Alapon

কুরআন-হাদীসের আলোকে পিতা মাতার হক...



দেশে ও প্রবাসে বৃদ্ধকালে পিতামাতার অবর্ণনীয় দুর্ভোগের চিত্র হরহামেশাই হৃদয়কে বেদনাবিঁধূর করে রক্তক্ষরণ ঘটায়। জীবনের শেষ প্রান্তে তাঁদের জীর্ণদশা ও ভগ্ন শরীরের যন্ত্রণার পাশাপাশি সন্তানের অবজ্ঞা-অবহেলা এই কষ্টকে আরও তীব্রতর করে অনেকগুণ বাড়িয়ে দেয়। আর এই ঘটনাগুলোর অন্তরালে অনেক ক্ষেত্রেই ভর করে আছে অজ্ঞতা, স্বার্থপরতা ও দায়িত্ব-কর্তব্য বিমুখতাসহ অনেক কার্যকারণ। বিরাজিত এই অবস্থায় আমাদের সকলেরই জানা উচিৎ পিতামাতার প্রতি আসলেই সন্তানদের কি কি করণীয় এবং বর্জনীয়। কোরআন ও হাদীসের আলোকে সন্তানের নিকট পিতামাতার প্রাপ্য অধিকারের বিষয়সমূহ হক নামে অভিহিত।

বিশ্বজুড়ে মানবজাতির মধ্যে সর্বাধিক অনুগ্রহ প্রদর্শনকারী ব্যক্তি দুজন হচ্ছেন আমাদের পিতামাতা। কেননা পিতার ঔরস ও মায়ের গর্ভ থেকেই আমাদের সকলেরই এই অসীম নিয়ামতে ভরা পৃথিবীতে আগমন। তাঁদের সাথে যেমন আছে আমাদের নিবিড়তম-ঘনিষ্ঠতম নাড়ীর সংযোগ তেমনি আছে রক্তের টান, সেইসাথে আছে তাঁদের প্রতি আমাদের অপরিসীম নিগুঢ়তম দায়িত্ব ও কর্তব্য। যদিও তাঁদের ঋণ অপরিশোধযোগ্য। পিতামাতার ক্ষেত্রে সন্তানের জন্য অবশ্য পালনীয় এসব দায়িত্ব ও কর্তব্যের সাথে জড়িত আছে দুনিয়া ও আখিরাতের মহাসাফল্য। তাই এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্‌ সুবহানুতাআলা কি নির্দেশ দিয়েছেন এবং মহানবী (সাঃ) কি বলেছেন তা সকলেরই জ্ঞাত হওয়া এবং সেভাবে পালন করা আবশ্যক।

পবিত্র কুরআন মাজীদে আল্লাহ্‌ বলেন-

“আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত করো না এবং পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করো। যদি তাঁদের একজন বা উভয়ই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাঁদের প্রতি বিরক্তিসূচক কিছু বলো না এবং উহ শব্দটিও উচ্চারণ করো না, ধমকের সুরে কথা বলবে না। তাঁদের সাথে সম্মানসূচক নম্র ভাষায় কথা বলবে। তাঁদের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে বিনয়াবনত থেকো। তাঁদের সেবাযত্নে আত্মনিয়োগ করো এবং বল, হে আল্লাহ্‌! আমার পিতামাতা শৈশবে যেভাবে স্নেহ-মমতা দিয়ে প্রতিপালন করেছিলেন, আপনিও তাঁদের প্রতি তেমনি সদয় থাকুন।“ সূরা বনী ইসরাইলঃ ২৩-২৪।

“আর তোমরা আল্লাহ্‌র ইবাদত করো, তাঁর সাথে কোন বস্তুকে শরীক করো না এবং পিতামাতার প্রতি উত্তম আচরণ করো। সূরা নিসাঃ ৩৬

“আল্লাহ্‌ ছাড়া কারো ইবাদত করো না, পিতামাতার সাথে অবশ্যই ভাল ব্যবহার করবে।“ সূরা বাকারাঃ ৮৩

“আমি মানুষকে নির্দেশ দিয়েছি তার পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার জন্য। আর যদি তোমার পিতামাতা তোমাকে আমার সাথে শিরক করার জন্য পীড়াপীড়ি করে, যে সম্পর্কে তোমার জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাঁদের আনুগত্য করো না।“ আনকাবুতঃ ৮

“আমি মানুষকে তার পিতামাতার সাথে সদয় ব্যাবহারের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে গর্ভে ধারণ করে কষ্টের সাথে এবং প্রসব করে কষ্টের সাথে, তাকে গর্ভে ধারণ করতে এবং তার স্তন্য ছাড়াতে লাগে ত্রিশ মাস। ক্রমে সে পূর্ণ শক্তি লাভ করে এবং চল্লিশ বছরে উপনীত হওয়ার পর বলে, হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে সামর্থ্য দান করো যাতে আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি। আমার প্রতি এবং আমার পিতামাতার প্রতি তুমি যে অনুগ্রহ প্রদর্শন করেছো তার জন্য এবং যাতে আমি সৎকর্ম করতে পারি যা তুমি পছন্দ করো, আমার জন্য আমার সন্তান সন্ততিদেরকে সৎকর্মপরায়ণ করো। আমি তোমারই অভিমুখী হলাম এবং আত্মসমর্পণ করলাম। “ সূরা আহকাফঃ ১৫

“হে আমার প্রতিপালক! আমাকে, পিতামাতাকে এবং আমার গৃহে মুমিন হিসাবে প্রবেশকারীদেরকে এবং সব ঈমানদার নর-নারীকে ক্ষমা করুণ।“ সূরা নূহঃ ২৮

“আর আমি মানুষকে তার পিতামাতা সম্পর্কে আদেশ করেছি। তার মাতা কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে তাকে গর্ভধারণ করেছেন। দুই বছর পর্যন্ত তাকে স্তন্য দান করেছেন। এই মর্মে যে, তোমরা তোমাদের পিতামাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। আর আমার দিকেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন। সূরা লোকমানঃ ১৪

“লোকে তোমাকে কি ব্যয় করবে সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে? বল, যে ধনসম্পদ তোমরা ব্যয় করবে তা পিতামাতা, আত্মীয় স্বজন, এতীম, অভাবগ্রস্ত এবং মুসাফিরদের জন্য।“ সূরা বাকারাঃ ২১৫

পিতামাতার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা কবীরা গুনাহ-

“যারা আল্লাহ্‌র সাথে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখতে আদেশ করেছেন, তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায় তাদের জন্য আছে লানত এবং ঘৃণ্য আবাস।“ সূরা রাদঃ ২৫

পবিত্র কুরআন মাজীদে পিতামাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে এভাবেই অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে বর্ণনা করা হয়েছে।

আবু বাকরাহ নুফাই ইবনে হারেস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, “আমি কি তোমাদেরকে সর্বাপেক্ষা বড় গুনাহ সম্পর্কে অবহিত করবো না? এই বাক্যটি তিনি তিনবার উচ্চারণ করলেন। উপস্থিত লোকজন বললেন, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! আপনি আমাদেরকে বিষয়টি খুলে বলুন। তিনি বললেন- আল্লাহ্‌র সাথে শরীক করা, পিতামাতাকে কষ্ট দেয়া। এরপর তিনি হেলান দেয়া অবস্থা থেকে সোজা হয়ে বসে বললেন- সাবধান! মিথ্যা কথা বলা ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়াও মারাত্মক গুনাহ। কথাগুলো তিনি বার বার উচ্চারণ করলেন। বুখারী ও মুসলিম

“ইবনে মাযা জাবির হতে এই মর্মে হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, এক ব্যক্তি বললেন, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! আমার সম্পদ এবং সন্তানাদি আছে কিন্তু আমার পিতা আমার সম্পদ ব্যয় করতে চায়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, তুমি এবং তোমার সম্পদ সবই তোমার পিতার।“ বুখারী ও মুসলিম

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবীজি (সাঃ) ইরশাদ করেন, “বড় গুনাহসমূহের মধ্যে মারাত্মক গুনাহ হল পিতামাতাকে গালি দেয়া। জিজ্ঞাসা করা হল, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! কীভাবে কোন ব্যক্তি তার পিতামাতাকে গালি দিতে পারে? উত্তরে তিনি বললেন- হ্যাঁ পারে! এক ব্যক্তি যখন অপর ব্যক্তির পিতাকে গালি দেয়, প্রতিউত্তরে সে তার পিতাকে গালি দেয়। সে ব্যক্তি যখন ঐ ব্যক্তির মাকে গালি দেয়, প্রতি উত্তরে ঐ ব্যক্তিও সে ব্যক্তির মাকে গালি দেয়। উভয়ের পিতামাতাকে পারস্পারিক এই গালাগালি অভিশাপ দেয়ার শামিল।“ বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করলাম, কোন কাজটি আল্লাহ্‌র কাছে সবচেয়ে প্রিয়? তিনি বললেন, ঠিক সময়ে সালাত আদায় করা, আমি আবার বললাম, এরপর কোনটি? তিনি বললেন, মা বাবার সাথে সদ্ব্যবহার করা। আমি পুনরায় জিজ্ঞাসা করলাম এরপর কোনটি? তিনি বললেন, আল্লাহ্‌র রাস্তায় জিহাদ করা।

“এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে পিতামাতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। হে আল্লাহ্‌র রাসূল! পিতামাতার প্রতি সন্তানের কি হক? রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, তাঁরা তোমার জান্নাত এবং তাঁরা তোমার জাহান্নাম (তাঁদের সন্তুষ্টির কারণে জান্নাত আর অসন্তুষ্টির কারণে রয়েছে সন্তানের জন্য জাহান্নাম)।“ ইবনে মাজাহ

মুগীরাহ ইবনে শুবা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী কারীম (সাঃ) বলেছেন- “আল্লাহ্‌ সুবহানুতাআলা পিতামাতাকে কষ্ট দেয়া, কৃপণতা করা, হকদারদের হক অবৈধভাবে ভক্ষণ করা এবং কন্যা সন্তানদের জীবন্ত কবর দেয়া তোমাদের জন্য হারাম করে দিয়েছেন। একইসাথে অর্থহীন অহেতুক কথা বলা, অতিরিক্ত প্রাপ্তির চাহিদা করা এবং সম্পদ নষ্ট করা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন।“ বুখারী, মুসলিম

“হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাঃ–এর কন্যা আসমা রাঃ বললেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর জীবদ্দশায় আমার মা একদিন আমার কাছে কিছু চাওয়ার জন্য মক্কা থেকে মদিনায় আসলেন। সেসময় তিনি মুশরিক ছিলেন। আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করলাম এই অবস্থায় আমি কি মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার করবো? তিনি উত্তরে বললেন- হ্যাঁ! তাঁর সাথে সৌজন্যমূলক আচরণ করো। বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, বায়হাকী।

সুতরাং সহীহ হাদীস থেকে সুস্পষ্ট যে, পিতামাতার হক ও সম্মান সংরক্ষণের প্রশ্নে তাঁরা যদি মুশরিকও হন, সেক্ষেত্রেও সন্তানকে তাঁদের সাথে সদাচারণ ও হৃদ্যতাপূর্ণ আচরণ করতে হবে।

অন্যত্র এক হাদীসে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বর্ণনা করেন-

“এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নিকট এসে জিহাদে যাওয়ার অনুমতি চাইলে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তার পিতামাতা জীবিত আছেন কিনা? জবাবে লোকটি বললেন, হ্যাঁ! উভয়েই জীবিত আছেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, তাহলে তুমি পিতামাতার কাছে ফিরে যাও, তাঁদের সাথে তুমি সদ্ব্যবহার করো এবং তাঁদের খেদমতে যথারীতি নিজেকে নিয়োজিত রাখো, এটাই তোমার জিহাদ।“

অন্য একটি হাদীসে বর্ণিত আছে, “হামজা নামক এক সাহাবী বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নিকট উপস্থিত হয়ে জিহাদে শরীক হওয়ার বিষয়ে পরামর্শ চাইলে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার মা জীবিত আছেন? আমি বললাম হ্যাঁ। তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, তাহলে তুমি ফিরে যাও এবং মায়ের সম্মান রক্ষা ও খেদমতে আত্মনিয়োগ করো। কারণ তাঁর পদতলে তোমার জান্নাত।“

“হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাঃ থেকে বর্ণিত, একদিন এক ইয়ামেনবাসী রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর খেদমতে উপস্থিত হলে তিনি লোকটিকে জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়ামেনে তোমার কেউ আছে কি? সে বললো- আমার বাবা মা আছেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) প্রশ্ন করলেন, তাঁরা কি তোমাকে এখানে আসার অনুমতি দিয়েছেন? লোকটি বললো না। মহানবী (সাঃ) বললেন, তুমি তাঁদের কাছে ফিরে গিয়ে অনুমতি নাও। তাঁরা যদি তোমাকে অনুমতি দেন তাহলে তুমি ফিরে এসে জিহাদ করো, নতুবা তাঁদের খেদমতে নিয়োজিত থেকো।“ আবু দাউদ, ইবনে হিব্বান

“ইমাম বুখারী রাঃ ইবনে আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত, জুহাইনা গোত্রের এক মহিলা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নিকট এসে বললো, আমার মা হজ্জ পালনের মানত করেছেন কিন্তু হজ্জ পালনের আগেই মৃত্যুবরণ করেন। এখন আমি কি তাঁর পরিবর্তে হজ্জ আদায় করতে পারি? রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, হ্যাঁ। তাঁর পক্ষ থেকে তুমি হজ্জ আদায় করো। তোমার মায়ের ওপর যদি ঋণ থাকতো তবে কি তুমি তা আদায় করতে না? ঐ মহিলা বললেন হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, আল্লাহ্‌র প্রাপ্যকে আদায় করো কেননা প্রাপ্য আদায়ে আল্লাহ্‌ বেশী হকদার।“

“হযরত ইবনে ওমর রাঃ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নিকট এসে বললো, আমি একটি বড় গুনাহ করে ফেলেছি, এরজন্য কি কোন তাওবা আছে? রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, তোমার কি মা আছেন? লোকটি বললো না। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, তোমার কি কোন খালা আছে? লোকটি বললো হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, তবে তাঁর সাথে ভাল ব্যবহার করো। তিরমিযী, ইবনে হিব্বান, আহমাদ, হাকিম

“হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, আল্লাহ্‌তাআলা তিন ধরণের লোকের জন্য জান্নাত হারাম করেছেন। এক- মদ পানকারী, দুই- পিতামাতার অবাধ্য সন্তান, তিন- দাইয়ুসঃ যে ব্যক্তি নিজ পরিবারের মধ্যে অশ্লীল কাজকে স্থান দিয়েছে।“ আহমদ, নাসাঈ, বাজ্জার হাকীম

অপর এক হাদীসে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নিকট এসে বললো, আমি আপনার কাছে জিহাদ ও হিজরত করার বাইআত গ্রহণ করতে চাই। আর এর বিনিময়ে স্রষ্টার কাছে প্রতিদানের আশা করি। তিনি বললেন- তোমার পিতামাতার কেউ কি জীবিত আছেন? জবাবে লোকটি বললেন, হ্যাঁ! উভয়েই জীবিত আছেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, এরপরও তুমি আল্লাহ্‌র কাছে প্রতিদান আশা করো? সে বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেন, পিতামাতার কাছে ফিরে যাও, তাঁদের সাথে সদ্ব্যবহার করো এবং তাঁদের খেদমত করো। আদাবুল মুফরাদ

অন্য একটি হাদীসে আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে, নবী কারীম (সাঃ) বলেন, “ঐ ব্যক্তির নাক ধূলায় ধূসরিত হোক, ঐ ব্যক্তির নাক ধূলায় ধূসরিত হোক, ঐ ব্যক্তির নাক ধূলায় ধূসরিত হোক।“ এভাবে তিনি তিনবার উচ্চারণ করলেন। তখন এক ব্যক্তি প্রশ্ন করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ এই হতভাগ্য ব্যক্তিটি কে? নবীজি জবাবে বললেন- “যে ব্যক্তি পিতামাতা উভয়কে অথবা একজনকে বৃদ্ধ অবস্থায় পেয়েও তাঁদের খেদমত করে জান্নাতে যেতে পারলো না।“ মুসলিম, আহমেদ

এমনকি মা যদি সন্তানের স্ত্রীকে শরীয়ত বিদ্বেষী হওয়ার কারণে তালাক দিতে বলেন, সেটাও ইসলাম সম্মত বলে বিবেচিত হবে।

আবু দারদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, একদিন এক লোক তাঁর কাছে এসে বললো, আমার স্ত্রী আছে কিন্তু আমার মা তাকে তালাক দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আবু দারদা (রাঃ) বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে বলতে শুনেছি, মা বাবা হলেন জান্নাতের দরজাগুলোর মধ্যে একটি। তুমি ইচ্ছা করলে এই দরজা ভেঙে ফেলতে পারো অথবা সংরক্ষণ করতে পারো। তিরমিযী

তবে এক্ষেত্রে স্মরণযোগ্য! স্ত্রী যদি দ্বীনদার, পর্দানশীল ও পরহেজগার নারী হন তবে মায়ের হুকুম পালন করা জায়েয হবে না।

মনে রাখতে হবে, দুনিয়াতে একমাত্র পিতামাতা তাঁদের সন্তানের সুখ-শান্তির জন্য হাসিমুখে কষ্ট স্বীকার করেন। নিজেরা অনাহারে-অর্ধাহারে থেকে সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেন। সন্তানের প্রশান্তি, হাসিমুখ এবং কল্যাণকর জীবনের জন্য তাঁরা নিজেদের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য অনায়াসে বিসর্জন দেন। সন্তান অসুস্থ হলে তাঁরা দিশেহারা হয়ে পড়েন। সন্তানের পঙ্গুত্ব বা যেকোন ধরণের অক্ষমতা কখনই পিতামাতার কাছে বিরক্তিকর বা অস্বস্তিকর হিসাবে পরিলক্ষিত হয়না। পিতামাতার এই মহান আত্মত্যাগের অনুপম দৃষ্টান্তের নজীর পৃথিবীতে আর কোন সম্পর্কের সাথেই তুলনা করা চলে না।


পিতামাতার প্রতি সন্তানের সন্তানের করণীয় হকসমূহ-


পিতামাতার প্রতি সন্তানের সদাচরণ ও উত্তম ব্যাবহারের বিষয়টি কোরআনে অতি গুরুত্বের সাথে বর্ণনা করা হয়েছে-


“আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি উত্তম আচরণ করার আদেশ প্রদান করেছি।“ ২৯:৮


হযরত আবু বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত, প্রিয় নবী করীম (সাঃ) বলেন- “পিতামাতার অবাধ্যতার মত দ্রুত শাস্তিযোগ্য পাপ আর নেই।“


হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, আল্লাহ্‌র প্রিয় হাবীব (সাঃ) ইরশাদ করেন- “সন্তানের পক্ষে তার পিতামাতার ঋণ পরিশোধ করা অসম্ভব। তবে যদি সে তাঁদেরকে ক্রীতদাস অবস্থায় পায়, তখন যেন সে তাঁদেরকে ক্রয় করে মুক্ত করে দেয়।“


প্রিয় নবী (সাঃ) আরও বলেন, “যে ব্যক্তি তার পিতামাতাকে অভিশাপ দেয়, তাকে আল্লাহ্‌ও অভিশাপ দেন।“


মায়ের অধিকার তিনগুণ বেশীঃ


সন্তানের ওপর পিতামাতা উভয়েরই হক আছে। তবে পিতার চেয়ে মাতার হক বা অধিকার সন্তানের ওপর অনেক বেশী।


একদিন এক সাহাবী প্রিয় নবী (সাঃ) কে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কার খিদমত করব? নবীজি (সাঃ) উত্তর দিলেন তোমার মায়ের। তিনি আবারও জিজ্ঞেস করলেন, তারপর কার খিদমত করব? নবীজি (সাঃ) এবারও উত্তর দিলেন তোমার মায়ের। তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, তারপর কার খিদমত করব? আল্লাহ্‌র প্রিয় হাবীব (সাঃ) এবারও উত্তর দিলেন তোমার মায়ের। এভাবে পরপর তিনবার মায়ের খিদমত করার কথা বলার পর চতুর্থবারে তিনি বাবার খিদমতের কথা বললেন। বুখারী, মুসলিম


এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট যে, সন্তানের কাছে মায়ের সম্মান ও মর্যাদা অপরিসীম। যা অতীব গুরুত্বসহকারে প্রত্যেকটি সন্তানের অবশ্যই পালনীয় কর্তব্য।


হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রহঃ) –এর বিশিষ্ট খলীফা মুহিউস সুন্নাহ হযরত মাওলানা শাহ্‌ আবরারুল হক (রহঃ) পিতা-মাতার ১৪ টি হক বর্ণনা করেছেন, তন্মন্ধে ৭টি জীবদ্দশায় করণীয় এবং বাকী ৭টি তাদের মৃত্যুর পর

পালনীয়।


জীবদ্দশায় ৭টি করণীয় হল-


১। পিতা-মাতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া।

২। তাঁদেরকে মনে-প্রাণে ভালোবাসা।

৩। তাঁদের আদেশ-উপদেশ সর্বদা মেনে চলা।

৪। তাঁদের সেবাযত্ন করা।

৫। তাঁদেরকে সর্বাবস্থায় শান্তিতে রাখা।

৬। তাঁদের প্রয়োজন পূরণ করা।

৭। নিয়মিত তাঁদের সাথে সাক্ষাৎ করা এবং খোঁজ খবর নেয়া।


মৃত্যুর পর ৭টি পালনীয় হল-


১। তাঁদের মাগফিরাতের জন্য দোয়া করা।

২। তাঁদের উদ্দেশ্যে আমল ও দান-খয়রাত করা।

৩। তাঁদের সঙ্গী-সাথী ও আত্মীয়-স্বজনকে সম্মান করা।

৪। তাঁদের আত্মীয়গণকে সাহায্য সহযোগিতা করা।

৫। তাঁদের রেখে যাওয়া ঋণ ও আমানত পরিশোধ করা।

৬। তাঁদের শরীয়তসম্মত অসিয়ত থাকলে তা পূরণ করা।

৭। মাঝে মাঝে তাঁদের কবর যিয়ারত করা।


এমতাবস্থায় একজন সন্তানের প্রধান কর্তব্য হচ্ছে জীবিতাবস্থায় পিতামাতার সুখ-শান্তিপূর্ণ বিষয়গুলোর প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখা। তাঁরা মনে কষ্ট পাবেন এমন কোন কাজ না করা। বয়োবৃদ্ধকালে যখন তাঁরা দুর্বল ও অসুস্থ হয়ে পড়েন তখন তাঁদের সর্বাত্মক সেবাযত্ন করা। আর মৃত্যুর পর তাঁদের আত্মার শান্তির জন্য উপরে বর্ণিত বিষয়সমূহের প্রতি মনোযোগী হওয়া।


এভাবেই মহান রাব্বুল আলামীন পিতামাতার অধিকার ও মর্যাদা সর্বাবস্থায় সমুন্নত রাখার তাগিদ দিয়ে তাঁদেরকে দুনিয়া এবং আখিরাতের বুকে উচ্চাসন দান করেছেন। শিশুকালে পিতামাতা যেমন অবর্ণনীয় কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করে সন্তানকে বুক দিয়ে আগলিয়ে রেখেছিলেন, বৃদ্ধকালে পিতামাতাকেও সেরূপ যত্নে রাখা প্রত্যেক সন্তানের অবশ্যই করণীয়। প্রত্যেকের দায়িত্ব ও কর্তব্য হল আল্লাহ্‌র হুকুম এবং শরীয়তের আদেশ নির্দেশ মেনে পিতামাতার প্রতি সচেষ্ট থাকা ও তাঁদের খেদমতে নিজেকে নিয়োজিত রেখে উভয় জগতের কামিয়াবী অর্জন করা। আল্লাহ্‌ সুবহানুতাআলা আমাদের সকলকেই জীবন জিন্দেগীর সীমাহীন প্রতিকূলতার মাঝেও পিতামাতার সন্তুষ্টি অর্জন করার সৌভাগ্য নসীব করুণ। আমীন।

- সংগৃহিত

পঠিত : ৩৭ বার

ads

মন্তব্য: ০