Alapon

একটি নীরব বেদনার কথকতা....

এক বুক দুঃখ, যন্ত্রণা আর অতৃপ্তি নিয়ে বহু বছর ধরে কাটছে আমার দিবস-রজনী। কোনো এক বিষন্ন সন্ধ্যায় একবার হালদার ওপারের একটি গ্রামে ঘুরতে গিয়েছিলাম। ছোট ডিঙ্গি নৌকাটা দুলতে দুলতে যখন আমাদের নদীর ওপারে পৌঁছে দিলো, তখন যে দৃশ্যের মুখোমুখি হলাম, তা আমার বহু দিন ধরে বয়ে বেড়ানো দুঃখটিকে আরও খানিকটা বাড়িয়ে দিলো।


দেখলাম, মাইলের পর মাইল জুড়ে শামিয়ানা টাঙ্গানো। পুরো এলাকাজুড়েই ঝাড়বাতি লাগানো হয়েছে। এই বিরাট আয়োজন করা হয়েছে রাসূল (সা.) এর জন্ম উপলক্ষে। নিঃসন্দেহে এর জন্য ব্যয় হয়েছে লক্ষ লক্ষ টাকা। সেখানে একটি স্টেজও সাজানো দেখতে পেলাম। স্টেজে যত জন বক্তা, নিচে ততো জন শ্রোতাও নেই।


বক্তারা আলোচনা করছেন উর্দুতে। সামনের শ্রোতারা তার কতটা বুঝতে পারছেন বলতে পারি না, তবে আমি এক বর্ণও বুঝতে পারলাম না। পাশেই বড় বড় পাতিলে রান্না হচ্ছে। পুরো এলাকাজুড়ে উৎসবের আমেজ। মনে হতে লাগলো, আমি চলে এসেছি এক অন্য পৃথিবীতে।


রাসূল (সা.) এর প্রতি এই আবেগ আর ভালোবাসাকে আমি কিছুতেই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখছি না। শুধু আফসোস লাগছিলো এই ভেবে যে, আমাদের সিংহভাগ মুসলিম জনগোষ্ঠী রাসূল (সা.) এর আগমনের সত্যিকারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে একটি ভুল ধারণা নিয়ে জীবন-যাপন করছে।


তাদের চোখে রাসূল একজন ধর্ম প্রচারক মাত্র এবং তাঁর জীবন নিছক একটি ঘটনা-দুর্ঘটনার বিরাট সমষ্টি বৈ অন্য কিছু নয়। রাসূল (সা.) এর জীবনেতিহাস যে একটি আন্ত মানবীয় কর্মসূচী বাস্তবায়নের অক্লান্ত সংগ্রামের ইতিহাস; এ বিরাট সত্যটি সম্পর্কে তারা কিছু মাত্রও ওয়াকিফহাল নয়।


এক বুক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ভাবতে লাগলাম, এভাবে কত শত সহস্র মানুষ রাসূল (সা.) এর আগমনোদ্দেশ্যের পূর্ণ অবয়বটুকুকে অবলকন না করেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে তার ইয়ত্তা কোথায়! আমার মন হালদার ওপারের এক নিভৃত গ্রামে দাঁড়িয়েই ঘুরে বেড়াতে লাগলো মক্কা, তায়েফ আর মদীনার অলি-গলি-পথ-প্রান্তরে বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের সিপাহসালারের আশপাশটায়।


এই মানুষগুলোর জন্য আমার হৃদয় মায়ায় আদ্র হয়ে উঠলো এই ভেবে যে, তারা কোনোভাবেও একটাবার যদি জানতে পারতেন রাসূল (সা.) কী বিরাট এক মিশন নিয়ে পৃথিবীতে এসেছিলেন!


রাসূল (সা.) নিছক কোনো দার্শনিক, ওয়াজেন কিংবা ধর্মনেতা ছিলেন না। মানব জাতির ত্রাণকর্তা এই মহামানব যখন ময়দানে নেমেছিলেন, তখন সমগ্র আরব সম্প্রদায় তাঁর বিরোধিতায় উঠে পড়ে লেগেছিলো। কারণ, তারা বুঝতে পারছিলো, রাসূল (সা.) এর এই বিপ্লবী দাওয়াতের অন্তরালে লুকিয়ে ছিলো একটি বিরাট সাম্রাজ্য।


তারা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলো, একটি বিপ্লব ঘনিয়ে আসছে, যার দ্বারা সমাজ জীবনের সবকিছু ওলট পালট হয়ে যাবে। এই আন্দোলনের পরিণতি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ছাড়া আর কিছু নয়। তাই তো আরব গোত্রপতি বুখাইরা রাসূল (সা.) এর দাওয়াত শুনে তাঁকে প্রস্তাব দিয়েছিলো, “আপনি যখন আপনার বিরোধীদের উপরে বিজয়ী হবেন এবং ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবেন, তখন আপনার পরে আমরা ক্ষমতাসীন হবো।”


প্রিয় পাঠক, একটু ভেবে দেখুন তো! রাসূল (সা.) যদি সংকীর্ণ অর্থে নিছক একজন ধর্মীয় প্রচারক ও ওয়াজ নসিহতকারী হতেন এবং তাঁর কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য একেবারেই না থাকতো, তাহলে কি বুখাইরাকে স্পষ্ট করে বলে দিতেন না, “আরে ভাই! আমি তো আল্লাহওয়ালা মানুষ। ক্ষমতার বখরা দিয়ে আমার কি কাজ? রাষ্ট্র ও সরকারের সাথে আমার কি সম্পর্ক?” বরং রাসূল (সা.) জবাব দিয়েছিলেন, “ ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব আল্লাহর হাতে। ওটা তিনি যাকে দিতে চান তাকেই দিবেন।”


আরেকটু ভেবে দেখুন তো প্রিয় পাঠক! রাসূল (সা.) যখন কাবার চাবির রক্ষক উসমান বিন তালহাকে কাবার চাবি দিতে অনুরোধ করেছিলেন এবং উসমান চাবি দিতে অস্বীকার করলো, তখন রাসূল (সা.) তাকে বলেছিলেন, “সেই দিন খুব বেশি দূরে নয়, যেদিন এই চাবি আমাদের হাতে থাকবে এবং এই চাবি আমরা যাকে দিতে চাইবো, তাকেই দিবো।”


কিংবা হিজরতের সময় সুরাকার হাতে পারস্য সম্রাটের মাথার মুকুট দেয়ার প্রতিশ্রুতি কোন আত্মবিশ্বাসে বলিয়ান হয়ে রাসূল (সা.) দিয়েছিলেন? এসব কি এটাই প্রমাণ করে না যে, তিনি এই আন্দোলনের পথের শেষে একটি প্রতিষ্ঠিত ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার ছবি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলেন?


যাদের রাসূলকে একটি বিশ্বজোড়া সাম্রাজ্যের বাদশাহ হবার জন্য পাঠানো হয়েছিলো, তাঁর উম্মতরা সেই মহান দায়িত্বটি ভুলে গিয়ে ময়দানে না নেমে নিছক রাসূল (সা.) এর প্রতি কিছু দোয়া-দরুদ-তাসবি-তাহলীল পড়ে তাদের দায়িত্ব শেষ করছে। ভেবে দেখেছেন কখনও?

পঠিত : ৬৭ বার

ads

মন্তব্য: ০