Alapon

বিশ্বনবীর নামাজে জানাযা



বিশ্বনবীর নামাজে জানাযা
সাহাদত হোসেন খান

ধীরে ধীরে বিশ্বনবী (সা.)-এর রোগযন্ত্রণা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। একদিন তিনি হজরত আয়েশা (রা.)-এর কাছে কিছু স্বর্ণমুদ্রা জমা রেখেছিলেন। তিনি তীব্র রোগযন্ত্রণার মধ্যেও বললেন: আয়েশা! সেই স্বর্ণমুদ্রাগুলো কোথায়? আমি কি আল্লাহর সঙ্গে এ অবস্থায় মিলিত হবো যে, আমার ঘরে স্বর্ণমুদ্রা? এগুলো বিতরণ করে দাও। রোগযন্ত্রণা কখনো বৃদ্ধি পাচ্ছিল আবার কখনো হ্রাস পাচ্ছিল। ওফাতের দিন সোমবার তিনি অনেকটা সুস্থ ছিলেন। কিন্তু সময় যত গড়াতে থাকে তিনি তত ঘন ঘন বেহুঁশ হতে থাকেন। আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর রসূল (সা.)-এর কাছে একটি মিছওয়াক হাতে নিয়ে এসেছিলেন। রসূল (সা.)-কে বারবার মিছওয়াকের দিকে তাকাতে দেখে হজরত আয়েশা বললেন: আপনি কি মিছওয়াক করবেন? তখন তিনি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালে হজরত আয়েশা (রা.) একটি মিছওয়াক নিয়ে মুখে চিবিয়ে নরম করে রসূল (সা.)-কে দেন। তিনি সেই মিছওয়াক দিয়ে মিছওয়াক করেন।
ইন্তেকালের আগে সাহাবীরা বিশ্বনবী (সা.)-এর দরবারে আসেন। সাহাবীদের দেখে তার চোখ বেদনার অশ্রুতে ভরে যায়। তিনি বললেন, আমি তোমাদের আল্লাহর কাছে সোপর্দ করছি। আল্লাহ তোমাদের সঙ্গী হবেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) জানতে চাইলেন: হে আল্লাহর রসূল (সা.) আপনার যাওয়ার সময় খুব নিকটে চলে এসেছে। আপনার ইন্তেকালের পর আপনাকে কে গোসল দেবে? রসূল (সা.) বললেন: আমার আহলে বায়াত (আমার পরিবারের সদস্যরা)। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ আবার জানতে চাইলেন: কে আপনাকে কাফন পরাবে? রসূল (সা.) বললেন: আমার আহলে বায়াত। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ আবার জানতে চাইলেন: কে আপনাকে কবরে নামাবে? রসূল (সা.) বললেন: আমার আহলে বায়াত। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ আবার জানতে চাইলেন: আপনার জানাজা কে পড়াবে? তখন রসূল (সা.)-এর চোখ বেয়ে বেদনার অশ্রু নেমে আসে। তিনি বললেন: তোমাদের নবীর জানাজা এমন হবে না যেমন তোমাদের হয়। যখন আমার গোসল হয়ে যাবে তখন তোমরা সবাই ঘর থেকে বের হয়ে যাবে। সবার আগে জিবরাইল আমার জানাজা পড়বে। তারপর মিকাঈল ও ই¯্রাফিল। ধারাবাহিকভাবে আরশের ফেরেশতারা এসে আমার জানাজা পড়বে। তারপর তোমাদের পুরুষ, নারী এবং শিশুরা আমার জন্য দোয়া ও সালাম পড়বে। অতপর তোমরা আমাকে আল¬াহর কাছে সোপর্দ করে দেবে।
১১ হিজরির ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার চাশতের নামাজের শেষ সময় বিশ্বনবী (সা.) হজরত আয়েশা (রা.)-এর হুজরায় তার কোলে মাথা রেখে
ওফাত করেন।

হজরত আবু বকর (রা.) বেরিয়ে এলে লোকেরা জানতে চাইলো: হে নবীজির বন্ধু! নবীজি কি ইন্তেকাল করেছেন? হজরত আবু বকর (রা.) বললেন: হ্যাঁ। তখন লোকেরা নবীজির ইন্তেকালের খবর দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করলো। তারপর সাহাবায়ে কেরাম হজরত আবু বকর (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন: হে নবীজির বন্ধু! নবীজির কি জানাজার নামাজ পড়া হবে? তিনি বললেন: হ্যাঁ। জিজ্ঞেসা করা হলো, কিভাবে? হজরত আবু বকর (রা.) বললেন: এভাবে যে, এক এক জামায়াত নবীজির ঘরে প্রবেশ করবে এবং জানাজা পড়ে বেরিয়ে আসবে। তারপর অন্য জামায়াত প্রবেশ করবে। সাহাবীরা হজরত আবু বকর (রা.)-কে জিজ্ঞেস করেন: নবীজিকে কি দাফন করা হবে? তিনি বললেন: হ্যাঁ। জিজ্ঞেসা করা হয়, কোথায়? তিনি বললেন: যেখানে আল্লাহতায়ালা নবীজির রূহ কবজ করেছেন সেখানেই। কেননা, আল্লাহতায়ালা নিশ্চয় নবীজিকে এমন স্থানে মৃত্যু দান করেছেন যে স্থানটি উত্তম ও পবিত্র। হজরত আবু বকর (রা.) নিজেই নবীজির আহলে বায়াতকে ডেকে গোসল দেয়ার নির্দেশ দেন। মঙ্গলবার তাকে গোসল দেয়া হয়। গোসল দেন হজরত আব্বাস (রা.), হজরত আলী (রা.), হজরত আব্বাস (রা.)-এর দুই ছেলে ফজল ও সাকাম, রসূল (সা.)-এর আজাদকৃত ক্রীতদাস সাকরাম, ওসামা বিন জায়েদ ও আউস ইবনে খাওলা (রা.)। গোসলের পর বিশ্বনবী (সা.)-কে তিনটি ইয়েমেনী সাদা কাপড়ে কাফন পরানো হয়। রসূল (সা.)-এর দেহ মোবারক রওজার পাশে রাখা হয়। তাবাকাতে ইবনে সা’দের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, হজরত আবু বকর ও ওমর (রা.) এক সঙ্গে নবীজি (সা.)-এর ঘরে উপস্থিত হন। নবীজির দেহ মোবারক সামনে রেখে নামাজ, সালাম ও দরূদ পেশ করেন। পেছনে সারিবদ্ধ সাহাবীরা ‘আমিন’, ‘আমিন’ বলেন।
প্রচলিত নিয়মে জামায়াত করে নবীজির জানাজার নামাজ পড়া হয়নি ১০ জন ১০ জন করে সাহাবায়ে কেরাম হুজরায় প্রবেশ করে পর্যায়ক্রমে জানাজার নামাজ আদায় করেন। নামাজে কেউ ইমাম ছিলেন না। সর্বপ্রথম বনু হাশিম গোত্রের সাহাবীরা, তারপর মুহাজির, অতঃপর আনসার, তারপর অন্যান্য পুরুষ সাহাবী, পরে মহিলা ও সবশেষে শিশুরা জানাজার নামাজ পড়ে। জানাজার নামাজ পড়তে পড়তে মঙ্গলবার সারা দিন অতিবাহিত হয়ে যায়। মঙ্গলবার দিবাগত রাতে রসূল (সা.)-কে হজরত আয়েশা (রা.)-এর হুজরায় দাফন করা হয়।

তিনটি কারণে মহানবী (সা.)-এর জানাজা ও দাফন বিলম্বিত হয়:

এক. তার ওফাতের ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছতে বিলম্ব হওয়া।
দুুুই. দাফনের স্থান নির্দিষ্ট না থাকা। মহানবী (সা.)-কে কোথায় দাফন করা হবে তা সাহাবায়ে কেরামের জানা ছিল না। ফলে তাদের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়। কেউ কেউ বলেন, জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হোক। কেউ কেউ বলেন, মসজিদে নববীতে দাফন করা হোক। আবার কেউ কেউ প্রস্তাব করেন হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর পাশে সমাহিত করা হোক। এ অবস্থায় হজরত আবু বকর (রা.) বলেন: রসূল (সা.) বলেছেন, নবীরা যেখানেই মৃত্যুবরণ করেন সেখানেই সমাহিত হন। অতঃপর হজরত আয়েশা (রা.)-এর হুজরায় যেখানে রসূল (সা.) ইন্তেকাল করেন সেখানে সমাহিত করার ব্যাপারে একমত হন।
তিন. খলিফা নির্বাচনে ঐকমত্যে পৌঁছতে বিলম্ব। মহানবী (সা.)-এর স্থানে কে রাষ্ট্রের খলিফা হবেন, এ নিয়ে আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে মতভেদ দেখা দিয়েছিল। পরবর্তী সময় হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর ব্যাপারে সবাই ঐকমত্যে পৌঁছলে মহানবী (সা.)-এর দাফনের কাজ সম্পন্ন করা হয়।

পঠিত : ৭৩ বার

ads

মন্তব্য: ০