Alapon

আকিদা নিয়ে বিতর্ক এবং সাধারণ মানুষের জন্য কিছু নির্দেশনা


আকীদা নিয়ে নানান ধরনের তর্ক সেই প্রাচীন কাল থেকেই বিদ্যমান। চূড়ান্ত পর্যায়ের বিভিন্ন বাতিল ফিরকা বাদ দিলে অন্যদের মধ্যেও আকিদা নিয়ে কমবেশ মতভেদ আছে। বর্তমান সময়ে এই বিতর্কের একটা বড় অংশ হচ্ছে আশআরী-মাতুরিদি ও সালাফী দ্বন্দ্ব। সাধারণ ভাই-বোনরা এই বিষয়ে বেশ পেরেশানিতে পড়ে যান। তাদের জন্য সংক্ষেপে কিছু কথা পেশ করছি। উপকারী মনে হলে এটি শেয়ার করবেন। এতে অন্যরাও উপকৃত হতে পারবে ইনশাআল্লাহ।
ক. আকিদার এসব বিতর্ক শত শত বছর ধরে চলে আসছে। দুই পক্ষেই আছে গ্রহণযোগ্য উলামারা। তাই সমকালীন এসব বিতর্ক যেন কাউকে বেআদবির দিকে ঠেলে না দেয়। আপনি চুপচাপ দেখেন, শুনেন। দুই পক্ষের বিষয়েই জানার ও বুঝার চেষ্টা করেন। যেন আপনার জানাটা ‘অন্ধের হাতি দেখা’ এর মত না হয়।
খ. আশআরী-মাতুরিদি ও সালাফী বিরোধের প্রধান ও মৌলিক ক্ষেত্র হলো সিফাতের মাসআলা। এটাকেই কেন্দ্র করে মূলত যত বিবাদ। ইতিহাসের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় উভয় পক্ষের অনেকের মধ্যেই বাড়াবাড়ি হয়েছে। যেমন- সালাফীদের কেউ কেউ সিফাতের ক্ষেত্রে প্রকৃত অর্থে থাকার উপর জোর দিতে গিয়ে একেবারে দেহবাদের কাছাকাছি চলে গিয়েছেন। আবার আশআরী-মাতুরিদিদের অনেকে দেহবাদ থেকে উম্মাহকে বাচাতে সিফাতের ক্ষেত্রে ব্যাখ্যা করতে করতে একে এক রকম নাই করে দিয়েছেন। এই ধরনের নানান ব্যাপার-স্যাপার উভয় দলে আছে। ফলে সব আশআরী-মাতুরিদি যেমন এক কাতারের না, তেমনি সব সালাফীও এক কাতারের না। অর্থাৎ এক শব্দে কারও ব্যাপারে বলে দেওয়ার সুযোগ এখানে নেই।
গ. আকিদার এসব তর্ক অনেক অনেক সূক্ষ্ম ও প্যাচালো। এক পক্ষ একটা যুক্তি-প্রমাণ দিলে অন্য পক্ষ একে খন্ডন করে পাল্টা যুক্তি-প্রমাণ দিয়ে। তারপর প্রথম পক্ষ আবার একে খণ্ডন করলে দ্বিতীয় পক্ষ পুনরায় তাকে পাল্টা খণ্ডন করে। এভাবে সীমাহীনভাবে চলতে থাকে গভীর থেকে গভীরে গিয়ে। সাধারণ মানুষ তো দূরে থাক, আলেমদেরও কষ্ট হয়ে যায় এসব যুক্তি-প্রমাণ ও বিতর্ক ধৈর্য নিয়ে পড়তে ও বুঝতে। কারণ এতে নানান রকম পারিভাষিক, শাস্ত্রীয় ও দার্শনিক আলাপ থাকে। সাধারণ মানুষের উচিত তাই এসব তর্ক-বিতর্ক এড়িয়ে চলা।
ঘ. তাদের করণীয় হচ্ছে আকীদার এই বিতর্কিত মাসআলায় (সিফাতের মাসআলা) এত গভীরে ও ঝামেলায় না গিয়ে সংক্ষেপে ‘আল্লাহ যা বুঝিয়েছেন সেটা যেটাই হোক তা মানি’ বিশ্বাস রাখা। সেই সাথে তার সিফাতে যাতি বা সত্তাগত গুণের ক্ষেত্রে এই বিশ্বাস রাখা যে এগুলো আমাদের ভাষায় অঙ্গ বা দেহের কোন অংশ বুঝালেও আল্লাহর ক্ষেত্রে তেমনটি নয়। তিনি দেহ/অঙ্গ থেকে পবিত্র।
ঙ. আশআরী-মাতুরিদি হলেই পাইকারিহারে বিদআতি ট্যাগ লাগানো থেকে বিরত থাকা। কারণ এই ট্যাগ দিয়ে হয়ত আপনি আপনার স্মৃতিতে থাকা সমকালীন কিছু ব্যক্তিকে মিন করছেন, কিন্তু আপনার খবর নেই যে, এর ভেতর দিয়ে উম্মাহর বড় একটা আলেম শ্রেণিকে আপনি বিদআতি বানিয়ে দিয়েছেন যাদের জ্ঞান, ইলম, তাকওয়া, যুহদ ইত্যাদি নিয়ে আপনি আবার গর্ব করেন। মুশকিল হলো, এই উম্মাহর ইলম ও জিহাদের খেদমত আঞ্জাম দেওয়া সবচে বড় শ্রেণিটাই যে আশআরী-মাতুরিদি ছিল এটা অনেক সাআধারণ ভাই-বোনরাই জানে না। যদি জানত -আমার বিশ্বাস- এতটা সহজভাবে তারা বিদআতি ট্যাগ লাগিয়ে দিতে পারত না। অন্তর একটু হলেও কাঁপত। এমনিভাবে সালাফী হলেই পাইকারিভাবে মুজাসসিমা বা দেহবাদী ট্যাগ লাগানো থেকে বিরত থাকুন।
নিচে আমি একটা তালিকা দিচ্ছি যারা আশআরী-মাতুরিদি ছিলেন। এদের মধ্যে ব্যক্তিভেদে আশআরি চিন্তাধারা ধারণ করায় কমবেশ হবে কারও কারো ক্ষেত্রে। অর্থাৎ হয়ত কেউ কেউ কিছু সিফাতে আশআরী-মাতুরিদি চিন্তাধারা গ্রহণ করেছেন, অন্য কিছুতে গ্রহণ করেননি। আবার কেউ কেউ হয়ত সবখানেই গ্রহণ করেছেন। এদের কেউ কেউ আশআরী-মাতুরিদি চিন্তাধারার দায়ী ছিলেন, কেউ কেউ ছিলেন না। তাই সবার স্তর সমান না। কিন্তু যেই জায়গাতে মিল, সেটা হলো সিফাতের মাসআলায় কখনো না কখনো আশআরী-মাতুরিদি চিন্তাটা গ্রহণ করেছেন। তো মূল বিতর্ক তো আসলে সিফাত নিয়েই। সুতরাং বিদআতি বললে এদের সবার উপর গিয়ে সেটা পড়ে। হ্যা, কারো উপর কম আর কারো উপর বেশি।
এই তালিকায় সবার নাম আনা সম্ভব হয়নি। যাদেরটা পেরেছি এনেছি। এর বাইরেও অনেকে রয়ে গেছে। আপনারা সবার নামই পড়বেন। তাহলে হয়ত আচরণ-উচ্চারনে সহনশীলতা আসবে। উনারা সবাই বিখ্যাত। হয়ত আপনি কাউকে কাউকে চিনবেন আর কাউকে কাউকে না জানার কারণে চিনতেও না পারেন। এর মানে এই না যে, উনি সাধারণ কেউ। আমি যাদের তালিকা এনেছি তারা হলেন- মুফাসসির, মুহাদ্দিস, চার মাযহাবের ফকীহগণ, ভাষাবিদ ও মুজাহিদ/শাসকগণ
মুফাসসিরদের মধ্যে-
১. আল্লামা বাগাবী
২. আবু বকর ইবনুল আরাবী
৩. ইবনুল জাওযী
৪. ফখরুদ্দিন রাযি
৫. বাইযাবী
৬. নাসাফী
৭. আলাউদ্দিন খাযেন
৮. বদরুদ্দিন যারকাশী
৯. সা’লাবী
১০. ইবনু আদেল
১১. জালালুদ্দিন সুয়ুতী
১২. আবুস সাউদ
১৩. যুরকানী
১৪. তাহের ইবনু আশুর
১৫. আবু যাহরা
১৬. ওয়াহবা যুহাইলি
১৭. আলী সাবুনী
মুহাদ্দিসদের মধ্যে-
১৮. ইবনু হিব্বান
১৯. বাইহাকী
২০. সামআনী
২১. ইবনুস সালাহ
২২. ইয ইবনে আব্দুস সালাম
২৩. কিরমানি
২৪. ইবনে হাজার আসকালানী
২৫. কাস্তাল্লানি
২৬. নববী
২৭. মুনাবি
২৮. হাইসামী
২৯. ইবনুল কাত্তান ফাসী
৩০. যাইনুদ্দিন ইরাকী
৩১. ইবনু জামাআহ
৩২. বদ্রুদ্দিন আইনি
৩৩. ইবনু ফাওরাক
৩৪. ইবনুল মুলাক্কিন
৩৫. ইবনু দাকিকিল ঈদ
৩৬. যাইলায়ী
৩৭. সাখাবী মুল্লা আলি কারি
৩৮. মুনযিরী
৩৯. আব্দুল হাই লাখনবি
৪০. মুরতাযা যাবিদি
 হানাফী ফুকাহাদের মধ্যে-
৪১. বাযদাবি
৪২. তাফতাযানী
৪৩. জুরজানি
৪৪. ইবনুল হুমাম
৪৫. আলাউদ্দিন বুখারী
৪৬. আক্মালুদ্দিন বাবারতি
৪৭. বুরহানুদ্দিন (হেদায়ার লেখক)
৪৮. আলাউদ্দিন কাসানি (বাদায়িউস সানায়ে এর লেখক)
৪৯. ইবনু কামাল পাশা
৫০. ইবনু আমির হাজ
৫১. ইবনু কুতলুবুগা
৫২. ইবনু নুজাইম
৫৩. ইবনু আবেদিন শামি
৫৪. আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি
৫৫. শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি
 মালেকি মাযহাবের ফুকাহাদের মধ্যে-
৫৬. আবুল ওয়ালিদ বাজি
৫৭. আবু বকর বাকিল্লানি
৬৮. তারতুসি
৬৯. আবু যার হারাবি
৭০. ইবনে রুশদ
৭১. ইবনে খালদুন
৭২. ইবনুল হাজেব
৭৩. ইবনে বাত্তাল
৭৪. কারাফী
৭৫. শাতিবি
৭৬. কাজি ইয়ায
৭৭. কুরতুবি
৭৮. আলি ইবনে মাখলুফ আব্দুর রহমান আখযারী
৭৯. ইবনু আশুর
 শাফেয়ী মাযহাদের ফুকাহাদের থেকে-
৮০. ইবনু হিব্বান
৮১. ইবনে আসাকির
৮২. ইবনুল জাযারি
৮৩. যাকারিয়া আনসারি
৮৪. কুতুবুদ্দিন নাইসাবুরি
৮৫. জালালুদ্দিন মাহাল্লি (সুয়ুতির উস্তাদ)
৮৬. যাইনুদ্দিন ইরাকি
৮৭. কাযবিনি
৮৮. ইমামুল হারামাইন জুয়াইনি
৮৯. কুশাইরি
৯০. আবু নুয়াইম আসবাহানি
৯১. গাযালী
৯২. ইবনে ইসহাঁক শিরাজি
৯৩. ইস্ফারায়েনি
৯৪. আব্দুল ওয়াহহাব শারানী
৯৫. তকিউদ্দিন সুবকী
৯৬. তাজুদ্দিন সুবকি
৯৭. খতিব বাগদাদী
৯৮. ইবরাহীম বাজুরি
৯৯. শামসুদ্দিন রমালি
১০০. ইবনে আল্লান
 হাম্বলিদের মধ্যে-
৯৫. ইবনুল জাওযী
৯৬. বাহুতি
 ভাষাবিদের মধ্যে-
৯৭. ইবনুল আম্বারি
৯৮. ফাইরুযাবাদি
৯৯. ইয়াকুত হামাবি
১০০. ইবনে মানযুর (লিসানুল আরবের লেখক)
১০১. ইবনে আকিল
১০২. ইবনে মালেক
 মুজাহিদদের মধ্যে-
১০৩. আলপ আরসালান
১০৪. নিজামুল মুলক তুসি
১০৫. ইউসুফ বিন তাশফিন
১০৬. নুরুদ্দিন যিনকি
১০৭. সালাহুদ্দিন আইউবি
১০৮. সাইফুদ্দিন কুতয
১০৯. মুহাম্মাদ আল-ফাতিহ
১১০. বাদশা আলমগির
১১১. উমর মুখতার
১১২. ইযযুদ্দিন কাসসাম (হামাসের কাসসাম ব্রিগেড যার নামে)
১১৩. সাইদ নুরসি
১১৪. আব্দুল কাদের আল-জাযায়েরি

পঠিত : ১১৮ বার

ads

মন্তব্য: ০