Alapon

// ইবরাহিম (আঃ)-এর জীবনী এবং আমাদের জন্য শিক্ষা//


রাজা মৃত্যদণ্ড প্রাপ্ত দু’জন কয়েদীকে ধরে এনে সকলের সামনে একজনকে হত্যা করলো, আর একজনকে ছেড়ে দিলো। এবং ইবরাহিম আলাইহিস সালাতু আসসালামকে জবাব দিলো , ‘আমিও তো জীবন দান করতে পারি এবং মৃত্যু ঘটাই’।

ইবরাহিম আলাইহিস সালাম এবার ভীত হলেন না। তাঁর ভেতর ছিলো দাওয়াতি মনোভাব। তাই তো তিনি জনতার সামনে নির্ভিক চিত্তে উত্তর দিলেন—

‘আমার আল্লাহ তো সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উদয় ঘটান, তুমি তাকে পশ্চিম দিক হতে উদিত করো তো দেখি’। এই যুক্তিপূর্ণ জবাব শুনেই সে পুরোপুরি নির্বাক ও হতবুদ্ধি হয়ে পড়লো। কিন্তু তবুও সত্যের কাছে মাথা নতো করেনি। মেনে নেয়নি সত্যকে। তাওহিদকে। আল্লাহর একত্ববাদকে। যেভাবে তাঁর নিজ কওমের নেতারাও মানেনি।

জালিম বাদশা তখন নির্দেশ জারি করলেন যে, সাঈয়েদুনা ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে জ্বলন্ত আগুনে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার। সেই সাথে সাথে রাজা তার প্রজাদেরকেও মিথ্যে প্রভু দেবদেবিদের দোহাই দিয়ে বললো, ‘তোমরা একে পুড়িয়ে মারো এবং তোমাদের সাহায্য করো উপাস্যদের, যদি তোমরা কিছু করতে চাও’ ।

যুক্তিতর্কে হেরে গিয়ে নমরূদ ইবরাহিম (আঃ)-কে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার হুকুম দিলো। আর তা বাস্তবায়নের জন্য বিশাল এক আগুনের কুণ্ডলী তৈরি করা হলো। তিনি তাঁকে পুড়িয়ে ছারখার করে মারার এতোসব আয়োজন দেখেও বিন্দুমাত্র ঈমান থেকে দূরে সরেননি। তিনি শান্ত-স্থির। তাঁর মাঝে কোনো ভয়-শঙ্কা নেই। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাও নেই।

জালিম-আল্লাহদ্রোহী বাদশাহ অনেক শ্রমিক দিয়ে বিশাল বড়ো একটা গর্ত বানিয়ে সে গর্তে সম্রাজ্যের বড়ো বড়ো গাছগুলো দিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ রকমের আগুনের লেলিহান তৈরি করেছিলো। সে লেলিহান আগুনের কুণ্ডলীতে নিয়ে আসা হলো সাম্রাজ্যের একমাত্র তাওহিদবাদী যুবক ইবরাহিমকে। গর্তের আগুনের বিশালতা চারদিকে ছড়িয়ে পড়্লো। আগুনের লেলিহান শিখা এমন পর্যায়ে পৌঁছলো যে, কোনো মানুষ গর্তের ধারে-কাছেও যেতে পারে না।


যেহেতু গর্তের দ্বারে-কাছেও যাওয়া যায় না, তাই তারা যুবক ইবরাহিমকে আগুনে কোন উপায়ে আগুনে ফেলবেন, সেটা নিয়ে চিন্তা করতে লাগলেন। অবশেষে সে উপায় বের করেও ফেললো। অনেক উঁচু একটি লোহার দোলনা তৈরি করা হলো। ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে সেখানে উঠিয়ে দেওয়া হলো। তিনি আগুনে দগ্ধ হয়ে কীভাবে ছাই হয়ে মারা যায়, রাজা ও তার মন্ত্রীপরিষদ গর্তের কিছুটা দূরে একটি উঁচু মঞ্চ তৈরি করেছে তা দেখার জন্য। তারা এমন ঘটা করেই ইবরাহিম আলিহিস সালামকে পোড়াবার মনস্থির করেছে যে, তাদের অসহায় রুগ্না নারীরা পর্যন্ত মানত করলো; তারা যদি সুস্থ হয়ে যায়, তাহলে তারাও ইবরাহিমকে পোড়াবার জন্যে খড়-লাকড়ি যোগাড় করবে।

একপর্যায়ে তাঁকে গর্তে নিক্ষেপ করা হলো। তবুও তিনি নির্ভিক। ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে যাননি তিনি। ভেঙেও পড়েননি। যে সময় তাঁকে দোলনায় উঠিয়ে ঘুরপাক দিয়ে ফেলে দিবে, ঠিক সেই মুহূর্তেও তাঁর ঈমান টলেনি আল্লাহর থেকে। তাঁকে আগুনের কুণ্ডলীতে নিক্ষেপ করা হচ্ছে। আর সে সময়ও তিনি এক্ত্ববাদের সাক্ষ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর মুখ থেকে সে সময় উচ্চারিত হচ্ছিলো এই দু’আটি — حَسْبُنَا اللهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ ‘আমার জন্য আমার আল্লাহই যথেষ্ট। তিনিই উত্তম অভিভাবক’।


আল্লাহর ওপর যাঁর পূর্ণ ভরসা, সারা দুনিয়ায় এমন কী আছে বা কে আছে যা দিয়ে তাকে ভীত-বিহ্ববল করা যাবে? আর যাকে স্বয়ং আল্লাহই রক্ষা করবেন বা করেন, তাবৎ দুনিয়ায় এমন কে এবং কী আছে যে জিনিস বা যে ব্যক্তি তার ক্ষতি করবে? যুবক ইবরাহিমেরও আল্লাহতে ছিলো পরিপূর্ণ দৃঢ়তর আস্থা ও ঈমান। আল্লাহও সেই আস্থা আর ঈমানের প্রতিদান দিলেন। তাঁকে আগুনে ফেলার সঙ্গে সঙ্গেই আল্লাহ আগুনকে আদেশ করলেন—

‘হে আগুন, আমার ইবরাহিমের জন্য তুমি শান্তিদায়ক হয়ে যাও’। ইবরাহিম (আঃ) আগুনের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হলেন; কিন্তু একটু পুড়ছেন না, বরং তিনি সুস্থ্-সুন্দর আছেন। বেশ ভালোই আছেন। স্বাভাবিক আছেন। শুধু কপাল থেকে সামান্য একটু ঘাম ঝরেছিলো একবার। আল্লাহ সুবহানাহু ও’তাআলার পবিত্র কালামে পাকে বিষয়টি এভাবেই এসেছে—

‘তারা ইবরাহীমের বিরুদ্ধে মহা ফন্দি আঁটতে চাইলো। অতঃপর আমরা তাদেরকেই সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত করে দিলাম’। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘আমরা তাদেরকে পরাভূত করে দিলাম।


আমরা যারা দ্বীনের পথে চলতে চেষ্টা করি, আমরাও এভাবে ইবরাহিম আলাইহিস সালামের মতো আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থাও বিশ্বাস রাখতে পারি। তিনি যেভাবে আল্লাহর একত্ববাদের দাওয়াত পৌঁছে দেয়ার চিন্তায় বিভোর ছিলেন, তাঁর মতো আমরাও আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত, তাঁর একত্ববাদের দাওয়াত পৌঁছে দেয়ার মতো চিন্তায় মুখিয়ে থাকতে হবে। আর যাঁরা ইতোমধ্যে আমাদের রব্ব আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত মানুষের ধারে ধারে পৌঁছে দেয়ার কাজ করি, আমাদের ওপরও বিপদের বিমান ক্রাশ হতে পারে। নানান ধরনের ঝুঁকিতে পড়ার সমূহ সম্ভবনা আছে, সে সময় আমরাও যেনো তাঁর মতো আমাদের ঈমানের অগ্নি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারি, আমাদের যেনো সে প্রচেষ্টাটা থাকে সর্বোত্তমভাবে!

এছাড়া আমরাও জীবনের পরতে পরতে সংকটে আর সংগ্রামে নিপতিত হয়ে পড়ি। আমরাও যদি এই অনুভূতিটা হৃদয়ে বদ্ধমূল রাখতে পারি যে, আমার সাহায্যকারী হিসেবে, আমার অভিভাবক হিসেবে, সর্বাবস্থায় আমার আল্লাহই আমার জন্যে যথেষ্ট।

আমরা যদি আমাদের অন্তরে লুকানো ব্যথাগুলোকে, কলিজার কষ্টগুলোকে। আমাদের সর্বপ্রকার অশান্তিগুলোকে, আমাদেরর অসুস্থতাকে, রোগ-শোক আর বিপদ-আপদকে, আমাদের বুকজুড়ে বেড়ে ওঠা বিষণ্ণতা আর যন্ত্রণাগুলোকে, আমাদেরর দুঃখ-যাতনাগুলোকে আমরা যদি তাঁর স্বকাশেই পেশ করি। তাঁর কাছেই উপস্থাপন করি। তাঁর কাছেই নিবেদন করি; তাহলে তিনিই আমাদেরকে শান্তি দিতে পারেন। তিনিই আমাদেরকে স্বস্তি আর মুক্তি দিতে পারেন। তিনিই করে তুলতে পারেন সুস্থ ও শক্তিমান! তিনিই দূর করতে পারেন বিপদ-মুসিবত আর দুর্বলতাগুলোকে। কারণ, আমরা জানি, আমরা বিশ্বাস করি নিশ্চয়ই তিনিই সর্বোত্তম ফায়সালাকারী। সাহায্যকারী আর অভিভাবক হিসেবেও তাঁর মতো কেউ নেই! কেউ নেই! সুতরাং আমাদের জন্যে তিনিই যথেষ্ট। শুধুই তিনি। আর কারোই প্রয়োজন নেই। কখনোই না! কেউই না...


হুবহু এই কথাটিই পবিত্র কালামুল্লাহ মাজিদে সূরা নিসার ৪৫ নং আয়াতে আল্লাহ রব্বুল আলামিন ইরশাদ করেছেন। আমাদের হৃদয়-মন এবং মুখেও এই আয়াতটি সদা-সর্বদা ধ্বনিতপ্রতিধ্বনিত হওয়া উচিত। আয়াতটি বা দু’আটি সম্মানিত পাঠক সমাজ এখুনি মুখস্থ করে রাখতে পারেন। ও কাফা বিল্লাহি ওলিয়্যা, ও কাফা বিল্লাহি নাসিরা... وَ کَفٰی بِاللّٰهِ وَلِیًّا

وَّ کَفٰی بِاللّٰهِ نَصِیۡرًا ... কিংবা মনের গোপণ কোণে জমিয়ে রাখতে পারি হাসবুনাল্লাহু নি’মাল ওকীল...

حَسْبُنَا اللهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ এই দু’আটিও। কারণ, এটা শুধু ইবরাহিম আলাইহিস সালাম নয়, আমাদের প্রিয় নবিও একই প্রার্থনা করেছিলেন। উহুদ যুদ্ধে আহত মুজাহিদগণ যখন শুনতে পেলেন যে, আবু সুফিয়ান মক্কায় ফিরে না গিয়ে পুনরায় মদিনায় ফিরে এসেছে মুসলিমদেরকে, আল্লাহর দ্বীনের পক্ষের মুজাহিদদেরকে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য যখন যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে, সে সময় কাফিরদের পক্ষ হয়ে যখন কিছু গুজব রটনাকারী মুসলমানদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার জন্যে বলেছিলো যে, তোমাদের বিরুদ্ধে কাফিররা বিরাট সাজ-সরঞ্জামের সমাবেশ করেছে, সুতরাং তোমরা তাদের ভয় করো। তাদের এমন কথাবার্তায় মু’মিনরা কর্ণপাত না করে , ভয় না পেয়ে উল্টো আরো সাহসের সাথে তাঁরা রাসুলে আকরাম স্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লামের নেতৃত্বে ঘোষণা দিয়ে উঠলেন যে— حَسْبُنَا اللّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيْلُ، ‘আমার জন্য আমার আল্লাহই যথেষ্ট। তিনিই উত্তম অভিভাবক। শুধু এইটুকুই নয়। বরং এটা পবিত্র কুরআনুল কারিমেরও আয়াত।


তবে সর্বশেষ আমরা এখান আরো একটা বিষয় শিখতে পাএরি। তা হলো এই যে, আমরা আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়েই শুধু বসে থাকবো না। বরং আমরা আমাদের কাজ চালিয়ে যাবো। সাথ সাথে আল্লাহর কাছে দু’আও করে যাবো। আর আল্লাহ অবশ্যই আমাদেরকে সাহায্য করবেন। আমাদেরকেও ভীত-সন্ত্রস্ত করতে পারে আল্লাহদ্রোহী অপশক্তিগুলো, কিন্তু তাদের ভয় দেখানোতে আমরা ভীত হয়ে পড়বো না। আমরা বরং দ্বিগুণ গতিতে কাজ চালিয়ে যাবো। আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর প্রতি পূর্ণ ঈমানের অধিকারী বান্দা হিসেবে কবুল করুন। আ-মী-ন!!


// ইবরাহিম (আঃ)-এর জীবনী এবং আমাদের জন্য শিক্ষা//

~রেদওয়ান রাওয়াহা

পঠিত : ৩১ বার

ads

মন্তব্য: ০