Alapon

লাশ পোড়া গন্ধ...



(১)
ঘড়িতে সময় রাত একটা বেজে চুয়ান্ন মিনিট। আলিশান বাড়ির বিলাসবহুল কামরায় শুয়েও ঘুম নেই ইশতিয়াক ফরিদের চোখে। এসির শীতল বাতাসেও কপালে ঘাম চিকচিক করছে। রুমের আলো-আঁধারি পরিবেশ আজকে তার কাছে কবর গৃহের মতো মনে হচ্ছে। হঠাৎ করেই বেজে উঠল বেসুরো ফোনটা। এত রাতে কে হতে পারে?
ফোনটা কানে ছোঁয়াতেই সেই কণ্ঠস্বর টা আবার শুনতে পেল। যে কণ্ঠস্বর গত এক সপ্তাহ যাবত তার পেছনে পড়ে আছে। গভীর একটা মায়া জড়িয়ে এই কন্ঠের সাথে। ঠিক তার বাবার গলার মত। কিন্তু এটা কিভাবে হতে পারে, তিনি তো ওই পাড়ের বাসিন্দা হয়ে গেছেন অনেক আগেই ।
። কি ব্যাপার ইশতিয়াক ফরিদ, ঘুমিয়ে গিয়েছিলেন? ওই চোখ-নাক নিয়ে এখনও ঘুমাতে পারেন আপনি? নাকে গন্ধ লাগে না? লাশের পোড়া পোড়া গন্ধে তো আপনার ঘর ভুরভুর করছে।
። কে আপনি ? কি চান আমার কাছে ?
። চাওয়া-পাওয়ার খুচরো হিসাব নেবার সময় তো আপনার কাছে অবশিষ্ট নেই। আপনাকে তো এখন পালাতে হবে ।
። রসিকতা রেখে বলুন কে আপনি ? ব্ল্যাকমেইল করছেন আমায় ? কি চান বলুন ?
። ভয় পাচ্ছেন ? গলা শুকিয়ে গেছে ? চলুন, এক গ্লাস পানি খেয়ে নিন । মৃত্যুর পরে ভয়, গলা শুকিয়ে যাওয়া সব থেমে যাবে । নিশ্চিত মৃত্যুর আগে একজন মানুষের কেমন ভয় লাগে জানেন আপনি ? আপনি তো মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করেন । ফাইল চাপা পড়ে জীবনের গল্প শেষ হয়ে যায় না । প্রত্যেক মৃতের একটি পরিবার থাকে। তার জন্য অপেক্ষায় থাকে স্বজনেরা । নিন, এক গ্লাস পানি খেয়ে নিন।
ফ্রিজ থেকে কোম্পানির সিল করা এক বোতল ঠান্ডা পানি গ্লাসে ঢেলে নিলেন। আজকাল বাসার কারো দেয়া পানিতেও ভীষণ সন্দেহ জাগে তার । কিন্তু পানিটা গ্লাসের তলা স্পর্শ করা মাত্রই একটা তীব্র আলোর ঝলকানি । তারপর মাংস পোড়া গন্ধ। পায়ের তলায় পেট্রোলের উপস্থিতি অনুভব করলেন। তারপর আর কিছু নেই । সকালবেলা এই আলিশান কুঠুরীটা আবিষ্কৃত হল এক মৃত্যুগহ্বররূপে। আর ইশতিয়াক ফরিদের জৌলুসে মোড়া শরীরটা, পোড়া মাংসের স্তূপ বৈ কিছু নয়।

(২)
মাগরিবের আযান শুনে দ্রুত ফরজটুকু আদায় করে নিল মুয়াজ। ডিউটিরত অবস্থায় নিজ দায়িত্বে অবহেলা করতে তার বিবেকে বাধে। প্রত্যেকবার বাড়ি থেকে ফেরার সময় বাবা একটা সুন্দর হাসি দিয়ে বলেন-"আল্লাহ্ তোমার হাতে মানুষ বাঁচানোর সুযোগ দিছে,বাপ। খবরদার, দায়িত্বে অবহেলা কইরো না। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে যেমন সবার আগে হাজিরা দিতে শিক্ষা দিছি, তেমনি মানুষের জীবন বাঁচাতে ও সবার আগে দাঁড়াইয়া যাইবা। কাপুরুষ হইয়া কোনদিন আমার সামনে আসবা না।"

জায়নামাজ গুটাতে গুটাতে শুনলো সাইরেন বাজছে। টিম রেডি। আজকে আবার আগুন নেভানোর মিশন। ফায়ারম্যান হিসেবে তার চাকুরিজীবন পাঁচ বছরের। জীবন-মৃত্যুর খেলা দেখতে দেখতে অনুভূতি ভোঁতা হয়ে গেছে। প্রথম প্রথম মিশনে বের হলে হাত পা কাঁপতো। কাটা-ছেঁড়া, পোড়া, আহত-মৃত নিয়ে টানাটানি করতে করতে দম ফুরিয়ে আসতো। মনে হতো এক্ষুনি সেই শেষ হয়ে যাবে, পুড়ে ছাই হওয়া বাড়ি দেখলে নিজের বাড়ির কথা মনে পড়ে চোখে জল আসতো। এখন মিশন কমপ্লিট করে অন্য সবার মতো দু'চারটা সান্ত্বনা বাক্য শেষে যখন ক্যাম্পে ফিরে, ক্লান্তি অবসন্নতায় এমনিতেই চোখ বুজে আসে আগের মতো ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন তাড়িয়ে বেড়ায় না।

গন্তব্য একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি। ইয়ানা গ্রুপ অব ইন্ড্রাস্টিজের একটি প্রতিষ্ঠান। বছরে দু একটা সিরিয়াস কেস থাকে। আজকেরটা তেমনই। দীর্ঘক্ষণ স্ট্যামিনা ধরে রাখার জন্য মন শক্ত করে নিল সে।সাইরেন বাজানোর আওয়াজ শুনলে মানুষের বুক ছ্যাৎ করে উঠে। আবার কারো কলিজায় পানি আসে।

সাইরেনের আওয়াজে ভিড় কিছুটা হালকা করার চেষ্টা করছে ট্রাফিক পুলিশ। ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সাতটা বেজে গেল। ইতোমধ্যে আরো দুটো টিম কাজ করছে। তাদের সঙ্গে আগেই কথা হয়েছে। প্রত্যেকে দায়িত্ব বন্টন করে নিল। এগারো তলা ভবন। আগুনের সূত্রপাত তৃতীয় তলা থেকে। আগুনের উৎস বরাবরের মতো অজানা। আগুন ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুত। এই শহুরে মানুষগুলোর মতো আগুনের ভীষণ তাড়া। হঠাৎ করে সব ছাই করে একসময় থেমে যায়, পেছনে পড়ে থাকে হাজারো অশ্রুপতনের গল্প।

অফিস আওয়ার চলছিল। এখানে শ্রমিক সংখ্যা পাঁচ হাজার। এখনো ভেতরে প্রচুর লোক আছে বুঝা যাচ্ছে। জানালার পাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলীর মধ্যে দাঁড়িয়ে সমানে চিৎকার করছে প্রচুর লোক। বাইরে শোরগোল প্রচন্ড রকমের। আমরা মানুষ হিসেবে বড্ড আবেগপ্রবণ কিনা। তাই আমাদের একটা কট্টর বিশ্বাস, এ জায়গাতে আমি থাকলে নিজের জান দিয়ে হলেও বাঁচিয়ে দিতাম সবাইকে। নিজের পরিবারের সদস্যদের জন্য আমাদের আবেগ আবার ভিন্ন তরঙ্গ নিয়ে ছুটে। খবর পাওয়া মাত্র ছুটে আসা শ্রমিকদের আত্মীয়-স্বজনের ভিড় ঠেকাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বহুলোক ছুটে যাচ্ছে বিল্ডিং এর দিকে নিজের স্বজনদের বের করে আনার জন্য। ফলে আটকে পড়া মানুষগুলোর বের হয়ে আসতে কষ্ট বাড়ছে ।

আগুন তৃতীয় তলা থেকে দ্রুত নিচতলায় ছড়িয়ে পড়ায়, নিচতলার সিঁড়িগুলো ব্যবহার উপযোগী নয়। তাছাড়া বেশিরভাগ বিল্ডিং এর নিচতলা অবৈধভাবে ক্যামিকেল গোডাউন হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তাই এখানে পানি ব্যবহার করাও বিপজ্জনক।অগ্নিনির্বাপক ব্যবহার করে ধীরে ধীরে এগোতে হয়। আগুন লেগেছে বিকেল সাড়ে চারটায় সময় কেটে গেছে ইতোমধ্যে তিন ঘন্টা। আগুন লাগলে প্রথমে আতঙ্কে সবাই কিছু সময় ছোটাছুটি করে। তারপর অলিগলি পেরিয়ে দমকল বাহিনী পৌঁছাতে সময় লেগে যায় অনেক।তারপর কাজে হাত দিতে দিতে আগুন অনেক দূর ছড়িয়ে পড়ে।

কারখানা মালিক খরচ কমানোর জন্য অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রাখতে পারেননি। তাছাড়া বিল্ডিংটাতে সিঁড়ি ছিল মাত্র একটি। প্রথমদিকে দ্বিতীয় তলা এবং তৃতীয় তলার মানুষজন দ্রুত বেরিয়ে আসতে থাকে। ভেতরের সমস্ত দাহ্য জিনিসপত্রের জন্য আগুন ছড়িয়ে পড়েছে খুব দ্রুত। সবার গন্তব্য এখন ছাদে। আগুনের উত্তাপ আর ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে পুরো ভবনটি। একটিমাত্র সিঁড়ি দিয়ে ক'জনইবা পৌঁছাতে পারে?

অন্ধকারের গাঢ়ত্ব কমে গেছে লেলিহান শিখায়। মানুষের আহাজারিতে নিস্তব্ধতার বালাই নেই। লাশ পোড়া গন্ধ নাকে লেগে ভেতরটা ধ্বক করে উঠলো। কোন মায়ের সন্তানের ইঞ্চি ইঞ্চি দেহ জানি ঝলসে যাচ্ছে! জানালায় দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোর অসহায়ত্ব চিন্তা করার ফুরসত পাচ্ছে না কেউ। ওই লোক গুলো ঠিক কী ভাবছে? মাস শেষে বাজারের খুচরো পাওনা কিভাবে পরিশোধ করবে? নাকি কারো সামনে নতুন জীবন? কেউ হয়তো বাবা-মা কেউ অসুস্থ, চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে চোখ মুছতে মুছতে আজকে কাজে এসেছে।

গ্রামের মানুষগুলো বিপদের সময় আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করে ।শহরের যান্ত্রিকতা সাথে নাস্তিকতার হাওয়া এতটা বেশি,যে ঈমান হারা হতে ভয় লাগে এ পরিবেশে। মনে মনে এস্তেগফার পড়ছে সে। তার মা নিশ্চয়ই খবরটা শুনলে এক্ষুণি জায়নামাজে বসে যেতেন। তারপর শুরু হতো মমতাময়ী দোয়া," আল্লাহ আমার পোলাডারে ভালো রাইখো। বিনিময়ে আমার জীবন তোমার কাছে সমর্পন করলাম।"এ বিষয়ে সবার মা অবুঝ। আল্লাহর কি বিনিময়ের প্রয়োজন আছে? তিনি যার ব্যাপারে যে ফায়সালা উত্তম জানেন, তাই করেন।

(৩)
সময়ের সাথে সাথে বাড়ছে আগুনের উত্তাপ, মানুষের আহাজারি। ফায়ার সার্ভিসকর্মীদের থেকে বেশি ত্যাগ স্বীকার করতে হচ্ছে পুলিশ ভাইদের। স্বজনদের ঠেকিয়ে রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। জরুরী ভিত্তিতে প্রশাসনের বিভিন্ন টিমকে বিভিন্ন দায়িত্বে মোতায়েন করা হচ্ছে। মানুষ যে যার জায়গাতে আটকে পড়ছে ধীরে ধীরে। ফায়ার সার্ভিস টিম পানি দিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রনে রাখার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি ছাদে আটকে পড়া মানুষগুলোকে দড়ি এবং ক্রেনের সাহায্যে নিচে নামিয়ে আনছে। পুরুষরা দড়ির সাহায্যে নামতে পারলেও মহিলাদের জন্য ক্রেন ছাড়া উপায় থাকে না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখানে নারী এবং আঠারোর নিচে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা অনেক। তাদের অনেকে ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে। মুয়াজ ও এ কাজের দায়িত্বে। অনেককে নিয়ে ছুটতে হচ্ছে এম্বুলেন্সের দিকে।

কিছুক্ষণ পর একটু অসুস্থ বোধ করায় সে মিনিট পাঁচেকের বিরতি নিলো। একটু পাশ ঘেঁষে দাঁড়াতেই একটা মহিলা আর্তচিৎকারে কাঁদছে," ভাই, আমার ভাইটারে বাঁচান,ও কোনো দোষ করে নাই।"সে দুয়েকটা সান্ত্বনা বাক্য শুনে এড়িয়ে যেতে চাইলো, যে এখানে তো দোষের কিছু নাই। কিন্তু মহিলা তার হাতে একটা মুঠোফোন তুলে দিয়ে জোরাজুরি করতে লাগলো।

যদিও এক মুহূর্ত সময় অপচয় করা উচিত নয়, তবুও কেন যেন কথাগুলো শুনতে ইচ্ছে হলো তার। মুঠো ফোনের ওপাশ থেকে বলতেছে - "আপনি যেই হন ভাই, একটু শুনেন আমার কথা। বড় স্যার কইলো আগুন বেশি কিছু না। সবাইরে শান্ত রাখনের চেষ্টা করতে আর পাঁচতলার সিঁড়ি তালা আটকায়া দিতে। আমরা এখানে পাশশোর উপরে লোক আছি। আমি ফাইস্সা গেছি। আমাগোরে বাঁচান স্যার। আমগো মত লোকের জন্য কেউ নাই। আমরা না থাকলে পরিবারগুলা না খায়া মরবো। আমি পাপ করছি, আমি মরলেও আল্লাহ আমারে মাফ করবো না।"

মুয়াজের হাতে এই মৃত্যুকালের শেষ কাতরোক্তি শোনার আর সময় ছিল না। দ্রুত তাকে পৌঁছাতে হবে, যেখানে মানুষগুলো বন্দী হয়ে আছে। ধোঁয়া বন্দী মানুষদের মতো ভীষণ অক্সিজেন স্বল্পতায় ভুগছে সে। আধপোড়া আহত মানুষগুলো লাফিয়ে পড়ছে জানালা দিয়ে। কেউ জীবিত,কেউ মৃত আর কেউ মারাত্মকভাবে আহত। বেঁচে থাকার যুদ্ধ।

(৪)
মুয়াজ ছুটছে। অন্ধকারের অগভীর কূপকে নিজের চক্ষুতৃষ্ণার কাছে পরাজিত করতে। টিম লিডারকে জানিয়ে ক্রেনের ব্যবস্থা করতে সময় লেগে গেল অনেক। উত্তাপের জন্য কাছে ঘেঁষা দায়। তবু জানালার কাঁচ ভেঙ্গে শুরু হলো দুঃসাহসিক অভিযান। বাইরে থেকে দেখলে মানুষ যে পরিমাণ মনে হয়, ভেতরে মানুষ আছে তার কয়েকগুণ বেশি। জ্ঞান হারিয়ে গেছে অনেকের। একটু ভেতরের দিকে জীবন্ত মানুষ পুড়ছে। দৃশ্যগুলো চোখে দেখা দায়! কারো চামড়া মাংস পুড়ে গেছে ,কারো একটা হাত নেই ,কারো হয়তো নেইপা, ভাঙ্গা কাঁচ পেরিয়ে আসতে গিয়ে কেউ নির্মমভাবে আহত। লাশের স্তূপ পড়ে আছে। চতুর্থ তলার ম্যাটারনিটি বিভাগ থেকে এখনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। দেয়াল ফুটো করে ভেতরে প্রবেশ করতেই তার চোখে পড়লো বাচ্চা কোলে একজন মা গুটিয়ে বসে আছেন এক কোণে। মা সদ্য মৃত।আর শিশুটি যেন ঘুমিয়ে আছে পরম স্বস্তিতে। বাচ্চার শরীর একদম ঠান্ডা। সেই শীতল ছোট্ট দেহটাকে উষ্ণ রাখার প্রাণান্ত যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটল মাত্রই। পঞ্চম তলার শেষ মুহূর্তে পানি চাওয়া হিন্দু লোকটার শেষকৃত্য হয়তো এখানেই হবে। কেননা মৃত লাশের আগে জীবিতকে উদ্ধার করতে হয়।

প্রায় সাড়ে তিনশো লোককে আহত-অর্ধমৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হলো। নাগালের বাইরে রয়ে গেছে আরো শ'খানেক। বিভিন্ন জায়গায় কাটা পোড়ার যন্ত্রণা মুয়াজ ও তার সহকর্মীদেরও হচ্ছে। কিন্তু তাদের অন্তর্দহন আরো অনেক গুণ বেশি। হয়তো এ জায়গায় আরেকটু আগে পৌঁছাতে পারলে ঐ মানুষটাকে বাঁচানো যেত। অক্সিজেনের অভাবে অনেকেই পৃথিবীর মুক্ত বাতাসের অপেক্ষা করতে করতে, প্রাণবায়ু চলে গেছে। অপেক্ষায় থাকা স্বজনের কাছে ফিরে এসেছে তার লাশ। কেউ মারা গেছে জানালার ফাঁক গলে নিচে নামতে গিয়ে। আহা জীবন! আহা মৃত্যু! সে হয়তো লেখক হলে এই আবেগ ফুটিয়ে তুলতে পারতো। কিন্তু তখন কলমের কালি রক্ত আর দগদগে ঘা হয়ে পাঠককে পাগল করে দিতো।

অঙ্গার হয়ে যাওয়ার পর থেমে গেল দাবানল। কিন্তু অঙ্গার হতে সময় লেগেছে প্রায় পনেরোটা ঘন্টা। বাঁচানো সম্ভব হয়নি তালাবদ্ধ অনেক স্বপ্নাতুর মানুষকে। পুড়ে ছাই হয়ে গেছে তারা এবং তাদের স্বপ্ন। স্বজনহারানো আর্তনাদ পরিণত হয়েছে লাশটুকু পেতে চাওয়ার গল্পে। প্রিয়জনের জন্য অপেক্ষার পালা, কিন্তু যে লাশের চিহ্নটুকু নেই তাকে আপনজন বলা যায় কিনা জানি না। জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি যাদের, তাদের লাশ কুড়ানোর মিছিল পড়লো। সাংবাদিক পাড়ায় চড়াও হয়ে রটে গেল লাশেদের দুঃখবিলাস জীবনের গল্প। পরিবারগুলোর অশ্রুপতন তাতে থামলো কিনা কে জানে?

জীবনের মূল্য হয় কি না জানিনা তবে ক্ষতিপূরণ হয়। একটা লাশের ক্ষতিপূরণ ৫০ হাজার থেকে দেড় লক্ষ পর্যন্ত বিকোয়। আহতরা পাবে ৩০ হাজার করে। শেয়ার বাজারের দরপতনেও এতটা অসামঞ্জস্য হয় কিনা আমার জানা নেই। আর যেই গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ করতে এতগুলো লোক চোখের পলকে পোড়া লাশের স্তুপে স্থান নিল তার কি হলো? ফ্যাক্টরির মালিকও ক্ষতিপূরণ পেলেন। নতুন করে লোন। নতুন দেনা-পাওনার হিসাবের খাতা।

মুয়াজ আচ্ছন্ন সেই মুঠোফোনের লোকের কথাগুলো শুনতে। অঢেল সময় এখন। কিন্তু লাশ কি কথা বলে? ওই মহিলাকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু অতি শীঘ্রই তাকে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। সে আবেদন করল ইয়ানা গ্রুপের চেয়ারম্যান এর ব্যাপারে যেন তদন্ত করা হয় - কেন ইচ্ছাকৃতভাবে তিনি এতগুলো মানুষকে আটকে রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন? কিন্তু উপরমহল থেকে সাহায্য এলো না। একজন দমকলকর্মীকে এতটা আবেগী হলে চলে না। আর সব কাজের দায়িত্বে লোক আছে। একজন দমকলকর্মীর গোয়েন্দাগিরি করা সাজে না। সংবাদপত্র বলে, হতে পারে এটা পরিকল্পিত। কিন্তু সেই দায়ভার তো আমাদের নয়। পুলিশ-দুদক সব পেরিয়ে তদন্ত ঠিকই হয়। কিন্তু ফলাফল কি হয়,সেটা সাধারণের অজানা।

পত্রিকার কর্ণারে কখনো রহস্যজনক একটা দুটো বার্তাও এসে যায়। যার সারমর্ম এমন - ইয়ানা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের গার্মেন্টস ভবনটির নিরাপত্তা মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল দুই বছর আগেই। অগ্নিনির্বাপণের কোন ব্যবস্থাই ছিল না। বছরখানেক আগে তাদের প্রধান ক্লায়েন্ট Wallmart তাদের পণ্যের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং তাদের সাথে সমস্ত চুক্তি বাতিল করে। কিন্তু একই ব্র্যান্ডনেইম ব্যবহার করে জালিয়াতি ব্যবসা চালিয়ে আসছিল ইয়ানা গ্রুপ। দুদকের উপর থেকে ছিল ট্যাক্স ফাঁকির চাপ, মিল শ্রমিকদের অনেক বেতন বকেয়া। সবমিলিয়ে গার্মেন্টসটা পরিণত হয় একটা সাদা হাতিতে। নতুন করে সব শুরু করার একটাই রাস্তা...

মুয়াজ যুক্তি তথ্য দিয়ে ইয়ানা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশ করে। কিন্তু শুকনো হাতে তার অথৈ জল ধরার প্রচেষ্টা সফল হয় না। বরং তাঁর ট্রান্সফার হয়ে যায় রাঙ্গামাটিতে। বাড়িতে গিয়ে যখন বাবার চোখের দিকে তাকালো, তখন তার চোখ বেয়ে দরদর করে বয়ে গেল অশ্রুধারা।
"বাবা আমি পারিনি ওই মানুষগুলোকে বাঁচাতে। আমি কাপুরুষ বাবা। আমি তোমার সন্তান হওয়ার উপযুক্ত নই।"
পিতা শক্ত করে পুত্রকে জড়িয়ে ধরে বললেন -
" তুই পেরেছিস, বাবা। ওদের বিচার আল্লাহ করবেন।"

(৫)
সময়ের ডানপিটে কলরোলে কত কি ঘটে, কত কি চাপা পড়ে কে জানে? নিত্য নতুন অ্যাডভেঞ্চারের জীবন যার, তার কি স্মৃতিকাতরতা মানায়! ভুলে যাওয়া মস্তিষ্কের ফাঁক গলে কেটে গেছে অনেকটা সময়। তারপর কোন এক সকালে গরম ধোঁয়া ওঠা চায়ের সাথে নতুন শিরোনামে চোখ পড়ে মুয়াজের।

"রহস্যজনকভাবে নিজ বাসায় আগুনে পুড়ে মৃত্যু, ইয়ানা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান ইশতিয়াক ফরিদের।"

লাশপোড়া গন্ধটা আবার জেগে উঠেছে মুয়াজের নাকে, ঠোঁটের কোণে এক টুকরো হাসি। হয়তো কোনো নির্যাতিত অতৃপ্ত আত্মা নিজের কাঁধে শাস্তির দায়িত্ব তুলে নিয়েছে। সব জালিমের শাস্তি অবশ্য এ পাড়ের গল্পে হয় না। থেকে যায় ওপারের উপাত্ত হয়ে।

দমকল বাহিনী ছুটে চলেছে রোজকার মতো।গন্তব্য অগ্নিকাণ্ডে বিপদগ্রস্থ কোন বাড়ি, ভবন, নগর। লাশপোড়া গন্ধের সাথে সভ্যতার কত লুকোনো কালো অধ্যায় চাপা পড়ে, কে রাখে খোঁজ তার?

- সামিয়া খানম সামি

পঠিত : ৪৪ বার

ads

মন্তব্য: ০