায় ‘ঐতিহাসিক পদক্ষেপ’ শিরোনামে একটি সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। সেখানে লেখা হয়, “জাতীয় জীবনে একটি ঐতিহাসিক ক্রান্তির সূচনা হয়েছে। …জাতীয় জীবনে সূচিত এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপকে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন দিয়েছেন জনগণ ও মুক্তিযোদ্ধারা।… দেশে কোথাও কোনো অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটেনি। সর্বত্র বিরাজিত স্বাভাবিক অবস্থা।”



বঙ্গবন্ধু হতাকাণ্ড বা নৃসংশতার কোনো বর্ণনা সেদিন দৈনিক বাংলার কোথাও ছিল না। প্রধান প্রতিবেদনে বলা হয়, “শুক্রবার সকালে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী ‘বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে’ সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের পতন ঘটিয়ে প্রেসিডেন্ট খোন্দকার মুশতাক আহমদের নেতৃত্বে ক্ষমতা গ্রহণ করে। সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণের সময় সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান তার বাসভবনে নিহত হন বলে ষোষণা করা হয়।”



বাংলাদেশ অবজারভারের প্রধান শিরোনাম সেদিন ছিল, ‘রাষ্ট্রপতি হয়েছেন মুশতাক’। শোল্ডারে লেখা ছিল- ‘ক্ষমতায় সশস্ত্র বাহিনী: সামরিক আইন জারি: কারফিউ জারি’। আর মূল শিরোনামের নিচে কিকারে ছোট করে লেখা ছিল ‘মুজিব নিহত: পরিস্থিতি শান্ত’।



এছাড়া প্রথম পৃষ্ঠায় একটি সম্পাদকীয় ছাপা হয় ‘হিসটোরিকাল নেসিসিটি’ শিরোনামে। সেখানে বলা হয়, “এটা ছিল বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে এবং ইতিহাসের আবশ্যকতার প্রেক্ষিতে’... রাষ্ট্রপতি মুশতাক রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের সত্য আকাঙ্ক্ষা পূরণের পবিত্র দায়িত্ব থেকে...।”




অবজারভারের আরেকটি শিরোনাম ছিল– ‘ক্ষমতা গ্রহণে জনগণের অভিবাদন’

আর আব্দুল গনি হাজারি সম্পাদিত বাংলাদেশ টাইমসের আট কলামের প্রধান শিরোনাম ছিল, ‘মুসতাক অ্যাসিউমস প্রেসিডেন্সি’

এই শিরোনামের শোল্ডারে লেখা ছিল, ‘মার্শাল ল প্রক্লেইমড ইন দ্য কান্ট্রি: মুজিব কিলড’। প্রধান খবরে সঙ্গে মোশতাকের শপথের ছবি ছাপা হয়েছিল।

মূল শিরোনামের নিচে পত্রিকাটির প্রথম কলামে ‘আওয়ার কমেন্টস’ নাম দিয়ে একটি সম্পাদকীয় ছাপা হয়; যার শিরোনাম ছিল- ‘অন দ্য থ্রেশলড অব দ্য নিউ এরা’।

পত্রিকাটির প্রথম পাতার অন্যান্য শিরোনা ছিল, ‘পিপল থ্যাঙ্ক আর্মড ফোর্সেস’, ‘মুজিবস পিকচার রিমুভড’, ‘ইউএস রেডি ফর নরমাল টাই’, ‘ভাইস প্রেসিডেন্ট, টেন মিনিস্টার, সিক্স স্টেট মিনিস্টার সোয়র্ন ইন’, ‘ভ্যালুজ হ্যাভ টু বি রিহ্যাবিলিটেটেড’, ‘হেল্প মেক বাংলাদেশ এ প্রসপরাস কান্ট্রি’।



বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর অগাস্টের বাকি দুই সপ্তাহ ধরে সংবাদপত্রে চলে মুশতাক সরকারের প্রতি ‘সমর্থনসূচক’ প্রতিবেদন প্রচার। শেখ মুজিবের ঘনিষ্ঠ সহচরদের ‘হয়রানির’ খবর সেখানে আসেনি।

মুশতাক সরকারকে কয়েকটি দেশের স্বীকৃতির খবর প্রকাশিত হয় ১৭ অগাস্টের দৈনিক বাংলায়।



‘জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অভিনন্দন’
শিরোনামে একটি প্রতিবেদনের ভাষা ছিল এরকম-, “কায়েমী স্বার্থবাদী মহলের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য রাষ্ট্রপতি খোন্দকার মুশতাক আহমদের নেতৃত্বাধীন নয়া সরকার এবং সশস্ত্রবাহিনীর প্রতি দেশের সর্বস্তরের জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অভিনন্দন জ্ঞাপন অব্যাহত রয়েছে। তারা নয়া সরকারের প্রতি তাদের পূর্ণ আস্থা ও আনুগত্য প্রকাশ করেছেন।”

অবজারভারও সেদিন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল নতুন সরকারের প্রতি সৌদি আরব ও সুদানের স্বীকৃতিকে। টুঙ্গিপাড়ায় মুজিবের দাফনের কথা বলা হয় ২৪ শব্দের এক সংবাদে।

মুশতাক সরকারের প্রতি ‘সমর্থনসূচক’ প্রতিবেদন ছাপার পাশাপাশি ‘লন্ডনে প্রায় দুই শ’ বাঙালি কর্তৃক’ বঙ্গবন্ধুর ছবি পোড়ানোর খবর প্রাধান্য পায় সেদিনের অবজারভারে।



ভেতরের পৃষ্ঠার একটি শিরোনাম ছিল ‘পরিস্থিতি স্বাভাবিক’। আরেকটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল- ‘পরিবর্তন (ক্ষমতা) বিদেশে প্রশংসিত’।

‘নয়া সরকারের প্রতি আকুণ্ঠ সমর্থন অব্যহত’, ‘বিভিন্ন স্থানে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা’, ‘যোগাযোগ ও পরিবহন স্বাভাবিক: কর্মচঞ্চল জীবনযাত্রা’, ‘ইয়েমেনের স্বীকৃতি: সাম্প্রতিক পরিবর্তন বিদেশে অভিনন্দিত’, ‘সকল স্তরের মানুষের অভিনন্দন অব্যহত’- এ ধরনের শিরোনাম দৈনিক বাংলায় ধারাবাহিকভাবে দেখা যায় অগাস্টের শেষ দিনগুলোতে।

‘কোনো বিভ্রান্তির অবকাশ রাখা হয়নি’ শিরোনামে একটি নিবন্ধে বলা হয়, “স্ফটিক-স্বচ্ছ দর্পণের আলোকেই মূল্যায়ন করতে হবে জাতির জীবনে সূচিত পরিবর্তনকে।... ঐতিহাসিক প্রয়োজনে জাতির দুর্গতি মোচনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখেই ক্ষমতায় এসেছেন নতুন সরকার।”

মুক্তিযোদ্ধা মেজর ডালিম (পরে লেফটেন্যান্ট কর্নেল) ১৫ অগাস্ট সকাল থেকেই বাংলাদেশ বেতারে ক্রমাগত ঘোষণা দিচ্ছিলেন যে দেশে সামরিক শাসন জারি করা হয়েছে। "মুজিব সরকারের তথ্য প্রতিমন্ত্রী তাহের উদ্দিন ঠাকুর শেখ মুজিবের খুবই বিশ্বস্ত ছিলেন। কিন্তু তিনিও মুশতাকের ক্ষমতা দখলে জড়িত ছিলেন। আরও অনেকেই জড়িত ছিলেন। ১৫ তারিখে তাহের উদ্দিন ঠাকুর বেতার অফিসে গিয়ে নির্দেশনা দিয়েছে। তাহের উদ্দিন ঠাকুরের অফিস থেকে সব নির্দেশনা গিয়েছিল গণমাধ্যমগুলোতে। তাহেরের নেতৃত্বে ঠিক হয়েছে পত্রিকায় কী যাবে, কী যাবে না।

এশিয়ান এইজের এডিটর ইন চার্জ সৈয়দ বদরুল আহসান বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর একদিন কেবিনেট মিটিংয়ের একটি ছবি এসেছিল একটি পত্রিকায়। সেই ছবিতে মুশতাক সরকারের মন্ত্রীদের চেহারায় কোনো উৎকণ্ঠা দেখা যায়নি। অথচ তারা মুজিবেরও মন্ত্রী ছিলেন। ওই ছবি পরে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

তথ্যসূত্রঃ দৈনিক সংগ্রাম, দৈনিক ইত্তেফাক, বিডিনিউজ২৪ডটকম, দৈনিক গণকণ্ঠ আর্কাইভ, বাংলাদেশ টাইমস আর্কাইভ, বাংলাদেশ অবজারবার আর্কাইভ, দৈনিক বাংলা আর্কাইভ, ইন্টারনেট আর্কাইভ

পঠিত : ১৪২৩ বার

মন্তব্য: ০