Alapon

আমার মায়ের বিয়ে...



আমার মায়ের বিয়ে। হ্যা বাবা মারা গিয়েছেন আজ তিন বছর হলো। তারপর মা নানাদের বাড়িতেই ছিলেন। এবার নানা হঠাৎ করে মার বিয়ে ঠিক করে ফেললেন। ছেলে এর আগে বিয়ে করেনি। মাকে সে বিয়ে করতে হুট করেই রাজি হয়ে গেলো। কী অদ্ভুত কান্ড!
কিন্তু এরচেয়ে বড় অদ্ভুত কান্ড হলো বিয়ের দিন সকাল বেলা আমায় লুকানোর জন্য নানাদের পাশের এক বাড়িতে নিয়ে গেলেন বড় মামী।

আমায় নিয়ে যাওয়ার সময় মা কেমন ছলছল চোখে তাকিয়ে রইলেন। কিন্তু নানাকে ভয় পেয়ে তিনি কিছুই বলতে পারলেন না। আমায় নিয়ে যাওয়ার সময় মামীকে আমি অবাক হয়ে বললাম, 'ও মামী, মার বিয়ে হচ্ছে আর আমায় তুমি ওখানে নিয়ে যাচ্ছো কেন? আমি বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাবো না। আমি আজ সারাদিন মার কাছে বসে থাকবো। মা বউ সাজবে, সুন্দর সুন্দর গয়না পড়বে, শাড়ি পড়বে, চোখে কাজল মাখবে আর আমি তা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবো।'

মামী এক ধমক দিলেন আমায়। ধমক দিয়ে বললেন, 'বাপকে তো খেয়ে বসে আছিস এখন মাকে নিয়ে আমাদের কাঁধে বোঝা হয়ে আছিস। এবার যখন একটা হিল্লে হলো তোর মায়ের তখন এটাও নষ্ট করে দিতে চাইছিস। অলুক্ষোণে মেয়ে একটা!'

আমি তো ছোট মানুষ অত কিছু বুঝি না। তাই বোকার মতো আবার বললাম, 'মামী, আমি ওখানে থাকলে সবকিছু নষ্ট হয়ে যাবে কেন? তোমরা কী মিথ্যে বলে মার বিয়ে দিবে? তোমরা কী বলবে মার কোন সন্তান নাই?'

মামী এক চড় দিলেন আমার গালে। তারপর বললেন, 'চুপ করে থাক বলছি বাঁদড় মেয়ে।অত কথা বলস কেন?এই বাড়িতে তোকে রেখে যাচ্ছি চুপচাপ এখানেই থাকবি। দুপুর বেলা তোর জন্য খাবার নিয়ে আসবো আমি। পেট পুড়ে খাবি।'

আমি কেঁদেই ফেললাম তখন। আর বললাম, 'ও মামী, আমি খেতে চাই না। আমি মার কাছে থাকতে চাই।' মামী আমার কথা শুনলেন না। চুপচাপ ঘরের ভেতর আমায় রেখে ঠাস করে দরজাটা বাহির থেকে বন্ধ করে দিলেন। আমি ভেতর থেকে দরজায় কড়া নাড়তে নাড়তে বললাম, 'ও মামী, দরজাটা খুলো না,আমি এখানে থাকতে পারবো না। আমায় মার কাছে নিয়ে যাও।'

কিন্তু মামী আমার কথা শুনলেন না। তিনি দরজা বন্ধ করেই চলে গেলেন।

এ বাড়ির সবাই নানাদের বাড়িতে আজ। পাশের বাড়ির বিয়ে বলে কথা। এখানে আমি একা। আর কেউ নাই। মামী চলে যাওয়ার পর আমি ঘরের পেছনের জানলাটা খুলে দূরের রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে রইলাম আমি। এই রাস্তা ধরেই একটু পর মায়ের বর আসবে গাড়ি করে।ফুল দিয়ে সাজানো থাকবে সেই গাড়ি। আচ্ছা মায়ের এই নতুন বর কী আমায় সন্তানের মতো আদর করবে?

তারপর আবার ভাবলাম আদর করবে কীভাবে? তিনি তো জানবেনই না যে মার কোন সন্তান আছে! কেউ তো তাকে জানতে দিবে না। জানতে দিবে না এই ভয়ে যে মায়ের নতুন বর এসব শুনে যদি বিয়েটা ভেঙে দেয় শেষে!

দুপর বেলা হঠাৎ আমার চোখে পড়লো একসাথে তিনটা সাদা রঙের মাইক্রোবাস যাচ্ছে রাস্তা দিয়ে।কী সুন্দর করে সাজানো গাড়িগুলো। এইগুলোই বরযাত্রীর গাড়ি। মায়ের বিয়ের বরযাত্রী। আমার মায়ের বিয়ে।অথচ আমি এখানে বন্দী। এখান থেকে কিছুতেই যেতে পারছি না বের হয়ে। আচ্ছা মা এখন কী করছে? মারও কী খুব খারাপ লাগছে আমার জন্য? কী জানি!

দুপুর বেলা ঠিক মামী খাবার নিয়ে এলেন আমার জন্য।আর বললেন, 'এইগুলো খেয়ে নে মা। আর খানিক সময় এইখানে থাক মা। এরপর তো ওরা তোর মাকে নিয়ে চলেই যাবে। আর তোকে এসে নিয়ে যাবো আমি!

মাকে নিয়ে চলে যাবে এই কথাটা শুনতেই আমার ভেতরটা হো হো করে উঠলো। চোখ ফেটে দরদর করে নেমে এলো জল। বড় মামী এই কান্না দেখলেন না। তিনি চুপচাপ দরজা বন্ধ করে রেখে আবার চলে গেলেন। আমি খাবারের প্লেট রাগে উল্টে ফেলে দিয়ে আবার জানলাটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমি জানি, একটু পরই এখান দিয়ে মাকে নিয়ে যাবে ওরা। আমি এই আশায় এখানে দাঁড়িয়েছি যে মাকে যদি এক পলক দেখতে পাই এখান থেকে!

আমি হঠাৎ চমকে উঠলাম নানাদের বাড়িতে চিৎকার চেঁচামেচি শুনে। কারোর গলায় শোনা যাচ্ছে, মেয়ের সন্তান আছে আগে বলেনি কেন? কথাটা শুনে বুকটা আমার কেঁপে উঠলো। ভয়ে আমি শিউরে উঠলাম। আর ভাবতে লাগলাম আমার জন্য যদি মার এবারের বিয়েটা না হয় তবে তো সবাই মার প্রতি খুব রাগ করবে। আমায় খুব বকাঝকা করবে।এসব ভাবছি যখন ঠিক তখন কেউ ঘরের দরজাটা জট করে খুললো। আমি ভীষণ চমকে উঠে পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখি বড় মামী। মামী আমার কাছে এসেই ঝট করে আমায় কোলে তুলে নিলেন। তারপর বললেন,'আয় মা।'

আমি অবাক হলাম। ভীষণ ভীষণ রকম অবাক। এটা কী হচ্ছে! আমায় এখন নিয়ে যাচ্ছে কেন মামী?বরযাত্রী তো এখনও যায়নি মাকে নিয়ে!
আমি বললাম, 'ও মামী আমায় নিয়ে যাচ্ছো কেন?'
মামী বললো,'তোর মায়ের নতুন বর সবকিছু আগে থেকেই জানতো। ও তোকেও নাকি নিয়ে যাবে।'

আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। তাই চুপ করে রইলাম।

কিন্তু বাড়িতে গিয়ে আরো চমকে উঠলাম। মায়ের নতুন বর তখন নানাকে বলছেন, 'আপনি তো একজন মুরুব্বি মানুষ। নামাজ কালাম পড়েন। কিন্তু মেয়েকে বিয়ে দেয়ার জন্য কীভাবে অতো বড় একটা মিথ্যে নাটক সাজালেন। বললেন, মেয়ের বিয়ে হয়েছিল কিন্তু কোন সন্তান নাই। কিন্তু আমি তো সন্তান আছে জেনেই বিয়ে করেছি আপনার মেয়েকে। আপনার মেয়ের যদি একটা কন্যা সন্তান না থাকতো তবে আমি আপনার মেয়েকে বিয়ে করতাম না। আমি তো চাইলেই কুমারী একটা মেয়েকে বিয়ে করতে পারতাম। কিন্তু করিনি।করিনি এই জন্য যে আমি চেয়েছি একটা জান্নাত ক্রয় করতে। আপনার মেয়ে একটা আস্ত জান্নাত জন্ম দিয়েছে। আর সেই জান্নাত লাভের লোভেই আমি আপনার মেয়েকে বিয়ে করেছি। আর আপনি কি না আমার সেই জান্নাতটাকেই লুকিয়ে ফেলেছেন!'

নানাভাই কাঁদছেন। কাঁদছেন মাও। বাড়ির সবকজন মানুষের চোখে জল। যেন তারা এমন খুশির সংবাদ আর কখনো শোনেনি। যেন এমন মহৎ মানুষ তারা আর কখনো দেখেনি চোখে।

মায়ের নতুন বর আমায় মামীর কাছ থেকে নিয়ে তার কোলে তুলে নিলেন। তারপর আমার কপাল চুমু এঁকে দিয়ে বললেন, 'মাগো, আমি তোমায় সারা জীবন ভরে মায়ের আদর দিয়ে যাবো বিনিময়ে তুমি কী আমায় কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে বলতে পারবে, ইনি আমার পিতা। ইনি আমায় নিজের জান্নাত মনে করে লালন পালন করে বড় করেছেন?'

আমি জানি না কী বলবো তখন। কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। কিন্তু না বুঝেই তখন বলে ফেললাম, 'বাবা, আমি আপনাকে পিতা বলেই পরিচয় দিবো। আল্লাহর কাছে বলবো, ইনি আবার বাবা। যিনি আমায় লালন পালন করে বড় করেছেন।'

এই কথা বলতেই বাবা আমায় তার বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরলেন। আর পেছনে দাঁড়িয়ে মা আঁচলে নিজের চোখের জল লুকোতে চাইলেন। কিন্তু সেই জল তিনি লুকোতে পারলেন না। আসলে মানুষ দুঃখের কান্না লুকোতে পারলেও সুখের কান্না কোনদিন লুকোতে পারে না কেউ।

- সংগৃহিত

পঠিত : ৮৮ বার

ads

মন্তব্য: ০