Alapon

পথভুলে পথে

কনকনে শীত। কুয়াশার চাদরে ঢেকে আছে গৌরিপুর। মাত্র দশডিগ্রী তাপমাত্রার গ্রামীন জীবন কতটা ভয়ংকর হতে পারে তা অনুমান করাও ভার। আপন হাতখানাও চেনা দায় হয়ে পড়েছে। পুরো শরীর কাঁপছে। লাল সূর্যটাও বেশ ফ্যাকাশে। ঘর থেকে বের হতে মন সাধে না। তবুও বের হতে হবে৷ জীবিকার তাড়নায়, পেটের জ্বালায়, গন্তব্যের খোঁজে।


মফস্বল পেরিয়ে ছোট হাট। প্রতিদিন মানুষের জমজমাট কোলাহল। আজ সবই নিস্তব্ধ। অল্প ক'টি দোকান খুলেছে৷ দোকানী জড়োসড়ো অবস্থায় খদ্দেরের অপেক্ষায়। কয়েকটি মোটরগাড়িও দেখা যাচ্ছে।

বাজারের পাশেই মেঘনা। স্বচ্ছ জলরাশিতে ইঞ্জিন চালিতো নৌকা বাঁধা। যাত্রী পারাপারের অপেক্ষায় মাঝি। ছোটছোট ডিঙি নাউ' ও আছে৷ কিন্তু মানুষ নাই। নদীর একপাশে বড় বড় জাহাজ। শিল্পাঞ্চল বলে। এখান থেকেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সার ও পাট পৌছে যায়। নদীর দু'পাশ ধরে গড়ে উঠেছে সারকারখানা, পাটকল।

একটু ভট ভট আওয়াজ করে বারবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ইঞ্জিন। চালককে অনেকক্ষণ চেষ্টা করে মেশিন স্টার্ট দিতে হয়েছে। মেশিনের কালো হাওয়ার সাথে চালকও দুই ঠোঁট ফাঁক করে বের করে দেয় বিড়ির ধোঁয়া। চালক বড় আয়েশ করে ধূম ছাড়েন, তার সহযোগী এবার আওয়াজ দিয়ে বলেন 'এই সামনের মানুষডি পিছে আইয়েন।' এবার আমরাও ঘুরে দাঁড়ালাম। পাশেই আরেকজন স্যূটেডবুটেড লোক সিগারেট জ্বালিয়ে দিয়েছে। আমি এই ভদ্রলোকদের একদম সহ্য করতে পারিনা৷ সমাজ সংসারে এরা বড়ই অভাগা যাদের মানুষ ঘৃণা করে তবে প্রকাশ করে না, নাক ছিটকায় কিন্তু থুথু ফেলে না। আমিও নাকছিটকানি দিয়ে পাশ ফিরে গেলাম। যথারীতি গলুই ঘুরিয়ে দেয়া হলো, নৌকা চলতে শুরু করেছে।

ঘন কুয়াশায় অবগুণ্ঠিত পুরো মেঘনা। মাঝি যেনো অন্ধকারে পথ চলছে। একটু পরেই কচুরিপানার ঝোপ। বড় একটা জাহাজে আমাদের নৌকা লেগে যায় যায় এমন সময় একজন চিৎকার দিয়ে বলে 'ডাইনে চাপেন, ডাইনে চাপেন।' এবার মাঝি স্বগতোক্তি করে 'সামনেতো কিছু দেখতাছি না, দেহি কদ্দুর যাইতারি।' সবাই সাহস যোগায় 'যাও, যাও, যাইতারমুগা ঠিকমতনে।'

নৌকার গতি নাই। নদীর পানিও যেনো স্থির হয়ে আছে। গভীর কুয়াশা ভেদ করে সামনে চলছে ছোট্টতরী। ক্ষণিক পর কিছুটা দূরে আরেকটি ঘাটের দেখা মিলে, প্রচন্ড শীতে জড়োসড়ো হয়ে সবাই বসে আছে। হঠাৎ ইঞ্জিন থেমে যায়। যাত্রীরা ভয় পেয়ে মাঝির দিকে তাকায়, মাঝি জিজ্ঞেস করে 'লোকজন আছেনি, কিচ্ছু না দেইখখাঅই কইলাম থামাইছি।' আরেকজন বলে ওঠে, 'চাইরজন আছে দেহা যায়।'
মাঝি ঘাটে নৌকা ভিড়ায়। একজন বোরকা পরিহিতা মহিলা ও তিনজন পুরুষ এসে উঠে৷ ইঞ্চিনের গমগম শব্দে পুনরায় নৌকা চলতে শুরু করে৷

আমরা তাকিয়ে আছি জমে থাকা শীতে নদীতে সাঁতার কাটা রাজহাঁসের পালের দিকে। পানিতে ডুব দিয়ে মাছ খোঁজার চেষ্টায় লিপ্ত তারা। দূরে কাউকে দেখা যায় এই কনকনে শীতেও নদীতে গোসল করছে। মেঘনা পাড়ের মানুষের বেড়ে ওঠা, দৈনন্দিন জীবনের সকল কাজকর্ম এই নদীতেই হয়। হুমায়ুন কবিরের 'মেঘনার ঢল' কবিতা আজও কালের সাক্ষী হয়ে আছে।

''ভরবেলা গেলো, ভাটা পড়ে আসে, আঁধার জমিছে আসি,
এখনো তবুও এলো না ফিরিয়া আমিনা সর্বনাশী।
দেখ দেখ দূরে মাঝ-দরিয়ায়
কাল চুল যেন ঐ দেখা যায়-
কাহার শাড়ীর আঁচল-আভাস সহসা উঠিছে ভাসি?
আমিনারে মোর নিল কি টানিয়া মেঘনা সর্বনাশী।''

দেখতে দেখতে সময় বয়ে যায়- বাঁশের সাঁকোর সাথে ধাক্কা লাগতেই সম্বিত ফিরে আসে৷ সবার মধ্যে তড়িঘড়ি ভাব। কার আগে কে নামবে৷ গ্রামীন জনজীবন পরেই যান্ত্রিক শহরের অস্থির পথচলা। আমরা চলছি, ট্রেনের ঝকঝকানি, বাসের পিইইপিপ আর মোটরগাড়ীর ধোঁয়াটে শহরে। যেখানে প্রেম স্বার্থের, গতিশীলতা অর্থের, বেড়ে ওঠার যুদ্ধ ফোঁটা ফোঁটা ঘাম আর ছুপছুপ রক্তের।

পঠিত : ৬৩২ বার

মন্তব্য: ০