Alapon

দারুল ইসলামের সুস্পষ্ট নীতি, তারবিয়াত ও দণ্ডবিধি



তাবুক অভিযানের পর তায়েফের মুশরিক ও মদিনার মুনাফিকদের আর কোনো আশা থাকলো না। তারা উপায় না দেখে বিজয়ী ইসলামের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করলো। পুরো আরব উপদ্বীপের অধিকাংশ গোত্র মক্কা বিজয় ও হুনাইনের বিজয়ের পর ইসলামে দাখিল হয়েছে। যারা বাকী ছিল তারাও তাবুক অভিযানের পর মুহাম্মদ সা.-এর নিকট আনুগত্যের বাইয়াত করেছে। আল্লাহর রাসূল সা. দীর্ঘদিন অবরোধ করে যাদের নমনীয় করতে পারেন নি সেই তায়েফবাসী নিজ দায়িত্বে এসে ইসলাম গ্রহণ করলো। এভাবে হাজারো মানুষ ইসলামের পতাকাতলে শামিল হতে শুরু করলো। সমগ্র আরব ইসলামী রাষ্ট্র তথা দারুল ইসলামে পরিণত হয়।

ইসলামের সূচনাকালে যে সব লোকের হৃদয়ে ইসলামের সত্যতা আসন পেতে নিতো এবং যারা পুরোপুরি বুঝে-শুনে ইসলাম গ্রহণ করতো, কেবল তারাই এ আন্দোলনের সহায়তা করতে এগিয়ে আসতো। কিন্তু এ পর্যায়ে ইসলামের প্রভাব চারদিকে ছড়িয়ে পড়ায় দলে দলে লোকেরা ইসলামের মধ্যে দাখিল হতে লাগলো। দেশের পর দেশ, জনপদের পর জনপদ ইসলামের বশ্যতা স্বীকার করে নিলো। এর ফলে খুব কম লোকই পুরোপরি বুঝে-শুনে ইসলাম গ্রহণের সুযোগ পেলো; বরং বেশির ভাগ লোকই অল্প কিছু জেনে-শুনে ইসলামের সহায়তা করতে প্রস্তুত হয়ে গেলো। এভাবে হাজার হাজার লোক ইসলামী সমাজের অন্তর্ভুক্ত হতে লাগলো।

দৃশ্যত এই পরিস্থিতিটা ছিলো ইসলামের শক্তি বৃদ্ধির লক্ষণ। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো জনসমষ্টি ইসলামের মূলনীতিগুলোকে উত্তমরূপে বুঝতে না পারবে এবং এবং ইসলাম কর্তৃক অর্পিত নৈতিক দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত না হবে, ততোক্ষণ সে ইসলামী সমাজের পক্ষে দুর্বলতারই কারণ হয়ে থাকবে। তাবুক অভিযানকালে এমনি পরিস্থিতিরই কিছুটা আভাস পাওয়া গিয়েছিলো। তাই এই কারণে ইসলামী রাষ্ট্রকে আভ্যন্তরীণ দুর্বলতা থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ প্রদান করা হলো। আর তা হলো, জনসাধারণের মধ্য থেকে কিছু লোককে ইসলামী রাষ্ট্রের কেন্দ্র মদিনায় আসতে হবে এবং এসব কেন্দ্র থেকে ইসলামের শিক্ষা -দীক্ষা ও তার বিস্তারিত নিয়ম-কানুন শিখে তাদেরকে সত্যিকার ইসলামী ভাবধারা বুঝতে হবে। অতঃপর মুসলিম জন-মানসে সঠিক ইসলামী চেতনা জাগ্রত করার ও তাদেরকে আল্লাহর নির্দেশাবলী সম্পর্কে অবহিত করানোর উদ্দেশ্যে এই শিক্ষাপ্রাপ্ত লোকদেরকে নিজ নিজ জনপদে ফিরে গিয়ে জনগণের শিক্ষা-দীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।

এই সাধারণ ইসলামী শিক্ষার অর্থ কেবল লোকদেরকে কিছু লেখা-পড়া শেখানোই ছিলো না; বরং লোকদের মধ্যে দ্বীনী চেতনা সৃষ্টি এবং ইসলামী ও অন ইলামী জীবন পদ্ধতির পার্থক্যবোধ জাগিয়ে তোলাই ছিলো এর মূল উদ্দেশ্য। নবম হিজরিতে তাই আল্লাহর রাসূল সা. তারবিয়াতের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেন। তাবুক যুদ্ধে কিছু নিষ্ঠাবান সাহাবাদের পদচ্যুতির ফলে মুহাম্মদ সা. এই বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করেন।

নবম হিজরিতে ইসলামী দন্ডবিধির প্রসার হয়। অনেকগুলো আইন ও নিয়ম জারি হয়। প্রচুর জনগণ ইসলামের আওতায় থাকায় অনেক মোকদ্দমা আল্লাহর রাসূল সা.-এর দরবারে দায়ের হতো। মুহাম্মদ সা. এগুলোর সমাধান করতেন। কিছু সমস্যার সমাধান আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়।

আয়িশা রা.-এর বিরুদ্ধে অপবাদ দেওয়ার ঘটনায় নিয়ম তৈরি হয়েছিল কোনো মহিলার বিরুদ্ধে অনৈতিকতার অভিযোগ আনলে অবশ্যই চারজন সাক্ষী হাজির করতে হবে। নতুবা এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এর ফলে একটা সমস্যার সৃষ্টি হয়। কেউ একাকী কাউকে অনৈতিকতা করতে দেখলেও তা সাক্ষীর অভাবে বলতে পারতো না। বাইরের মানুষের ব্যপারে অভিযোগ না করে চুপ থাকা যায়, এভোয়েড করা যায় কিন্তু নিজের স্ত্রীর ব্যাপারে যদি এরকম কিছু দেখা যায় সেক্ষেত্রে চুপ থাকা তো কষ্টের। এটা তো সহ্য করা যায় না।

নিজের স্ত্রীর চরিত্রহীনতা দেখলে কি করবে? হত্যা করলে তো উল্টো শাস্তি লাভের যোগ্য হয়ে যাবে। সাক্ষী খুঁজতে গেলে তাদের আসা পর্যন্ত অপরাধী সেখানে অপেক্ষা করতে যাবে কেন? আর সবর করলে তা করবেইবা কেমন করে। তালাক দিয়ে স্ত্রীকে বিদায় করে দিতে পারে। কিন্তু এর ফলে না মেয়েটির কোন বস্তুগত বা নৈতিক শাস্তি হলো, না তার প্রেমিকের। আর যদি তার অবৈধ গর্ভসঞ্চার হয়, তাহলে অন্যের সন্তান নিজের গলায় ঝুললো।

এ প্রশ্নটি প্রথমে হযরত সা’দ ইবনে উবাদাহ রা. একটি কাল্পনিক প্রশ্নের আকারে পেশ করেন। তিনি এতদূর বলে দেন, আমি যদি আল্লাহ না করুন নিজের ঘরে এ অবস্থা দেখি, তাহলে সাক্ষীর সন্ধানে যাবো না বরং তলোয়ারের মাধ্যমে তখনই এর হেস্তনেস্ত করে ফেলবো। এর কিছুদিন পরেই এমন কিছু মামলা দায়ের হলো যেখানে স্বামীরা স্বচক্ষেই এ ব্যাপার দেখলো এবং নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এর অভিযোগ নিয়ে গেলো। আনসারদের এক ব্যক্তি মুহাম্মদ সা.-এর সামনে হাযির হয়ে বলেন, হে আল্লাহর রসূল! যদি এক ব্যক্তি নিজের স্ত্রীর সাথে পরপুরুষকে পায় এবং সে স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে সাক্ষী ছাড়া, তাহলে আপনি তার বিরুদ্ধে কি মিথ্যা অপবাদের “হদ” জারি করবেন?

তাদের কাউকে হত্যা করলে আপনি তাকে হত্যা করবেন। নীরব থাকলে সে চাপা ক্রোধে ফুঁসতে থাকবে। শেষমেশ সে করবে কি? এ কথায় রসূলুল্লাহ্ সা. দোয়া করেন, হে আল্লাহ! এ বিষয়টির ফায়সালা করে দাও। হেলাল ইবনে উমাইয়াহ রা. এসে নিজের স্ত্রীর ব্যাপারে অভিযোগ করে বলেন, তিনি তাকে নিজের চোখে ব্যভিচারে লিপ্ত থাকতে দেখেছিলেন। নবী সা. বলেন, “প্রমাণ আনো, অন্যথায় তোমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদের শাস্তি জারি হবে।”

এতে সাহাবীদের মধ্যে সাধারণভাবে পেরেশানী সৃষ্টি হয়ে যায় এবং হেলাল রা. বলেন, সেই আল্লাহর কসম যিনি আপনাকে নবী বানিয়ে পাঠিয়েছেন, আমি একদম সঠিক ঘটনাই তুলে ধরছি, আমার চোখ এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে এবং কান শুনেছে। আমি বিশ্বাস করি আল্লাহ আমার ব্যাপারে এমন হুকুম নাযিল করবেন যা আমার পিঠ বাঁচাবে। এ ঘটনায় আল্লাহ তায়ালা সূরা নূরের ৬ থেকে ৯ নং নাজিল করেন। এখানে মীমাংসার যে পদ্ধতি দেয়া হয়েছে তাকে ইসলাম আইনের পরিভাষায় “লি’আন” বলা হয়।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, //আর যারা নিজদের স্ত্রীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অথচ নিজেরা ছাড়া তাদের আর কোন সাক্ষী নেই, তাহলে তাদের প্রত্যেকের সাক্ষ্য হবে আল্লাহর নামে চারবার সাক্ষ্য দেবে যে, সে নিশ্চয়ই সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত। আর পঞ্চমবারে সাক্ষ্য দেবে যে, সে যদি মিথ্যাবাদী হয়, তবে নিশ্চয় তার উপর আল্লাহর লা‘নত।

আর তারা স্ত্রীলোকটি থেকে শাস্তি রহিত করবে, যদি সে আল্লাহর নামে চারবার সাক্ষ্য দেয় যে, নিশ্চয় তার স্বামী মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত। আর পঞ্চমবারে সাক্ষ্য দেবে যে, যদি তার স্বামী সত্যবাদী হয়, তবে নিশ্চয় তার উপর আল্লাহর গজব।//

এ আয়াত নাজিল হবার পর হেলাল ও তার স্ত্রী দু’জনকে নবীর আদালতে হাযির করা হয়। রসূলুল্লাহ্ সা. প্রথমে আল্লাহর হুকুম শুনান। তারপর বলেন, “খুব ভালভাবে বুঝে নাও, আখেরাতের শাস্তি দুনিয়ার শাস্তির চাইতে কঠিন।” হেলাল বলেন, “আমি এর বিরুদ্ধে একদম সত্য অভিযোগ দিয়েছি।” স্ত্রী বলে, “এ সম্পূর্ণ মিথ্যা।” রসূলুল্লাহ্ সা. বলেন, “বেশ, তাহলে এদের দু’জনের মধ্যে লি’আন করানো হোক।”

সে অনুসারে প্রথমে হেলাল উঠে দাঁড়ায়। তিনি কুরআনী নির্দেশ অনুযায়ী কসম খাওয়া শুরু করেন। এ সময় নবী সা. বারবার বলতে থাকেন, “আল্লাহ্ জানেন তোমাদের মধ্যে অবশ্যই একজন মিথ্যেবাদী। তারপর কি তোমাদের মধ্য থেকে কেউ তাওবা করবে?” পঞ্চম কসমের পূর্বে উপস্থিত লোকেরা হেলালকে বললো, “আল্লাহকে ভয় করো। দুনিয়ার শাস্তি পরকালের শাস্তির চেয়ে হালকা। এ পঞ্চম কসম তোমার ওপর আখিরাতের শাস্তি ওয়াজিব করে দেবে।”

কিন্তু হেলাল বলেন, যে আল্লাহ এখানে আমার পিঠ বাঁচিয়েছেন তিনি পরকালেও আমাকে শাস্তি দেবেন না। একথা বলে তিনি পঞ্চম কসমও খান।

তারপর তার স্ত্রী ওঠে। সেও কসম খেতে শুরু করে। পঞ্চম কসমের পূর্বে তাকেও থামিয়ে বলা হয়, “আল্লাহকে ভয় করো, আখেরাতের আযাবের তুলনায় দুনিয়ার আযাব বরদাশত করে নেয়া সহজ। এ শেষ কসমটি তোমার ওপর আল্লাহর আযাব ওয়াজিব করে দেবে।” একথা শুনে সে কিছুক্ষণ থেমে যায় এবং ইতস্তত করতে থাকে। লোকেরা মনে করে নিজের অপরাধ স্বীকার করতে চাচ্ছে। কিন্তু তারপর সে বলতে থাকে। “আমি চিরকালের জন্য নিজের গোত্রকে লাঞ্ছিত করবো না।” তারপর সে পঞ্চম কসমটিও খায়।

অতঃপর নবী সা. তাদের উভয়ের মধ্যে ছাড়াছাড়ি করে দেন এবং ফায়সালা দেন, এর সন্তান (যে তখন মাতৃগর্ভে ছিল) মায়ের সাথে সম্পর্কিত হবে। বাপের সাথে সম্পর্কিত করে তার নাম ডাকা হবে না। তার বা তার সন্তানের প্রতি অপবাদ দেবার অধিকার কারোর থাকবে না। যে ব্যক্তি তার বা তার সন্তানের প্রতি অপবাদ দেবে সে মিথ্যা অপবাদের শাস্তির অধিকারী হবে। ইদ্দতকালে তার খোরপোশ ও বাসস্থান লাভের কোন অধিকার হেলালের ওপর বর্তায় না। কারণ তাকে তালাক বা মৃত্যু ছাড়াই স্বামী থেকে আলাদা করা হচ্ছে।

আরেকটি ঘটনা হলো, মায়েজ ইবনে মালেক রা. নবী সা.-এর নিকট এসে বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ সা.! আমাকে পবিত্র করুন। তিনি বললেন, আক্ষেপ তোমার প্রতি, চলে যাও, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও এবং তওবা করো। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি চলে গেলেন এবং সামান্য একটু দূরে গিয়েই আবার ফিরে আসলেন এবং আবারও বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাকে পবিত্র করুন। নবী সা. এইবারও তাঁকে পূর্বের ন্যায় বললেন। এইভাবে তিনি যখন চতুর্থবার এসে বললেন, তখন রাসূলুল্লাহ সা. জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা! আমি তোমাকে কোন জিনিস হতে পবিত্র করবো?

তিনি বললেন, জিনা হতে। তাঁর কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সা. সাহাবা জিজ্ঞেস করলেন, লোকটি কি পাগল? লোকেরা বলল, না, তিনি পাগল নন। তিনি আবার বললেন, লোকটি কি মদ পান করেছে? তৎক্ষণাৎ এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে তাঁর মুখ শুঁকে দেখেন; কিন্তু মদের কোন গন্ধ তাঁর মুখ হতে পাওয়া গেল না। অতঃপর তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি সত্যই জিনা করেছ? তিনি বললেন,জি হাঁ। এর পর তিনি রজমের নির্দেশ দিলেন, তখন তাঁকে রজম করা হল।

এই ঘটনার দুই তিন দিন পর রাসূলুল্লাহ সা. (সাহাবাদের সম্মুখে) এসে বললেন, তোমরা মায়েয ইবনে মালেকের জন্য ইস্তেগফার করো (ক্ষমা প্রার্থনা কর)। কেননা সে এমন তওবাই করেছে, যদি তা সমস্ত উম্মতের মধ্যে বিতরণ করে দেওয়া হয়, তবে উহা সকলের জন্য যথেষ্ট হবে।

অতঃপর আয্দ বংশের গামেদী গোত্রীয় একটি মহিলা এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে পবিত্র করুন। তিনি বললেন, তোমার প্রতি আক্ষেপ! চলে যাও, আল্লাহর কাছে ইস্তেগফার কর এবং তওবা কর। তখন মহিলাটি বলল, আপনি মায়েয ইবনে মালেককে যেভাবে ফিরিয়ে দিয়েছেন আমাকেও কি সেভাবে ফিরিয়ে দিতে চান? দেখুন, আমার এই গর্ভ যিনার! তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি (সত্যই গর্ভবতী)? মহিলাটি বলল, জি হাঁ।

নবী সা. মহিলাটিকে বললেন, তুমি চলে যাও এবং সন্তান প্রসব হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করো। অতঃপর সন্তান প্রসবের পর যখন আসলো, তখন বললেন, আবারও চলে যাও এবং তাকে দুধ পান করাও এবং দুধ ছাড়ান পর্যন্ত অপেক্ষা কর। পরে যখন বাচ্চাটির দুধ খাওয়া বন্ধ হয়, তখন মহিলাটি বাচ্চার হাতে এক খন্ড রুটির টুকরা দিয়ে তাকে সঙ্গে করে রাসূল সা.-এর খেদমতে উপস্থিত হলো। এইবার মহিলাটি বললো, হে আল্লাহর নবী! এই দেখুন (বাচ্চাটির) দুধ ছাড়ান হয়েছে, এম কি সে নিজের হাতের খানাও খেতে পারে। তখন রাসূল সা. বাচ্চাটিকে একজন মুসলমানের হাতে তুলে দিলেন।

অতঃপর লোকদেরকে নির্দেশ করলেন, তারা মহিলাটিকে রজম করল। খালেদ ইবনে ওলীদ রা. সম্মুখে অগ্রসর হয়ে তার মাথায় একখন্ড পাথর নিক্ষেপ করতেই রক্ত ছিটে এসে তাঁর মুখমন্ডলের উপর পড়ল। তাই তিনি মহিলাটিকে ভৎর্সনা ও তিরস্কার করে গাল-মন্দ করলেন, (এটা শুনে) নবী করীম সা. বললেন, হে খালেদ, থামো! সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ! অবশ্যই মহিলাটি এমন তওবা করেছে, যদি কোন বড় জালেমও এই ধরনের তওবা করে, তারও মাগফেরাত হয়ে যাবে। অতঃপর তিনি তার জানাযা পড়ার আদেশ করলেন, অতঃপর তার জানাযা পড়লেন এবং তাকে দাফনও করলেন।

এভাবে নবম হিজরিতে ঘটা অনেকগুলো মোকদ্দমা থেকে ইসলামী দন্ডবিধি আইনের বিকাশ হয়। ইসলামে অপরাধের জন্য শাস্তি দেওয়াটা মুখ্য নয় বরং অপরাধবোধ তৈরি করে ন্যায়ের পথে ফিরে আসাটা এবং সমাজকে অন্যায় থেকে দূরে রাখাই মুখ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

ইসলামী দণ্ডবিধির তিনটি ধারা রয়েছে। কিসাস, হুদুদ ও তাজির। যেসব অপরাধের শাস্তিকে আল্লাহর হক হিসাবে নির্ধারণ করে জারি করেছে, সেসব শাস্তিকে ‘হুদুদ’ বলা হয় এবং যেসব শাস্তিকে বান্দার হক হিসেবে জারি করেছে, সেগুলোকে ‘কিসাস’ বলা হয়। কিসাসের শাস্তি হুদূদের মতই সুনির্ধারিত। প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ সংহার করা হবে এবং জখমের বিনিময়ে সমান জখম করা হবে। কিন্তু পার্থক্য এই যে, হুদূদকে আল্লাহর হক হিসেবে প্রয়োগ করা হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ক্ষমা করলেও তা ক্ষমা হবে না। কিন্তু কিসাস এর বিপরীত। কিসাসে বান্দার হক প্রবল হওয়ার কারণে হত্যাকারীকে নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীর অধিকারে ছেড়ে দেয়া হয়। ক্ষতিগ্রস্থ ব্যক্তি ইচ্ছা করলে কিসাস হিসাবে তাকে মৃত্যুদণ্ড করাতে পারে। যখমের কিসাসও একই রকম।

যেসব অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ হয়নি সে জাতীয় শাস্তিকে বলা হয় ‘তাজির’ তথা ‘দণ্ড’। তাজির বা দণ্ডগত শাস্তিকে অবস্থানুযায়ী লঘু থেকে লঘুতর, কঠোর থেকে কঠোরতর এবং ক্ষমাও করা যায়। এ ব্যাপারে বিচারকদের ক্ষমতা অত্যন্ত ব্যাপক। কিন্তু হুদুদের বেলায় কোনো বিচারকই সামান্যতম পরিবর্তন, লঘু অথবা কঠোর করার অধিকারী নয়। স্থান ও কাল ভেদেও এতে কোনো পার্থক্য হয় না। শরী’আতে হুদুদ মাত্র পাঁচটি: ডাকাতি, চুরি, ব্যভিচার, ব্যভিচারের অপবাদ ও মদপান। এর মধ্যে প্রথম চারটির শাস্তি কুরআনে বর্ণিত রয়েছে। পঞ্চমটি হাদিস দ্বারা নির্ধারিত।

দ্বীন কায়েমের সংগ্রামে নিয়োজিত দাঈদের ইসলামী দণ্ডবিধি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা আবশ্যক। ইসলামী রাষ্ট্রের আবশ্যিক কাজগুলোর মধ্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি হল শরীআতের দন্ডবিধি বাস্তবায়ন করা।

নবম হিজরিতে মুহাম্মদ সা. হজ্ব করেননি, তিনি দারুল ইসলামকে মেরামতের জন্য মদিনায় থেকে গেছেন। তবে আবু বকর রা.-এর নেতৃত্বে একদল প্রতিনিধিকে তিনি মক্কায় হজ্বে শামিল হওয়ার জন্য প্রেরণ করেন। আবু বকর রা.-এর নেতৃত্বে হজ্ব কাফেলা রওনা হওয়ার পর মুহাম্মদ সা.-এর কাছে ওহি আসে ও সূরা তাওবার ১ থেকে ৫ আয়াত নাজিল হয় এবং আরব থেকে সমস্ত মুশরিকদের উচ্ছেদ করার ঘোষণা আসে।

এ সময় সমগ্র আরব ভুমির শাসন ক্ষমতা মুসলিমদের হাতে নিবদ্ধ ছিলো। তাদের মুকাবিলা করার মতো উল্লেখযোগ্য কোনো শক্তি বর্তমান ছিলো না। তাই এবার ইসলামী হুকুমতের অভ্যন্তরীণ নীতি ঘোষণার সময় এলো। মুহাম্মদ সা. দারুল ইসলামের আভ্যন্তরীণ নীতি ঘোষণার জন্য আলী রা.-কে নির্দেশনা সহকারে হজ্বে পাঠালেন। তিনি দ্রুত রাস্তা অতিক্রম হাজিদের সাথে মিলিত হলেন। আবু বকর রা. এর নেতৃত্বে মুসলিমরা হজ্ব করেন। নবম হিজরির ১০ জিলহজ্ব আবু বকর রা.-এর পাশে দাঁড়িয়ে তিনি দারুল ইসলামের নীতি ঘোষণা করেন। এই ঘোষণার মূলকথাগুলো ছিল,

১. যে ব্যক্তি দ্বীন-ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।
২. এ বছরের পর কোনো মুশরিক কা’বা গৃহে হজ্জ করতে আসতে পারবে না।
৩. কাউকে নগ্ন হয়ে বায়তুল্লাহর চারদিকে তওয়াফ করার অনুমতি দেওয়া হবে না।
৪. যাদের সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (স)-এর চুক্তি রয়েছে এবং যারা চুক্তির পর থেকে এ পর্যন্ত বিশ্বাস ভঙ্গ করেনি, তাদের সঙ্গে চুক্তির শর্তানুযায়ীই ব্যবহার করা হবে এবং তার মেয়াদ পূর্ণ করা হবে।
৫. কিন্তু যারা চুক্তি থাকা সত্ত্বেও ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বেছে নিয়েছে তাদের জন্যে আর মাত্র চার মাসের অবকাশ রয়েছে। এই অবকাশের ভেতর হয় মুসলমানদের সঙ্গে লড়াই করে তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করতে হবে, নচেত দেশ ছেড়ে তাদেরকে চলে যেতে হবে অথবা বুঝে-শুনে আল্লাহর দ্বীনকে গ্রহণ করে ইসলামী ব্যবস্থাপনায় শামিল হতে হবে।
৬. কা’বার তত্ত্বাবধান ব্যবস্থা সম্পূর্ণ তওহীদবাদীদের হাতে থাকবে। এতে মুশরিকদের কোনো অধিকার থাকবে না। এবার থেকে কা’বার ভেতর কোনো মুশরিকানা প্রথা পালন করা যাবে না; এমন কি কোনো মুশরিকরা এই পবিত্র ঘরের নিকটে পর্যন্ত আসতে পারবে না।

পঠিত : ১২৯ বার

ads

মন্তব্য: ০