Alapon

সামরিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয় যেভাবে সামাল দিয়েছিলেন মুহাম্মদ সা.




উহুদের সামরিক বিপর্যয়ের পর নবগঠিত ইসলামী রাষ্ট্র 'মদিনাতুন্নবি' কঠিন রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। এই বিপর্যয় তৈরি করেছে তিনটি পক্ষ। প্রথমত নজদের মুশরিকরা। তারা রাজি ও বীরে মাউনার ঘটনায় মুসলিম দুইটি তাবলীগী দলের ওপর হামলা চালিয়ে খুন করে।

দ্বিতীয়ত মুনাফিক ও দুর্বল চিত্তের মুসলিমরা। এরা আল্লাহর রাসূল সা.-এর নেতৃত্ব ও প্রজ্ঞাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তারা উহুদ, রাজি ও বীরে মাউনার বিপর্যয়ের জন্য মুহাম্মদ সা.-কে দায়ী করে। শহীদদের বেশিরভাগ ছিল মদিনার আনসার। এই আনসার শহীদ পরিবারদের ক্ষেপিয়ে তুলে। যা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংহতির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

তৃতীয়ত মদিনার উপকণ্ঠে থাকা ইহুদিরা। যারা নজদ ও মুনাফিকদের ইন্ধনে ভালো ভূমিকা রেখেছে। একইসাথে তারা যত্রতত্র মুসলিদের হেয় করা ও উত্যক্ত করতো। এমতাবস্থায় জানবাজ ও মুখলিস ঈমানদার সাহাবারা মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। একটা নবগঠিত রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে এসব ঘটনা ছিল মুহাম্মদ সা.-এর জন্য চরম বিব্রতকর। একদিকে সঙ্গীদের হারানোর বেদনা, বিপর্যয়ের বেদনা অন্যদিকে এই বেদনা নিজেদের মধ্যেই কলহ, ক্ষোভ; আবার এসব নিয়ে ইহুদিদের ঠাট্টা-বিদ্রপ। সব মিলিয়ে একটি খারাপ অবস্থা।

এই খারাপ অবস্থার মধ্যেই ধৈর্য ধারণ করেছেন আল্লাহর রাসূল সা. এবং বিশ্বস্থ সাহাবারা। একপর্যায়ে বনু নাদিরের ইহুদিরা আল্লাহর রাসূল সা.-কে হত্যার ষড়যন্ত্র করলো। জিবরাঈল আ.-এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা সেটি মুহাম্মদ সা.-কে জানিয়ে দিলেন। যেহেতু তারা মদিনা সনদের চুক্তি ভঙ্গ করেছে তাই মুহাম্মদ সা. তাদের বিরুদ্ধে একশন নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। সুযোগ পেয়েই তিনি তাদের মদিনা থেকে বহিষ্কার করলেন।

তাদের ফেলে যাওয়া প্রচুর সম্পদ অস্ত্র শস্ত্র মুসলিমদের হস্তগত হলো। আল্লাহর বিধান অনুসারে সেগুলো বিতরণ করা হলো। এই ঘটনায় রাসূল সা. আরেক ইহুদি গোত্র বনু কুরাইজাকে সতর্ক করতে সক্ষম হলেন। তারা চুক্তি মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দিল। এদিকে ইহুদিদের বিরুদ্ধে আল্লাহর রাসূল সা.-এর বিজয় ও রাসূল সা. কঠোর মনোভাব দেখে মুনাফিকরা দুর্বল হয়ে গেল। তারা এখন মুহাম্মদ সা. বিরুদ্ধে কথা বলা থেকে বিরত রইলো। তাদের বিরুদ্ধে মুহাম্মদ সা. সরাসরি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেন নাই কারণ তারা নিজেদের মুসলিম পরিচয় দেয়। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে তারা ও তাদের পরিবার রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আরো বেশি হিংস্র হয়ে উঠবে। অন্যদিকে শত্রুরা এর সুযোগ নিবে।

এজন্য পরবর্তীতেও দেখা যায় রাসূল সা. একই অপরাধে বিশ্বস্ত সাহাবাদের শাস্তির আওতায় এনেছেন যাতে তারা সংশোধন হন কিন্তু মুনাফিকদের তিনি ছেড়ে দিয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, তাবুক যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করা সাহাবাদের মধ্যে মাত্র তিনজনকে শাস্তি দিয়েছেন। বাকীদের অজুহাত শুনে ছেড়ে দিয়েছেন। এর সুবিধা হয়েছে রাষ্ট্রীয় সংহতি বজায় ছিল এবং মক্কা বিজয়ের এই মুনাফিক দল বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।

বিরোধী তিনটি পক্ষের মধ্যে দুইটি পক্ষ নিষ্ক্রিয় হয়ে গেলো। বাকী রইলো নজদের বেদুইন মুশরিকরা। আল্লাহর রাসূল সা.এবার তাদের দিকে নজর দিতে চাইলেন। তারা উহুদের পর থেকেই মুসলমানদের কঠিন সমস্যায় ফেলে রেখেছিলো। প্রথমে তারা একত্র হয়েছে মদিনায় আক্রমণ করার জন্য। আল্লাহর রাসূল সা. সৈন্য পাঠিয়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেন। এরপর তারা প্রতারণামূলকভাবে ইসলামের দাঈ বা প্রচারকদের ওপর অত্যন্ত নৃশংসভাবে হামলা করে তাদের জীবন শেষ করে দিয়েছিলো। বনু নাদিরের অবরোধের সময় তারা মদিনায় হামলার পরিকল্পনা করে ইহুদিদের সাথে।

বনু নাদিরের যুদ্ধ শেষে মুহাম্মদ সা. তাঁর গোয়েন্দা মারফত খবর পেলেন, নজদের বনু গাতফানের অন্তর্গত বনু মাহারিব ও বনু সালাবা গোত্র মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য বেদুইনদের সমবেত করতে শুরু করেছে। এই খবর পাওয়ার সাথে সাথেই মুহাম্মদ সা. অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন। মুহাম্মদ সা. দ্রুত সাহাবাদের নিয়ে বেরিয়ে পড়েন যাতে তারা সংগঠিত আগেই তাদের ছত্রভঙ্গ করা যায়।

রাসূল সা. নজদের প্রান্তর পেরিয়ে বহুদূর অগ্রসর হন। এই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিলো কঠোর প্রাণ বেদুইনদের মনে ভয় ধরানো, যাতে তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে আগের মতো তৎপরতার পুনরাবৃত্তি করতে সাহসী না হয়। বনু গাতফানের মুশরিকরা মুসলমানদের এ আকস্মিক অভিযানের খবর শোনামাত্রই ভীত হয়ে পালিয়ে গিয়ে পাহাড়ে আশ্রয় নেয়। মুসলমানরা এসব লুটেরাদের ওপর প্রভাব বিস্তারের পর মদীনার পথে রওয়ান হন। মুসলিমদের এই নজদ অভিযানের কারণে প্রায় দুই বছর তারা নিষ্ক্রিয় ছিল।

আল্লাহর রাসূল সা. মদিনায় আবারো রাষ্ট্রকে সুসংহত করতে সক্ষম হয়েছেন। এরপর তিনি সাহাবাদের মধ্যে নিয়মিত নসিহত, প্রশিক্ষণ দিতে থাকেন। মদিনার নিরাপত্তায় চারদিকে গোয়েন্দা নিয়োগ ও টহল জোরদার করেন। কয়েকমাস পর মুহাম্মদ সা. আবার যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকেন। এটা ছিল উহুদের মাঠে আবু সুফিয়ানের সাথে প্রতিশ্রুত যুদ্ধ।

আবু সুফিয়ান উহুদের মাঠ থেকে যাওয়ার সময় মুহাম্মদ সা.-কে আবারো একই যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ দিয়েছিল। মুহাম্মদ সা. চ্যালেঞ্জ এক্সেপ্ট করেছিলেন। চতুর্থ হিজরীর শাবান মাসে মুহাম্মদ সা. মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য বের হলেন। এসময় আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহার ওপর মদীনার দায়িত্বভার ন্যস্ত করে যান। রাসূল সা. যুদ্ধের জন্য বদর অভিমুখে রওয়ানা হন। তাঁর সাথে ছিলো প্রায় ১৫০০ সাহাবা এবং দশটি ঘোড়া। সেনাবাহিনীর পতাকা হযরত আলীর রা. হাতে প্রদান করা হয়। বদরের প্রান্তরে পৌঁছে মুহাম্মদ সা. ও মুসলমানরা কুরাইশ বাহিনীর জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন।

অন্যদিকে আবু সুফিয়ান প্রায় দুই হাজার মুশরিক সৈন্যের এক দল নিয়ে রওনা হয় এবং মক্কা থেকে একটু দূরে মাররাজ জাহারানের মাজনা নামের জলাশয়ের তীরে তাঁবু স্থাপন করে। কিন্তু মক্কা থেকে রওয়ানা হওয়ার সময় থেকেই আবু সুফিয়ানের মন ছিলো ভীতবিহ্বল। এই এক বছরের মধ্যে রাসূল সা. আবরে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছেন। বনু নাদিরকে বহিষ্কার ও বনু গাতফানকে ছত্রভঙ্গ করার কারণে মুসলিমদের বীরত্বের কথা ছড়িয়ে পড়েছিলো। আবু সুফিয়ানও ভেবেছে যেহেতু মুসলিমরা প্রতিশোধ নিতে মরিয়া তাই এই যুদ্ধ হবে ভয়ংকর।

আবু সুফিয়ানের মনোবল পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেলো। সে মক্কায় ফিরে যাওয়ার বাহানা খুঁজতে শুরু করলো। অবশেষে সঙ্গীদের সে বললো, শোনো আমার সঙ্গীরা! যুদ্ধ তো সেই সময় করা যায়, যখন প্রাচুর্য থাকে। ঘাস থাকে প্রচুর। এতে পশুরা মনের সুখে ঘাস খাবে, আর তোমরা তাদের দুধ পান করবে। এবার তো শুষ্ক মৌসুম। কাজেই আমি ফিরে চললাম, তোমরাও ফিরে চলো।

মুশরিক সৈন্যরা যেন এই কথার জন্যই অপেক্ষা করছিলো। আবু সুফিয়ানের এই প্রস্তাবের সাথে সাথে তারা কেউ নতুন করে যুদ্ধ করার জন্য কোনো যুক্তি দেখালো না। মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করতে কারোই আগ্রহ রইলো না। ফলে তারা সবাই ফিরে চললো।

এদিকে মুসলমানরা বদর প্রান্তরে আটদিন যাবত আবু সুফিয়ান ও মুশরিক সৈন্যদের জন্য অপেক্ষা করেন। মুশরিকদের ফিরে যাওয়ার খবর পেয়ে তারা আল্লাহর শুকরিয়া ও উচ্ছ্বাস করতে থাকেন। এরপর তারা বদর প্রান্তর থেকে ফিরে আসেন। এ সময় সাহাবারা ব্যবসার জিনিস বিক্রি করে এক দিরহামকে দুই দিরহাম পরিণত করতে লাগলেন। আটদিন পর মনে আনন্দ নিয়ে বীরদর্পে মুসলমানরা মদীনায় ফিরে এলেন। পরিস্থিতি ছিলো পুরোপুরি মুসলমানদের অনুকূলে। এই যুদ্ধ বদরের দ্বিতীয় যুদ্ধ নামে পরিচিত।

এরপর মুসলমানরা মদিনা গঠনে, চাষবাদ ও ব্যবসায় মনোনিবেশ করেন। কারণ চারিদিকে তখন শান্তি ও স্বস্তির পরিবেশ। মদিনা ও তার আশে পাশের সমগ্র এলাকায় ইসলামের জয় জয়কার। প্রায় ছয় মাস পর মুহাম্মদ সা. আরবের শেষ সীমান্ত পর্যন্ত নজর দেয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন। সেখানে গোয়েন্দা নিয়োগ করলেন। সমগ্র আরব রাসূল সা. ইসলামের প্রভাব বলয়ে আনতে চাইলেন।

গোয়েন্দা মারফত রাসূল সা. জানতে পারলেন, সিরিয়ার নিকটবর্তী দুমাতুল জান্দাল নামক এলাকা এবং এর আশে পাশে গোত্রসমূহ ব্যবসায়িক কাফেলাগুলোর ওপর ডাকাতি ও লুটপাট শুরু করছে। এই খবরের প্রেক্ষিতে মুহাম্মদ সা. সেখানে অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি নিলেন। ঐ অঞ্চল সম্পর্কে জানেন এমন কয়েকজনকে সাথে নিয়ে মুহাম্মদ সা. অভিযানের রূপরেখা নির্ধারণ করেন। প্রায় এক হাজার সাহাবী সাথে নিয়ে ৫ম হিজরির রবিউল মাসে এই অভিযানে বের হন মুহাম্মদ সা.। এটি দুমাতুল জান্দালের যুদ্ধ নামে পরিচিত।

এই অভিযানে রাসূল সা. এক বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেন। যেহেতু তিনি তাদের প্রস্তুতির সময় দিতে চান নি তাই এই অভিযানের যাত্রা হতো রাতের বেলা। দিনের বেলা কাফেলা লুকিয়ে থাকতো। এভাবে দুমাতুল জান্দলের কাছাকাছি পৌঁছে জানা গেলো যে, তারা সবাই পালিয়ে গেছে। তাদের পশুপাল এবং রাখালদের মুসলিমরা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিল। মুসলমানরা দুমাতুল জান্দালে পৌঁছার পর স্থানীয় অধিবাসীদের কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। মুহাম্মদ সা. সেখানে কয়েকদিন অবস্থান করেন। আশেপাশের বিভিন্ন স্থানে সেনাদল প্রেরণ করা হয় কিন্তু কাউকে পাওয়া যায়নি। কয়েকদিন থেকে মুহাম্মদ সা. মদিনায় ফিরে আসেন।

এ ধরনের সুচিন্তিত পদক্ষেপ এবং প্রজ্ঞাপূর্ণ পরিকল্পনার ফলে উহুদের সামরিক বিপর্যয় ও রাজনৈতিক বিপর্যয় মুহাম্মদ সা. ইসলামের গৌরব শক্তি ও শান্তির আদর্শ দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হন। মদিনার আভ্যন্তরীণ ও বাইরের সমস্যা ও সঙ্কট কমে আসে। অথচ কিছুকাল উভয় ধরনের সমস্যা মুসলমানদের ঘিরে রেখেছিলো।

এসকল সফল অভিযানের ফলে মুনাফিকরা নিশ্চুপ হয়ে যায়। ইহুদীদের অন্য গোত্র বনু কুরাইজা বার বার মুসলিমদের এটা বুঝাতে চায় যে, তারা প্রতিবেশী, তারা চুক্তির ব্যপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কুরাইশদের শক্তিও হ্রাস পায়। মুসলমানরা ইসলামের সুমহান শিক্ষার প্রচার এবং আল্লাহ রব্বুল আলামীনের দ্বীনের তাবলীগ করার সুযোগ লাভ করেন। আল্লাহর রাসূল সা.-ও তাবলীগ ও তারবিয়াতের মধ্যে দিন কাটাতে শুরু করেন।

পঠিত : ৫৫ বার

ads

মন্তব্য: ০