Alapon

গান-বাজনার বিষয়ে উস্তাদ ইউসুফ আল কারজাভীর শর্তাবলি...



[গান ও মিউজিকের বিষয়ে আলোচনা এলেই সাধারণত উসতায কারযাভীকে কোট করা হয়। এক শ্রেণি তাঁর নামে বলে--- “কারযাভী ফতোয়া দিয়েছেন মিউজিক হালাল হওয়ার ব্যাপারে।” কিন্তু তিনি যে শর্তাদি উল্লেখ করেছেন তা তারা এড়িয়ে যায়। আবার কেউ কেউ তাঁর এ বিষয়ক মতামতকে এক বাক্যে ভ্রষ্টতা হিসেবে উল্লেখ করে।
উসতায কারযাভীর এ বিষয়ের মতামত জানতে ‘ইসলাম ও শিল্পকলা’ বইটি পড়া যেতে পারে। বইটি অনুবাদ করেছেন ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়ার আরবি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও প্রফেসর ড. মাহফুজুর রহমান। এ বইয়ের একটি অংশ এখানে হুবহু তুলে দেওয়া হলো।]

গান বৈধ হওয়ার জন্য অবশ্যই কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, গান শোনা বৈধ হওয়ার জন্য বেশ কিছু জরুরি শর্ত রয়েছে-- যা অবশ্যই পূরণ করতে হবে।

এক.
আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, সব ধরনের গান হালাল নয়। এ বিষয়টির প্রতি আমরা পুনর্বার জোর দিতে চাই। আমরা বলতে চাই-- গান হালাল হওয়ার জন্য অবশ্যই তার বিষয়বস্তু ইসলামের শিক্ষা ও শিষ্টাচারের সাথে সংগতিশীল হতে হবে। সুতরাং আবু নওয়াসের নিম্নোক্ত গান কিছুতেই বৈধ হতে পারে না--

“আমার নিন্দা করো না, তোমার নিন্দা আমাকে আরও অনুপ্রাণিত করে;
আমার চিকিৎসা করো সেই জিনিস দিয়ে, যা নিজেই রোগ।” (অর্থাৎ মদ দ্বারা)

তেমনিভাবে কবি শাওকির এ গানও বৈধ হতে পারে না--
“চলে গেছে রমজান,
অতএব, সাকি! দাও মোরে সুরার পাত্র,
সুরার আগ্রহে হৃদয় মোর ভারাক্রান্ত।”

এর চেয়ে আরও জঘন্য হলো ইলিইয়া আবু মাযির রচিত আত-তালাসিম নামক গানের এই উক্তি--
“এসেছি আমি এ ধরায় জানি না কোথা থেকে,
তবে আমি এসেছি এটা সত্য,
সামনে রাস্তা দেখেছি তাই চলেছি,
কিভাবে এসেছি? কী করে রাস্তা দেখেছি, জানি না।”

কারণ, এ গানে ঈমানের মূল কথা তথা-- স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস, পরকাল ও নবুওয়াতের প্রতি বিশ্বাসকে অস্বীকার করা হয়েছে।

অনুরূপভাবে অঞ্চলিক ভাষায় রচিত ‘কে মোরে বানাল’ গানটিও ইলিয়া আবু মাযির গানের মতো ঈমানের মৌলিক বিষয়ে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করে। তেমনিভাবে ‘দুনিয়াটা সিগারেট আর সুরার পাত্র বৈ আর কী?’ গানটি ইসলামি মূল্যবোধের পরিপন্থি। কারণ, ইসলাম মাদকদ্রব্যকে নাপাক ও শয়তানের প্ররোচনার ফল বলে ঘোষণা দিয়েছে। যারা সুরা পান করে, বানায়, বিক্রি করে, বহন করে, এমনকি তা তৈরিতে যে কোনো রকমের সহযোগিতা করে, তাদের সকলকেই ইসলামে লানত ও ভর্ৎসনা করা হয়েছে। তেমনিভাবে ধুমপানও একটা আপদ-- তা মানুষের দেহ, মন ও অর্থের বিরাট ক্ষতি করে। এটি নানান রোগ-ব্যাধিরও কারণ।

যেসব গান জালিম স্বৈরাচারী ফাসিক শাসকদের প্রশংসা করে --যারা আমাদের এ উম্মাহকে শাসনের আবরণে মূলত শোষণ করেছে ও করছে-- তাও ইসলামি শিক্ষার পরিপন্থি। কারণ, ইসলাম জালিম, জালিমদের দোসর এমনকি যারা জালিমের জুলুমের প্রতিবাদ করে না, তাদের সকলকে লানত করে। সুতরাং যে গানে তাদের প্রশংসা করা হয়, সে গান সম্বন্ধে ইসলামের অবস্থান কী ধরনের হতে পারে-- তা সহজেই অনুমেয়।

যে গান সীমালঙ্ঘনকারী ইভটিজার, ব্যভিচারী ও লোভী চোখের নারী কিংবা পুরুষদের প্রশংসা করে, সে গানও ইসলামি শিষ্টাচারবিরোধী। কারণ, মহাগ্রন্থ আল-কুরআন আহবান জানায়--
قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ َ
“মুমিনদের বলুন, তারা যেন নিজ দৃষ্টিকে অবনত রাখে।”
সূরা নূর : ৩০
وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ
“আর মুুমিন নারীদের বলুন, তারাও যেন দৃষ্টিকে নত রাখে।”
সূরা নূর : ৩১

নবি কারিম সা. আলী রা.-কে বলেছিলেন,
“হে আলী! একবার চোখ পড়ে গেলে, দ্বিতীয়বার চোখ দিয়ো না। কারণ, প্রথমবারের দৃষ্টি ক্ষমাযোগ্য হলেও, দ্বিতীয়বারের দৃষ্টি ক্ষমাযোগ্য হবে না।”

দুই.
তা ছাড়া গান গাওয়ার পদ্ধতিও তা হালাল বা হারাম হওয়ার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ। হয়তো গানের বিষয়বস্তু ইসলামি মূল্যবোধ ও শিক্ষার পরিপন্থি নয়; কিন্তু গায়ক-গায়িকার গাওয়ার পদ্ধতি, গানের সুর অথবা তাদের অঙ্গভঙ্গিতে সুড়সুড়ির উপাদান থাকে; কিংবা গায়ক-গায়িকার ইচ্ছায় সুপ্ত যৌনতাকে উত্তপ্ত করার চেষ্টা থাকে অথবা অসুস্থ মনের মানুষকে উত্তেজিত করার বাসনা থাকে, তাহলে গান হালালের সীমানা থেকে হারামের সীমায় উপনীত হবে কিংবা অন্তত সন্দেহজন বা মাকরুহর স্থানে চলে যাবে। এমন অনেক গান প্রচার করা হয়-- যাতে গায়ক-গায়িকার কণ্ঠে এমন মাদকতা ও আকর্ষণ থাকে; যা প্রবৃত্তি ও যৌনবৃত্তিকে জাগ্রত করে কিংবা প্রেম-প্রীতিতে শ্রোতা মাতাল হয়ে পড়ে। বিশেষত যুবক-যুবতিদের উত্তেজিত ও মাতাল করার জন্য এসব ধরনের উত্তেজক ক্রিয়াকাণ্ড করা হয়ে থাকে।

কুরআন নবি কারিম সা.-এর স্ত্রীগণকে সম্বোধন করে বলে--
فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ
“তোমরা (পরপুরুষের সাথে) কোমল ভঙ্গিতে কথা বলো না-- তা করলে অন্তরে ব্যাধি আছে এমন কেউ কুবাসনা করতে পারে।”
সূরা আহযাব : ৩২
সুতরাং যদি কোমল কণ্ঠস্বরের সাথে ছন্দ, সুর, মিউজিক ও উত্তেজিত করার মতো প্রক্রিয়া থাকে, তাহলে তার হুকুম কী হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।

তিন.
তৃতীয় আরেকটি বিষয় হলো, গানের সাথে হারাম কিছু থাকা চলবে না। যেমন-- মদপান, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, বেপর্দা ও বেহায়াপনা ইত্যাদি। প্রাচীনকাল থেকেই গান-বাজনার আসরে এসব হয়ে আসছে। যখনই গান-বাজনার অনুষ্ঠানের কথা আসে, তখনই এসব বিষয়ের কথাও মনে পড়ে। বিশেষত দাসী ও নারীদের গান-বাজনার অনুষ্ঠানে এসব হয়ে থাকেই।

সুনানে ইবনে মাজাহ সহ বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত নিম্নোক্ত হাদিসে এ কথাই বোঝানো হয়েছে--
“আমার উম্মতের কিছু লোক মদপান করবে। এমনকি মদকে তারা অন্য নামে নামকরণ করবে। তাদের সামনে গায়িকারা গান-বাজনা করবে। আল্লাহ তায়ালা তাদের সহ ভূমিধস করাবেন এবং তাদের বানর ও শূকরে পরিণত করবেন।”

আমরা এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করতে চাই। সেটি হলো-- অতীতে গান শোনার জন্য গানের আসরে যাওয়ার প্রয়োজন হতো, গায়ক-গায়িকা ও তাদের সাঙ্গ-পাঙ্গদের সাথে মেলামেশা করতে হতো। এসব আসরে প্রায়ই শরিয়ত ও দ্বীনবিরোধী কার্যকলাপ সংঘটিত হতো। কিন্তু আজকের দিনে গানের আসর ও গায়ক-গায়িকাদের থেকে দূরে অবস্থান করেও গান শোনা যায়। নিঃসন্দেহে এ বিষয়টি গানের হুকুমকে কিছুটা হালকা ও সহজতর করার একটা দিক হিসেবে বিবেচিত হবে।

চার.
গানের ক্ষেত্রে অন্যান্য মুবাহ ও বৈধ জিনিসের মতো অতিরঞ্জন পরিহার করা আবশ্যক। বিশেষত আবেগতাড়িত গান শোনার ব্যাপারে-- যাতে প্রেম-প্রীতি নিয়ে কথা থাকে। কারণ, মানুষ কেবল আবেগসর্বস্ব প্রাণী নয়, আর আবেগও কেবল প্রেমে সীমাবদ্ধ নয়, প্রেমও কেবল নারীর সাথে সুনির্দিষ্ট নয়, নারীও শুধু দেহসর্বস্ব কোনো সত্তা নয়। এ কারণেই আবেগতাড়িত এসব প্রেমের গান কম শোনাই বাঞ্চনীয়। তাতে গা ভাসিয়ে না দেওয়াই কর্তব্য।

আমাদের জীবনের অন্যান্য সব পরিকল্পনা ও গান শোনার মধ্যে একটা ভারসাম্য থাকা আবশ্যক। দ্বীন পালন ও দুনিয়া উপভোগের মধ্যেও থাকতে হবে একটা সমতা ও ভারসাম্য। দুনিয়া পালনের ক্ষেত্রেও থাকতে হবে ব্যক্তির অধিকার ও সমষ্টির অধিকার আদায়ে সাম্য। ব্যক্তিকেও রাখতে হবে তার বুদ্ধি-বিবেক ও আবেগের মধ্যে সামঞ্জস্যতা।
তেমনিভাবে মানুষের সমস্ত আবেগ যথা-- প্রেম-প্রীতি, হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা, সৌর্যবীর্য, সাহসিকতা, স্নেহ-মমতা, মাতৃত্ব, পিতৃত্ব, ভ্রাতৃত্ব, সততা ইত্যাদির মধ্যেও থাকতে হবে ভারসাম্য। কারণ, মানুষের সব ধরনের আবেগেরই রয়েছে হক ও অধিকার।

বিশেষ কোনো আবেগ প্রকাশের ক্ষেত্রে অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ি অবশ্যই অপরাপর আবেগ ও অধিকারে কমতি করে ব্যক্তির বিবেক-বুদ্ধি, আত্মা ও ইচ্ছাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এভাবে তা সমাজের অধিকার, বৈশিষ্ট্য ও মূল্যবোধকে ধ্বংস করে। সর্বোপরি এই অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ি দ্বীন, ধর্ম, নৈতিকতা ও আদর্শকে নিঃশেষ করেই হয়ে থাকে।

ইসলাম সব ক্ষেত্রেই এমনকি ইবাদত-বন্দেগিতেও অতিরঞ্জন এবং বাড়াবাড়ি হারাম ঘোষণা করেছে। কাজেই এ দ্বীন কী করে খেল-তামাশায় বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জনকে প্রশ্রয় দেবে? তা বৈধ হলেও তাতে সর্বক্ষণ ব্যস্ত থাকাকে কীভাবে সমর্থন করবে?

যারা গান-বাজনা নিয়ে সর্বদা ব্যতিব্যস্ত থাকে, তা প্রমাণ করে-- তাদের মন-মস্তিষ্ক বড়ো বড়ো দায়িত্ব-কর্তব্য পালনের ব্যাপারে অসতর্ক। আরও প্রমাণ করে যে, তারা অনেক হক ও অধিকার আদায়কে তুচ্ছজ্ঞান করে-- যা মানুষের এই সংক্ষিপ্ত জীবনে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আদায় করা আবশ্যক ছিল। ইবনে মুকাফফা যথার্থই বলেছেন,
“আমি এমন কোনো অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ি দেখিনি-- যেখানে অধিকার হরণ ও হক বিনষ্টকরণ নেই।”

হাদিসে আছে,
“বুদ্ধিমান মানুষ কেবল তিনটি বিষয়ের প্রতিই লোভ করতে পারে-- জীবনযাপনে সচ্ছলতা, পরকালের সঞ্চয় বৃদ্ধি এবং হারাম নয় (হালাল) এমন আনন্দ-বিনোদন।”
অতএব আমাদের উচিত, এই তিনটি বিষয়ের জন্য সময়কে পরিকল্পিত ও যথার্থভাবে ভাগ করা। আমাদের আরও মনে রাখতে হবে যে, আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক মানুষকে তার জীবন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন-- কীসে তার জীবনের মূল্যবান সময় অতিবাহিত করেছে? কোন কাজে তার যৌবনকাল কাটিয়েছে?

পাঁচ.
এ আলোচনার পর আরও কিছু বিষয় থাকে, যে ক্ষেত্রে প্রত্যেক গানের শ্রোতাকেই নিজের জন্য নিজেকে ফকিহ ও মুফতি হতে হয়। যদি গান অথবা বিশেষ কোনো গান তার প্রবৃত্তিকে তাড়িত করে, তাকে অশ্লীল কাজে উদ্ধুদ্ধ করে, তাকে সর্বদা কল্পজগতে নিয়ে যায়, তার মধ্যে আধ্যাত্মিকতার পরিবর্তে পশুত্বকে উজ্জীবিত করে, তখন তাকে সে গান-বাজনা পরিহার করতে হবে। তাকে সেই জানালা বন্ধ করে দিতে হবে, যে জানালা দিয়ে তার মন- মানসিকতায়, তার দ্বীন-ধর্ম ও চরিত্রের অভ্যন্তরে ফিতনার বাতাস ঢুকে পড়ে। এভাবেই তাকে সিদ্ধান্ত নিয়ে সুস্থির হতে হবে।

পঠিত : ১১৪ বার

ads

মন্তব্য: ০