Alapon

বিচারহীণতার দুর্গতি থেকে ‍মুক্তি পাওয়ার উপায়...



স্ট্যানফোর্ড এনসাইক্লোপিডিয়া অব ফিলসফির মতে, কোনো রাষ্ট্রে আইনের শাসন বিদ্যমান আছে বলতে বোঝায়, সেই রাষ্ট্রটি পরিচালিত হয় কিছু মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে। তার মধ্যে কিছু হলো তাত্ত্বিক মূলনীতি। যেমন সাধারনতা (জেনারেলিটি), স্বচ্ছতা, এবং স্থিতিশীলতা। আরেকটি হলো পদ্ধতিগত মূলনীতি। এই মূলনীতি অনুযায়ী স্বাধীন বিচার বিভাগের মতো কিছু প্রতিষ্ঠানের হাত ধরে তাত্ত্বিক মূলনীতিগুলোর বাস্তবায়ন ঘটবে। এখানে সাধারনতা বা জেনারেলিটিকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে ‘নৈর্ব্যক্তিক এবং নিরপেক্ষতা’ হিসেবে। অর্থাৎ, বাংলাদেশের সিভিল সোসাইটি যখন আইনের শাসন ব্যাহত হয়েছে দাবি করে, তাঁরা তখন আইন প্রয়োগের বিভিন্ন অসংগতির মধ্যে এমন একটি বিষয়ও বোঝাতে চায় যে সরকার তার পক্ষের মানুষের সঙ্গে যেভাবে আচরণ করে, তার বিপক্ষের মানুষের সঙ্গে একই আচরণ করে না।’

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যে সিভিল সোসাইটি সরকারকে প্রশ্ন করবে, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সরকার নিরপেক্ষ কিনা, সেই সিভিল সোসাইটি কি নিরপেক্ষ? সেই সিভিল সোসাইটি কি রাষ্ট্রের সকল নাগরিকদের জন্য সমান আচরণ করে?

আপনাদের নিশ্চয়ই স্মরণ আছে, কিছুদিন আগে কারাগারে লেখক মুক্তমনা লেখক মুশতাক মৃত্যুবরণ করেছেন। তার মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে মিডিয়া যেমন তৎপর ছিলো, তেমনই তৎপর ছিলো সিভিল সোসাইটি। সিভিল সোসাইটি লেখক মুশতাকে মৃত্যু নিয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রতিবাদ করেছে। আর এমন প্রতিবাদ সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু প্রতিবাদমুখর এই সিভিল সোসাইটিই আবার হেফাজত নেতা মাওলানা ইকবাল হোসেনের কারাগারে মৃত্যুর ব্যাপারটি নিয়ে প্রতিবাদমুখর হয়নি।

মাওলানা ইকবালের মৃত্যু নিয়ে সিভিল সোসাইটি যেমন প্রতিবাদ করেনি, ন্যায়বিচারের দাবিতে সরকারকে প্রশ্ন করেনি, তেমনই মিডিয়াও এই মৃত্যুর বিষয়টি নিয়ে তেমন গুরুত্ব দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেনি। তাহলে দেখা যাচ্ছে, আমাদের সিভিল সোসাইটি নিরপেক্ষ নয়। সিভিল সোসাইটি দেশের সকল নাগরিকের জন্য একই অধিকার দাবি করছে না। ফলে দেখা যাচ্ছে, আমাদের সিভিল সোসাইটির ভূমিকাই প্রশ্নবিদ্ধ! অতএব যে সিভিল সোসাইটি নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ, সেই সিভিল সোসাইটি সরকারকে আইন প্রয়োগে নিরপেক্ষ থাকার দাবি করতে পারে কীভাবে?

মূলত, এই সিভিল সোসাইটি দেশের সকল মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে না। এই সিভিল সোসাইটি কেবল তাদেরই প্রতিনিধিত্ব করে, যারা তাদের সমচিন্তার মানুষ। যেমন লেখক মুশতাকরা। কিন্তু মাওলানা ইকবাল সোবহান সাহেব যেহেতু তাদের সমচিন্তার মানুষ নন, তাই তারা মাওলানা সাহেবের মৃত্যুর বিচার দাবি করতে পারছেন না।

সিভিল সোসাইটির এই বিচ্ছিন্নতা নতুন কিছু নয়। এই বিচ্ছিন্নতা শত শত বছর ধরে চলে আসছে। কারণ, সিভিল সোসাইটি যদি সমস্ত দল-মতকে পাশ কেটে কেবল সকলের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হয়, তাহলে সরকারের পক্ষে আইনে হস্তক্ষেপ করা কঠিন হয়ে যাবে। এ কারণে সরকার বা রাষ্ট্র এই বিচ্ছিন্নতা চায়। আর বিচ্ছিন্ন থাকার কারণেই লেখক মুশতাকরা যেমন ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তেমনই বঞ্চিত হচ্ছেন মাওলানা ইকবালরাও! মোটকথা, আমরা দেশের মানুষরই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। আর ন্যায় বিচার পেতে হলে আমাদের এই ভেদাভেদ বা ডিককিরিমিনেশন ভাঙ্গতে হবে। নচেৎ আমাদের কপালে আরও দুর্গতি আছে।

পঠিত : ৪৬ বার

ads

মন্তব্য: ০