Alapon

❝ভাষা আন্দোলন রাষ্ট্রভাষার জন্য ছিলো নাকি মাতৃভাষার জন্য? ❞

ভাষা আন্দোলন রাষ্ট্রভাষার জন্য ছিলো নাকি মাতৃভাষার জন্য?


বাংলা ভাষার কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে ছিলেন না। ১৯১৮ সালের ২৮ জানুয়ারি গান্ধীর হিন্দি ভাষার ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে প্রশ্নের উত্তরে রবীন্দ্রনাথ লিখেন:
“Hindi is the only possible national language for inter-provincial intercourse in India.”
অর্থাৎ, ভারতের আন্ত-প্রাদেশিক ভাষা হিশেবে হিন্দিই একমাত্র সম্ভাব্য ভাষা। [১]
রাজনৈতিক বিবেচনায় হিন্দিকে প্রাধান্য দেবার পাশাপাশি ধর্মীয় বিবেচনায় মাঝেমাঝে তিনি বাংলার উপর সংস্কৃতকে রাখতেন। ১৯৪০ সালের ৭ আগস্ট অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় রবীন্দ্রনাথকে ডি.লিট বা সাহিত্যাচার্য উপাধি দেবার জন্য ভারতের ফেডারেল কোর্টের প্রধান বিচারপতি শান্তিনিকেতনে যান।
অক্সফোর্ডের রীতি অনুযায়ী মানপত্র লাতিন ভাষায় লিখিত ছিলো। বিশ্বভারতীর আচার্য হিশেবে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভাষণ দেন সংস্কৃত ভাষায়। তিনি সেই ভাষণ বাংলায়ও দিতে পারতেন। কিন্তু, জীবনের এমন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে উপনিষদের ভাষা ব্যবহার করাকে কবি সমীচীন মনে করেন। [২]
শান্তিনিকেতনে হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য তিনি আন্দোলন করেন। তার এই আন্দোলনে তাকে সাহায্য করেন ভাষা বিজ্ঞানী সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় ও ক্ষিতিমোহন সেন। রবীন্দ্রনাথ নিজে হিন্দি জানতেন না কিন্তু হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে ছিলেন [৩]। এমনকি শান্তি নিকেতনে হিন্দি ভাষার চর্চার জন্য রবীন্দ্রনাথ ‘হিন্দি ভবন’ প্রতিষ্ঠা করেন।
শুধু কি রবীন্দ্রনাথ? বাংলা সাহিত্যের সকল জায়ান্ট সাহিত্যিক ছিলেন হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে।
রমেশচন্দ্র মজুমদার, যদুনাথ সরকার, মেঘনাদ সাহা, সুকুমার সেন, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বালাইচাদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল) কেউই ভারতের রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে হিন্দির বাইরে বাংলাকে নিয়ে ভাবেননি। এমনকি ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি’ এর কবি জীবনানন্দ দাসও চেয়েছিলেন হিন্দিই হোক ভারতের রাষ্ট্রভাষা।
রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে-বিপক্ষে অন্নদাশঙ্কর রায়ের ভূমিকা দ্বিচারী। ভারতের রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে তিনি ছিলেন হিন্দির পক্ষে আর পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে তিনি ছিলেন বাংলার পক্ষে। এমনকি তার লেখনীর মাধ্যমে তিনি ভাষা আন্দোলনকে প্রমোট করেছেন।
ভাষা আন্দোলনের মৃতদের উদ্দেশ্যে তিনি লিখেন:
“প্রাণ দিল যারা ভাষার জন্যে কি হবে না তাদের?
জয় তো তাদের হয়েই রয়েছে জনতা পক্ষে যাদের।”
বাংলা ভাষার জন্য তার দরদ ছিলো মাসীর মতো!
মহাত্মা গান্ধীর মাতৃভাষা ছিলো গুজরাটি। কিন্তু তিনি তার প্রথম ও প্রধান বই ‘হিন্দ স্বরাজ’ লিখেন হিন্দি ভাষায়। মাতৃভাষার জন্য তার দরদ থাকলেও ভারতের রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে তিনিও ছিলেন হিন্দির পক্ষে। হিন্দ স্বরাজে তিনি লিখেন –
“A universal language for India should be Hindi. [৪]”
ভাষার প্রশ্নে ‘মানুষ গান্ধী’র চেয়ে ‘রাজনীতিবিদ গান্ধী’ বড় হয়ে উঠেন।
গান্ধীর মতো কংগ্রেসের বড় বড় নেতা যেমন- বালগঙ্গাধর তিলক, জওহরলাল নেহরু, রাজেন্দ্রপ্রসাদ, সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল প্রমুখ সবাই ছিলেন হিন্দিকে রাষ্টভাষা করার পক্ষে। এমনকি বাঙ্গালি নেতা সুভাষ চন্দ্র বসুও ছিলেন হিন্দির পক্ষে।
বড় বড় সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ সবাই ছিলেন ভারতের রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে হিন্দির পক্ষে। এটা দেখে কেউ মনে করতে পারেন যে, তখন মনে হয় হিন্দি ভাষা ছিলো ভারতের বেশিরভাগ মানুষের মুখের ভাষা। আদতে হিন্দি ছিলো ভারতের সংখ্যালঘু মানুষের মুখের ভাষা। অন্তত রবীন্দ্রনাথের সময়ে।
ভারতে হিন্দির আধিপত্য কায়েমের প্রশ্ন উঠলে ভারতের শেষ গভর্নর জেনারেল চক্রবর্তী রাজা গোপালচারী ১৯৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে লিখেন:
“…it is well known by now the Hindi is not the language of the majority of our people…Hindi is, at best the language of a large minority. [৫]”
দুই.
ভারতকে রামরাজ্য হিশেবে গড়ে তোলার জন্য তিনটি মূলস্তম্ভ ছিলো। হিন্দু ধর্ম, হিন্দি ভাষা এবং হিন্দুস্থান নামে একটি ভূখণ্ড।
ব্রিটিশরা ১৮৩৭ সালে ফারসিকে সরিয়ে ইংরেজিকে রাষ্ট্রভাষা করে এবং ১৮৫০ সালে প্রশাসনিক সুবিধার্থে উর্দুর গুরুত্ব বুঝতে পেরে ইংরেজির পাশাপাশি উর্দুকে সরকারি ভাষা হিশেবে স্বীকৃতি দেয়। অন্যদিকে হিন্দুরা হিন্দিকে সরকারি ভাষা হিশেবে স্বীকৃতির জন্য আন্দোলন শুরু করে। যার ফলশ্রুতিতে ব্রিটিশ সরকার ১৯০০ সালে উর্দু ও হিন্দি উভয় ভাষাকে সরকারি ভাষা হিশেবে স্বীকৃতি দেয়।
১৯১৮ সালের ২৯ মার্চ ইন্দোরে অনুষ্ঠিত অষ্টম হিন্দি সাহিত্য সম্মেলনে মহাত্মা গান্ধী প্রস্তাব করেন হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করার। হিন্দি ভাষার প্রসারের জন্য তিনি হিন্দি ভাষার পাঁচজন এম্বাসেডরকে সেসব প্রদেশে পাঠান যেখানে হিন্দি ভাষার প্রচলন ছিলোনা। সেই পাঁচজন এম্বাসেডরের মধ্য একজন ছিলেন তার ছোট ছেলে দেবদাস গান্ধী [৬]।
১৯৩৭ সালের নির্বাচনের আগে কংগ্রেস তার নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলে।
হিন্দিভাষী না হয়েও এসকল সাহিত্যিক আর রাজনীতিবিদদের হিন্দিপ্রেমের মূলে ছিলো তাদের ধর্মীয় অনুপ্রেরণা এবং রাজনীতি। যার ফলে সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথের চেয়ে রাজনৈতিক রবীন্দ্রনাথ, মানুষ গান্ধীর চেয়ে রাজনীতিবিদ গান্ধী বড় হয়ে উঠেন। ভাষিক আবেগের চেয়ে রাজনৈতিক আবেগকে তারা প্রাধান্য দিয়েছেন।
তিন.
বাংলা কোনো কালেই এই অঞ্চলের রাষ্ট্রভাষা ছিলোনা। বৌদ্ধ আমলে পালি, হিন্দু সেন আমলে সংস্কৃত, মুসলমান আমলে ফারসি এবং ইংরেজ আমলে ইংরেজি ছিলো রাষ্ট্রভাষা। প্রায় ৭০০ বছর ফারসি ছিলো বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা।
কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশের মানুষের মাতৃভাষা কেউ কেড়ে নেয়নি এবং সেটা সম্ভবও ছিলোনা।
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তানের গভর্নর হিশেবে ১৯ মার্চ ১৯৪৮ সালে পূর্ব বাংলায় আসেন ১০ দিনের সফরে।
রেসকোর্স ময়দান এই অঞ্চলের জাতীয় ভাষার/প্রাদেশিক ভাষার প্রশ্নে তিনি বলেন:
Whether Bengali shall be the official language of this province is a matter for the elected representatives of the people of this province to decide. I have no doubt that this question shall be decided solely in accordance with the wishes of the inhabitants of this province at the appropriate time.
…. People of this province to decide what shall be the language of your province. [৭]
অর্থাৎ, এই অঞ্চলের আন্ত-প্রাদেশিক ভাষা কী হবে তা এই অঞ্চলের জনগণ ভোটের মাধ্যমে নির্ধারণ করবে। একই কথা তিনি বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানেও।
এরই প্রেক্ষাপটে খাজা নাজিমউদ্দীন পরিষদে বাংলাকে পূর্ব বাংলার সরকারি ভাষা হিশেবে পাস করিয়ে আইনগত ভিত্তি দেন ৬ এপ্রিল ১৯৪৮ সালে। এই আইন যখন পাস হয় তখনও পশ্চিম বাংলায় বাংলা সরকারি ভাষা হিশেবে মর্যাদা পায়নি। অর্থাৎ, বাংলা ভাষা প্রথমবারের মতো এই অঞ্চলের জাতীয় ভাষা/প্রাদেশিক ভাষার মর্যাদা পায় পাকিস্তান আমলে!
কিন্তু, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে জিন্নাহর মত ছিলো উর্দুর পক্ষে। অনেকেই মনে করেন, জিন্নাহর মাতৃভাষা বুঝি উর্দু ছিলো। আদতে জিন্নাহর মাতৃভাষা ছিলো মহাত্মা গান্ধীর মতো- গুজরাটি। এমনকি তিনি উর্দু ভাষা জানতেনও না। তার কাজকর্মের ভাষা ছিলো ইংরেজি।
‘Urdu and only Urdu shall be the state language of Pakistan’ বলে তিনি যেই বক্তৃতা দিয়েছিলেন সেটি পর্যন্ত ইংরেজিতে দিয়েছিলেন, উর্দুতে নয়।
জাতীয় স্বার্থে গুজরাটিভাষী হয়েও গান্ধী যেমন চেয়েছিলেন ভারতের রাষ্ট্রভাষা হিশেবে হিন্দিকে, তেমনি জিন্নাহও চেয়েছিলেন উর্দুকে।
বাংলা ভাষা যে অভিবক্ত ভারত কিংবা পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হতে পারে, সেটা কেউ দুঃস্বপ্নেও হয়তো ভাবেনি। অভিবক্ত ভারতের রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে বিতর্ক ছিলো- উর্দু নাকি হিন্দি, কোনটি হবে ভারতের রাষ্ট্রভাষা?
‘বাংলার বাঘ’ হিশেবে পরিচিত শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক মনে করতেন উর্দু হচ্ছে ভারতীয় মুসলমানদের স্বভাবজাত ভাষা। ১৯৩৮ সালের ১ অক্টোবর কলকাতায় অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনে বাংলার প্রধানমন্ত্রী হিশেবে সভাপতির ভাষণে তিনি হিন্দির পরিবর্তে উর্দুকে ভারতের সাধারণ ভাষা (লিংগুয়া ফ্রাঙ্কা) রূপে গ্রহণের প্রস্তাব করেন [৮]।
বাংলাদেশের খাঁটি বাঙ্গালি হয়েও ফজলুল হক বিয়ে করেছিলেন অভিজাত উর্দু পরিবারে, সেই হিশেবে তার ঘরের ভাষা ছিলো উর্দু। তিনি নিজেও স্বচ্ছন্দ্যে উর্দু বলতে পারতেন। মাওলানা ভাসানী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও বেশ ভালো উর্দু বলতে পারতেন।
যেই জিন্নাহর মৃত্যুতে শেখ মুজিবুর রহমান হাউমাউ করে কেঁদেছিলেন [৯] সেই জিন্নাহকে বাঙ্গালী পারলে কবর থেকে তুলে এনে ফাঁসিতে ঝুলায়! বাঙ্গালীর কাছে জিন্নাহ ‘অপরাধী’ হয়ে আছেন কেবল ‘Urdu and only Urdu shall be the state language of Pakistan’ এই কথাটির জন্য।
অথচ রবীন্দ্রনাথেরা প্রায় একই কথা (Hindi is the only possible national language for inter-provincial intercourse in India) বলা স্বত্তেও তারা বেখসুর খালাস পেয়ে যান; এমনকি তারা আবির্ভূত হন বাংলা ভাষার ‘পয়গম্বর’ হিশেবে!
চার.
ভাষা আন্দোলনের পর কিছু ন্যারেটিভ তৈরি হয়। যার বেশিরভাগই ছিলো অতিরঞ্জিত ন্যারেটিভ। তারমধ্যে একটি হলো ‘মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়া’। শিল্পী আবদুল লতিফের গানের মধ্যে এরকম লাইন খুঁজে পাই:
“ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়
ওরা কথায় কথায় শিকল পরায় আমার হাতে পায়।”
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ লিখেন ‘মাগো ওরা বলে’ কবিতা। যেই কবিতার মধ্যে পাইঃ
“মাগো ওরা বলে
সবার কথা কেড়ে নেবে।
তোমার কোলে শুয়ে
গল্প শুনতে দেবে না।”
অথচ ভাষা আন্দোলন আদতে মুখের ভাষা কেড়ে নেবার বিপক্ষে আন্দোলন ছিলোনা, বরং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে আন্দোলন ছিলো। যখন ভাষা আন্দোলন হয় ততদিনে এই অঞ্চলের প্রাদেশিক ভাষা হিশেবে বাংলা ভাষা স্বীকৃতি পেয়ে যায়। তাহলে কেন ভাষা আন্দোলনকে ‘মাতৃভাষা রক্ষার আন্দোলন’ নামে ট্যাগ দেওয়া হচ্ছে?
এইসব স্লোগানের মধ্যে মিথ্যে আবেগ থাকলেও সত্যের ছিটেফোঁটা নেই। ভারতে হিন্দি ভাষা অফিশিয়াল ভাষা হবার ফলে কি আসাম সহ ভারতের বাংলাভাষীদের মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়া হয়েছে? কিংবা তামিল, তেলেগু এসব ভাষা কি হারিয়ে গেছে?
আবার, এই অঞ্চলের রাষ্ট্রভাষা বাংলা হবার ফলে কি এই অঞ্চলের আদিবাসীদের ভাষা কেড়ে নেওয়া হয়েছে?
আবহমান কাল থেকে এদেশের রাষ্ট্রভাষা ছিলো পালি, সংস্কৃত, ফারসি, ইংরেজি। অন্য ভাষা রাষ্ট্রভাষা হবার দরুন কখনো তো বাংলা ভাষা হারিয়ে যায়নি। উর্দু ভাষা রাষ্ট্রভাষা হবার দরুন মুখের ভাষা কেড়ে নেবার কথা যারা বলেন, সেটা একটা অতিরঞ্জিত আবেগ ছাড়া আর কিছু না।
আরেকটা মজার বিষয় হলো, ভাষা আন্দোলন যেখানে ছিলো মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন (মাতৃভাষা রক্ষার আন্দোলন নয়) সেখানে ভাষা আন্দোলনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ‘আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রভাষা দিবস’ না হয়ে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিশেবে স্বীকৃতি লাভ করে!
পাঁচ.
ভাষা আন্দোলনের ফলে আমরা কী পেয়েছি? আর এই আন্দোলনের উদ্দেশ্যই বা কতটুকু সফল হয়েছে?
এতো বছর পর এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে এখনো দেখতে পাই, বাংলা আজও এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চশিক্ষার ভাষা হতে পারেনি। বিজ্ঞান, গবেষণার কাজগুলোর লেখার ভাষা আজও বাংলা হয়ে ওঠেনি। উচ্চতর প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন- বিচার বিভাগ, ব্যাংক, বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানের কাজে বাংলা ব্যবহারোপযোগী হয়ে উঠতে পারেনি। বাংলা কেবল কবিতা, উপন্যাস আর নাটক-সিনেমার ভাষা হয়ে আছে!
এমনকি যারা ভাষা আন্দোলনকে প্রমোট করেছিলেন তাদের ঘরের ভাষা পর্যন্ত এখন আর বাংলা নেই!
আবদুর রহিম নামের একজন লেখক একবার ইংল্যান্ডে বেড়াতে গিয়ে তার বন্ধু আবদুল গাফফার চৌধুরীর সাথে দেখা করতে চাইলেন, যিনি ছিলেন ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো, একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটির রচয়িতা। আব্দুল গাফফার চৌধুরীর বাসায় টেলিফোন করলে এক মেয়ে ফোন ধরে বিশুদ্ধ ইংরেজি ভাষায় কথা বলা শুরু করলে তিনি একটু অবাক হয়ে ভাবলেন, ভুল জায়গায় ফোন করলাম কি-না। কিছুক্ষণ পর নিশ্চিত হলেন, ইংরেজি বলা মেয়েটি আবদুল গাফফার চৌধুরীর মেয়ে। পরে জানতে পারলেন, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো, একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটির রচয়িতা আব্দুল গাফফার চৌধুরীর ছেলেমেয়েরা বাসায় নিজেদের মধ্যে ইংরেজিতে কথা বলে! তাঁর ভাষায় বাংলা চলে না। [১০]
বাংলা ৮ ই ফাল্গুন ভাষা আন্দোলন হলেও ভাষা আন্দোলনের গান-কবিতায় যে তারিখটি জড়িয়ে আছে সেটিও বাংলা তারিখ নয়, ইংরেজি ২১ শে ফেব্রুয়ারি।
ভাষা আন্দোলনের তাত্ত্বিক উদ্দেশ্য কতটুকু পূরণ হয়েছে সেটা প্রশ্ন সাপেক্ষ। কিন্তু, এই আন্দোলন আমাদেরকে বানিয়েছে ‘ভাষিক মৌলবাদ’। যার ফলে উর্দু-ফারসি ভাষার প্রতি আমাদের তৈরি হয়েছে বিদ্বেষ। বাঙালী জাতীয়তাবাদ যারা লালন করে তাদের প্রায় প্রত্যেকেই এই দুটি ভাষাকে ঘৃণা করে।
পৃথিবীর সর্বত্র বহুভাষিতা যেখানে সাধারণ ঘটনা সেখানে আমরা সেই বিরল জাতিগুলোর একটি যারা একভাষী। আমরা না পারি ভালো বাংলা, না পারি ভালো ইংরেজি, না পারি ভালো আরবি। অথচ এদেশে সুলতানি শাসনামলে সুলতানদের ঘরের ভাষা ছিলো তুর্কি, ধর্মীয় ভাষা ছিলো আরবি আর রাজ-দরবারের ভাষা ছিলো ফারসি।

তথ্যসূত্র:
১। রবীন্দ্র জীবন ও সাহিত্য প্রবেশক, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫১-১৫২।
২। মাতৃভাষার দৈন্য মোচন ও রবীন্দ্রনাথঃ অ-মাতৃভাষার অনুশীলন, মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, প্রবন্ধ ২।
৩। বাংলার সূর্য আজ আর অস্ত যায় না, মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান।
৪। Post Independent India: Question of National Language (Selfstudyhistory)
৫। Hindi is at best, the language of a large minority,Rajaji, September 14, 1968.
৬। Post Independent India: Question of National Language (Selfstudyhistory)
৭। Quaid-i-Azam Mahomed Ali Jinnah Speeches, as governor general of Pakistan 1947-1948. Karachi: Pakistan Publication.
৮। বাংলাদেশের ইতিহাস, চতুর্থ খণ্ড, রমেশচন্দ্র মজুমদার।
৯। আহমদ ছফার সাক্ষাৎকার, বাংলাবাজার পত্রিকা, ৩১ জানুয়ারি - ২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৯।
১০। সুপ্রভাত বাংলাদেশ, আব্দুর রহিম। ননী প্রকাশনী, ১৯৯৫।

।। আরিফুল ইসলাম।।

পঠিত : ৮৫ বার

ads

মন্তব্য: ০