Alapon

বিকৃত যৌনাচার এবং কিছু কথা...



একটা ঘটনা বলি। টেড বান্ডি ছিলেন একজন কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার। ১৯৮৯ সালের ২৪ জানুয়ারি মৃত্যুদন্ড কার্যকরের পূর্বে তিনি মনোবিদ জেমস সি. ডবসনের কাছে নিজের অপরাধে জড়িয়ে পড়া সম্পর্কে একটি সাক্ষাতকার প্রদান করেন।

টেড বান্ডি ছিলেন খুবই সুদর্শন যুবক। আইনের তুখোড় এই ছাত্র কীভাবে এই ভয়ঙ্কর অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে গেলেন? তিনি এর পেছনে প্রধান কারন হিসাবে উল্লেখ করেছেন পর্নোগ্রাফিকে। চলুন সেই সাক্ষাতকারটি জেনে নিই-

জেমস সি. ডবসন : আপনার খুনের শুরুটা কীভাবে হলো? কীভাবে অপরাধীর খাতায় নাম লেখালেন?

টেড বান্ডি : আমার বারো-তেরো বছর বয়সে একদিন স্থানীয় মুদির দোকানে অপ্রত্যাশিতভাবেই কিছু সফটকোর পর্নোগ্রাফির সন্ধান পেয়ে যাই। কমবয়সী তরুণেরা পাড়াপড়শিদের মধ্যে এসবের বিস্তার ঘটায়। আর আমাদের প্রতিবেশীরা কী করতো জানেন, দরকার শেষে তারা এগুলো আবর্জনার স্তুপে ছুঁড়ে ফেলতো। এভাবে এক সময় আমি অল্প থেকে অধিক উত্তেজক বইয়ের সংস্পর্শে আসলাম-যেখানে আরও অনেক বেশী ছবি ছিল। এর মধ্যে গোয়েন্দা ম্যাগাজিনও ছিল, যেখানে পর্নোগ্রাফিকে ঘিরেই কাহিনি রচিত। নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, সবচেয়ে ক্ষতিকর পর্নোগ্রাফি হচ্ছে, যেগুলোতে ভায়োলেন্স বিশেষত সেক্সুয়াল ভায়োলেন্স উপস্থিত থাকে। এই দুইয়ের সমন্বয় এমন এক ধরনের বিধ্বংসী আচরণের জন্ম দেয়-যা বর্ণনা করাও ভীতিকর। আমার ভিতরেও এই ব্যাপারটি প্রভাব বিস্তার করেছিল।

আমি আমার কৃতকর্মের জন্য পুরো দায়ভার পর্নোগ্রাফির ওপর চাপিয়ে দিচ্ছি না। আমি বলছি না যে, এটাই আমাকে বাইরে বের করে এনে খুনগুলো করতে বাধ্য করেছিল। আমি যা যা করেছি, তার পুরো দায়ভার আমি নিজে বহন করতে রাজি আছি। প্রশ্নটা এখানে নয়। যা বুঝতে হবে তা হচ্ছে, পর্নোগ্রাফি কীভাবে ধ্বংসাত্মক আচরণ শেখায়। শুরুর দিকে পর্নোগ্রাফি এই ধরনের চিন্তা-প্রক্রিয়াকে ইন্ধন জোগায়। কিছু সময় বাদে এর কারণেই সম্পূর্ণ আলাদা একটা সত্তা নিজের ভেতরে স্পষ্ট হয়ে উঠে। পর্নোগ্রাফিতে একবার আসক্ত হয়ে পড়লে আপনি একটা থেকে আরেকটি বেশি চাইবেন। আরও হার্ডকোর, বেশি বেশি জোরালো উত্তেজনার খোজ করতে থাকবেন। অন্যান্য নেশার মতোই আপনি হন্যে হয়ে আরও কিছু খুঁজে বেড়াবেন-যা আপনাকে অধিক উত্তেজনা এনে দিতে পারে। এই অনুসন্ধান ততক্ষণ পর্যন্ত চলবে, যতক্ষণ না আপনি খাদের কিনারে এসে দাঁড়াচ্ছেন। এই অবস্থানে এসে আপনি ভাবতে শুরু করবেন, কেবল বই পড়ে অথবা দেখে দেখে আর চলছে না, প্রকৃত তৃপ্তি পাওয়া যাবে যখন কাজগুলো নিজে করতে পারবো!

জেমস সি. ডবসন : কাউকে শিকার বানানোর পূর্বে আপনি কত দিন এসবে জড়িত ছিলেন?

টেড বান্ডি : তা প্রায় দুই বছরের মতো। আমার ভিতরে যেমন অপরাধ প্রবনতা ও হিংস্র আচরণ বৃদ্ধি পাচ্ছিল, তেমনই অপরাধবোধও কাজ করতো। আশেপাশের পরিবেশ, প্রতিবেশী, স্কুল, গির্জা আমার মধ্যে অপরাধবোধ তৈরি করতো। আমি জানতাম, এই ধরনের কাজ করা তো দূরের কথা, এমন চিন্তা মনে আনাও পাপ। কিন্তু আমি ছিলাম খাদের একেবারে কিনারে! নিজেকে নিবৃত করার শেষ চেষ্টাটুকু করে যাচ্ছিলাম। কিন্তু পর্নোগ্রাফি আমার কল্পনার জগৎকে এমনভাবে প্রভাবিত করেছিল যে, আমি প্রতিনিয়ত পরাজিত হচ্ছিলাম।

জেমস সি. ডবসন : আপনার কি মনে আছে, কোন বিষয়টা আপনাকে খাদের কিনারে নিয়ে এসেছিল?

টেড বান্ডি : এটা সঠিকভাবে বর্ণনা করা খুবই কঠিন। ধ্বংসের পাহাড়ে পৌঁছানোর জন্য আমার ভেতরে এক অবিশ্বাস্য উত্তেজনা কাজ করতো এবং আমি জানতাম, এটা আমার নিয়ন্ত্রনে নেই। শিশুকালে যে সীমারেখাগুলোর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল, সেগুলো আমাকে পেছন থেকে টেনে ধরার জন্যে যথেষ্ট ছিল না।

জেমস সি. ডবসন : এটাকে কি যৌন উত্তেজনা বলা যায়?

টেড বান্ডি : হ্যা, এটাকে একরকম যৌন উত্তেজনা বলা যায়। এর সাথে আরও কিছু ব্যাপার জড়িত আছে, যা না বললেই নয় তা হচ্ছে, মাদকের সঙ্গে আমার পরিচয়। পর্নোগ্রাফির ব্যাপারে আমার আসক্তির সঙ্গে এর যোগসূত্রটা কোথায় জানেন? মাদক আমার চেতনাবোধকে হ্রাস করেছে আর পর্নোগ্রাফি এটাকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করেছে।

জেমস সি. ডবসন : প্রথম খুন করার পরে আপনার কি উপলব্ধি হয়েছিল এবং তার পরের দিনগুলোর অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

টেড বান্ডি : এত দিন পরে এসে এই ব্যাপারে কথা বলা একটু কঠিন। এটা অনেকটা ভয়ঙ্কর কোনো দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে যাওয়ার মতো ব্যাপার। ড্রামাটিক করতে না চাইলে বলতে হবে, আমার নিজেকে বশীভূত মনে হচ্ছিলো, যেন খুব ভয়ঙ্কর কিছু আমার ওপর ভর করেছে। আমি অন্য কারো নির্দেশে পরিচালিত হয়েছি। পরের দিন সকালে ঘুম ভেঙে আমার শুধু মনে হচ্ছিলো, যা করেছি তার জন্য আমি আইনের চোখে এবং ঈশ্বরের চোখে অপরাধী। একটু পরে যখন আমার মনে হলো, পুরো কাজটা আমি স্বজ্ঞানে ও খুবই ঠান্ডা মাথায় করেছি, তখন আতঙ্কে চমকে উঠলাম।

জেমস সি. ডবসন : অর্থাৎ প্রথম খুনটা করার আগে আপনি জানতেনও না যে, আপনি এই ধরনের কাজ করতে পারেন?

টেড বান্ডি : আসলে এই ধরনের কাজ করার জন্য ভেতরে ভেতরে যে প্রচন্ড হিংস্রতা কাজ করে-তা বর্ণনা করা কঠিন। আর একবার সেই ইচ্ছা পূরন হয়ে যাওয়ামাত্র ভেতরের বিধ্বংসী শক্তিটা কোথায় যেন মিলিয়ে যায়; আমি তখন নিজের মধ্যে ফিরে আসি। আসলে আমি ছিলাম খুবই সাধারণ পরিবারের সন্তান। আমি সরাইখানায় গিয়ে পড়ে থাকতাম না, অথবা বেকারদের মতো এদিক সেদিক ঘুরেও বেড়াতাম না। আমি বাহ্যিক দিক দিয়ে যৌনবিকারগ্রস্তও ছিলাম না-যাকে একপলক দেখেই লোকে বলে দিতে পারে, ‘এই ছেলের ভেতর সমস্যা আছে।’ আমি ছিলাম খুবই সাধারণ একজন মানুষ। আমার অনেক ভালো বন্ধু-বান্ধব ছিল।

আমাদের মতো যারা পর্নোগ্রাফিক হিংস্রতায় অতিমাত্রায় প্রভাবিত, তারা কেউই দানবীয় নয়। আমরা আপনাদেরই পুত্র ও স্বামী। আর সবার মতো আমরাও একটা পারিবারিক কাঠামোর মধ্যে বড়ো হয়েছিলাম। কিন্তু এখন ব্যাপারটা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, পর্নোগ্রাফি যে কারো ঘরের মধ্যে ঢুকে এক টানে ঘরের সাধারন বাচ্চাটাকে পারিবারিক কাঠামোর বাইরে বের করে নিয়ে আসে। ঠিক এভাবেই বিশ-ত্রিশ বছর আগে এটা আমাকে ছোবল মেরে বের করে এনেছিল। আমার বাবা-মা তাদের ছেলেমেয়েদের এসব থেকে বাঁচিয়ে রাখার ব্যাপারে আন্তরিক ছিলেন, যেমনটা সব কট্টর খ্রিষ্টান পরিবারেই হয়। কিন্তু আমাদের পরিবার ও সমাজ জানে না পর্নোগ্রাফিতে আশক্তি কাদের দ্বারা হয় এবং কোন উপাদান গুলো প্রভাব বিস্তার করে। এসব প্রভাবকের ব্যাপারে সমাজ অনেকটাই নিরব।

আমি কোনো সমাজবিজ্ঞানী নই কিন্তু দীর্ঘদিন যাবৎ কারাগারে বন্দি আছি। এই সময়ের মধ্যে আমার সাথে অনেকের পরিচয় হয়েছে-যারা ভায়োলেন্স ঘটানোর ব্যাপারে আগ্রহী। কতক ছাড়া তাদের প্রত্যেকেই পর্নোগ্রাফিতে গভীরভাবে আসক্ত ছিল। এফ.বি.আই-এর রিপোর্ট বলে, সিরিয়াল কিলারদের সাধারণ আগ্রহের বিষয় হচ্ছে পর্নোগ্রাফি। সুতরাং এটাকে উপেক্ষা করার কোনো উপায়ই নেই।

জেমস সি. ডবসন : এই প্রভাবকগুলো না থাকলে আপনার জীবন কেমন হতে পারত?

টেড বান্ডি : আমি মনে করি, অনেক বেশি ভালো হতো। শুধু আমার জন্যে না, আরও অনেক মানুষ আছে, যারা শিকারে পরিনত হয়েছে, তাদের পরিবারের জন্যেও ভালো হতো। এখানে বলাই বাহুল্য যে, আমার জীবনটা অনেক চমৎকার হতো। আমি নিশ্চিত, প্রভাবকগুলো না থাকলে আমি কখনোই নিজেকে এই ধরনের ভায়োলেন্সের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলতাম না।

জেমস সি. ডবসন : আপনি কি কখনো আপনার শিকার এবং তাদের পরিবারের কথা ভেবেছেন? ভাবলে কি আপনার ভেতর অনুশোচনা কাজ করে?

টেড বান্ডি : আমি জানি, আমার কাজের জন্য মানুষ কেবল আমাকেই দোষারোপ করবে। কিন্তু আমি এমনটা হয়ে গেলাম কেন-তা নিয়ে কেউ ভাববে না। যাইহোক, সৃষ্টিকর্তার দয়ায় দেরিতে হলেও আমি এমন এক জায়গায় এসে পৌঁছেছি, যেখানে দাঁড়িয়ে তাদের অসহনীয় ব্যাথা ও ভোগান্তি অনুভব করতে পারছি। হ্যাঁ, অবশ্যই পারি! বিগত কয়েকদিনে অমীমাংসিত কেসগুলো নিয়ে আমার সঙ্গে বেশ কয়েকজন তদন্তকারী কর্মকর্তার কথা হয়েছে, যেগুলোতে আমি জড়িত ছিলাম। এত দিন পরে এসে এসব ব্যাপারে কথা বলা বেশ কঠিন। কারণ, এটা ভয়ঙ্কর অনুভূতি। আর সেগুলো আমার চিন্তা-ভাবনাকে জাগিয়ে তোলে, যেগুলো একসময় বেশ ঠান্ডা মাথায় করেছিলাম। আমি সেইসব বিভীষিকার কথা ভাবলেই আঁতকে উঠি।

আশা করবো, আমি যাদের অপূরণীয় ক্ষতি করেছি, তারা আমার অনুশোচনায় বিশ্বাস না করলেও এখন যে কথাগুলো বলবো, সেগুলো বিশ্বাস করবে। আমাদের শহর ও সমাজ কিছু প্রভাবকের ব্যাপারে এতটাই শিথিল, যেগুলো সুদূরপ্রসারী ক্ষতি সাধন করে। আজ হোক কাল হোক, এগুলো প্রকাশ পাবেই। মিডিয়ায় ভায়োলেন্স বিশেষ করে সেক্সুয়াল ভায়োলেন্স এখন বিভিন্নভাবে প্রচার করা হচ্ছে। আমার ভয় হয়, আজকাল সিনেমার মাধ্যমে যেসব ভায়োলেন্স আমাদের শোবার ঘর অবধি পৌঁছে গেছে, ত্রিশ বছর পূর্বে সেগুলো এক্স-রেটেড অ্যাডাল্ট থিয়েটারেও দেখানো হতো না।

জেমস সি. ডবসন: আপনার কি মনে হয় রাষ্ট্রের এই সাজা আপনার প্রাপ্য?

টেড বান্ডি : খুব ভালো একটা প্রশ্ন করেছেন। মিথ্যা বলবো না, আমি মরতে চাই না। তবে, এই শাস্তিটা আমার প্রাপ্য। অবশ্যই সর্বোচ্চ শাস্তিটাই আমার প্রাপ্য। আমি মনে করি, আমি এবং আমার মতো আরও যারা আছে, তাদের থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখাটা সমাজের অধিকার। এ ব্যাপারে সন্দেহের কোনো অবকাশ নাই। আমি আশা করবো, আমাদের আলোচনা থেকে এই ব্যাপারটা স্পষ্ট হবে যে, সমাজের তার নিজের থেকেই সুরক্ষা দরকার সবচেয়ে বেশি।

যা আমি পূর্বেও বলেছি, যে জিনিসগুলো পর্নোগ্রাফি আসক্তিতে প্রভাব বিস্তার করে, সেগুলোর ব্যাপারে আমাদের সমাজের নিশ্চুপ থাকা চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে এই ধরনের উগ্র পর্নোগ্রাফির ব্যাপারে। যখন সভ্য সমাজ টেড বান্ডিকে দোষারোপ করতে করতে পর্নো ম্যাগাজিনের পাশ দিয়ে যায়, তখন দেখেও যেন না দেখার ভান করে হেঁটে যায়। আর ঠিক তখনই একদল তরুণ সমাজের অগোচরেই টেড বান্ডিতে পরিণত হচ্ছে। আক্ষেপের জায়গাটা ঠিক এখানেই।

আমাকে মৃত্যুদন্ড দিলেই ফুটফুটে বাচ্চাগুলো-যাদের আমি হত্যা করেছি, তারা তাদের বাবা-মায়ের কাছে ফিরে যাবে না অথবা আমার মৃত্যুতে তাদের মনের কষ্টও কমে যাবে না। কিন্তু এখনো অনেক ছোটো ছোটো বাচ্চা আছে, যারা এখন হয়তো রাস্তায় খেলাধুলা করছে, হয় কাল নয়তো পরশু এরাও মারা পড়বে। কারণ কী জানেন? অল্পবয়স্ক অসংখ্য তরুণের কাছে আপত্তিকর ওইসব সামগ্রী, এখন অনেক বেশি সহজলভ্য হয়ে গেছে।

পঠিত : ১৫৩ বার

ads

মন্তব্য: ০