Alapon

ড. মুহাম্মদ মুরসির রাজনৈতিক কৌশল ও শাহাদাত........

নতুন মিশরের যাত্রা ও বিল্পবের মহানায়ক ছিলেন ড. মুহাম্মদ মুরসি। তিনি মিশরকে উন্নত করার বেশ কিছু যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। যেগুলো শত্রুদের চোখে ছিলো মারাত্মক ভুল। কি কি ছিলো সেগুলো? চলুন জেনে নেয়া যাক।

১. আমেরিকাকে উপেক্ষাঃ
ক্ষমতায় এসেই মুরসি অনেকগুলো দেশভ্রমন করেছিলেন। একমাত্র উদ্দেশ্যে ছিল ঐ দেশ গুলো মিশরের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক উন্নয়নে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে। তিনি চীন দিয়ে শুরু করেছিলেন, এরপরে যান রাশিয়ায়। তৃতীয়বারে যান ব্রাজিল। তারপর পাকিস্থান, দক্ষিণ আফ্রিকা। গেলেন সৌদি, কাতার, আরব আমিরাত। কিন্তু ভুলেও তিনি আমেরিকার দিকে তাকাননি, আমেরিকায় যাওয়ার নিয়তও বাঁধেননি। এমনকি যে আমেরিকার টাকা মিশরের সেনাবাহিনীকে আনোয়ার সাদাত থেকে শুরু করে অনেককেই পেটমোটা করতে সাহায্য করলো, সেই আমেরিকার প্রতি খুব উঁচু নজরেও কয়েকবার তাকিয়েছেন তিনি। যার জন্য তাকে আমেরিকা বিশ্বাস করতে পারেনি।

২. সরাসরি ইসরাইলের বিরোধিতাঃ
২০১২ সালের নভেম্ববরে ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরাইল কর্তৃপক্ষ জোর করে অভিবাসনের চেষ্টা করে। ফিলিস্তিনের আন্দোলনকারী যোদ্ধারা হামাসের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে, এবং এক অসম যুদ্ধ শুরু হয়। এর নাম ছিলো “হিজারাতুস সিজ্জিল”। যুদ্ধ শুরু হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই ইসরাইলের কলজে ঝলসে যাওয়া শুরু হয় মুরসীর জন্য। সিংহের মত হুংকার ছাড়েন তিনি।
মুরসি বলেন, “মনে রেখ ফিলাস্তিনেরা একা নয়”।

তিনি দ্রুততার সাথে তেল-আবিব থেকে মিশরীয় দূতাবাস প্রত্যাহার করে নেন। তার প্রধানমন্ত্রী কিনদীলকে গাজাতে পাঠালেন সাহায্যের চিহ্নস্বরূপ। যিনি হামাসের সাথে প্রতিরোধ যুদ্ধে পরিপূর্ণ ঐকমত্য ঘোষণা করে আসেন। খুলে দেন রাফাহ সুড়ংগ। এবং দ্রুত যুদ্ধ বিরতিতে বাধ্য করেন ইসরাইলকে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে তিনি আরব বিশ্বের অবিসংবাদিত নেতার মর্যদায় উন্নিত হলেন, আর অন্যান্য নেতাদের মনে ঢেলে দিলেন হিংসার আগুন। আমেরিকার কয়েকটি জার্নালে তখন মুরসীকে আরবের একমাত্র ইসলামি নেতা হিসেবে উল্লেখ করে, টাইমস তাকে পৃথিবীর প্রথম ১০০ নেতার মর্যাদায় ভূষিত করে।

৩. বিশ্ব অর্থনীতিতে মিশরকে দাড় করানোর চেষ্টাঃ
মিশরের সুয়েজ খালের উন্নয়নের জন্য তিনি বিরাট অংকের বাজেট নির্ধারণ করেন। এতে অর্থনীতিবিদরা মনে করলো আগামি ২০২২ সালের মধ্যেই এখান থেকে মিশরের আয় ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। তাই যদি হয়, মিশর পৃথিবীর উন্নত দেশ সমূহের কাতারে দাঁড়িয়ে যাবে। আর এটা হলে আরব দেশ গুলোতে আমেরিকার মাতবরীতে আসবে মারাত্মক বাঁধা। এ ছাড়া ইসরাইলের সিনাই পরিকল্পনাও ভেস্তে যাবে। আমেরিকার খ্যাতনামা বুদ্ধিজীবি নোয়াম চমস্কি কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির এক সেমিনারে বলেন, মুরসীর সুয়েজ খালের ডেভলপমেন্ট প্লান বাস্তবায়ন হলে আরব আমিরাতের অর্থনীতিতে, বিশেষ করে দুবাইয়ে, মারাত্মক ধ্বস নেমে আসবে। কারন দুবাই ও আবু ধাবির সী-পোর্টগুলো তখন মূল্য হারিয়ে ফেলবে। ফলে আমেরিকার অর্থনীতিতে দুবাই থেকে আসা সুবিধা লুপ্ত হবে। টানাটানিতে পড়বে সবাই। কী মারাত্মক পরিকল্পনা ছিলো মুরসী সাহেবের!

৪. সিনাই অঞ্চলে পরিবর্তন প্রচেষ্টাঃ
তিনি ক্ষমতায় যেতে না যেতেই সিনাই-এ উন্নয়ন কাজ শুরু করে দেন। সিনাই এ আছে মিশরের ৩১% ভূমি। এর কোন উন্নয়ন এতদিন হয়নি। এই ভূখন্ড উন্নত হলে মিশরে ইনকাম চলে যাবে দিগুণে। চাকুরির সুযোগ পাবে হাজার হাজার বেকার। ফলে তিনি চার দশমিক চার বিলিয়ন ডলার বাজেট করেন ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে। মিশরের সেনা বাহিনীকেও এ এলাকার উন্নয়নে শরিক রাখতে দুই দশমিক পাঁচ বিলিয়ন ডলার বাজেটের ঘোষণা দেন।

‘ফাইরুয মিলিয়ন সিটি’ নামে এখানে বসবাসের সমস্ত সুযোগ সহ উন্নত ও বিশাল শহর নির্মাণের কাজ শুরু করেন। সিনাই-এর উত্তর ও দক্ষিণে দুই ইউনিভার্সিটি তৈরি করার জন্য অফিসিয়াল কাজ ও শুরু করেন তিনি। ঘোষণা দেন ছাত্র রিক্রুটিং এর জন্য দারুন স্কলারশিপের। এটা ছিলো ইসরাইলের সিনাই দখল পরিকল্পনার বিরুদ্ধে এক ধরণের যুদ্ধ ঘোষণা। এত বড় কাজ তার আগে আজ পর্যন্ত কেহ মিশরে করার সাহস দেখাতে পারেনি।

৫. মিশরকে খাদ্যে পূর্ণতা দেওয়ার পদক্ষেপঃ
মুরসীর চিন্তা ছিল মিশরে খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণ হওয়া। কাজেই ক্ষমতায় যেয়ে দেরি না করেই নতুন খাদ্য গুদাম বানানো শুরু করেন তিনি। তিনি কৃষকদেরকে চাষ কাজে উৎসাহিত করার জন্য বহু রকম সহযোগিতা ও ঋণ দান কর্মসূচি গ্রহন করেন। মনে রাখা দরকার, মিশর আরব বিশ্বের সবচেয়ে বেশী খাদ্য আমদানি করা রাস্ট্র। ২০০৯ সাল থেকে মিশর শিকাগো থেকে দশ মিলিয়ন মেট্রিক টন গম আমদানি করেছে। খাদ্য আমদানির সাড়ে চুয়াল্লিশ ভাগ আমেরিকা থেকে, বাইশ দশমিক সাত ভাগ অস্ট্রেলিয়া থেকে, বার দশমিক সাত ভাগ ইউরোপ থেকে, তিন দশমিক ছয় ভাগ কানাডা থেকে এসে থাকে। এই দেশ গুলো এক সাথেই আই এম এফ কে মিশরে কোন ধরণের অর্থ দিতে নিষেধ করে। সমস্ত আরব রাস্ট্র গুলোকেও নির্দেশ দেয়া হয় মিশরকে যেন এক পয়সাও ঋণ সাহায্য না দেয়া হয়। মুরসীর এতবড় পদক্ষেপ তারা সহ্য করতে পারেনি।

৬. পশ্চিমা শিক্ষাব্যাবস্থা থেকে মিশরকে মুক্ত করাঃ
শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাবার জন্য তিনি প্রাথমিক, সেকেন্ডারি এবং হাইয়ার সেকেন্ডারি লেভেল গুলোতে পাশ্চত্য সিলেবাস বাতিল করার পদক্ষেপ নেন। শুধু তাই না পাশ্চত্যের মানের সাথে সামাঞ্জস্য রেখে বিকল্প শিক্ষা ব্যবস্থার নির্দেশ দেন তিনি। যাতে মিশরের ইতিহাস ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির প্রাধান্য থাকতো বেশি। এটা বাস্তবায়ন করলে দেখা যেত ওখানে নিয়োজিত হাজারো আমেরিকান ও পশ্চিমা শিক্ষক ও উপদেষ্টাদের ছাটাই করতে হতো। এটা মারাত্মক পদক্ষেপ যা বিদেশি বেনিয়াদের ক্ষেপিয়ে তোলে। বাইরের লোকদের কাছে না পড়লে পড়াশুনা হয়?

৭. বিশ্ব মোড়লদের সিরিয়ানীতিতে বাগড়াঃ
সিরিয়ার ব্যপারে মুরসী সাহেব নিয়ে ফেলেন এক মারাত্মক পদক্ষেপ। তিনি মিশরে প্রবেশ করতে সিরিয়ানদের উপর থেকে ভিসা ফিস উঠিয়ে নেন। তিনি ঘোষণা করেন সিরিয়ান ছাত্ররা মিশরীয় ছাত্রদের মতই সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করবে। তিনি সিরিয়ার সাথে সকল কুটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে দেন এবং তড়িৎ ভাবে দামেস্ক থেকে মিশরীয় দূতাবাস সরিয়ে নেন। বন্ধ করে দেন কায়রোর সিরীয়ান দূতাবাসের সকল কার্যক্রম। আরো মারাত্মক কাজ করেন যে, সিরিয়ার ব্যপারে আমেরিকার কোন পরামর্শই তিনি শুনতে চাননি।
বরং উলটো “মু’তামার আলউম্মাহ আলমিসরিয়্যাহ লিদা’মি আলসাওরাহ আলসুরিয়্যাহ” নামে সারা বিশ্বের নামকরা উলামা, বুদ্ধিজীবি ও রাজনীতিবিদদের নিয়ে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করেন। এতে একদিকে যেমন তার মাথা মুসলিম বিশ্বের উপর উঁচু হয়ে যায়, অপর দিকে সিরিয়ার সমস্যা সমাধানে মুসলিম বিশ্বের হস্তক্ষেপ আসন্ন হয়ে পড়ে। ফলে আমেরিকা ও ইস্রায়েলের আরেকটা পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে বসে। যেটা ছিলো মুরসীর উপর যায়োনবাদীদের ক্ষেপার আরেকটা কারণ।

৮. এরদোগানসহ মুসলিম নেতাদের একত্রিকরণের ভূমিকাঃ
তিনি এরদোগানের হাতে হাত রেখে মুসলিম বিশ্বের ‘জি-এইট’ কে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা চালান। এরই ফলোশ্রুতিতে তূর্কির সাথে এক চুক্তি সম্পাদিত হয়। এতে করে মিশরের বাজার তুর্কির জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়। এবং তুর্কির সাথে মালায়েশিয়ার বড় বড় উনভেস্টমেন্টের দরোজা খুলে যেতে থাকে। মিশরকে উন্নত পর্যায়ে নিতে তার এই পদক্ষেপ ওরা কেও মানতে পারেনি।

৯. পরিবর্তনশীল মিশরের যাত্রা শুরু করাঃ
তিনি মিশরে বেশ কিছু পরিবর্তন খুব দ্রুততার সাথে করতে চেয়েছিলেন। সেনা বাহিনীতে তিনি ছাটাই শুরু করে ছিলেন। বিচার বিভাগের প্রতি শ্যেন দৃষ্টি রেখেছিলেন। পুলিশ বাহিনীর দূর্ণীতি তিনি রাতারাতি শেষ করতে ব্যপৃত হয়ে পড়েন। মিডিয়ার প্রতি ছিলো তার খুব রাগ। এগুলোর পরিবর্তনে তিনি এত সচেষ্ট হন যে সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ না করলে দেশ টা অন্য কিছুতে পরিণত হতে যাচ্ছিল। এই অপরাধ ক্ষমা করার মত মন কারোরই ছিলো না।

১০. মিশরে ফেরাউনে শাসনের অবসান ঘটিয়ে ‘কুরআনি’ সংবিধান প্রণয়নের চেষ্টাঃ
মিশরে চলে আসতেছিলো কিবতিদের রাজা ফিরাউনের শাসন। এই শাসন শুরু হয় জামাল নাসের থেকে। ষাট সত্তর বছরের এই শাসনকে তিনি প্রথম ছয় মাসের মধ্যেই পরিবর্তন করে নতুন এক সংবিধান প্রনয়ন করেন এবং একে “শারইয়্যাহ” নাম দিয়ে জনগনের ভোটে পাস করিয়ে নেন। সংবিধানটা পড়লে পাগলেও বুঝতে পারবে যে ওটা ছিলো “কুরআন ও সুন্নাহ” এর সরাসরি প্রতিবিম্ব। সত্যি বলতে কি, এই অপরাধ ক্ষমা করতে মিশরের ফিরাউনী শাসক, সেনাবাহিনি, পুলিশ, মিডিয়া বা বিচার বিভাগ-কেউই মেনে নিতে পারেনি।

পঠিত : ২৪ বার

ads

মন্তব্য: ০