Alapon

ইমামে আজম নো'মান বিন সাবিতের জীবনী...



কুফা নগরে একবার একটা ছাগল চুরি হয়েছিল। একজন মানুষ এক ছাগল ব্যবসায়ীর সাথে দেখা করে জানতে চায়, ছাগল কতদিন বাচে।ব্যবসায়ী জবাব দেয় ৭ বছর। উক্ত ঐ ব্যক্তি ৭ বছর পর্যন্ত কুফার বাজার থেকে ছাগলের গোসত কিনে খায়নি এই ভয়ে যে,না জানি এটা আবার সেই ছাগলের গোসত।

এমনই খোদাভীরু ব্যক্তি ছিলেন ইমাম আবু হানিফা(রহ.).৫ ই সেপ্টেম্বর ৬৯৯ ইংরেজি মোতাবেক ৮০ হিজরিতে সাহাবী এবং যুগশ্রেষ্ঠ জ্ঞানীগুনীদের শহর কুফা নগরে জন্মগ্রহণ করেন। তার আসল নাম নো'মান তার পিতা সাবিত।তার দাদা যুতি ছিলেন ফারিসের অধিবাসী অগ্নি উপাসক।৩৬ হিজরিতে ইসলাম গ্রহণ করে কুফা নগরে বসবাস শুরু করেন।৪০ হিজরিতে তার এক পুত্র সন্তানদের জন্মগ্রহণ করে যার নাম রাখেন সাবিত। বরকতের জন্য তাকে হযরত আলী(রা.) নিকট আনা হয়। তিনি শিশুর মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করেন।

ইমাম শাবী নামক একজন বিখ্যাত বুজুর্গ আবু হানিফার সাথে দেখা হলে জানতে চায় সে কি করে। জবাবে তিনি বলেন, ব্যবসা।তখন ইমাম শাবী আবু হানিফা কে জ্ঞান অর্জন করতে বলেন।

ইমাম আবু হানিফা বলেন, "সেই আন্তরিকতাপুর্ন উপদেশবানীগুলো আমাকে ভাবিয়েছিল খুব।তারপর থেকেই আমি শিক্ষাকেন্দ্রে যাতায়াত শুরু করি"।

আবু হানিফা রহ. জ্ঞানের প্রতি তার প্রচন্ড আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল। তাই হাম্মাদের নিকট ১৮ বছর কাটিয়েছিলেন। হাম্মাদ ইবনে আবি সুলায়মান ইব্রাহিম নাখঈ এর ছাত্র ছিলেন। যিনি হাদিস ও ইলমে শরিয়ত শিক্ষালাভ করেছিলেন হযরত আলী (রা.) , আব্দুল্লাহ ইবনে মাসুদ (রা.) থেকে।

ইমাম আবু হানিফা রহ. কে সমকালীন যুগে ফকিহদের সর্দার বলে গন্য করা হত।তিনি একজন তাবেয়ী ছিলেন। তাকে হাদিস শাস্ত্রের আমিরুল মুমেনিন বলা হয়।ইমাম শাফেয়ী রহ. বলেন, ফিকহের ব্যাপারে মানবজাতি আবু হানিফা রহ. এর পরিবারভুক্ত।

আবু হানিফা রহ. লিখিত গ্রন্থ ২০ টি। আকাইদ সংক্রান্ত এ সকল কিতাবের পান্ডুলিপি তুরস্কের ইস্তাম্বুল,ফ্রান্সের প্যারিস, মিশরের কায়রো, ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার ও ভারতের বিভিন্ন জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।তার সবচেয়ে বড় অবদান কোরআন ও হাদিস থেকে জনসাধারণের আমল উপযোগী মাসআলা বের করে 'উসুলূল ফিকহ' সম্পাদনা করা। এর কারণেই তাকে ইমামে আজম বলা হয়।

ইমাম আবু হানিফা রহ. তার জীবদ্দশায় ৭ জন সাহাবীর সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন। তিনি ৫৫ বার হজ্জব্রত পালন করেন। প্রতি রমজানে ৬১ খতম কোরআন তেলাওয়াত করতেন। ইমাম শাফেয়ী, ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ, ইমাম যুফার তার ছাত্র ছিলেন। যারা পৃথিবী বিখ্যাত আলেমে পরিনত হয়েছিলেন।

বর্তমানে ইরাক, চীন, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ নিজেদের জীবন চলার পথে উদ্ভুদ সমস্যার সমাধানে ইসলামের দিকনির্দেশনা হিসেবে আবু হানিফা রহ. মাজহাব মেনে চলে। উসমানীয় সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত এলাকায় হানাফি মাজহাব কে রাষ্ট্রীয়ভাবে রাষ্ট্রে প্রয়োগ করা হয়। প্রসিদ্ধ ৪ ইমামের মধ্যে তাকেই শ্রেষ্ঠ হিসেবে ধরা হয়।

বাগদাদের খলিফা জাফর আল মানসুর আবু হানিফা কে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়। কিন্তু জুলুমের ঐ রাজ্যে ন্যায় বিচার করা ছিল কঠিন। ব্যক্তি স্বাধীনতা, ন্যায় বিচার ইত্যাদি চিন্তা করে আবু হানিফা বিচারকের পদ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়।খলিফার আদেশে তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। এই মহান মনীষী ৭০ বছর বয়সে ১৫০ হিজরিতে শবে বরাতের রাতে বাগদাদের কারাগারে ইন্তেকাল করেন। বাগদাদের খায়জুরান কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়।

ইমাম শাফেয়ী রহ বলেন, যে ব্যক্তি ফেকাহের জ্ঞান অর্জন করতে চায় সে যেন আবু হানিফার সান্নিধ্যে আসেন। কারণ ফেকাহর ব্যাপারে সকলেই আবু হানিফার মুখাপেক্ষী।
জীবনীকারগন লিখেছেন, একমাত্র আবু হানিফা রহ. ছাড়া অন্য কোনো তাবেয়ী জীবদ্দশায় এত খ্যাতি ও প্রসিদ্ধি পাননি।

আবু হানিফার মৃত্যুর সংবাদ শুনে ইবনে হাজ্জাজ আল আতকী বলেন, ইমাম আবু হানিফা সাথে কুফার ফিকাহও চলে গেল। ইসলামের জ্ঞানভাণ্ডারে ইমামে আজম আবু হানিফা রহ. যে অবদান রেখে গেছেন কিয়ামত পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহ তার কাছে ঋনী থাকবে।

- মোহাম্মদ ফয়সাল

পঠিত : ৬৪ বার

ads

মন্তব্য: ০