Alapon

বিমান চালনা বিদ্যার জনক আব্বাস ইবনে ফিরনাসের কথা



বিমান চালনা বিদ্যার জনক আব্বাস ইবনে ফিরনাসের কথা

শহরজুড়ে ঘোষণা করা হলো যেন সবাই রাস্সাফা পাহাড়ের নিচে সমাবেত হয়। রাস্সাফা পাহাড়ে এমন কান্ড ঘটানো হবে যা সম্পর্কে মানুষ শুধু রুপকথার গল্পেই শুনতো। অনেক মানুষ এই ঘোষণা বিশ্বাস করতে প্রস্তুত ছিলো না। কিন্তু যখন মানুষরা শুনলো যে, বাদশাহ এবং বাদশাহর অনেক মন্ত্রীরাও এই ঘটনা দেখতে উপস্থিত থাকবে। তখন মানুষদের বিশ্বাস করতেই হলো। ঘটনাটা ছিলো - এক লোক রাফাস্সা পাহাড় থেকে লাফ দিয়ে আকাশে উড়বে। এরকম ঘটনা এর আগে কখনো দেখা ও শোনা যায় নি। নির্ধারিত সময়ে অনেক মানুষ পাহাড়ের নিচে জড়ো হয়ে গেল। বাদশাহ ইশারা করে এই কীর্তি শুরু করার আদেশ দেন। পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকা ৬৫ বছর বয়সী ব্যক্তি এই আদেশের অপেক্ষাই ছিলো। ঐ ব্যক্তি নিচে জড়ো হয় মানুষদের দিকে একবার তাকালেন। তারপর আকাশের দিকে একটি গভীর দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন এবং কিছুক্ষণ পর আকাশে লাফ দিলেন। এই ব্যক্তি কে ছিলেন? রাস্সাফা পাহাড় কোথায়? এই ঘটনাটি কোন শহর এবং কোন সময়ের? চলুন এ সম্পর্কে বিমান চালনা বিদ্যার জনক আব্বাস ইবনে ফিরনাসের কথায় জানা যাক।
ইউরোপে ইসলামের আগমণ তারিক বিন যিয়াদের দ্বারা ৭১১ সালে হয়। তারিক বিন যিয়াদ ও এর পরে আসা মুসলিম সেনাবাহিনী ৭২০ সাল নাগাদ আজকের স্পেন ও পর্তুগালের অধিকাংশ এলাকা জয় করে নেয়। তাও ৭৫৬ সালে আন্দালুস তথা স্পেন ও পর্তুগালে কেন্দ্রীয় উমাইয়া খিলাফাত প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর আন্দালুসে মুসলিমদের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। এর সাথে সাথে আন্দালুসে বিজ্ঞান, শিল্প এবং সভ্যতা চর্চার এমন এক যুগ শুরু হয় যাকে শুধু ইসলাম নয় বরং ইউরোপের স্বর্ণযুগও বলা হয়। ইউরোপে জ্ঞান বিজ্ঞানের এই বিপ্লবের কেন্দ্র ছিলো তৎকালীন উমাইয়া খিলাফাতের রাজধানী কর্ডোভা। ইসলামি স্বর্ণযুগে মুসলিমদের শহর বাগদাদ ও কর্ডোভা সারা পৃথিবীর জন্য জ্ঞানের মিনার ছিলো। যার তুলনা যদি আজকের সময়ের নিউইয়র্ক এবং লন্ডনের সাথে করা হয় তাহলে তা ভুল হবে না। ৮২২ সালে যখন উমাইয়া খলিফা দ্বিতীয় আব্দুর রহমান শাসক হন তখন তিনি বিখ্যাত ইরাকী সংগীতজ্ঞ জারিয়াবকে দ্বায়িত্ব বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের কর্ডোভায় একত্রিত করার। জারিয়াব একজন জ্ঞানী মানুষ ছিলেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে সংগীতসহ অন্যান্য শিল্পের চর্চা হতে থাকে। সেই সাথে তিনি জ্যোর্তিবিদ্যা, ইঞ্জিনিয়ারিং, বিজ্ঞানের অন্যান্য বিষয় চর্চার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করেন। প্রতিভার কদরকারী এই জায়গায় অগণিত জিনিয়াস বিজ্ঞানী তৈরি হয়। এদের মধ্যে একজন ছিলেন আব্বাস ইবনে ফিরনাসও (Abbas ibn Firnas) ছিলেন। আব্বাস ইবনে ফিরনাস নবম শতাব্দীর আন্দালুসের বিখ্যাত মুসলিম পলিমেথ (Polymath) ছিলেন। পলিমেথ বলতে এমন পন্ডিত কিংবা বিশেষজ্ঞদের বোঝায় যারা বিজ্ঞানের একাধিক বিষয়ের ওপর গভীর জ্ঞান রাখেন। আব্বাস ইবনে ফিরনাস বিজ্ঞান, ইঞ্জিনিয়ারিং, চিকিৎসা বিজ্ঞান, জ্যোর্তিবিদ্যা, সঙ্গীত, কাব্য রচনা, জ্যোতি শাস্ত্র এবং বিমানা চালনা বিদ্যার বিশেষজ্ঞ ছিলেন। আব্বাস ইবনে ফিরনাসের জন্ম আজকের স্পেনের শহর রোন্ডাতে (Ronda)। আব্বাস ইবনে ফিরনাস আফ্রিকার বারবার গোত্রের লোক ছিলেন। আব্বাস ইবনে ফিরনাসের পূর্ব পুরুষ তারিক বিন যিয়াদের সাথে স্পেনে এসেছিলো।

আব্বাস ইবনে ফিরনাস জ্ঞান অর্জনের জন্য বাগদাদের বিখ্যাত বাইতুল হিকমাহ (House Of Wisdom) বা জ্ঞানের গ্রহে গমন করেন। সেখানে তিনি বিজ্ঞান, নানা শিল্প এবং অন্যান্য বিষয়ে বিশদ জ্ঞান লাভ করেন। বাইতুল হিকমাহ তৎকালীন সময়ের প্রতিভাবান বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, ডাক্তার এবং নানা বিষয়ের পন্ডিতদের প্রাণকেন্দ্র ছিলো। আব্বাস ইবনে ফিরনাসের নাম তাঁর জ্ঞানের কারণে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছিলো। তাও তিনি আরো অধিক সুবিধা লাভের আশায় তৎকালীন বিশ্বের আরেক জ্ঞানের রাজধানী তাঁর নিজের দেশ উমাইয়া খিলাফাতের রাজধানী কর্ডোভায় চলে যান। এখানে তিনি জারিয়াবের তত্ত্বাবধানে অনেক ভালো ভাবে বৈজ্ঞানিক গবেষণা করার সুযোগ পান। একজন বিজ্ঞানী, দার্শনিক, আবিষ্কারক, কবি, সংগীতজ্ঞ হিসেবে চারিদিকে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর পান্ডিত্বের জন্য তাঁকে হাকিমুল আন্দালুস বলা হতো। জ্যোর্তিবিদ্যায় আব্বাস ইবনে ফিরনাস ইউরোপকে সিন্ধ হিন্দ জ্যোতির্বিদ্যা সারণীর সাথে পরিচয় করান। এই সারণীকে জ্যোর্তিবিদগণ চাঁদ সূর্য এবং অন্যান্য গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান নির্ণয়ের জন্য ব্যবহার করতো। এই সারণী কয়েক শতাব্দী যাবৎ ইউরোপের জ্যোর্তিবিদ্যা বিষয়ক বিভিন্ন কোর্সে পড়ানো হতো। আব্বাস ইবনে ফিরনাস বিজ্ঞানী হওয়ার সাথে সাথে ইঞ্জিনিয়ার বা প্রকৌশলীও ছিলেন। তিনি নানা বৈজ্ঞানিক নীতিকে কাজে লাগিয়ে অনেক নতুন যন্ত্র ও শিল্প কারখানায় ব্যবহারের জন্য নানা লাভজনক পদ্ধতিও উদ্ভাবন করেন। ইউরোপের প্রথম স্পিরিক্যাল এস্ট্রোলভও (Spherical Astrolabe) আব্বাস ইবনে ফিরনাস আবিষ্কার করেন। বালি এবং স্ফটিক তথা ক্রিস্টাল নিয়েও তিনি গবেষণা করেন। যার মাধ্যমে আব্বাস ইবনে ফিরনাস স্বচ্ছ কাঁচ তৈরির পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। যা আজও আন্দালুসিয়ান গ্লাস (Andalusian Glass) নামে পরিচিত। ক্রিস্টালের ওপর গবেষণা করার পর তিনি এমন এক কাঁচ উদ্ভাবন করেন যা গবেষণার কাজেও ব্যবহৃত হতো। আব্বাস ইবনে ফিরনাস ক্রিস্টাল কাটা এবং পলিশ করার পদ্ধতিও উদ্ভাবন করেন। এর আগে এই পদ্ধতি শুধু মিশরীয়রাই জানতো। আর আন্দালুস থেকে বিভিন্ন জিনিসপত্র এজন্য মিশর পাঠাতে হতো।
আব্বাস ইবনে ফিরনাস যন্ত্র প্রকৌশল বা মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর নীতি ব্যবহার করে পানির সাহায্যে চলমান একটি জলঘড়ি তৈরি করেন। যা দিন ও রাতের সঠিক সময় নির্দেশ করতো। আব্বাস ইবনে ফিরনাসের আরও একটি চমকপ্রদ আবিষ্কার হলো প্ল্যানটেরিয়াম (Planetarium)। এই যন্ত্রে মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং জ্যোর্তিবিদ্যার নীতি কাজে লাগিয়ে সূর্য, গ্রহ এবং উপগ্রহের ঘূর্ণন দেখানো হয়। যাকে একটি সৌর জগতের মডেল বলা যেতে পারে। এছাড়া এতে কৃত্রিম ভাবে বজ্রপাত দেখানো হতো। এটি তাঁর সময়ের এক রকমের থ্রীডি সিনেমাও ছিলো। এসব আবিষ্কার ছাড়াও ইবনে ফিরনাসের এমন এক কীর্তি রয়েছে যা দ্বারাই ইবনে ফিরনাসের প্রতিভা ও জ্ঞানের সম্পূর্ণ পরিচয় পাওয়া যায়। আপনারা জানেন যে, বিমান বা উড়ো জাহাজ বিংশ শতাব্দীর শুরুতে রাইট ভ্রাত্বদ্বয় আবিষ্কার করেছিলো এবং তারাই আকাশে উড়া প্রথম মানুষ। কিন্তু না। আপনারা হয়তো জেনে অবাক হবেন যে, আকাশে পাখির মতো উড়া প্রথম মানুষ ছিলেন আব্বাস ইবনে ফিরনাস। যিনি রাইট ভ্রাত্বদ্বয়ের ১০০০ হাজার বছর আগে আকাশে উড়েছিলেন। রাইট ভ্রাত্বদয়ের প্রথম উড়ান ছিলো মাত্র কয়েক সেকেন্ডের। অন্যদিকে ইবনে ফিরনাস কয়েক মিনিট যাবৎ আকাশে উড়তে থাকেন। রাইট ভ্রাত্বদয় যখন বিমান আবিষ্কার করেন ততদিনে ইঞ্জিন আবিষ্কার হওয়ার পর তা আরও উন্নত হয়ে গিয়েছিলো। আকাশে উড়ার জন্য যে শক্তি প্রয়োজন তা তারা ইঞ্জিন থেকেই পেতো। অন্যদিকে আব্বাস ইবনে ফিরনাসের এরকম কোন সুবিধা ছিল না। আব্বাস ইবনে ফিরনাসের উড়ার প্রক্রিয়া পুরোটাই ছিলো বাতাসের প্রবাহ এবং পাখির উড়ার প্রক্রিয়ার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই পদ্ধতিতে আজ থেকে ১২০০ বছর পূর্বে কোন মানুষের দ্বারা বাতাসের চেয়ে ভারী কোন যন্ত্রকে সফলতার সাথে উড়ানো প্রায় অসম্ভব ছিলো। আব্বাস ইবনে ফিরনাসের আকাশের উড়ার ইচ্ছে কেন হলো? মানব ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, আরও কয়েক হাজার পূর্ব থেকেই মানুষ আকাশে উড়ার স্বপ্ন দেখতো। গ্রীক, মিশরীয়, রোমান এবং ব্যবলনীয় সভ্যতার রুপকথায় উড়ন্ত মানুষের বর্ণনা পাওয়া যায়।

এসব রুপকথার ভিতর সবচেয়ে বিখ্যাত কাহিনী হলো ইকারুসের (Icarus)। ইকারুস গ্রীক রুপকথার এক চরিত্র। গ্রীক রুপকথা অনুযায়ী ইকারুসের বাবা অত্যন্ত দক্ষ এক কারুশিল্পী ছিলো। ইকারুসের বাবা দাইদালোসের ওপর ক্রীট (Crete) দ্বীপের রাজা প্রচন্ড রাগান্বিত হন এবং ইকারুসকে তাঁর পিতার সাথে বন্দী করেন এবং হত্যা করার আদেশ দেন। তখন ইকারুসের পিতা জেল থেকে পালানোর জন্য ইকরুসকে ডানা বানিয়ে দেন এবং নিজের জন্যও ডানা বানান। দাইদালোস কাঠের ওপর মোম দিয়ে পাখির পালক দিয়ে এই ডানা তৈরি করেছিলো। ইকারুসের বাবা দাইদালোস ইকারুসকে বেশী উপরে উড়তে নিষেধ করেন৷ কারণ বেশী উপরে উড়লে মোম গলে গিয়ে ডানা খুলে যাবে। এরপর ইকারুস যখন উড়তে শুরু করে তখন ইকারুস উড়ার আনন্দে তাঁর বাবার নিষেধের কথা ভুলে গিয়ে অনেক উপরে উড়তে থাকে। তখন সূর্যের তাপে মোম গলে গিয়ে ডানা খসে পড়ে এবং ইকারুস সমুদ্রে ডুবে মারা যায়।

ইংরেজি প্রবাদ "Flying too close to the sun" এই কাহিনী থেকে উদ্ভুত। যদি আমরা বাস্তব পৃথিবীতে কোন জিনিসকে উড়ানোর কথা বলি যা প্রাকৃতিকভাবে উড়ে না এর প্রথম নমুনা পাওয়া যায় চীনে। খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতকে চীনের দুই জন বিজ্ঞানী মোজী (Mozi) এবং লু বান (Lu Ban) ঘুড়ি আবিষ্কার করেন। এরপর ৮৫২ সালে কর্ডোভায় আরমান ফিরম্যান (Armen Firman) নামক এক ব্যক্তিদাবী করেন যে, তিনি বাতাসে উড়তে পারেন। আর তিনি তাঁর এই দাবি প্রমাণ করার জন্য কর্ডোভার মসজিদের মিনারে উঠে গেলেন। তিনি কাঠের সাথে রেশমি কাপড় এবং পাখির পালক মিলিয়ে ডানা তৈরি করেছিলেন। মিনারের নিচে অনেক মানুষ আরমান ফিরম্যানের এই কাজ দেখতে জড়ো হলো। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল যে, তিনি ডানাগুলোকে পাখির মতো ব্যবহার করে উড়তে পারবেন। তিনি মিনার থেকে লাফ দিলেন। লাফ দেওয়ার পর উড়ার পরিবর্তে নিচের দিকে পড়তে থাকেন। তাঁর ভাগ্য ভালো ছিলো যে, তিনি নিচে পড়ার আগে তাঁর রেশমী কাপড়ের ডানা বাতাসে ভর্তি হয়ে ফুলে উঠে। ফলে তাঁর নিচে পড়ার গতি কমে যায়।

তাঁর জীবন রক্ষা পায় এবং সামান্য কিছু আঘাত ছাড়া তাঁর আর তেমন কোন ক্ষতি হয় নি। আরমান ফিরম্যানের রেশমী কাপড়ের ডানা পৃথিবীর সর্বপ্রথম প্যারাস্যুট হিসেবে প্রমাণিত হয়। আরমান ফিরম্যানের এই কান্ড দেখতে জড়ো হওয়া মানুষদের মধ্যে আব্বাস ইবনে ফিরনাসও ছিলেন। তখন তাঁর বয়স ৪২ বছর ছিলো। ততদিনে তিনি তাঁর জ্ঞানের জন্য পুরো আন্দালুসে পরিচিতো এবং সবাই তাঁকে শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখতো। আরমান ফিরম্যানের আকাশে উড়ার এই ব্যর্থ চেষ্টা দেখে আব্বাস ইবনে ফিরনাসের মনেও আকাশে উড়ার ইচ্ছে প্রবল হয়। তিনি তখন একজন বিজ্ঞানী, আবিষ্কারক এবং প্রকৌশলী ছিলেন। তাই তিনি আকাশে উড়ার জন্য একটি যন্ত্র বানানোর গবেষণা করতে লাগলেন। আর এই গবেষণার জন্য তিনি তাঁর জীবনের পরবর্তী ২৩ বছর ব্যয় করেন। তাঁর এই গবেষণাই পরবর্তীতে বিমান চালনা বিদ্যার গবেষণার কাজে লাগে। আব্বাস ইবনে ফিরনাস বাতাসের গতি প্রবাহের নানা দিক গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করলেন। এছাড়া তিনি পাখির ডানাগুলোর সংযোগ, উড়ার সময় পাখির ডানাগুলোর অবস্থান, এবং পাখির ডানাগুলোর এঙ্গেলও পর্যবেক্ষণ করেন। এরপর তিনি ধীরে ধীরে এসব তথ্যের সাহায্যে তাঁর যন্ত্রের নকশাকে উন্নত থেকে উন্নততর করতে থাকেন। যখন একটি চূড়ান্ত নকশা প্রস্তুত হয়ে গেলো তখন এই নকশার বাস্তবায়নের জন্য তিনি বাঁশের টুকরোর সাহায্যে একটি ফ্রেম বা কাঠামো তৈরি করলেন। তারপর নকশা মোতাবেক এই কাঠামো রেশমি কাপড় দিয়ে ডাকেন এবং বিভিন্ন পাখির পালক যুক্ত করেন৷ এভাবে ইবনে ফিরনাসের উড়ান যন্ত্র বা ফ্লাইং মেশিন তৈরি হয়ে গেলো। যা বর্তমান সময়ের গ্লাইডারের মতো ছিলো। কিন্তু এর বিশেষত্ব ছিলো এই যন্ত্রের ডানার অবস্থান এবং কোণ পরিবর্তন করা যেতো। যা বর্তমান সময়ের গ্লাইডারে করা যায় না। তখন ইবনে ফিরনাসের বয়স প্রায় ৬৫ বছর ছিলো। ৮৭৫ সালে তিনি তাঁর আবিষ্কৃত এই উড়ান যন্ত্রের পরীক্ষা করার জন্য রাস্সাফা পাহাড়কে বেছে নেন।
রাস্সাফা পাহাড়ের বিশেষত্ব এই ছিলো যে, এই পাহাড়ের সাথে বাতাস বাঁধা প্রাপ্ত হয়ে একটি বিশেষ কোন উপরে উঠতো। যার ফলে নিচে পড়ন্ত কোন বস্তুকে উপরের দিকে উড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি এখান থেকে পাওয়া যেতো। নির্ধারিত দিনে কর্ডোভার শহরের প্রায় সকল মানুষ সেখানে উপস্থিত ছিলো এবং বাদশাহ ও তাঁর সভাসদরাও উপস্থিত ছিলো। আব্বাস ইবনে ফিরনাস সকলের সামনে পাহাড় থেকে লাফ দিলো। কিন্তু তিনি নিচে পড়ে যাওয়ার পরিবর্তে আকাশে উড়তে থাকেন৷ যাকে প্রকৌশল বিদ্যা বা ইঞ্জিনিয়ারিং এর ভাষায় সাসটেইন্ড ফ্লাইট (Sustained Flight) বলা হয়। ইতিহাসে সর্বপ্রথমবার কোন মানুষকে আকাশে উড়তে দেখা যায়। ঐতিহাসিক তথ্যানুযায়ী, ইবনে ফিরনাস আজকের ১০ মিনিটের মতো আকাশে উড়তে থাকেন৷ কিন্তু তিনি যখন ল্যান্ড করবেন তখন তাঁর নকশার কিছু ত্রুটির কারণে তিনি সঠিকভাবে ল্যান্ড করতে পারেন নি এবং এর ফলে তিনি সামান্য আঘাত প্রাপ্ত হন। আব্বাস ইবনে ফিরনাসের আকাশে উড্ডয়ন অতিক্রান্ত দুরত্ব এবং সময়ের হিসেবে রাইট ভ্রাত্বদ্বয়ের চেয়ে অনেক বেশী সফল ছিলো। ইবনে ফিরনাস এই ঘটনার পর আরও ১২ বছর জীবিত ছিলেন এবং এরপর তিনি তাঁর এই উড়ান যন্ত্রের নকশাকে আরও উন্নত করেন। ইবনে ফিরনাসের মতে, তাঁর প্রথম নকশায় পাখির লেজের মতো কোন অংশ ছিলো না। তাই তাঁর ল্যান্ডিং এ তিনি সামান্য আঘাত প্রাপ্ত হন। পরবর্তী নকশায় তিনি তাঁর এই ভুল সংশোধন করলেও তিনি পরবর্তীতে আর কখনো আকাশে উড়ার চেষ্টা করেন নি। হয়তো তিনি তাঁর বয়সের কারণে আর উড়ার চেষ্টা করেন নি। আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি না কেন তিনি আর উড়ার চেষ্টা করেন নি। তাঁর গবেষণা পরবর্তী সময়ের আকাশে উড়ার স্বপ্ন দেখা বিজ্ঞানীদের গবেষণার কাজকে সহজ করেছিলো। ইবনে ফিরনাসের মৃত্যুর পর একটা সময় পর্যন্ত ইবনে ফিরনাসের উড়ান যন্ত্র নিয়ে গবেষণা হয়। এরপর অনেক লম্বা সময় পর্যন্ত ইতিহাসে কোন মানুষের আকাশে উড়ার কথা পাওয়া যায় না। ১১ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডের ইলমার অফ মালিমসবোরিও (Eilmer of Malmesbury) ইবনে ফিরনাসের মতো ফ্লাইং মেশিন তৈরি করেছিলেন। ইলমারের উড়ান সফল হলে ল্যান্ডিংর ত্রুটির কারণে তাঁর পা ভেঙ্গে যায়। এরপর ১৭ শতাব্দীতে ওসমানী সুলতান চতুর্থ মুরাদের আমলে তুর্কী বিজ্ঞানী হেজারফেন আহমেদ জেলেবিও (Hezârfen Ahmed Çelebi) একটি ফ্লাইং মেশিন বানিয়ে বসফরাস পার হন। যদিও আধুনিক ঐতিহাসিকগণ হেজারফেন জেলেবির এই আকাশে উড়াকে অস্বীকার করেন। এছাড়া ইভলিয়া জেলেবির (Evliya Çelebi) গ্রন্থ ছাড়া এই ঘটনার উল্লেখ অন্য কোথাও পাওয়া যায় না।

যাই হোক ইবনে ফিরনাসের এই গবেষণাকে সামনে রেখে যদি গবেষণা চালিয়ে যাওয়া হতো এবং তাঁর আবিষ্কৃত ফ্লাইং মেশিনকে আরও উন্নত করা হতো। তাহলে হয়তো মানুষ আরও কয়েক শতাব্দী আগে আকাশে উড়তে পারতো। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, ৮৫২ সালে কর্ডোভার মসজিদ থেকে লাফ দেওয়া ব্যক্তি আরমান ফিরম্যান অন্য কেউ নন বরং তিনিই আব্বাস ইবনে ফিরনাস ছিলেন। বলা হয়ে থাকে আরমান ফিরম্যান আব্বাস ইবনে ফিরনাসের নামের ল্যাটিন সংস্করণ। যেমন ইবনে সিনাকে আবে সিনাও বলা হয়। অনেকটা সেরকম। এই দুই মতের মধ্যে কোনটি সঠিক তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। আধুনিক ঐতিহাসিকদের একাংশ বলেন, যদিও ইবনে ফিরনাসের সত্যিই ছিলো এবং অনেক কিছুর আবিষ্কারকও তিনি, কিন্তু তাঁর আকাশে উড়ার ঘটনাটা কাল্পনিক মনে হয়। ২০০৩ সালে আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অফ হাউস্টনের প্রফেসর লিনহার্ড আব্বাস ইবনে ফিরনাসের আকাশে উড়ার ঘটনাকে সত্য বলেছেন। আব্বাস ইবনে ফিরনাস ৮৮৭ সালে ৭৭ বছর বয়সে কর্ডোভায় মৃত্যু বরণ করেন এবং উনার সমাধিও কর্ডোভায় অবস্থিত। মানব জাতির অগ্রগতিতে ইবনে ফিরনাসের অবদানের জন্য পৃথিবীর কয়েকটি জায়গার নাম রাখা হয়েছে তাঁর নামে। বাগদাদের বিমান বন্দরের বাইরে ইবনে ফিরনাসের একটি মূর্তি রয়েছে। স্পেনের কর্ডোভায় কর্ডোভা নদীর ওপর নির্মিত ব্রিজের নাম ইবনে ফিরনাস ব্রিজ (Ibn Firnas Bridge)। এছাড়া আল বিরুনির মতই চাঁদের এক অংশের নাম ইবনে ফিরনাসের নামে রাখা হয়েছে। যাকে ইবনে ফিরনাস ক্রেটার (Ibn Firnas Crater) বলা হয়। বিখ্যাত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রোলস রয়সও ইবনে ফিরনাসকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য তাদের একটি গাড়ির মডেলের নাম রোলস রয়স গোস্ট ফিরনাস মোটিফ (Rolls-Royce Ghost Firrnas Motif) রাখে।
[সমাপ্ত]

তথ্যসূত্রঃ Abbas ibn Firnas - Wikipedia [English]
Abbas Ibn Firnas: the first human to fly
- TRT World
Abbas Ibn Firnas - Father of Aviation -
Muslim Heritage
Abbas ibn Firnas: The Great Arab
Aviation Pioneer, Scientist -
arabamerican.com
Abbas Ibn Firnas: The World's First
Pilot - Forgotten Islamic History
Abbas ibn Firnas - (Biography +
Contributions + Facts) -
science4fun.info
Abbas ibn Firnas: Father of the Flying
Machine - Muslim Ink
Abd al-Rahman II - Wikipedia
Icarus - Greek Mythology
Icarus - Wikipedia [English]
kite | aeronautics | Britannica
Eilmer of Malmesbury - Wikipedia
Evliya Çelebi - Wikipedia [English]
Hezârfen Ahmed Çelebi - Wikipedia
ABBAS IBN FIRNAS by John H.
Lienhard
Ibn Firnas (crater) - Wikipedia
Rolls-Royce Ghost Firnas Motif
collection announced - Motor1
লেখিকাঃ জান্নাত খাতুন।
আন্তর্জাতিক বার্তা সম্পাদক, হাভার টার্ক।

পঠিত : ১০১৬ বার

মন্তব্য: ০