Alapon

নারীবাদী প্রতিক্রিয়াশীলতা এবং প্রথাবিরোধিতার প্রেতাত্মা...



১.
নারী হলো ডিভোর্সি, ঢাকা ক্লাব মেম্বার,
নারী হলো যার আছে নামিদামি চেম্বার।
নারী শুধু সেই হবে, পরবে যে লাল টিপ;
তারা কেউ নারী নয়, যারা করে না গসিপ।
নারী হবে মদ্যপ, ধূমপায়ী-বিড়িখোর,
গাঁজা খাবে চাইলেই; ক্যান শালা, জ্বলে তোর?
নারী হবে যদি কেউ শাহবাগে গান গায়,
নারীত্ব শুধু তার, মাঝরাতে ভাং খায়।
তুমি খালা পান খাও? পানখেকো গং-রা?
জিভ তাই লাল এত? দাঁত এত নোংরা?
জাকাতের শাড়ি নাও এক ঈদে কুড়িটা?
কোরবানি-বকরির হাড় আর ভুঁড়িটা?
তুমি আয়া, তুমি বুয়া? তুমি তবে নিচু ক্লাস;
পানি খেলে কাপ নাও, ধরবে না দামি গ্লাস!
ফ্যাক্টরি-জব করো? তুমি চাঁদু নারী না!
তোমাদের ন্যাকামিতে আমি আর পারি না!
তুমি ঢাকো চাঁদমুখ কালো-রঙা বোরকায়?
তেল মেখে যাও শুধু নিজের এক চরকায়?
চোখে পরো সানগ্লাস, হাতমোজা হাতে-তে?
স্বামী নিয়ে ঘুম দাও নিউ ইয়ার রাতে-তে?
ফোনকলে সালামের বাক্যটা আওড়াও?
তুমি তবে নারী নও, তুমি মরা শ্যাওড়াও!
তুমি সাম্প্রদায়িক, তুমি ঘোর তালেবান,
নারীদের খাতা থেকে নাম খানি কেটে আন!
নারী যদি হতে চাও, রোজ রাত গভীরে -
গালি দেবে ইসলাম আর তার নবিরে।
লাইক দেবে, লাভ দেবে, পুরুষের রোস্টে;
"সহমত আপু" দেবে নারীবাদী পোস্টে।
নারীবাদ নাম দিয়ে ফ্যাসিবাদী হবে যে,
তারাই আসল নারী, প্রথম আলো কাগজে।
রেসিজম-ব্লাসফেমি একাকার করলেই,
তুমি খাসা নারীবাদী, এই ভাবে মরলেই।
শেষমেশ যদি কেউ নারীবাদী হতে চাও,
গৃহপরিচারিকাকে মারধর করে যাও।
নারীবাদী শাহবাগে, বর্বর বাসাতে;
ফরেন অ্যাসাইলাম - একটাই আশাতে!

২.
বাংলাদেশে নারীবাদ কিংবা প্রগতিশীলতা - এই সব কিছুই মূলত প্রবল বর্ণবাদী চরিত্রের আন্দোলন। মুক্ত চিন্তার দাবি করলেও তাদের নির্ধারণ করে দেয়া স্ট্যান্ডার্ডের বাইরে আপনি যখনই যাবেন, তখনই তারা আপনাকে ছিড়েখুঁড়ে খাবে। অভিজাত শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করা এসব নারীবাদী এবং প্রগতিশীলদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্যই হচ্ছে কিম্ভূতকিমাকার এসব আদর্শ প্রচারের মাধ্যমে উচ্ছৃঙ্খলতার বৈধতা পাওয়া এবং বিদেশে অ্যাসাইলাম নিশ্চিত করা। তাই তারা যতটা না নারীবাদ বা প্রগতির চর্চা করেন তার চেয়ে ঢের বেশি চর্চা করেন ইসলামবিদ্বেষের, কারণ তাতে খুব দ্রুত পশ্চিমা প্রভুরা বাঙালি কুকুরদের প্রতি নেক নজর দেয়।

আমাদের সবার মনে থাকার কথা - এই বছরের একদম শুরুর দিকে র‍্যাগ ডে পালনের জন্য কুয়েটের কিছু ছাত্র জোব্বা পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলেন। সেটা নিয়ে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর দেখা দেয় গাত্রদাহ। সেই গোষ্ঠীর দালাল চ্যানেল একাত্তর টিভির নেতৃত্বে তোলপাড় শুরু হয় মিডিয়ায়, প্যান্ট-শার্ট পরা উপস্থাপিকা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে থাকেন জোব্বা পরার মাধ্যমে আমাদের সংস্কৃতিকে অপমান করা হয়েছে কিনা! অবশেষে সকল তর্কের অবসান ঘটে যখন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই ধরনের 'বিদেশি' পোশাকের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।
গতকাল বোরকা পরা এক মায়ের ছবি নিয়ে নোংরামিতে মেতে ওঠে বাঙালি নারীবাদীরা। অন্য সকল ক্ষেত্রে ব্যক্তিস্বাধীনতার ফুলঝুরি শিকা সাজিয়ে তারা বরণ ডালা উপস্থাপন করলেও শুধুমাত্র ইসলাম মেনে চলার স্বাধীনতাটুকু দিতে তাদের বড্ড অনীহা, কেননা ল্যাঞ্জা ইজ ভেরি ডিফিকাল্ট টু হাইড। বর্ণবাদে বিশ্বাসী এই নারীবাদীরা নিজেদের মুখোশ ছিঁড়ে অতিকায় কুৎসিত চেহারা এক ঝলক দেখিয়েছেন বলেই তার কিছুটা আভাস পাওয়া গেছে। বাস্তবে এরা কতখানি ইসলামবিদ্বেষী ইতর তা এদের সাথে সরাসরি চলাফেরা না করলে বোঝা মুশকিল।

নতুন এক বাংলাদেশের স্বপ্নে যারা বিভোর, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ যারা কায়েম করতে চান তাদের এখন থেকেই শত্রুমিত্র চিনতে হবে। উগ্র এসব মতবাদ যারা ধারণ ও চর্চা করে তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করা এখন সময়ের দাবি। কেননা নরকের নিকৃষ্ট কীটদের জিইয়ে রেখে কখনো জান্নাত কায়েম করা যায় না।

৩.
প্রথাবিরোধিতার নামে প্রথাগত প্রগতিশীলতার চর্চা শুরু করেছিলেন গরিবের সক্রেটিস হুমায়ুন আজাদ সাহেব। চৌর্যবৃত্তিতে ঠাসা বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে হুমায়ুন আজাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি তাতে বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছিল। তখন থেকেই তথাকথিত প্রথাবিরোধিতা একটি স্বতন্ত্র ফ্যাশন হয়ে দাঁড়ায়। আফসোসের ব্যাপার হচ্ছে, প্রথাবিরোধিতার এই প্রেতাত্মা প্রবল হয়ে চেপে বসতে চলেছে মুসলিম অ্যাক্টিভিস্টদের উপরেও।

মুসলিমদের একাংশ নিজেদের মধ্যে ঘৃণার চাষ করতে বড্ড ভালোবাসে। এই দুঃখজনক প্রবণতাকে উস্কে দেয়া হচ্ছে প্রথাবিরোধী বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার নামে।
ব্যাপারটা একটু ব্যাখ্যা করি।

ধরা যাক, একজন অভিনেতা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। অভিনেতার ভক্তদের শুভেচ্ছা বাণীতে ভেসে যাচ্ছে কমেন্টবক্স। ঠিক তখনই প্রথাবিরোধিতার ভুতে পাওয়া কোনো একজন স্ট্যাটাস দেবে - এই অভিনেতা তো নারীদের সাথে সিনেমায় অভিনয় করে। তার নামাজ পড়ায় কোনো লাভ হবে না।

ব্যাপারটা কি সেই অভিনেতার জন্য দাওয়াতি কাজ হবে, নাকি তাকে ইসলাম থেকে দূরে ঠেলে দেয়ার মতো হঠকারী স্ট্যাটাস হবে?

কেউ একটি পাপে লিপ্ত বলে কি তার ভালো কাজগুলোকে দূরে ঠেলে সেই পাপ কাজটিকেই ফোকাস করতে হবে? আল্লাহর কাছে তো একটি পাপের জন্য অন্য সব ভালো কাজ বাতিল হয়ে যায় না। তাহলে আল্লাহর বান্দা হয়ে আমাদের এতখানি জাজমেন্টাল হওয়ার অধিকার কে দিয়েছে?

গতকাল মা-ছেলের ছবিটি ভাইরাল হওয়ার পর নারীবাদীদের উগ্র প্রতিক্রিয়ায় যখন সব মহলে নিন্দার ঝড় বইছিলো, তখন প্রথাবিরোধী কয়েকজন মুসলিম অ্যাক্টিভিস্ট কলম ধরলেন ভিন্ন টপিকে। ক্রিকেটের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন হারাম - এই ফতওয়াকে সামনে এনে তারা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় দাবি করলেন, যারা বোরকা-পরা মায়ের ছবি দেখে আবেগে ভেসে যাচ্ছে তারা সেক্যুলার। তারা 'সহিহ মুসলিম' না।

ইসলাম কি এতটাই বাইনারি? সাদা-কালো? অসহিষ্ণু? যারা আবু বকরের মতো ইমানদার হতে পারবে না তারা সবাই আবু জাহাল? এর মাঝামাঝি কিছুই নেই?
সামান্য একটা ঘটনায় নিজেদের গোষ্ঠীর পক্ষে না থাকায় সে সেক্যুলার, মডারেট, আধা-মুসলিম?

নিজেকেই হক-বাতিলের একমাত্র ডিলার ভেবে জান্নাতের সার্টিফিকেট দিতে চেষ্টা করার চেয়ে এই ব্যাপারগুলো নিয়ে আরো সহনশীল হওয়াই কি কাম্য নয়?

নারীদের অস্তিত্বই কি তাহলে সমাজের জন্য হুমকি? সবাইকে জ্যান্ত কবর দিয়ে দিতে হবে?
বাস্তবতা বোধহয় এই যে - ইসলামপন্থী দাবিদারেরাও নিজেদের মধ্যে লুকায়িত সূক্ষ্ম নারীবিদ্বেষ আড়াল করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

৪.
পরতে পারো রুপোর বোতাম ফুলশার্টের হাতায়,
বিলেত দেশের নকশা আঁকো মলাট করা খাতায়।
ঘিঞ্জি হলেও গেঞ্জি পরো লজ্জা লাগবে বলে,
জাইঙ্গা পরো, ভাইঙ্গা গড়ো, সিন্থেটিকের খোলে।
স্যুটও পরো, বুটও পরো, গলায় পরো টাই,
ব্লেজার পরে রেজার মারো চকচকে গাল চাই।
গ্যাবাডিনের পেন্টেলুনের উপর পরো বেল্ট,
ঘামতে ঘামতে চামড়া নাহয় হলোই খানিক মেল্ট।
কিন্তু শালা, পরলে এ কী! জোব্বা বলে নাকি?
হায় ভগবান! আরব হতে রাখলে কী আর বাকি!
জাত গিয়েছে, পাত গিয়েছে, বাঙাল মরোমরো,
সোনার দেশে এমন পোশাক কেমনে তুমি পরো?
পরতে পারো লেহেঙ্গা আর পরতে পারো ঘাগড়া,
বিয়ের স্টেজে নাচ করে যাও লাগবে বড়ই তাগড়া
কিংবা পরো শেমিজ-জ্যাকেট, পকেটবিহীন টপ;
টপের সাথে মাপ মিলিয়ে জিন্স মেলাবার শপ।
ব্লাউজ পরেছ হস্তবিহীন, বলছ সিলিভলেস,
বের হয়েছে অন্তঃবাসের রঙিন ফিতার কেস।
ম্যাচিং করে রুজ মেখেছ, সেম কালারের পার্স,
হিল নিয়েছ জুতোর নিচে, ভাঙলে পরেই কার্স!
কিন্তু বেকুব! কী পরেছো, নিকাব নাকি ওটা?
তাঁবুর ভেতর ঢাকলে কেন তোমার শরীর গোটা?
আইএস নাকি আল কায়েদা, কোনটা তুমি করো?
সোনার দেশে এমন পোশাক কেমনে তুমি পরো?
পরতে পারো সকল কিছুই, সংবিধানের কথা;
সেক্যু হলে নগ্নতাতেও মিলবে স্বাধীনতা।
বিলেত দেশের পাক্কা গোলাম, চামড়া শুধু কালো,
অগ্রগতির জোয়ার দেখো, রেনেসাঁসের আলো।
চামড়া ছাড়া আর কী দিয়ে করবে মোদের ভিন্ন?
শ্বেত প্রভুদের পা চেটে যাই, ধর্ম ভীষণ ঘৃণ্য।
জোব্বা পরো পাগড়ি পরো মাথায় বাঁধো রুমাল?
তুমি শালা সত্যিকারের কাঠমোল্লা, আবাল।
জঙ্গি হলো দেশটা আমার, সব কিছু আজ নষ্ট,
কোথায় রাখি আমার বুকের জ্বলন্ত এই কষ্ট?
পরতে পারো সকল কিছুই, এই কথাটা ঠিক,
তাই বলে কি মারবে এমন আমার পাছায় কিক?
পোশাক তোমার চয়েজ বলেই আরব হবে ঘরও?
সোনার দেশে এমন পোশাক কেমনে তুমি পরো?

- তাজরিয়ান আয়াজ

পঠিত : ৯৯ বার

ads

মন্তব্য: ০