Alapon

মুনাফিকদের বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা ও সেরা সাহাবীদের স্বীকৃতি



তাবুক অভিযানের মূল কারণ ছিল রোমান সম্রাটের তৎপরতা ও মদিনার মুনাফিকদের সাথে তার সংযোগ। মুনাফিকরা তাদের শলাপরামর্শের জন্য কেন্দ্র স্থাপন করেছে মসজিদের নামে। যা মসজিদে দিরার নামে পরিচিত। তাবুক অভিযানের আগেই এটি তৈরি হয়েছে। আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে মুহাম্মদ সা. তাবুক থেকে ফিরে মদিনায় প্রবেশের আগেই একটি ছোট বাহিনী পাঠিয়ে মসজিদটি ভেঙে ফেলেন।

মুহাম্মদ সা. মদিনার রাষ্ট্রের শুরু থেকে তৈরি হওয়া মুনাফিক গোষ্ঠীর ব্যাপারে উপেক্ষা নীতি গ্রহণ করেছিলেন। তাদের দোষ ও বিশ্বাসঘাতকতা দেখেও তিনি এড়িয়ে যেতেন। এর মূল কারণ ছিল রাষ্ট্রের সংহতি ঠিক রাখা। এবার যখন পুরো আরব মুহাম্মদ সা.-এর নিয়ন্ত্রণে এলো এবং সীমান্তের রোমানদের সাথেও বোঝাপড়া হয়ে গেল তখন আল্লাহ তায়ালা মুনাফিকদের সাথে কঠোর আচরণ করার নির্দেশ দিলেন। বিশেষত যেহেতু বাইরের শক্তির সাথে আঁতাত করে রাষ্ট্রের ক্ষতি করতে চেয়েছিলো তাই এদের ব্যাপারে আর নরম থাকার সুযোগ আল্লাহ দেননি।

আল্লাহ তায়ালা সূরা তাওবার ৭৩ নং আয়াতে বলেন, //হে নবী! পূর্ণ শক্তি দিয়ে কাফির ও মুনাফিক উভয়ের মোকাবিলা করো এবং তাদের প্রতি কঠোর হও। শেষ পর্যন্ত তাদের আবাস হবে জাহান্নাম এবং তা অত্যন্ত নিকৃষ্ট আবাসস্থল।//

যেহেতু আরবের বাইরের সাথে এখন সংঘাতে লিপ্ত হতে হচ্ছে তাই ঘরের শত্রুদের আর ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। তাছাড়া তাদেরকে ৯ বছর সময় দেওয়া হয়েছিল চিন্তা-ভাবনা করার, বুঝার এবং আল্লাহর সত্য দ্বীনকে যাচাই-পর্যালোচনা করার জন্য। তাদের মধ্যে যথার্থ কল্যাণ লাভের কোন আকাঙ্ক্ষা থাকলে তারা এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারতো। কিন্তু তা না করে তারা রাষ্ট্রের ওপর হামলা চালানোর জন্য রোমানদের আহ্বান করেছে। এখন তাদের ছাড় দিলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে।

মাওলানা মওদূদী বলেন, এটি ছিল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ। এই নির্দেশ ইসলামী সমাজকে অবনতি ও পতনের আভ্যন্তরীণ কার্যকারণ থেকে সংরক্ষণ করা সম্ভব হতো না। যে জামায়াত ও সংগঠন তার নিজের মধ্যে মুনাফিক ও বিশ্বাসঘাতকদেরকে লালন করে এবং যেখানে দুধকলা দিয়ে সাপ পোষা হয়, তার নৈতিক অধঃপতন এবং সবশেষে পূর্ণ ধ্বংস ছাড়া গত্যন্তর নেই। মুনাফিকী প্লেগের মতো একটি মহামারী। আর মুনাফিক হচ্ছে এমন একটি ইঁদুর যে এ মহামারীর জীবাণু বহন করে বেড়ায়। তাকে জনবসতির মধ্যে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার সুযোগ দেয়ার অর্থ গোটা জনবসতিকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া। মুসলমানদের সমাজে একজন মুনাফিকদের মর্যাদা ও সম্ভ্রম লাভ করার অর্থ হলো হাজার হাজার মানুষকে বিশ্বাসঘাতকতা ও মুনাফিকী করতে দুঃসাহস যোগানো।

তাবুক যুদ্ধের প্রাক্কালে যখন যুদ্ধ ব্যয় মেটানোর জন্য বাইতুল মাল চাওয়া হয়েছিল তখন মুনাফিকরা ঝামেলা তৈরি করে। ধনশালী মুনাফিকরা হাত গুটিয়ে বসে রইলো। কিন্তু যখন নিষ্ঠাবান ঈমানদাররা সামনে এগিয়ে এসে চাঁদা দিতে লাগলেন তখন ঐ মুনাফিকরা তাদেরকে বিদ্রূপ করতে লাগলো। কোন সামর্থ্যবান মুসলমান নিজের ক্ষমতা ও মর্যাদা অনুযায়ী বা তার চেয়ে বেশি অর্থ পেশ করলে তারা তাদের অপবাদ দিতো যে, তারা লোক দেখাবার ও সুনাম কুড়াবার জন্য এ পরিমাণ দান করছে। আর যদি কোন গরীব মুসলমান নিজের ও নিজের স্ত্রী ও ছেলে মেয়েদের অভুক্ত রেখে সামান্য পরিমাণ টাকাকড়ি নিয়ে আসতো, অথবা সারা রাত মেহনত মজদুরী করে সামান্য কিছু খেজুর উপার্জন করে তাই এনে হাজির করতো, তখন এ মুনাফিকরা তাদেরকে এ বলে ঠাট্টা করতো, সাবাস! এই অর্ধেকটা খেজুর পাওয়া গেলো। এ দিয়েই রোমের দূর্গ জয় করা যাবে।”

আল্লাহ তায়ালা এই ঘটনা উল্লেখ করে তাদের সমালোচনা করেছেন সূরা তাওবার ৭৫ থেকে ৭৯ নং আয়াতে। তিনি বলেন, // আর তাদের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহর সাথে ওয়াদা করে যে, যদি আল্লাহ অনুগ্রহ করে আমাদের দান করেন, আমরা অবশ্যই দান-খয়রাত করব এবং অবশ্যই আমরা নেককারদের অন্তর্ভুক্ত হবো। কিন্তু যখন আল্লাহ‌ তাদেরকে বিত্তশালী করে দিলেন তখন তারা কার্পণ্য করতে লাগলো এবং নিজেদের অঙ্গীকার থেকে এমনভাবে পিছটান দিলো। ফলে তারা আল্লাহর সাথে এই যে অঙ্গীকার ভঙ্গ করলো এবং এই যে, মিথ্যা বলতে থাকলো, এ কারণে আল্লাহ‌ তাদের অন্তরে মুনাফিকী বদ্ধমূল করে দিলেন, তার দরবারে তাদের উপস্থিতির দিন পর্যন্ত তা তাদের পিছু ছাড়বে না।

তারা কি জানে না, আল্লাহ‌ তাদের গোপন কথাও গোপন সলা-পরামর্শ পর্যন্ত জানেন এবং তিনি সমস্ত অদৃশ্য বিষয়ও পুরোপুরি অবগত? যারা ঈমানদেরদের সন্তোষ ও আগ্রহ সহকারে আর্থিক ত্যাগ স্বীকারের প্রতি দোষ ও অপবাদ আরোপ করে এবং যাদের কাছে (আল্লাহর পথে দান করার জন্য) নিজেরা কষ্ট সহ্য করে যা কিছু দান করে তাছাড়া আর কিছুই নেই, তাদেরকে বিদ্রূপ করে। আল্লাহ‌ এ বিদ্রূপকারীদেরকে বিদ্রূপ করেন। এদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব।//

তাবুক যুদ্ধের প্রাক্কালে অংশগ্রহণ না করার জন্য মুনাফিকরা মুহাম্মদ সা.-এর কাছে মিথ্যা অজুহাত দিয়ে যুদ্ধ থেকে বিরত থাকতে চেয়েছে। আর যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার জন্য ক্ষমা প্রার্থণা করছিলো। তখন মুহাম্মদ সা. তাদের ক্ষমা করে দিলেন, যুদ্ধ থেকে মুক্তি দিলেন ও তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলেন। আল্লাহ তায়ালা এই ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এবং মুনাফিকদের এই অপরাধের জন্য তাদের মধ্যে থেকে কেউ যদি ভবিষ্যতের কোনো যুদ্ধে যোগ দিতে চায় তাদেরকে যেন যুদ্ধে শামিল না করা হয়।

এই প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা সূরা তাওবার ৮০ থেকে ৮৩ নং আয়াতে বলেন,

//হে নবী! তুমি এ ধরনের লোকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো বা না করো, তুমি যদি এদের জন্য সত্তর বারও ক্ষমা প্রার্থনা করো তাহলেও আল্লাহ‌ তাদেরকে কখনোই ক্ষমা করবেন না। কারণ তারা আল্লাহ‌ ও তার রসূলের সাথে কুফরী করেছে। আর আল্লাহ‌ ফাসেকদেরকে মুক্তির পথ দেখান না। যাদেরকে পিছনে থেকে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল তারা আল্লাহর রসূলের সাথে সহযোগিতা না করারও ঘরে বসে থাকার জন্য আনন্দিত হলো এবং তারা নিজেদের ধন-প্রাণ দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করতে অপছন্দ করলো। তারা লোকদেরকে বললো, “এ প্রচণ্ড গরমের মধ্যে বের হয়ো না।” তাদেরকে বলে দাও, জাহান্নামের আগুন এর চেয়েও বেশী গরম, হায়! যদি তাদের সেই চেতনা থাকতো!

এখন তাদের কম হাসা ও বেশী কাঁদা উচিত। কারণ তারা যে গুনাহ উপার্জন করেছে তার প্রতিদান এ ধরনেরই হয়ে থাকে। যদি আল্লাহ‌ তাদের মধ্যে তোমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যান এবং আগামীতে তাদের মধ্য থেকে কোন দল জিহাদ করার জন্য তোমার কাছে অনুমতি চায় তাহলে পরিষ্কার বলে দেবে, “এখন আর তোমরা কখনো আমরা সাথে যেতে পারবে না এবং আমার সঙ্গী হয়ে কোন দুশমনের সাথে লড়াইও করতে পারবে না। তোমরা তো প্রথমে বসে থাকাই পছন্দ করেছিলে, তাহলে এখন যারা ঘরে বসে আছে তাদের সাথে তোমরাও বসে থাকো।//

তাবুক থেকে ফিরে আসার পর কয়েকদিন মধ্যেই মুনাফিকদের নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই মারা গেলো। তার ছেলে আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ ছিলেন নিষ্ঠাবান মুসলমান। তিনি নবী সা. এর কাছে এসে খবর জানালেন এবং জানাজার নামাজ পড়ানোর জন্য আহ্বান জানালেন। শুধু তাই নয় আব্দুল্লাহ তার বাবার ব্যাপারে জানতেন। বাবার মাগফিরাত নিশ্চিতের জন্য তিনি মুহাম্মদ সা.-এর কাছে আবেদন করলেন, তিনি যাতে তার জামা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের কাফন হিসেবে দান করেন।

গত নয় বছর যার থেকে কষ্ট পেয়েছেন তাকে জামা দান করতে মুহাম্মদ সা.-এর একটু বিলম্ব হয়নি। তিনি অত্যন্ত উদার হৃদয়ের পরিচয় দিয়ে জামা দিয়ে দিলেন। তারপর আবদুল্লাহ তাঁকেই জানাযার নামায পড়াবার জন্য অনুরোধ করলেন। তিনি এ জন্যও তৈরী হয়ে গেলেন। হযরত উমর রা. বারবার এ মর্মে আবেদন জানাতে লাগলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি এমন ব্যক্তির জানাযার নামায পড়াবেন যে অমুক অমুক কাজ করেছে? কিন্তু তিনি তার এ সমস্ত কথা শুনে মুচকি হাসতে লাগলেন। তার অন্তরে শত্রু মিত্র সবার প্রতি যে করূনার ধারা প্রবাহিত ছিল তারই কারণে তিনি ইসলামের এ নিকৃষ্টতম শত্রুর মাগফেরাতের জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করতেও ইতস্তত করলেন না।

এরপর মুহাম্মদ সা. জানাজার নামাজ পড়ালেন। আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের জন্য দোয়া করলেন। এই ঘটনা পছন্দ করেননি আল্লাহ তায়ালা। তিনি মুহাম্মদ সা.-কে সতর্ক করে দিলেন। দাফন কার্যে অংশ নিয়ে মুহাম্মদ সা. যখন ফিরে এলেন তখন সূরা তাওবার ৮৪ নং আয়াত নাজিল হলো। আল্লাহ তায়ালা বলেন, // আর আগামীতে তাদের মধ্য থেকে কেউ মারা গেলে তার জানাযার নামাযও তুমি কখনো পড়বে না এবং কখনো তার কবরের পাশে দাঁড়াবে না। কারণ তারা আল্লাহ‌ ও তার রসূলকে অস্বীকার করেছে এবং তাদের মৃত্যু হয়েছে ফাসেক অবস্থায়।//

এরপর থেকে মুহাম্মদ সা. আর কখনো কোনো মুনাফিক ও ফাসিক ব্যাক্তির জানাজায় অংশ নেন নি। যখনই কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর খবর আসতো তিনি তার ব্যাপারে সাহাবাদের জিজ্ঞাসা করতেন। সন্তোষজনক উত্তর পেলে জানাজায় যেতেন। আর আনুগত্যের ব্যাপারে সন্তোষজনক উত্তর না পেলে মৃত ব্যক্তির পরিবারের লোকদের বলতেন তোমরা তাকে যেভাবে ইচ্ছে দাফন করো।

হজরত উমার ফারুক রা. একই নীতি অবলম্বন করতেন। তিনি বাকী জীবনে কোনো মুনাফিকের জানাজায় অংশ নেননি। যাদের ব্যাপারে তাঁর আইডিয়া ছিল তাদের ব্যাপারে নিজে থেকেই যেতেন না। আর যাদের ব্যাপারে তাঁর আইডিয়া ছিল না তাদের ক্ষেত্রে তিনি হুজাইফা রা.-কে অনুসরণ করতেন। আল্লাহর রাসূল সা. হুজাইফা রা.-কে সকল মুনাফিকদের নাম প্রকাশ করে গিয়েছিলেন। যাদের জানাজা হুজাইফা রা. পড়তেন না, তিনিও তাদের জানাজা পড়তেন না। একবার উমার রা. এক লোকের জানাজায় যাওয়ার উঠতেছিলেন তখন হুজাইফা রা. তাকে চিমটি কাটেন। উমার রা. বুঝে ফেলেন। তিনি জানাজায় যাননি।

হুজাইফা রা.-কে মুনাফিকদের নাম জানিয়ে দেওয়ার ঘটনাও প্রাসঙ্গিক। রোমানদের কেন্দ্র করে মুনাফিকরা ভালোই প্রস্তুতি নিয়েছে। তারা রোমানদের উস্কে দিয়েছে। শলাপরামর্শ করার জন্য মসজিদ বানিয়েছে। মদিনা দখল করার জন্য মদিনায় থেকে গেছে। আরেকটি দল মুসলিমদের সাথে তাবুক অভিযানে গেছে। তাদের পরিকল্পনা ছিল যদি রোমানদের সাথে যুদ্ধে বিপর্যয় তৈরি হয় তবে যেন মুসলিমদের সাথে থাকা মুনাফিকেরা দ্রুতই মুহাম্মদ সা.-কে হত্যা করতে পারে। যে কাজটা উহুদ যুদ্ধে সুযোগ পেয়েও মক্কার কুরাইশরা পারেনি সে কাজ যাতে এবার ব্যর্থ না হয় তারই পরিকল্পনা মুনাফিকেরা করেছে।

কিন্তু যেহেতু যুদ্ধ হয়নি তাই তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ আসেনি। অভিযান থেকে ফিরে আসার সময় রাতে পথ চলছিলো মুসলিম বাহিনী। পথ চলতে চলতে মুহাম্মদ সা. মূল দল থেকে একটু আলাদা হয়ে পড়লেন। তাঁর সাথে ছিলেন আম্মার রা. ও হুজাইফা রা.। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে চেয়েছে দলে থাকা মুনাফিকেরা। তারা ১২ জন চেহারা ঢেকে মুহাম্মদ সা.-কে হত্যা করার জন্য এগিয়ে আসলো। তাদের এই এগিয়ে আসাকে সন্দেহের চোখে দেখার কোনো অবকাশ ছিল না। কারণ তারা মুসলিম দলেরই সৈনিক।

মুহাম্মদ সা. বিষয়টা বুঝতে পারলেন। তিনি হুজাইফা রা.-কে ইঙ্গিত করলেন। হুজাইফা রা. পেছনের দিকে গিয়ে এলোপাথাড়ি আক্রমণ শুরু করলেন ও চিৎকার দিলেন। এতে মুনাফিকেরা ভয় পেয়ে গেলো। এবং দ্রুত পিছু হটে সাহাবাদের সাথে মিশে গেল। সাহাবারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘটনা শেষ হয়ে গেল। রাসূল সা. হুজাইফা রা.-কে মুনাফিকদের নাম উল্লেখ করে বললেন, তারা আমাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যেই এসেছিলো। তিনি এই নামগুলো গোপন রাখার অনুরোধ করেন। এভাবে হুজাইফা রা. মুনাফিকদের নাম জানতেন কিন্তু তিনি তা কারো কাছে নামগুলো প্রকাশ করেননি।

যাই হোক সূরা তাওবার ৮৪ নং থেকে শরীয়াতের এ বিষয়টি নির্ধারিত হয়েছে যে, ফাসেক, অশ্লীল, নৈতিকতা বিরোধী কাজকর্মের লিপ্ত ব্যক্তি এবং প্রকাশ্যে কবিরা গুনাহ করা লোকদের জানাযার নামায মুসলমানদের ইমাম ও নেতৃস্থানীয় লোকদের পড়ানো উচিত নয়। তাতে শরীক হওয়াও উচিত নয়। আমাদের নেতারা এই নিয়ম মেনে এসেছেন।

মুনাফিকদের সমালোচনা করার পর আল্লাহ তায়ালা আরব বেদুঈনদের সমালোচনা করেছেন যারা তাবুক অভিযানে অংশ নেয়নি। এরা মূলত হুনাইনের যুদ্ধের পরে মুসলিমদের প্রভাব প্রতিপত্তি ও সম্পদের আধিক্য দেখে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। সূরা তাওবার ৯০ থেকে ৯৯ নং আয়াতে তাদের ব্যাপারে কথা বলেছেন। একইসাথে অসুস্থ লোকদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। যারা যুদ্ধ-সরঞ্জামের অভাবে কারণে যুদ্ধে অংশ নিতে পারেনি তাদেরকেও দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

এরপর মহান আল্লাহ তায়ালা সূরা তাওবার ১০০ নং আয়াতে নবী সা.-এর দুই শ্রেণির সাহাবীদের সৎকর্মের স্বীকৃতি দেন। তিনি বলেন, //মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম সারির অগ্রণী আর যারা তাদেরকে যাবতীয় সৎকর্মে অনুসরণ করেছে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট আর তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট, তাদের জন্য তিনি প্রস্তুত করে রেখেছেন জান্নাত যার তলদেশে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। এটাই হল মহান সফলতা।//

এই আয়াত নাজিলের মাধ্যমে সাহাবীদের নামের শেষে 'রাদিয়াল্লাহু আনহুম' এই বিশেষণ যুক্ত করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা মুহাজির ও আনসার সাহাবীদের ব্যাপারে এই অসাধারণ স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। এর মানে হলো আল্লাহ তাদের ওপর সন্তুষ্ট।

আল্লাহ তায়ালা প্রথম সারির বলতে কাদের বুঝিয়েছেন এই ব্যাপারে শা'বি রহ. বলেছেন, যারা হুদায়বিয়ার বাইয়াতে অংশ নিয়েছেন তারা। আর আবু মুসা আশআরি রা., সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব রহ., ইবনে সিরিন রহ., হাসান বসরি রহ. ও কাতাদা রহ. বলেছেন যারা দুই কিবলার দিকে মুখ করে সালাত আদায় করেছেন তারা। এই আয়াত নাজিলের পর উমার ফারুক রা. খুশি হয়ে বলেন, আমরা এমন এক মর্যাদা লাভ করেছি যা আমাদের পরে আর কেউ লাভ করতে পারবে না।

আর মুহাজিরদের অনুসরণকারী মুহাজির হলো যারা মক্কা বিজয়ের আগে মক্কা থেকে পালিয়ে মদিনায় এসেছে। আর আনসারদের অনুসরণকারী আনসার হলো যারা মদিনায় নিষ্ঠার সাথে মুহাম্মদ সা.-এর আনুগত্য করেছে। আল্লাহ তায়ালা এই সাহাবীদেরকে স্বীকৃতি দিয়ে মর্যাদাবান করেছেন।

পঠিত : ১৭৩ বার

ads

মন্তব্য: ০