Alapon

ফেমিনিজমের সাম্যতা বনাম ইসলামের ন্যায্যতা

ফেমিনিজম!
বিশ্বায়ন এর সুযোগ সুবিধার কারণে শব্দটি আমাদের কাছে পরিচিত। নারী অধিকারের সমার্থক হিসেবে আমরা এই টার্ম ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু বাস্তবিকভাবেই কি ফেমিনিজম কেবলই নারী অধিকার আদায়ে সোচ্চার? ফেমিনিজম কি সংশয়বিহীন মতবাদ? ইসলামের সাথে ফেমিনিজমের কোন সম্পর্ক রয়েছে কি? ইসলাম নারীর অধিকার নিয়ে কি বলে? এসব প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি।

জুলুমের পরিণাম কখনোই ভাল হয়না। ভাবছেন হয়তো কোন জুলুমের কথা বলছি! নারী বিভিন্ন শতাব্দীতে নানাভাবে নির্যাতিত হয়ে এসেছে। মধ্যযুগীয় ইউরোপে নারীদের সম্পত্তির অধিকার, পড়াশোনা করার অধিকার, জাতীয় জীবনের কোন কিছুতে অংশ নেওয়ার অধিকার দেওয়া হতো না। এমনকি এখনো জার্মানির কিছু জায়গায় স্বামীর, তার স্ত্রীকে বিক্রি করার অধিকার রয়েছে। বিংশ শতাব্দীতেও নারীকে ভোটাধিকার দেওয়া হতো না। যার ফলশ্রুতিতে নারী হয়ে উঠলো স্বাধীনতাকামী। স্বাধীনতা অর্জনের এক বিশাল সুযোগ এনে দিল শিল্প বিপ্লব। পুরুষতান্ত্রিকতার শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে বিশ্বের কাছে নিজেকে উপস্থাপনের জন্য তার সামনে সুযোগ সুবিধার দুয়ার খুলে গেলো। এই সুযোগ সুবিধার ফল হলো এরূপ যে, নারী তার স্বস্থান থেকে সরে এসে পুরুষের স্থান নিতে চাইলো। যা কোনভাবেই নিয়ম এর মাঝে পড়ে না।কেননা স্বভাব প্রকৃতি ও মনস্তাত্বিকতার দিক থেকে নারী এবং পুরুষ সম্পূর্ণভাবে ভিন্ন সত্তা।
“Man, The Unknown” বইয়ের লেখক নোবেল পুরষ্কার প্রাপ্ত ফরাসি চিন্তাবিদ অ্যালেক্সিজ ক্যারেল লিখেছেনঃ
"পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে পার্থক্য দেখা যায়, তা মৌলিক পর্যায়ের। তাদের দেহের রগ-রেশা-স্নায়ু সংগঠন ভিন্নতর বলেই তাদের মধ্যকার এই পার্থক্য"।
পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে পারা নারীর জন্য সার্থকতা নয়। কেননা একালের নারীদের একান্তভাবে ঘর গৃহস্থালির কাজ করতে না দিয়ে ব্যাপকভাবে তাদের অফিস-বিপণী ও সিনেমা-নাটকের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ফলে পুরুষরা কেবল বাহিরে কাজ করে অবসর পেলেও নারীকে ঘর ও বাইরে উভয় ক্ষেত্রেই কলুর বলদের মত খেটে যেতে হচ্ছে।
প্রখ্যাত মনীষী আর্নল্ড টয়েনবি বলেছেনঃ

দুনিয়ার পতন যুগ সাধারণভাবে তখনই সূচিত হয়েছে, যখন নারী ঘরের চার দেয়াল ডিঙিয়ে বাইরে পা রেখেছে।


ফেমিনিস্ট নাওমি উলফ কে আল জাজিরা আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে যখন প্রশ্ন করা হয় তিনি ধর্ম নিয়ে কি ভাবেন, কোনো ধর্ম কি নারীর অধিকার রক্ষা করে নাকি কেবলই বঞ্চিত করে?!
তিনি তখন উত্তরে বলেন, যুগে যুগে ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীকে বঞ্চিত করা হয়ে থাকে। সবাই বলে নারী এই অধিকার পাবে না, কেননা ধর্মে এটা নেই, সৃষ্টিকর্তা এটা পছন্দ করেন না। এ প্রসংগে তিনি মুসলিম ফেমিনিজমের প্রশংসা করেন, যে তারা পিতৃতান্ত্রিক সমাজের গঠন পরিবর্তনে সোচ্চার হয়ে নিজেদের অধিকার আদায়ে সচেষ্ট হয়েছেন!
★ফেমিনিজমের সমর্থকগণ মনে করেন ইসলাম নারীকে পিছিয়ে রেখেছে। সমাজ গঠনে তাদের ভূমিকা রাখতে দেয়া হয়নি।
আসলেই কি ইসলাম তাদের ধারণা অনুযায়ী নারীর অধিকার আদায় করে না! নাকি তাদের ধারণা ভুল!
প্রকৃতপক্ষে ইসলামে নারীকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়া হয়ে থাকে। ইসলামী ইতিহাসে নারীরা উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন।
‍ √ রাসূল (সাঃ) এর স্ত্রী হযরত আয়েশা (রাঃ) ছিলেন তৎকালীন সময়ের বিদূষী একজন নারী। তিনি প্রায় ২২১০টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি কেবল ধর্মজ্ঞানে অতুলনীয় ছিলেন তা নয়। ইতিহাস, সাহিত্য, কবিতা প্রমুখ ক্ষেত্রেও ছিল তার দক্ষতা।
√ ফাতিমা আল ফিহরি মরক্কো তে আল-কারাউন
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিলো ইতিহাসের প্রথম ডিগ্রিদাতা বিশ্ববিদ্যালয়।
√ মধ্যযুগে আন্দালুসিয়ার উমাইয়া দরবারে শিক্ষাবিদ ছিলেন লুবনা আল কুরতুবিয়া।
√ ইবনে আল জাওযী, ইবনে আল খতীব বাগদাদী এবং ইবনে কাসীর সহ অনেক ঐতিহাসিক দশম শতাব্দীর সুতাইতা আল মাহামালী নামক একজন নারী গণিতবিদের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি একজন প্রসিদ্ধ গণিতবিদ ছিলেন।
√ রুফাইদা বিনতে সাদ আল আসলামিয়া (রাঃ) ছিলেন মদীনার একজন প্রখ্যাত নারী চিকিৎসক।
√ নুসাইবা বিনতে কাব আল আনসারী (রাঃ), যিনি পরিচিত ছিলেন উম্মে আম্মার নামে, তিনি উহুদ যুদ্ধে সাহাবীদের সেবা প্রদানে ভূমিকা রাখেন।

উপরে উল্লেখিত তথ্যের আলোকে বলা যায়, ইসলাম নারীকে কখনো পিছিয়ে রাখেনি । নারীর অবমূল্যায়ন করার কোন বিধান ইসলামে নেই। নারীকে অসম্মান করা কোন আল্লাহর বান্দার জন্য শোভনীয় নয়। একজন প্রকৃত মুসলমান এমনটা করেন না।

★ প্রাচীন কালের ধর্মসমূহ নারী ও পুরুষের জন্য ভিন্ন ভিন্ন আইন রচনা করা হয়েছিলো। কিন্তু ইসলাম নারী ও পুরুষের জন্য সমানভাবে অনুসরণীয় জীবন বিধান বিধিবদ্ধ করেছে।
অষ্টম হেনরির শাসনামলে ইংরেজ পার্লামেন্টে একটি আইন পাস করা হয়। সে আইনে নারীর জন্য "নিউ টেস্টামেন্ট" পড়া নিষিদ্ধ করা হয়, কারণ নারী নাপাক।
সামগ্রিক ভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইসলামী অনুশাসন ব্যাতীত অন্য সব সামাজিক বিধান বা ধর্মীয় রীতিনীতি নারীকে যথোপযুক্ত মর্যাদা দেয় নি। বরং নারীকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখা হতো।

এখন কথা হচ্ছে, আপনি বলতে পারেন, আমাদের আশেপাশে আমরা নারীকে পরিপূর্ণ মর্যাদা পেতে দেখি না। এর কারণ কোনভাবেই ইসলাম প্রদত্ত বিধান নয়, বরং ইসলামকে নিজের ব্যক্তিগত জীবনে পূর্ণাংগভাবে পালন না করাই এ সমস্যার কারণ।
ইসলাম নারীর অধিকারের ক্ষেত্রে সমতা বিধান করে নি। কেননা নারী ও পুরুষ আলাদা সত্ত্বা। ইসলাম নারীর জন্য ন্যায্য অধিকারের বিধান দিয়েছে।
★যেই পশ্চিমা সমাজ নারীর অধিকার নিয়ে আন্দোলন করে, সেখানে নারীর যথাযথ নিরাপত্তা নেই। নারীকে পশ্চিমা সমাজ ভোগ্য পণ্যের দৃষ্টিতে দেখে। তাদের কাছে নারী কেবলই ভোগ্যবস্তু!
তারা মুসলিমদের বহুবিবাহ নিয়ে বিতর্ক করলেও একাধিক নারীর সাথে লিভ টুগেদার এর বিষয়ে ছাড় দিচ্ছে!
ফেমিনিস্ট নারীরা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেও, সেই পুরুষদের শেখানো বুলি আউড়ে যান।
ফেমিনিজম দাবী করে তারা নারীর স্বাধীনতা, অধিকার আদায় করার চেষ্টা চালাচ্ছে! পরিহাসের বিষয় হলো মুসলিম নারীর হিজাব নিয়ে তাদের আপত্তি! অথচ হিজাব একজন মুসলিম নারীর স্বতন্ত্র অধিকার!
সবশেষে এটাই বলতে হয়, ইসলাম নারীকে ন্যায্য অধিকার দিয়েছে এবং যথাযোগ্য মর্যাদার আসন দিয়েছে। ফেমিনিজম এর মনভুলানো বুলি যতই শুনতে মিষ্ট শোনাক, নারীর অধিকার আদায়ে এ মতবাদ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে!

তথ্যসূত্রঃ
√ নারী - মাওলানা আবদুর রহীম
√ ব্রিটানিকা- আর্টিকেল বাই এলিনর বার্ক
~~ সাবিহা সাবা

পঠিত : ১২১ বার

ads

মন্তব্য: ০