Alapon

বনু কায়নুকার অভিযান এবং ইসলামে নারীর সম্মান...



দ্বিতীয় হিজরির কথা। মদীনায় এক মুসলিম নারী স্বর্ণ কেনা-বেচার জন্য মদীনার বাজারে গেলেন। মদীনার স্বর্ণের ব্যবসা মূলত ইহুদিরাই পরিচালনা করতো।

তো সেই মুসলিম নারী এক ইহুদি ব্যবসায়ীর দোকানে গেলেন। দোকানে গিয়ে তিনি স্বর্ণ দেখতে চাইলেন। তখন সেই ইহুদি ব্যবসায়ী আগত মুসলিম নারীকে তার মুখের পর্দা সরাতে বলল। কিন্তু সেই মুসলিম নারী নিজের নেকাব সরাতে অস্বীকৃতি জানায়। সেখানে আরও কয়েকজন ইহুদি উপস্থিত ছিল। তারাও সেই মুসলিম নারীকে নিজের মুখের পর্দা সরানোর জন্য জোর করছিল। কিন্তু সেই মহিলা নিজের সিদ্ধান্তে অটল রইলেন।

সেই মুসলিম নারী যখন স্বর্ণ দেখায় ব্যস্ত ছিলেন, তখন সেই ইহুদি ব্যবসায়ী চুপি চুপি নিচে পড়ে থাকা সেই মহিলার একটি অংশ মাটির সাথে গেধে দেয়। সেই মহিলা যখন বসা থেকে উঠে হাটতে ‍শুরু করলেন, তখন মাটির সাথে বেধে রাখা কাপড়ে টান পড়ে, তার পরনের কাপড়টা খুলে গেল। তার কাপড় খুলে যাওয়ার সাথে সাথে উপস্থিত ইহুদিরা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে।

সেসময় সেখানে এক মুসলিম যুবক উপস্থিত ছিল। এভাবে একজন একজন মুসলিম নারীকে হেনস্থা হতে দেখে সেই মুসলিম যুবক ক্ষোভে ফেটে পড়ে। তিনি সাথে সাথে সেই ইহুদি দোকানদারের উপর ঝাপিয়ে পড়ে তাকে হত্যা করেন। এরপর সেখানে উপস্থিত ইহুদিরা সেই মুসলিম ‍যুবকের উপর ঝাপিয়ে পড়ে তাকে উপর্যুপরি আঘাত করে হত্যা করে।

উল্লেখ্য, নিহত ইহুদির গোত্র ছিল বনু কায়নুকা গোত্র। এই ঘটনার পর বনু কায়নুকা গোত্র ও নিহত যুবকের গোত্র মুখোমুখি অবস্থান নেয়।

আল্লাহর রাসূল সা. এই ঘটনা শোনা মাত্রই সৈন্যদের নিয়ে বনু কায়নুকা অভিমুখে রওনা হন। তারপর চারদিক থেকে বনু কায়নুকা গোত্রকে ঘিরে ফেলে মুসলিম বাহিনী। তারপর আল্লাহর রাসূল বলেন, ‘আমরা বনু কায়নুকা গোত্রকে ১৫ দিন অবরোধ করে রাখবো।’

অন্যদিকে, মুসলিম বাহিনী যখন বনু কায়নুকা গোত্র ঘিরে ফেলল, তখন বনু কায়নুকার ইহুদিরা ভয়ে কাঁপতে শুরু করলো। অথচ, এতোদিন তারা আড়ালে আবডালে বলে বেড়াতো, ‘আমরা কৌশলগত কারণে মুসলিমদের সাথে চুক্তি করেছি। কিন্তু আমরা চাইলেই ‍মুসলিমদের ধুলোর সাথে মিশিয়ে দিতে পারি।’ কিন্তু তাদের এই দম্ভ যে মিছেমিছি ছিল, তা সেই দিন প্রমাণ হয়ে যায়।

এরপর বনু কায়নুকার ইহুদিরা আর উপায়ন্তর না দেখে আত্মসমর্পন করার সিদ্ধান্ত নেয়। তখন মদীনার অস্থায়ী গভর্ণর ছিলেন মুনযির ইবনে খুদামাহ রা.। আল্লাহর রাসূল মুনযির ইবনে খুদামাহকে বললেন, ‘বনু কায়নুকার সমস্ত পুরুষদের বেঁধে ফেলো।’
আল্লাহর রাসূলের আদেশ পাওয়া মাত্রই মুনযির রা. কাজে নেমে পড়লেন।

এরপর ঘটনাস্থলে হাজির হল মুনাফিক সর্দার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই। আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে মুনযিরকে বললেন, ‘ওদের বাঁধন খুলে দাও।’
কিন্তু মুনযির বাঁধন খুলে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বললেন, ‘না, কক্ষনো না। কেউ যদি তাদের বাঁধন খুলে দিতে আসে, তাহলে তাকেও হত্যা করা হবে।’

এরপর আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই তার ইহুদি বন্ধুদের বাঁচাতে রাসূল সা. এর কাছে গেলেন। আল্লাহর রাসূলকে গিয়ে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই বললেন, ‘আমার বন্ধু গোত্র বনু কায়নুকার বন্দিদের মুক্তি দেওয়া হোক।’
আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের এ কথা শুনে আল্লাহর রাসূল মুখ ফিরিয়ে নিলেন।
এরপর সে আবারও আল্লাহ রাসূলকে একই কথা বলল। তখন আল্লাহর রাসূল মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অন্যদিকে চলে যাচ্ছিলেন। তখন আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই আল্লাহর রাসূলের পকেটের ভিতরে হাত রাখে এবং আল্লাহর রাসূলের হাতে থাকা বর্মটি চেপে ধরে। এ অবস্থায় আল্লাহর রাসূল খুবই রেগে গেলেন। রেগে গিয়ে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইকে বললেন, ‘ছাড়ো, ছাড়ো আমাকে।’
তখন আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই আল্লাহর রাসূলের বর্মটি আরও শক্ত করে চেপে ধরে বলে, ‘বনু কায়নুকার ৭০০ যোদ্ধা সর্বদা আমার জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত। তারা আমার বহু বিপদে আপদে সহায়তা করেছে। আর তাদের কিনা এক সকালের মধ্যেই হত্যা করা হবে। আমি তা হতে দিতে পারি না। আপনি দয়া করে তাদের মুক্ত করে দিন।’

আল্লাহর খুব বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘ঠিক আছে। আমি তাদের ছেড়ে দিচ্ছি, কিন্তু তারা আর মদীনায় থাকতে পারবে না। তাদের মদীনা থেকে বহিষ্কার করা হলো।’

এই ঘটনাকে বনু কায়নুকার অভিযান বলে অভিহিত করা হয়।

লক্ষ্য করুন, বনু কায়নুকার অভিযানটি ছিল, একজন মুসলিম নারীকে অপদস্থ করার কারণে। শুধু একজন মুসলিম নারীকে অসম্মান করার কারণে আল্লাহর রাসূল ব্নু কায়নুকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। যুগে যুগে ইসলাম নারীদের এভাবেই সম্মানিত করেছে। অথচ আজ আমরা মুসলিম হয়ে মুসলিম নারীদের হেনস্থা করি, অসম্মান করি। যা কখনোই একজন মুসলমানের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।

পঠিত : ৬৬ বার

ads

মন্তব্য: ০