Alapon

বাংলাদেশি সেক্যুদের ফিলিস্তিন নিয়ে মিথ্যাচারের জবাব



ফিলিস্তিন ইস্যুতে আমার ফ্রেন্ড লিস্টে সেক্যুলারের ভেক ধরে লুকিয়ে থাকা কিছু প্রো-জায়োনিস্ট এর উদ্ভট যুক্তি দেখলাম কাল। এরা বলে "ইহুদিরা হাগার হাগার (হাজার হাজার) বছর ধরে ফিলিস্তিনে বসবাস করছে। মুসলিমরা যাইয়া তাদের উৎখাত কইরা ফিলিস্তিন দখল করছে।"

এই কয়েক লাইনেই এদের জ্ঞানের বহর বুঝা যায়। পড়াশোনার ধারে কাছেও না ঘেঁষে, ইতিহাসের 'ই' ও না জেনে, কেবল মাত্র নিজের মন মতো ইসলামোফোবিয়া থেকে কিভাবে অত্যাচারীর পক্ষে অবস্থান নেয়া যায় তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ বাংলার সেক্যু গোষ্ঠীর মধ্যে লুকিয়ে থাকা প্রো-জায়োনিষ্টরা।

এসব গাধাদের উচিৎ ছিলো পোস্ট দেয়ার আগে একটু ইতিহাস ঘেটে আসা।
প্রথমত হলো মুসলিমরা ইহুদিদের থেকে ফিলিস্তিন দখল করে নি।

ইসলাম ধর্মের উত্থান হয় জাজিরাতুল আরব তথা আরব উপদ্বীপে। উত্থানের পর পরই পুরো আরব উপদ্বীপে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ার পর সীমান্তবর্তী বৃহৎ পরাশক্তিদের সাথে দ্বন্দ্ব শুরু হয় মুসলিমদের। কারণ সেসব পরাশক্তিগুলো মুসলিমদের প্রতি শুরু থেকেই নাখোশ ছিলো। তার উপর সীমান্ত এলাকায় নানা ধরণের উৎপাত করতো।

তৎকালীন বিশ্বপরাশক্তি পারস্যের সাসানীয় সাম্রাজ্যের দম্ভ চুর্ণবিচুর্ণ করে সেখানে নিয়ন্ত্রণ নেয় মুসলিমরা। এরপর তৎকালীন আরেক পরাশক্তি রোমান বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সাথে দ্বন্দ্বের জেরে যুদ্ধ শুরু হয়। তখন বাইজান্টাইনদের থেকে সিরিয়া, ফিলিস্তিন, মিশর সহ পুরো উত্তর আফ্রিকা মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে আসে। বাইজান্টাইনদের নিয়ন্ত্রণ তখন কেবল মাত্র আনাতোলিয়া (বর্তমান তুরষ্ক) ও ইউরোপীয় কিছু ভুখন্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

মুসলিমরা প্যালেস্টাইন দখল করেছে বাইজান্টাইনদের কাছ থেকে, ইহুদিদের কাছ থেকে না। তাছাড়া তখন বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রিত প্যালেস্টাইন, সিরিয়া সহ পুরো লেভান্ট অঞ্চল, মিশর তার আশপাশের অঞ্চলের অধিবাসীরা জাতিগতভাবে ছিলো আরব আর উত্তর আফ্রিকায় বাইজান্টাইন নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের অধিবাসীরা ছিলো বার্বার ও আরব। বাইজান্টাইনরা এক প্রকার উপনিবেশ তৈরি করে এই অঞ্চলগুলো শাসন করছিলো। যার ন্যায় সংগত অধিকার তাদের ছিলো না।
তাই সেখানে মুসলিম কনকোয়েস্ট কে অন্যায্য বলার সুযোগ নেই।
সুতরাং, তারা যে বলে, 'মুসলিমরা ইহুদিদের থেকে প্যালেস্টাইন দখল করেছে' - এটা তাদের নিজেদের মূর্খতার পরিচয়। বরং বলা উচিৎ ছিলো বাইজান্টাইনদের থেকে উদ্ধার করেছে।

মুসলিমরা প্যালেস্টাইন দখলের সময় সেখানে ইহুদি ছিলো না তা বলছি না। ছিলো তবে সংখ্যায় অতি অল্প। তাছাড়া তারা তো শুধু প্যালেস্টাইন এ ছিলো তা নয়। তারা প্যালেস্টাইন, আনাতোলিয়া (বর্তমান তুরষ্ক), সিরিয়া সহ লেভান্ট অঞ্চল, মেসোপটেমিয়া(বর্তমান ইরাক ও সিরিয়ার কিছু অংশ), মিশর, উত্তর আফ্রিকা থেকে শুরু করে সারা পৃথিবীতেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো। কারণ তাদের তখন স্থায়ী কোনো বাসস্থান ছিলো না। তারা যাযাবরের মতো বিভিন্ন যায়গায় ঘুরে বেড়াতো।
তাহলে তাদের যুক্তিমতো ইহুদিরা 'হাগার হাগার' বছর ধরে কিভাবে প্যালেস্টাইন এ বসবাস করে?

এখন বলবে Kingdom of Israel (যদিও এই নাম নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যেই দ্বন্দ্ব আছে) এর শাসক কিং সলোমন (সুলাইমান আsmile ও তার পিতা ডেভিড (দাউদ আsmile এর সাম্রাজ্যের কথা। হ্যা, কিংডম অব ইসরায়েল এক সময় ছিলো। তাও কিং সলোমন ও কিং ডেভিডের শাসনামলেও ঐ রাজ্যের বসবাসরত বনি ইসরাইলরা আরবদের চেয়ে সংখ্যায় কোনো অংশেই বেশি ছিলো না।

পরবর্তীতে কিং সলোমনের মৃত্যুর পর তাদের নিজেদের মধ্যকার অন্তর্দন্দ্ব ও পার্শবর্তী বিভিন্ন জাতির সাথে দ্বন্দ্বের কারণে তারা বহু আগেই সেখানকার শাসন ক্ষমতা হারিয়েছিলো।
পরে পরে কালক্রমে হাত বদলের মাধ্যমে তা বাইজান্টাইনদের হাতে এসে পরে, এই যা।
তাছাড়া তারা এমনিই যাযাবর ছিলো। তাহলে তাদের থেকে দখল করা হয় কোন যুক্তিতে? উদ্ভট যুক্তি দেয়ার আগে একটু ন্যুনতম পড়াশোনা তো করে আসা উচিৎ।
তাছাড়া প্যালেস্টাইনের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর থেকে ধর্মীয় কারণে তাদের উপর আক্রমণের কোনো প্রমাণ দেখাতে পারবে? বরং প্যালেস্টাইনে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত ধর্মীয় কারণে কোনো ইহুদিদের শুধু প্যালেস্টাইন কেনো, মুসলিম শাসিত কোনো অঞ্চলেই বৈষম্যের শিকার হতে হয় নি। বরং মধ্যযুগে তারা ইউরোপে সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত হয়েছে।

স্পেনে গথ রাজাদের শাসনামলে অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে এই ইহুদিরা ও সেখানকার সাধারণ খ্রিষ্টানরাই উমাইয়া গভর্নর মুসা বিন নুসায়েরকে আহ্বান করেছিলো স্পেন বিজয়ের জন্য। পরে সেনাপতি তারিখ বিন জিয়াদ এর মাধ্যমে স্পেন বিজয়ের পর মুসলিম স্পেনে তারা বেশ রসেবসেই ছিলো।

এরপর মুসলিম স্পেনের পতনের পর রানি ইসাবেলা ও সম্রাট ফার্দিনান্ড এর সময় থেকে তাদের উপরও নির্যাতন হয়। তখন এই ইহুদিরাই অটোমান সাম্রাজ্যের অধিপতি "সুলেমান দ্যা ম্যাগনিফিসেন্ট" (সুলতান সুলেমান) এর কাছে আশ্রয় চায় এবং তাদের অটোমান সাম্রাজ্যে পূর্ণ মর্যাদার সাথেই বসবাসের অনুমতি দেয়া হয়।

এমন হাজারটা প্রমাণ দেখাতে পারবো, যেখানে Jews দের Jews হওয়ার কারণে কোনোদিন মুসলিমদের কাছে বৈষম্যের স্বীকার হতে হয় নি।

এখন সেক্যুরা বলবে “বনু কুরাইজা” , “বনু নাজির” ও “বনু কায়নুকা” এর কথা। বনু কুরাইজা, বনু নাজির ও বনু কাউনুকাকে ইহুদি হওয়ার কারণে শাস্তি দেওয়া হয় নি, বরং রাষ্ট্রদ্রোহী হওয়ার কারণে শাস্তি দেয়া হয়েছে।

নবীজি (সাঃ) ও মক্কা হতে আগত মুসলিমরা মদিনায় এসে তৎকালীন পরষ্পর বিবাদমান “আউস”, “খাজরাজ”, “বনু কুরাইজা”, “বনু নাজির”, “বনু কায়নুকা” সহ সব গোত্রের সাথে একটি চুক্তি করেন, যা মদিনা সনদ নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিত। চুক্তির শর্তানুযায়ী মদিনায় বসবাসরত সব গোত্র নিজেদের মধ্যে হানাহানি মারামারি বন্ধ করে ও পরষ্পর শান্তিতে বসবাস শুরু করে। চুক্তি অনুযায়ী, মদিনা রাষ্ট্র কোনোদিন শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হলে সব গোত্র মদিনার প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসবে। মদিনা রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান হন নবীজি (সাঃ)।

কিন্তু বনু কুরাইজা ও বনু নাজির খন্দকের যুদ্ধে (Battle of Trench) চুক্তিভঙ্গ করে কুরাইশদের পক্ষ নিয়ে মদিনা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। মূলত রাষ্ট্রদ্রোহীতার জন্য তাদের শাস্তি দেয়া হয়, তারা ইহুদি বলে নয়। বর্তমান আধুনিক রাষ্ট্র ব্যাবস্থায়ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক কাজ ও বিদ্রোহে জড়িত থাকলে শাস্তির বিধান রয়েছে।

অন্যদিকে বনু কায়নুকা পূর্ব থেকেই গোপনে মক্কার কুরাইশ ও আরব বেদুঈনদের সাথে নিয়ে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলো। পরে তারা একদিন এক মুসলিম নারীকে প্রকাশ্য বাজারে উলঙ্গ করে শ্লীলতাহানি করে। এর প্রতিবাদ করতে আসায় এক মুসলিমকে হত্যা করা হয়। এরপর তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র দাঙ্গা শুরু করে দেয়। এই জন্য ষড়যন্ত্র, চুক্তিভঙ্গ করা, নরহত্যা, নারীর শ্লীলতাহানী ও সশস্ত্র দাঙ্গার কারণে তাদের শাস্তি হিসেবে মদিনা থেকে বহিষ্কার করা হয়। বর্তমান আধুনিক রাষ্ট্র ব্যাবস্থায়ও উক্ত অপরাধ সমূহের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। তারা ইহুদি বলে তাদের এই শাস্তি দেয়া হয় নি। বরং চুক্তিভঙ্গ, বিদ্রোহ, দাঙ্গা, মানুষ হত্যা ও নারীর শ্লীলতা হানির জন্য তাদের বহিষ্কার করা হয়।

সুতরাং, মুসলিমরা ইহুদিদের থেকে ফিলিস্তিন দখল করেছে- এটা বলাটা চুড়ান্ত মূর্খতার পরিচয়। কথা বলার আগে একটু পড়াশোনা করে আসা উচিৎ বলেই আমি মনে করি।
কিন্তু ঝামেলা হলো এরা মাত্রাতিরিক্ত পর্যায়ে গণ্ডমূর্খ। মূলত এরা পড়াশোনা না করেই মুসলিম বিদ্বেষী।

পঠিত : ৪৫ বার

ads

মন্তব্য: ০