Alapon

মুহাম্মদ সা.-এর মসজিদ ভাঙার কাহিনী



রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াস শুরুতেই বুঝতে পেরেছে আরবের নবী দাবি করা মুহাম্মদ সা. সত্যিকারের নবী। সে মুহাম্মদ সা.-এর চিঠি পেয়ে আবু সুফিয়ান থেকে মুহাম্মদ সা.-এর সম্পর্কে জেনে নিল। তারপর মন্তব্য করলো, একসময় আমার দু'পায়ের নিচের ভূমিও তার দখলে চলে যাবে। যদিও সে বুঝতে পেরেছে মুহাম্মদ সা. সত্য নবী তারপরও সে নেতৃত্ব হারানোর ভয়ে মুহাম্মদ সা. আনুগত্য করেনি। বরং সে মুহাম্মদ সা.-কে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।

৮ম হিজরিতে রোমানদের এক লক্ষ সৈন্যের বিশাল বাহিনীর সাথে মুসলিমদের মাত্র তিনহাজার সৈন্যের যুদ্ধ হয়। যা মুতার নামে পরিচিত। সেই যুদ্ধে মুসলিমরা তিনজন সেনাপতি হারালেও যুদ্ধের এক পর্যায়ে রোমানরা পিছিয়ে যায়। মুতার যুদ্ধে মুসলিমদের ১২ জন সৈন্য শাহদাতবরণ করেন। অন্যদিকে রোমানদের শত শত সৈন্য মৃত্যুবরণ করে। এই যুদ্ধের পর রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াস আরো তীক্ষ্ণ নজর রাখে মুহাম্মদ সা.-এর ওপর।

মক্কা বিজয়ের পর নবম হিজরিতে সারা আরবে মুহাম্মদ সা.-এর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হলে সম্রাট হেরাক্লিয়াস আরো চিন্তিত হয়ে পড়ে। সে পরিকল্পনা করে এখনই যদি মুহাম্মদ সা.-কে না পর্যদস্তু করা যায় তাহলে আর কোনোভাবেই তাকে পরাজিত করা সম্ভব হবে না। এদিকে মদিনায় মুনাফিকদের একটি দল মক্কা বিজয়ের ফলে বিমর্ষ হয়ে পড়েছে। তারা আগে মক্কার কুরাইশ, নজদের বনু গাতফান ও খায়বারের ইহুদিদের প্ররোচিত করতো মুসলিমদের বিরুদ্ধে। কিন্তু এসব অঞ্চল এখন মুসলিমদের অধিকারে চলে আসায় ও বেশিরভাগ আরব মুসলিম হয়ে যাওয়ায় তারা হতাশ হয়ে পড়লো। হতাশা কাটানোর জন্য তারা এবার রোমানদের সাথে যোগাযোগ শুরু করলো।

মুনাফিকদের সাথে রোমানদের এই যোগাযোগের মাধ্যম ছিল আবু আমের। মুহাম্মদ সা. মদিনায় আগমনের আগে খাযরাজ গোত্রে আবু আমের নামের এই ব্যক্তি বসবাস করতো। জাহেলী যুগে সে খৃস্টান রাহেবের (সাধু) মর্যাদা লাভ করেছিল। তাকে আহলে কিতাবদের আলিমদের মধ্যে বিশিষ্ট ব্যক্তি গণ্য করা হতো। অন্যদিকে সাধুগিরির কারণে পন্ডিত সুলভ মর্যাদার পাশাপাশি তার দরবেশীর প্রভাবও মদীনা ও আশেপাশের এলাকার অশিক্ষিত আরব সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। নবী সা. যখন মদিনায় পৌঁছলেন তখন সেখানে বিরাজ করছিল আবু আমেরের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক প্রভাবের রমরমা অবস্থা।

কিন্তু তার এই জ্ঞান ও দরবেশী তার মধ্যে সত্যানুসন্ধিৎসা ও সত্যকে চেনার মতো ক্ষমতা সৃষ্টি করার পরিবর্তে উল্টো তার জন্য একটি বিরাট অন্তরাল সৃষ্টি করলো। আর এ অন্তরাল সৃষ্টির ফলে রসূলের আগমনের পর সে নিজে ঈমানের নিয়ামত থেকে শুধু বঞ্চিতই রইল না বরং রসূলকে নিজের ধর্মীয় পাণ্ডিত্যের প্রতিদ্বন্দ্বী এবং নিজের দরবেশী কর্মকান্ডের শত্রু মনে করে। তাই সে ইসলামের বিরোধিতায় নেমে পড়লো।

প্রথমে সে ভেবেছিল মক্কার কুরাইশরা ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য যথেষ্ট হবে। কিন্তু বদরের যুদ্ধে কুরাইশরা চরমভাবে পরাজিত হলো। এ অবস্থায় সে আর নীরব থাকতে পারলো না। সেই বছরই সে রাগে ক্ষোভে মদিনা থেকে বের হয়ে পড়লো। সে কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্রের মধ্যে ইসলামের বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করলো। যেসব কুচক্রীর চক্রান্ত ও যোগসাজশে উহুদ যুদ্ধ হয়, তাদের মধ্যে এই খৃস্টান আবু আমেরও অন্যমত। মুসলিমদের সাথে প্রতিটি যুদ্ধে সে মুশরিকদের সাহায্য করেছিল।

মক্কা বিজয়ের পর সে বুঝতে পারে আরবের আর কোনো শক্তি ইসলামের অগ্রযাত্রা রুখে দিতে পারবে না। তাই সে আরব দেশ ত্যাগ করে খৃস্টানদের রাজ্য রোমে চলে যায়। সে সম্রাটের সাথে দেখা করে এবং বারংবার তাকে এই মর্মে সাবধান করে এখনই যদি মুহাম্মদের অগ্রযাত্রা রুখে না দেওয়া যায় তবে তা সর্বনাশা হয়ে উঠবে।

খৃস্টান পণ্ডিত আবু আমেরের এ ষড়যন্ত্রমূলক তৎপরতায় তার সাথে শরিক ছিল মদীনার মুনাফিক গোষ্ঠির একটি দল। আবু আমেরকে তার ধর্মীয় প্রভাব ব্যবহার করে ইসলামের বিরুদ্ধে রোমের কায়সার ও উত্তরাঞ্চলের খৃস্টান আরব রাজ্যগুলোর সামরিক সাহায্য লাভ করতেও এ মুনাফিকরা তাকে পরামর্শ দেয় ও মদদ যোগায়। যখন সে রোমের পথে রওয়ানা হচ্ছিল তখন তার ও এ মুনাফিকদের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদিত হলো। এ চুক্তি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হলো, মদিনায় তারা নিজেদের একটি পৃথক মসজিদ তৈরি করে নেবে। এভাবে সাধারণ মুসলমানদের থেকে আলাদা হয়ে মুনাফিক মুসলমানদের এমন একটি স্বতন্ত্র জোট গড়ে উঠবে যা ধর্মীয় আবরণে আবৃত থাকবে। তার প্রতি সহজে কোন প্রকার সন্দেহ করা যাবে না। এর মাধ্যমে মুসলিমদের মধ্যে ফিরকা তৈরি হবে। আলাদা দল হবে। মতদ্বৈততা ও বিশৃংখলা সৃষ্টি হবে।

তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে নতুন মসজিদে মুনাফিকরাই সংঘটিত হবে এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণের জন্য পরামর্শ করবে। শুধু তাই নয়, আবু আমেরের কাছ থেকে যেসব এজেন্ট খবর ও নির্দেশ নিয়ে আসবে তারাও সন্দেহের ঊর্ধ্বে থেকে নিরীহ ফকীর ও মুসাফিরের বেশে এ মসজিদে অবস্থান করতে থাকবে। এ ন্যাক্করজনক ষড়যন্ত্রটির ভিত্তিতেই একটি মসজিদ নির্মান করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।

মদিনায় এ সময় তিনটি মসজিদ ছিল। একটি মসজিদে কুবা। ইসলামের প্রথম মসজিদ। এটি ছিল নগরীর উপকণ্ঠে। অন্য দুইটি ছিল মসজিদে নববী ও মসজিদে কিবলাতাইন। শহরের অভ্যন্তরে ছিল এদের অবস্থান। এ তিনটি মসজিদ বর্তমান থাকা সত্ত্বেও আরেকটি মসজিদ নির্মাণ করার কোন প্রয়োজনই ছিল না। আর এটা কোন যুক্তিহীন ধর্মীয় আবেগের যুগ ছিল না যে, প্রয়োজন থাকুক বা না থাকুক মসজিদ নামে নিছক একটি ইমারত তৈরি করে দিলেই তখন নেকীর কাজ বলে মনে করা হবে। বরং একটি নতুন মসজিদ তৈরি করার অর্থই ছিল মুসলমানদের জামায়াতের মধ্যে অনর্থক বিভেদ সৃষ্টি করা।

একটি সত্যনিষ্ঠ ইসলামী ব্যবস্থা কোন ক্রমেই এটা বরদাশত করতে পারে না। তাই তারা নিজেদের পৃথক মসজিদ তৈরি কারার আগে তার প্রয়োজনের বৈধতা, প্রমাণ করতে বাধ্য ছিল। এ উদ্দেশ্যে মুনাফিকরা মুহাম্মদ সা.-এর সামনে এ নতুন নির্মাণ কাজের প্রয়োজন পেশ করে। এ প্রসঙ্গে তারা বলে, বৃষ্টি বাদলের জন্য এবং শীতের রাতে সাধারণ লোকদের বিশেষ করে উল্লেখিত দু’টি মসজিদ থেকে দূরে অবস্থানকারী বৃদ্ধ, দুর্বল ও অক্ষম লোকদের প্রতিদিন পাঁচবার মসজিদে হাজিরা দেওয়া কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। কাজেই আমরা শুধুমাত্র নামাজীদের সুবিধার্থে এ নতুন মসজিদটি নির্মাণ করতে চাই।

আল্লাহ তায়ালা এই মসজিদকে দ্বিরার বা ক্ষতিকর বলেছেন। তাই ইসলামের ইতিহাসে এটি 'মসজিদে দ্বিরার' নামে পরিচিত। মুখে পবিত্র ও কল্যাণমূলক বাসনার কথা উচ্চারণ করে মুনাফিকরা এই মসজিদটির নির্মাণ কাজ শেষ করে। এরপর এ দুর্বৃত্তরা নবী সা.-এর দরবারে হাজির হলো এবং সেখানে একবার নামাজ পড়িয়ে মসজিদটির উদ্বোধন করার জন্য তার কাছে আবেদন জানালো। মহানবী সা.-এর কাছে ততক্ষণে ওহি নাজিল হয়েছিল এবং তিনি এই মসজিদের উদ্দেশ্য জেনেছিলেন।

এর মধ্যে জানা গেল রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্গত আরব অঞ্চলে রোমানরা ব্যাপক সৈন্য জড়ো করেছে। এদিকে আবু আমেরের সঙ্গী মুনাফিকরা মুসলিমদের মনে ভয় ধরিয়ে দেওয়ার জন্য রোমানদের প্রস্তুতির খবর বাড়িয়ে প্রচার করতে লাগলো। সবদিক বিবেচনা করে মুহাম্মদ সা. তৎকালীন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শক্তি রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকলেন।

মুনাফিকরা মসজিদে দ্বিরারে নামাজ পড়ার আবেদন জানালে মুহাম্মদ সা. তাদের বলেন, আমি এখন যুদ্ধের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত আছি এবং শীঘ্রই আমাকে একটি বড় অভিযানে বের হতে হবে, সেখান থেকে ফিরে এসে দেখা যাবে। একথা বলে তিনি তাদের আবেদন এড়িয়ে গেলেন। এরপর তিনি তাবুক রওয়ানা হয়ে গেলেন এবং তার রওয়ানা হওয়ার পর এ মুনাফিকরা এ মসজিদকে নিজেদের জোট গড়ে তুলতে এবং ষড়যন্ত্র পাকাতে ব্যবহার করতে লাগলো।

এমন কি তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল ওদিকে রোমান সীমান্তে মুসলমানদের পরাজয়ের সাথে সাথেই এদিকে তারা আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের মাথায় রাজ মুকুট পরিয়ে দেবে। কিন্তু তাবুকে যা ঘটলো তাতে তাদের সে আশা নিরাশায় পরিণত হলো। ফেরার পথে নবী সা. যখন মদীনার নিকটবর্তী “জি আওয়ান” নামক স্থানে পৌঁছলেন তখন এই মসজিদের ব্যাপারে সূরা তাওবার ১০৭ ও ১০৮ নং আয়াত নাযিল হলো।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, //আরো কিছু লোক আছে, যারা একটি মসজিদ নির্মাণ করেছে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে, কুফরী করার জন্য, মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে এবং এমন এক ব্যক্তির জন্য গোপন ঘাঁটি বানাবার উদ্দেশ্যে, যে ইতোপূর্বে আল্লাহ‌ ও তার রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। তারা অবশ্যই কসম খেয়ে বলবে, ভালো ছাড়া আর কোন ইচ্ছাই আমাদের ছিল না। কিন্তু আল্লাহ‌ সাক্ষী, তারা একেবারেই মিথ্যেবাদী।

তুমি কখনোই সেই ঘরে দাঁড়াবে না। যে মসজিদে প্রথম দিন থেকে তাকওয়ার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল সেই মসজিদে দাঁড়ানোই তোমার পক্ষে অধিকতর সমীচীন। সেখানে এমন লোক আছে যারা পাক-পবিত্র থাকা পছন্দ করে এবং আল্লাহ‌ পবিত্রতা অর্জনকারীদেরকে ভালবাসেন।//

আয়াত নাজিলের পরে মুহাম্মদ সা. কয়েকজন লোককে মদিনায় আগে পাঠিয়ে দিলেন। তাদেরকে দায়িত্ব দিলেন, মুসলিম বাহিনী মদিনায় পৌঁছার আগেই যেন তারা দ্বিরার মসজিদটি ভেঙ্গে ধুলিস্মাত করে দেয়।

পঠিত : ৬৫ বার

ads

মন্তব্য: ০