Alapon

ইসলামী কমিউনিজম ও তমদ্দুনে মজলিশ


ছবি : তমুদ্দুনের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবুল কাশেম

বিগত বিংশ শতাব্দির শুরু থেকে ইসলামী সভ্যতার পতন শুরু হয়। এর মাধ্যমে মুসলিমরা একের পর এক ভূমি হারাতে থাকে। ১ম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের পরাজয় ও খিলাফত ধ্বংস হওয়ার মাধ্যমে ইসলামের শেষ আশ্রয়টুকুও ধ্বংস হয়ে যায়। মুসলিম উম্মাহ'র বিপরীতে পশ্চিমারা ভাষা ও বর্ণভিত্তিক জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ঘটায়। এই জাতিবাদী তুর্কিরা খিলাফত ধ্বংস করে মুসলিমদের পরাজয় তরান্বিত করে। মুসলিম বিশ্ব ছোট ছোট দেশে পরিণত হয়। আর্থিক কর্মকাণ্ডের জন্য পুঁজিবাদ ও রাষ্ট্র গঠনের জন্য জাতীয়তাবাদ হয়ে ওঠে ট্রেন্ডি আদর্শ।

বিংশ শতাব্দির মাঝামাঝি সময়ে সমাজতন্ত্র বা সোশ্যালিজমের আবির্ভাব হয়। এর একটু আপডেট ভার্সন হলো সাম্যবাদ বা কমিউনিজম। কমিউনিজম হলো শ্রেণীহীন, শোষণহীন, ব্যক্তি মালিকানাহীন এমন একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মতবাদ যেখানে ব্যক্তিগত মালিকানার স্থলে উৎপাদনের সকল মাধ্যম এবং প্রাকৃতিক সম্পদ (ভূমি, খনি, কারখানা) রাষ্ট্রের মালিকানাধীন এবং নিয়ন্ত্রণাধীন থাকে। সাম্যবাদীরা নিজেদের সমাজতন্ত্রের একটি উন্নত এবং অগ্রসর রূপ বলে মনে করে।

উভয়েরই মূল লক্ষ্য হল ব্যক্তিমালিকানা এবং শ্রমিক শ্রেণীর উপর শোষণের হাতিয়ার পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থার অবসান ঘটানো। কার্ল মার্কস যে মতাদর্শ উপস্থাপন করেছিলেন সেই মতে সাম্যবাদ হল সমাজের সেই চূড়ান্ত শিখর, যেখানে পৌঁছাতে হলে বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজে অর্থনৈতিক সাম্য স্থাপন করতে হবে এবং সেই ক্রান্তিকালে উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে, সমাজে সামগ্রী ও সেবার অতিপ্রাচুর্য সৃষ্টি হবে। কোনো দেশে সাম্যবাদ থাকলে সেখানে ধনী গরীবের ব্যবধান থাকবে না। নাগরিকদের মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করার দ্বায়িত্ব সরকার নেবে।

সাম্যবাদী বা কম্যুনিস্টরা নিজেদেরকে প্রগতিবাদী ও বৈজ্ঞানিক হিসেবে উপস্থাপন করে। আর বাকি সব মতবাদকে সেকেলে ও কুসংস্কারচ্ছন্ন বলে অভিহিত করে। বিংশ শতাব্দির মাঝামাঝি সময়ে রাশিয়া থেকে এর বিস্তার শুরু হয়। এদের নান্দনিক উপস্থাপনা পরাজিত মুসলিম বিশ্বকে বেশ আন্দোলিত করে। মুসলিম যুবকরা ইসলামকে পরাজিত আদর্শ ভেবে ইসলাম থেকে দূরে সরে যায়, গ্রহণ করে কমিউনিজমকে। ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রাণকেন্দ্র সমরখন্দ, বুখারা, উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, আফগানিস্তান, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও তুরস্কে এই মতবাদের বিপুল প্রসার হয়। এই অঞ্চলের যুবকেরা সাম্যবাদ গ্রহণ করে ধর্মহীন হয়ে পড়েছে।

তবে হিন্দুস্থান, পাকিস্তান ও বাংলায় এর সর্বগ্রাসী আক্রমণ কিছুটা রোধ করা গেছে। এই মতবাদের বিরুদ্ধে যুক্তি ও ইসলামের মাহাত্ম্য উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন গত শতাব্দির শ্রেষ্ঠ মুজাদ্দিদ সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদী রাহিমাহুল্লাহ। তিনি এই মতবাদের বিরুদ্ধে মুসলিম যুবকদের ফিরিয়ে আনতে রিসালায়ে দ্বীনীয়াত নামে একটি বই লিখেন। এটি পৃথিবীর প্রায় সব জনপ্রিয় ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। বাংলায় এর অনুবাদ হয়েছে ইসলাম পরিচিতি নামে। ইংরেজিতে Towards Understanding Islam নামে অনুবাদ হয়েছে। এভাবে বক্তব্য, বিবৃতি ও দল গঠনের মাধ্যমে মাওলানা মওদূদী আল্লাহর ইচ্ছেয় এই মতবাদকে ইসলামের মহান আদর্শ দিয়ে ঠেকিয়ে দিয়েছেন।

পাকিস্তান গঠনের সাথে সাথেই কিছু অপরিণামদর্শি মুসলিম বুদ্ধিজীবী সাম্যবাদকে ইসলামেরই অংশ হিসেবে ভাবতে শুরু করেন। তারা ইসলামী কমিউনিজমের প্রচার করেন। এমন একটি ভ্রান্ত মুসলিমরা মিলে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন তৈরি করেন। এদের কাজ ছিল কম্যুনিস্টরা যা করে তারাও তাই করবে শুধু আল্লাহর নাম নিয়ে করবে। গান-বাজনা, থিয়েটার, পথনাটক, সভা, পাঠচক্র ইত্যাদি ছিল তাদের কাজ। এক পর্যায়ে তারা ইসলামের সংস্কারে লেগে পড়েন। তারা বলতে চান ১৪০০ বছর আগের নিয়ম এখন আর কার্যকর নয়। কিছু কিছু সংস্কার করলেই ইসলাম হয়ে উঠবে যুগপোযোগী। এজন্য নারী-পুরুষে সমান অধিকার ও কর্ম, পর্দার শিথিলতা, ইসলামকে ব্যক্তিপর্যায়ে সীমিত করা ইত্যাদি প্রজেক্ট তারা হাতে নেয়।

এই কাজগুলো বাস্তবায়ন করতে সেই অতিবুদ্ধিসম্পন্ন লোকেরা গঠন করে তমদ্দুনে মজলিশ। ইসলামী সাম্যবাদ আদর্শাশ্রয়ী একটি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাশেমের উদ্যোগে ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর এটি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এর নামকরণ হয় পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিশ। তমদ্দুন মজলিশ প্রতিষ্ঠায় অধ্যাপক আবুল কাশেমের অগ্রণী সহযোগীদের মধ্যে ছিলেন দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, অধ্যাপক এ.এস.এম নূরুল হক ভূঁইয়া, শাহেদ আলী, আবদুল গফুর, বদরুদ্দীন উমর, হাসান ইকবাল এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় সিনিয়র ছাত্র। প্রফেসর আবুল কাশেম ছিলেন পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিশের প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক। দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ ১৯৪৯ সালে মজলিশের সভাপতি নির্বাচিত হন।

তমদ্দুন মজলিশের গঠনতন্ত্রে বর্ণিত এই সংগঠনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিম্নরূপ:
১. কুসংস্কার, গতানুগতিকতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতা দূর করে ‘সুস্থ ও সুন্দর’ তমদ্দুন গড়ে তোলা;
২. যুক্তিবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত সর্বাঙ্গ সুন্দর ধর্মভিত্তিক সাম্যবাদের দিকে মানবসমাজকে এগিয়ে নেওয়া;
৩. মানবীয় মূল্যবোধ ভিত্তিক সাহিত্য ও শিল্পের মাধ্যমে নতুন সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করা;
৪. নিখুঁত চরিত্র গঠন করে গণজীবনের উন্নয়নে সহায়তা করা।

প্রতিষ্ঠার পর এর প্রথম পর্বে তমদ্দুন মজলিশের ব্যাপক তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। মজলিশের উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনায় সারা বছর আলোচনা সভা, সেমিনার, বিতর্ক, নাট্যাভিনয়, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতো। এর নিয়মিত কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত ছিল বিভিন্ন বিষয়ে পুস্তক-পুস্তিকা ও প্রচারপত্র প্রকাশ। অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই বাজিমাত করে তারা। ভাষা আন্দোলনের নামে মুসলিম উম্মাহ'র বিরুদ্ধে বাঙালি জাতিবাদের বিষ রোপণ করে তারা।

উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগের বিরুদ্ধে বস্ত্তত তমদ্দুন মজলিশই প্রথম প্রতিবাদ উত্থাপন করে এবং বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিসহ ভাষা আন্দোলনের সূচনায় পথিকৃতের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। তমদ্দুন মজলিশ ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ শিরোনামে অধ্যাপক আবুল কাশেম সম্পাদিত একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে। এ ঐতিহাসিক পুস্তিকায় সন্নিবেশিত নিবন্ধগুলোতে এদের লেখক কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল মনসুর আহমদ ও অধ্যাপক আবুল কাশেম বাংলাকে পূর্ব বাংলায় শিক্ষার একমাত্র মাধ্যম, অফিস ও আদালতের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার পক্ষে জোরালো বক্তব্য রাখেন। তাঁরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিও তুলে ধরেন। এই মূল পুস্তিকার মুখবন্ধে, পুস্তিকার সম্পাদক আবুল কাশেম কর্তৃক প্রণীত একটি সংক্ষিপ্ত প্রস্তাবনাও ছিল বাংলা ভাষার অনুকূলে।

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের কার্যক্রম জোরদার করার লক্ষ্যে ১৯৪৭ সালেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিজ্ঞান বিভাগের লেকচারার অধ্যাপক নূরুল হক ভুইয়াকে আহ্বায়ক করে প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। ১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাসে তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে ফজলুল হক হলে রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। হাবিবুল্লাহ বাহারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ আলোচনা সভায় আলোচনায় অংশ নেন অধ্যাপক আবুল কাসেম, কবি জসীমউদ্দিন, কাজী মোতাহার হোসেন প্রমুখ। ১৯৪৭ সালের ১৭ নভেম্বর রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে মওলানা আকরম খাঁসহ কয়েকশ চিন্তাবিদ, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক, রাজনীতিক ও ছাত্রনেতাদের স্বাক্ষরসহ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি পেশ করা হয়।

এদিকে উর্দু সমর্থক আন্দোলন গড়ে উঠে। স্বনামখ্যাত মৌলানা দ্বীন মোহাম্মদ সাহেব প্রমুখকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহল্লায় ও মফস্বলের বহুস্থানে উর্দুকে সমর্থন করে বহু সভা করা হয়। এরা কয়েক লাখ দস্তখত যোগাড় করে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এক মেমোরেণ্ডাম পেশ করেন। পথেঘাটে ইস্টিমারে এ স্বাক্ষর সংগ্রহের কাজ চলে। স্বাক্ষর সংগ্রহের পর কয়েকজন নামকরা ব্যক্তি করাচীতে গিয়ে সরকারের কাছে পেশ করে আসেন।"

যারা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার বিপক্ষে ছিলেন তারা কেউ কিন্তু অবাঙালি ছিলেন না। তাদের যুক্তি হলো পূর্ব পাকিস্তানে যদি বাংলাকে অফিসিয়াল ভাষা করা হয় তবে অন্যান্য অঞ্চল যেমন পাঞ্জাব, সিন্ধ, বেলুচ, কাশ্মীরে তাদের নিজস্ব ভাষা চালু হবে। এক্ষেত্রে বাঙালিদের সেসব অঞ্চলে কাজ করা ও শিক্ষাগ্রহণ করা কঠিন হবে। অন্যদিকে বাংলায় অন্যান্য জাতি গোষ্ঠির পাকিস্তানীরা আসবে না। ফলে দীর্ঘদিনের ইংরেজ ও ব্রাহ্মণ্যবাদীদের শোষণের ফলে পিছিয়ে থাকা বাংলা আরো পিছিয়ে যাবে। সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় সংহতি বিনষ্ট হবে। এজন্য বাঙালিদের প্রতিনিধিত্বকারী কোনো রাজনৈতিক নেতা রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে ছিলেন না।

রাষ্ট্রভাষার পক্ষে দেওয়া অধ্যাপক আবুল কাশেমের বিবৃতিগুলো ভারতের কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেহাদে ছাপা হতো। কলকাতার ঐ পত্রিকা এ বিষয়ে পাকিস্তানের কড়া সমালোচনা করে ও বাঙালি নির্যাতনের অভিযোগ রিপোর্ট করতো। ওই পত্রিকায় কপি ঢাকায় নিয়ে এসে প্রচারণা চালায় তমদ্দুনে মজলিশেরর কর্মীরা। এই ঘটনা ঢাকাবাসীর মনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। তাদের আগের ধারণা সত্য হয়েছে বলে তারা মনে করেন। নতুন একটি ইসলামী ভাবধারার রাষ্ট্রে ফাসাদ সৃষ্টি করার জন্যই মুশরিকরা কিছু ছাত্রদের লেলিয়ে দিয়েছে। এরকমটাই ভাবতে থাকেন ঢাকাবাসী। ঢাকাবাসী তমদ্দুনের বিরুদ্ধে সক্রিয় অবস্থান গ্রহণ করেন।

১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তোলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। প্রেমহরি বর্মন, ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত এবং শ্রীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার এ প্রস্তাবকে স্বাগত জানায়। তারা পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত গণপরিষদ সদস্য ছিলেন। একমাত্র চারজন হিন্দু ছাড়া আর কোনো পূর্ব পাকিস্তানের গণপরিষদ সদস্য এই প্রস্তাবের পক্ষে অবস্থান নেননি। ফরিদপুরের নেতা তমিজুদ্দিন খানের নেতৃত্বে গণপরিষদের সকল বাঙালি নেতা একযোগে এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। ঢাকার নেতা খাজা নাজিমুদ্দিন এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বক্তৃতা দেন। তিনি বলেন যে, “পূর্ব বাংলার অধিকাংশ মানুষ চায় রাষ্ট্রভাষা উর্দু হোক, আমরা সবাই পাকিস্তান রাষ্ট্রের সংহতি চাই।” পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খান এ প্রস্তাবটিকে পাকিস্তানে বিভেদ সৃষ্টির অপচেষ্টা বলে উল্লেখ করেন। উর্দুকে লক্ষ কোটি মুসলমানের ভাষা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কেবলমাত্র উর্দুই হতে পারে”। গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথের সংশোধনী প্রস্তাব ভোটে বাতিল হয়ে যায়।

গণপরিষদে বাংলার রাষ্ট্রভাষা প্রস্তাব বাতিল হওয়ার প্রতিবাদে ২৬ ফেব্রুয়ারি অধ্যাপক আবুল কাশেমের সভাপতিত্বে সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং সংগ্রাম পরিষদ পুনর্গঠিত হয়। তবে বাংলার একজন রাজনৈতিক নেতারও প্রত্যক্ষ সমর্থন না পাওয়াও ভাষা আন্দোলন গণভিত্তি তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছে। যাই হোক রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল ও মিটিং-মিছিলের মাধ্যমে ১১ মার্চ প্রতিবাদ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। ১১ মার্চ ভাষা আন্দোলনকারীরা খুবই সহিংস হয়ে ওঠে। তারা সচিবালয়ে ঢুকে সরকারি কর্মকর্তাদের হেনস্তা করতে থাকে। এর প্রতিরোধে মুসলিম লীগের নেতা কর্মীরা রাস্তায় নামে। ফলে পালিয়ে যায় ভাষা আন্দোলনকারীরা। মুসলিম লীগের নেতা কর্মীরা ঢাকা মেডিকেল ও ঢাবির হলে হামলা চালায়। পুলিশ দুই পক্ষের লোকদেরই ছত্রভঙ্গ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে।

পাকিস্তানের গর্ভনর জেনারেল মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ ঢাকায় আসেন। ২১ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঘোষণা দেন "উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা"। এতে ভাষা আন্দোলনকারীরা ক্ষেপে যায় এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের উদ্যোগ নেয়। তমুদ্দুনের নেতৃত্বে কিছু ছাত্র জিন্নাহর সাথে দেখা করেন। জিন্নাহ তাদের বুঝান কেন একটি ভাষাই পাকিস্তানের সংহতির জন্য জরুরি। এরপর ২৪ মার্চ জিন্নাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার বক্তব্যে বলেন, “Let me make it very clear to you that the state language of Pakistan is going to be Urdu and no other language. Anyone who tries to mislead the people is really the enemy of the state. Without one state language no state can remain tied up solidly together and function.”

Let me restate my views on the question of a state language for Pakistan. For official use in this province, the people of the province can choose any language they wish... There can, however, be one lingua franca, that is, the language for inter-communication between the various provinces of the state, and that language should be Urdu and cannot be any other...

The state language, therefore, must obviously be Urdu, a language that has been nurtured by a hundred million Muslims of this subcontinent, a language understood throughout the length and breadth of Pakistan and, above all, a language which, more than any other provincial language, embodies the best that is in Islamic culture and Muslim tradition and is nearest to the languages used in other Islamic countries.

তখন তার এই বক্তব্য করতালি দিয়ে স্বাগত জানায় ছাত্ররা। প্রচলিত ইতিহাসে আমাদের জানানো হয়েছে ছাত্ররা ‘নো নো’ বলে প্রতিবাদ জানিয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো সে ‘নো নো’ শব্দ শোনা যায় নি। হতে পারে তারা সত্যই বলেছেন। কিছু ছাত্র হয়তো ‘নো’ বলেছেন। কিন্তু অধিকাংশ বাঙালি ছাত্র করতালি দিয়ে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন। এই ব্যাপারটা আমাদের প্রচলিত ইতিহাসে অস্বীকার করা হয়েছে।

যাই হোক জিন্নাহ ভাষা আন্দোলনকারীদের সাথে কথা বলতে আগ্রহী হন। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের একটি প্রতিনিধিদল জিন্নাহ্‌'র সাথে সাক্ষাৎ করে এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে একটি স্মারকলিপি দেয়। প্রতিনিধি দলে ছিলেন শামসুল হক, কামরুদ্দিন আহমদ, আবুল কাসেম, তাজউদ্দিন আহমদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, আজিজ আহমদ, অলি আহাদ, নঈমুদ্দিন আহমদ, শামসুল আলম এবং নজরুল ইসলাম। বৈঠকে জিন্নাহ একক রাষ্ট্রভাষার গুরুত্ব তুলে ধরেন, পাকিস্তান নিয়ে তার চিন্তা ও পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন।

জিন্নাহ তাদের বুঝাতে সক্ষম হন কেন উর্দু জরুরি এবং এতেই কল্যাণ রয়েছে বাঙালিদের। প্রতিটা প্রদেশে আলাদা ভাষা থাকলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে বাঙ্গালিরাই। জিন্নাহ ছাত্রদের বুঝিয়ে ভাষা আন্দোলন থেকে সরে আসার অনুরোধ করেন। ভাষা আন্দোলনের নেতারা জিন্নাহর যুক্তির কাছে হার মানে এবং আন্দোলন থেকে সরে আসার মৌখিক স্বীকৃতি দেয়। অবশ্য জিন্নাহ তাদের কাছ থেকে লিখিত কোনো ডকুমেন্টস চাননি। তিনি আন্তরিকভাবে বুঝিয়ে ছাত্রদের ভুল আন্দোলন থেকে ফিরতে বলেছেন।

আন্দোলন নিয়ে দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে পড়ে তমদ্দুন মজলিশ। দ্বিধান্বিত নেতৃত্ব থেকে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্ব কেড়ে নেয় বামাদর্শের ছাত্রনেতা কমরেড তোয়াহা এবং এই আন্দোলনকে কমিনিস্টদের আন্দোলনে পরিণত করেন। নেতৃত্ব হারানোর পর পরবর্তীতে তমদ্দুন মজলিশ আন্দোলন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবার জন্য কমিউনিস্টদের দায়ী করে একটি বিবৃতি প্রদান করে এবং পরে তারা আস্তে আস্তে আন্দোলনের পথ থেকে সরে আসে। ভাষা আন্দোলন ইসলামী কমিউনিস্টদের থেকে চলে যায় সাচ্চা কমিউনিস্টদের কাছে।

তমদ্দুনের আদর্শিক নেতা ছিলেন বেঙ্গল মুসলিম লীগের নেতা আবুল হাশেম। তিনিও একইসাথে ইসলামী ভাবধারা ও কমিউনিজম লালন করতেন। তিনি ১৯৫৩ সালে খেলাফতে রব্বানী পার্টি নামে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর তমদ্দুনের নেতারা এই পার্টির সাথে সংযুক্ত হন এবং তমদ্দুন হয়ে পড়ে খেলাফতে রব্বানীর কালচারাল উইং।

পঠিত : ৯৯ বার

ads

মন্তব্য: ০