Alapon

ধৈর্যের ফলাফল এবং আমাদের জন্য শিক্ষা...


রামসিস, মিশরের প্রতাপশালী ও মহা প্রভাবশালী শাসনকর্তা। যদিও তার নাম রামসিস, কিন্তু তৎকালীণ মিশরের রাজাদের ফিরাউন বলে সম্বোধন করা হতো। যার কারণে রামসিসের পদবী ফিরাউন নামের আড়ালে আসল নামটাই প্রায় মানুষ জানে না। যার কারণে আমরাও তাকে ফিরাউন বলে ডাকব। এমনকি মহান আল্লাহও কুরআনে তাকে ফিরাউন বলে সম্বোধন করেছেন।

একদিন ভোররাতে ফিরাউন ঘুম থেকে চমকে উঠলেন। অথচ তখন বাহিরে বইছিল মৃদু ঠান্ডা বাতাস, আর আবহাওয়া ছিল শীতল। যে আবহাওয়া ঘুমের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। অথচ এমন আবহাওয়াতেও ফিরাউন ঘামছিল।

পরেরদিন সভা ডাকা হল। ফিরাউন সভায় বললেন, স্বপ্ন ব্যাখ্যাকারদের খবর দাও। গতরাতে আমি একটা স্বপ্ন দেখেছি। তৎকালীন মিশরে ফিরাউনের স্বপ্নকে সবসময়ই বেশ সাথে দেখা হতো। স্বপ্ন ব্যাখ্যাকাররা সভায় উপস্থিত হল এবং ফিরাউন তার দেখা স্বপ্ন বর্ণনা করল। ফিরাউনের স্বপ্নের বর্ণনা শুনে ব্যাখ্যাকারকরা বললেন, বনি ইসরাইল জাতিতে এক শিশু জন্ম নিবে, যে কিনা আপনার মসনদের হুমকি হিসেবে আর্বিভূত হবে।

স্বপ্নের এই ব্যাখ্যা শুনে ফিরাউন তার সৈন্যদের তৈরি হতে বলল এবং হুকুম করল, এই মুহুর্তে তোমরা বনি ইসরাইলের এলাকায় অভিযান চালাবে। সেখানে যতো নবজাতক শিশু আছে সবাইকে হত্যা করবে। একটা শিশুও যেন বাঁচতে না পারে। এই হুকুম পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সৈন্য বাহিনী বনি ইসরাইলের বসতির দিকে ঘোড়া হাঁকালো।

অন্যদিকে বনি ইসরাইলের মাটিতে সেদিন সত্যই এক শিশু জন্ম নিলেন। সেই শিশুর মাকে মহান আল্লাহ তাঁর গায়েবি মদদে ফিরাউনের সৈন্যদের আগমনের সংবাদ পৌঁছে দিলেন। তখন আল্লাহ সেই শিশুর মাকে বললেন, তুমি তোমার সন্তানকে একটি বাক্সে করে নদীতে ভাসিয়ে দাও। আমি কথা দিচ্ছি, তোমার সন্তানকে তোমার কাছেই ফিরিয়ে দিবো।

একজন নবজাতক শিশুকে এভাবে একটি কাঠের বাক্সে খরস্রোতা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া কোনো মায়ের পক্ষেই সহজ ছিল না। যেহেতু আমি মা নই, তাই তখন সেই মায়ের মনে কেমন অনুভূতি কাজ করছিল- ঠিক বুঝতে পারব না। কিন্তু বর্তমান সময়ের যে কোনো মা এই ঘটনা শুনলে উপলব্ধি করতে পারবেন, তখন সেই মায়ের কেমন কষ্ট হচ্ছিল! সিদ্ধান্ত নেওয়া যদিও সহজ ছিল না। কিন্তু সেই মা আল্লাহর উপর ভরসা করে তার সন্তানকে নদীতে ভাসিয়ে দিলেন। আর সেই বাক্সটাতে সর্বোক্ষণ অনুসরণ করছিলেন, সেই শিশুর আপন বোন।

তারপর সেই বাক্সটি ভাসতে ভাসতে ফিরাউনের প্রাসাদের দিকে যাচ্ছিল। এই দৃশ্য দেখে সেই শিশুর বোনের কলিজা ভয়ে শীতল হয়ে গেল। যে ফিরাউনের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য আমরা আমাদের ভাইকে নদীতে ভাসিয়ে দিলাম, বাক্স কিনা সেই ফিরাউনের প্রাসাদের দিকেই যাচ্ছে!

মহান আল্লাহর ইচ্ছায় তখন নদীর ধারে বসে ছিলেন ফিরাউনের স্ত্রী আসিয়া। আসিয়া এমন অদ্ভুদ বাক্স দেখে কৌতূহলি হয়ে উঠেন এবং সেটি তুলে আনার জন্য প্রহরীদের হুকুম করেন। সেই বাক্সটি খোলার পর দেখা গেল সেখানে একটি ফুটফুটে শিশু ঘুমিয়ে আছে। আসিয়া ছিলেন নিঃসন্তান। তাই আসিয়া সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি এই বাচ্চাকে দত্তক নিবেন। যদিও ফিরাউন প্রথমে রাজি ছিল না। কিন্তু আসিয়ার জোরাজুরিতে ফিরাউন সম্পতি জ্ঞাপন করে।

কিন্তু এরপরই আসে বিপত্তি। এই শিশু কারোরই বুকের দুধ পান করছে না। এভাবে চলতে থাকলে তো সে একসময় মারা যাবে। আসিয়া ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। এমন সময় সেই শিশুর বোন- যে কিনা বাক্সটি অনুসরণ করছিল- সে আসিয়াকে বলে, আমার পরিচিত একজন মহিলা আছেন, যিনি বাচ্চাদের দুধ খাওয়ান। আসিয়া বললেন, তুমি দ্রুতই তাকে খবর দাও। তারপর সে তার নিজের মাকে নিয়ে আসল এবং সবাইকে অবাক করে দিয়ে সেই শিশু এই মহিলার দুধ পান করতে শুরু করল। আর দুধ পান করবেই বা না কেন, এই মহিলাই যে তাঁর আসল মা।

এতোক্ষণ আমরা যে শিশুর গল্প শুনলাম তিনি আর কেউ নন, মহান আল্লাহর রাসূল হযরত মূসা আ.। মূসা আ.-কে আল্লাহ এভাবেই তাঁর মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।

মহান মূসা আ.-এর মায়ের কাছে ওয়াদা করে বলেছিলেন, তোমার সন্তানকে তোমার কোলেই ফিরিয়ে দেওয়া হবে। মূসা আ.-এর মা আল্লাহর উপর বিশ্বাস রেখে ধৈর্যের সহিত অপেক্ষা করছিলেন। এবং একটা সময় পর আল্লাহ তাঁর ওয়াদা পূরণ করেছেন এবং মূসা আ.-কে তাঁর মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।

আমাদের জীবনেও এমন অনেক ঘটনাই ঘটে, যার দরুন আমরা ভীষণ ভেঙ্গে পড়ি। মনে করি, আমার জীবনের সবকিছুই শেষ হয়ে গেল। কখনো কখনো এমনটাও ভাবি, এই জীবনে বেঁচে থাকার আর কোনো মানে নেই। অথচ যে কোনো বিপদের সময় যদি আমরা ধৈর্য ধারণ করি এবং মহান আল্লাহর উপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে পারি, তবে এই বিপদের শেষেই আমাদের জন্য উত্তম কিছুর অপেক্ষা করছে। মহান আল্লাহ আমাদের ধৈর্যশীল হওয়ার তাওফিক দান করুন।

পঠিত : ৫৭ বার

ads

মন্তব্য: ০