Alapon

এক চিলতে রোদ্দুর...



এখন চেরি ব্লসম এর সময়। চারিদিক চেরি গাছে পরিপূর্ণ। পুরো রাস্তা জুড়ে রয়েছে পাতাবিহীন চেরি গাছ। আমার এই জিনিসটা খুব অবাক লাগে আবার ভালোও লাগে, পুরো গাছে একটা পাতাও নেই ! শুধু ফুল আর ফুল। গোলাপি, সাদা ফুলে ফুলে প্রকৃতি যেন নিজের রুপ লাবন্যের জলসা সাজিয়েছে।

আমি হিরোসাকি ক্যাস্টেল পার্কের রাস্তা ধরে এগোচ্ছি, আমার গন্তব্য লেকের কাছের বেঞ্চ। জাপানে সেটেল হওয়ার পিছনে চেরি ব্লসম এর অনেক বড় ভূমিকা রয়েছে । কেন জানি আগের থেকেই চেরি ব্লসম এর প্রতি একটা আলাদা ভালোলাগা কাজ করতো । তাইতো যখন পড়ালেখা করে বাইরে আসার সুযোগ হলো আমি জাপান কেই বেছে নিলাম।
জাপান অন্যতম ব্যস্ত নগরী , সবাই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজের পিছনে ছুটে। এত পরিশ্রমী জাতি হয়তো দুনিয়াতে কমই আছে ‌। এত ব্যস্ততার ভিড়ে নিজেকে যান্ত্রিক মনে হয়। তবে শীতকালের ব্যাপারটাই আলাদা! শীতকালে কেমন যেন সব কিছুর গতি একটু হলেও কমে যায় । প্রকৃতি তার অপার সৌন্দর্য মেলে ধরে। মানুষের কর্ম ক্ষেত্রে কিছুটা অসুবিধা হলেও আমার কাছে দারুন লাগে!

বেঞ্চে বসে লেক দেখার অনুভূতিটাই অন্য রকম । খুব আশ্চর্যজনক হলেও জাপানে পাঁচ বছর থাকাকালীন আমি একবারও নৌকায় উঠে লেক ঘুরে বেড়াই নি!

হ্যাঁ কিছুটা অদ্ভুত আমি, হয়তোবা খুবই সাধারণ! এমন কেউ যে নিজেকেই কখনো গুরুত্ব দেয়নি মানুষ তো দূরের কথা! আমার ব্যাগে আজকাল পয়জনের শিশি থাকে। হতে পারে আজকেই এই মনোরম পরিবেশে নিজের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করব!
আমি কেন এমন বলছি?

এর কারণ অনেকগুলো, কিন্তু হয়তো যুক্তিযুক্ত নয় কিন্তু তারপরেও!

বাংলাদেশে থাকাকালীন আমার বন্ধু বান্ধবদের মধ্যে কেনো জানি নিজেকে অবহেলিত মনে হতো, জানিনা ঠিক!! ওরা যে আমায় খাতির যত্ন করত না তা নয় কিন্তু তারপরেও কেমন যেন একটা অনুভূতি! হয়তোবা ওদের মধ্যে মিল টা বেশি ছিল আর আমার সাথে কম!
মাকে সব সময় দেখেছি সবথেকে বেশি আমার ছোট ভাইকে গুরুত্ব দিতে। মায়ের যেন একটা আলাদা দুনিয়া আছে আমার ছোট ভাইয়ের মধ্যে। ঝগড়া হোক খাওয়া-দাওয়া হোক, আমার মা আমার ছোট ভাইকেই দেখে। এইতো ছয় মাস আগে যখন দেশে গেলাম ছোট ভাই আমাকে রাগ করে ঘর থেকে বের করে দিতে চাইল। মা ওকে না ধমক দিয়ে আমাকে বলল - তুই চুপ থাকতে পারিস না? জানিস তো ওর রাগ বেশি!

খুব খারাপ লাগে এই জিনিসগুলো। এমন না যে আমার মা আমাকে ভালোবাসেন না! ভীষণ আদর করে আমাকে। আমি জাপানের ফেরত আসতে নিলে কান্না করে বুক ভাসায় কিন্তু তারপরেও!

জাপানে থাকাকালীন বেশ কিছু মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছে । কেমন যেন দুমুখো স্বভাবের জাতি সবখানেই আছে। ধোকা ধারি , বিশ্বাসঘাতকতা, বদনাম, ঠেলে নিচে ফেলে দেওয়ার মনোভাব এমন মানুষ কম নয় তবে এর মধ্যে যে ভালো কাউকে পাইনি তা নায় , কিন্তু তার পরেও!

সম্পর্কটা আমার দু'বছরের মাথায় ভেঙে গেল। ছেলেটা ড্রাগ এডিক্টেড ছিলো তার উপর চরিত্রহীন! আল্লাহ আমাকে বড় বাঁচা বাঁচিয়ে দিয়েছে কিন্তু তার পরেও!

এখন যে পোস্টে চাকরি করছি তাতে আশেপাশে মানুষের হিংসা তে পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে। বস একটু বেশিই বিশ্বাস করে বলে মানুষ নানাভাবে তার চোখে আমাকে খারাপ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে । দিনের পর দিন মানুষিক অত্যাচার করছে। তবুও আমার উন্নতি থেমে নেই । প্রমোশন হয়েছে , ভালো সেলারি পাচ্ছি, জীবনটা ভালোই কাটছে আলহামদুলিল্লাহ, কিন্তু তার পরেও!

তার পরেও যেন কেমন একটা খালি খালি অনুভূতি। মনে হয় আমার জীবনে কি যেন নেই! কি যেন হলে জীবনটা আরো বেশি সুন্দর হতো। আমার জীবনটা যে খারাপ তা নয় কিন্তু এটাকে পারফেক্ট বলা যায় কি?? জানিনা ! তবে কেন জানি এই অদ্ভুত সুন্দর আর বিচিত্র দুনিয়ায় থাকার আসাটাই রোজ ক্ষীণ হয়ে আসছে। কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও হঠাৎ করে কয়েক সেকেন্ডের ফুরসতে হুট করে মাথায় সবকিছু ছেড়ে চলে যাওয়ার চিন্তা মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। খুব মজা করে কোন ছবি দেখতে দেখতেই কেন যেন মনে হয় আমার জীবনের অর্থ আছে কি?

খুব মনোরম সুন্দর পরিবেশে সময় কাটাতে কাটাতেই মনে হয় একটু পরেই তো এই অনুভূতিটা শেষ হয়ে যাবে, তারপর আবার সেই একঘেয়ে জীবন! কেন কাটাচ্ছি এরকম জীবন?

আমি সত্যিই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানিনা! খুব কষ্ট হয় আমার, কেন জানি নিজের অনুভূতি গুলোকে আমি বুঝতে পারিনা! বুঝতে পারলে হয়তো এই জীবনের খুব ভালো একটা পরিবর্তন আনতে পারতাম। হয়তোবা আনন্দের মধ্যে হঠাৎ করে বিষন্নতায় ঢুকে পরতাম না।

হঠাৎ নৌকা দুলানোর শব্দে নিজের চিন্তায় ভাটা পড়ল। বৃদ্ধ দম্পতি একজন আরেকজনের হাত ধরে আছে শক্ত করে। দুজনেই লাইফ জ্যাকেট পরা , তারা বোটে উঠতে ভয় পাচ্ছে সম্ভবত। নৌকার চালক খুব যত্ন করে তাদের নিয়ে বসালেন। বৃদ্ধ দম্পতির চোখে অপার আনন্দের ছোঁয়া।

মনে হচ্ছিল কোনরকম ঝড়ঝাপটা ছাড়া খুব আনন্দে কেটেছে তাদের পুরোটা জীবন। এই বৃদ্ধ বয়সেও দুজনের মধ্যে কি মিল, কি প্রেমময় সম্পর্ক ! একজন আরেকজনের হাতও ছাড়ছে না।

ঠিক সে সময় একটা মহিলার চেঁচানো আওয়াজ কানের এলো - বন্ধ করো এসব নাটক। তোমাদের ছেলের অফিস থেকে ফেরার সময় হয়ে যাচ্ছে , আমি বেশিক্ষণ এখানে থাকতে পারবো না।

বৃদ্ধ দম্পতি একে অপরের দিকে হতাশ ভঙ্গিতে তাকালো কিন্তু নৌকা থেকে নামছে না। তাদের ছেলের বউ রাগে ফস করে উঠলো - ঠিক আছে বসে থাকো ! এখন বাসায় হেটে হেটে এসো!! আমি চললাম।

মহিলাটি চলে গেল। বৃদ্ধাটিকে খুব হতাশ দেখালো কিন্তু বৃদ্ধটি তার হাতে হাত রেখে ভরসা দিল । এবার দুজনে মৃদু হাসলো। তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, নৌকায় ঘোরার এ সুযোগটা তারা হাতছাড়া করবে না।

আমার পাশের বেঞ্চে সোয়েটার হাতে বসে আছে এক বৃদ্ধা । গত বছরের এই সময়টা তেও আমার সাথে দেখা হয়েছিল তার। ছেলে হারানোর শোকে তিনি কাতর‌। ছেলে বেঁচে থাকা অবস্থায় রোজ হুইলচেয়ারে করে তাকে এ পার্কে ঘুরতে নিয়ে আসতেন। দু'বছর যাবৎ তিনি একাই বসে থাকেন আর ছেলের স্মৃতিচারণ করেন। কি অদ্ভুত না! ওই বৃদ্ধ দম্পতির জীবনে ভালোবাসার কমতি নেই কিন্তু হয়তো নিজের ছেলের ঘরে তারা দিনের পর দিন নির্যাতিত হয়ে যাচ্ছেন , তার পরেও জীবনের শেষ বয়সটা হাসিমুখে পার করার আশা রাখছেন। এদিকে আরেকজন নিজের সন্তানকে হারিয়েও রোজ অন্যদের খুশি দেখে নিজে কে বাঁচিয়ে রাখার রসদ যোগাচ্ছেন।

আমার ব্যাগে রাখা পয়জনের শিশিটার দিকে একবার তাকালাম। তারপর সে বৃদ্ধার কাছে গিয়ে বসলাম।
- নৌকায় উঠবেন?
বৃদ্ধাটি অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
আমি আবার বললাম - চলুন না নৌকায় কিছুক্ষণ ঘুরে আসি ! আপনার ভালো লাগবে।
আমি আমার হাত বাড়িয়ে দিলাম তিনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে আমার হাত ধরলেন।
আমি সে বৃদ্ধাকে নিয়ে নৌকায় উঠে বসলাম। শীতকালের ঝিরঝিরে বাতাস গায়ে লাগছে। চেরি ফুলের সৌন্দর্য পানিতে আরো সুন্দর করে ফুটে উঠেছে। হঠাৎ কেমন উষ্ণতা অনুভব হল। বৃদ্ধাটি তার হাতে রাখা সোয়েটার আমার কাঁধে ঝুলিয়ে দিলেন। তার চোখে এক অন্যরকম আনন্দ ঝিলমিল করছে। আমি মৃদু হেসে তার দিকে তাকালাম।

আমাদের নৌকা লেকে ঘুরে বেড়াচ্ছে।আমি ব্যাগ থেকে পয়জনে শিশিটি বের করে আস্তে করে পানিতে ছেড়ে দিলাম। মনে হয় না এটার আর কোন দরকার আছে! মানুষের জীবন কখনো পারফেক্ট হয় না। প্রত্যেকটা মানুষের জীবনে কিছুটা ভালোলাগা আর কিছুটা খারাপ লাগা থাকে। প্রত্যেকটা মানুষেরই জীবনে কিছু দিক খুব সুখের হয় আবার কিছু দিক দুঃখের, না পাওয়ার হয়। পারফেক্ট লাইফ বলতে কিছু নেই। কারণ পারফেক্ট লাইফ হলে হয়তো মানুষ বেশি হতাশায় ভুগত। জীবনে কষ্ট আর না পাওয়া না থাকলে কেউ আনন্দ, অনেক কষ্টের পর কিছু অর্জন করার খুশিটা মন থেকে উপলব্ধি করতে পারত না। খুব বেশী আবেগে আপ্লুত হয়ে চোখের পানি ফেলতে পারতো না। চোখের পানি বিসর্জন দেওয়ার মধ্যে যে অন্যরকম একটা শান্তি আছে তার মর্মটা আমি আজকে বুঝতে পারছি।

সত্যিই মানুষের জীবন পরিবর্তন হতে বেশি কিছু লাগে না। এক চিলতে রোদ যেমন বরফের উপর পড়লে তা ঝিকমিক করে ওঠে, আজকের এই দুটি ঘটনা যেন এক চিলতে রোদ্দুরের মতো আমার জীবন টাকে আলোকিত করে তুলল। হয়তো আমার জীবনে না পাওয়ার জায়গা অনেক আছে কিন্তু আল্লাহ আমাকে বেঁচে থাকার মত অনেক কিছু দিয়েছেন যেটা হয়তো অনেক মানুষের কাছে নেই! দুনিয়াতে খুব কম অর্জন নিয়ে হাসিমুখে যারা বেঁচে থাকতে জানে তারাই সবচেয়ে সুখী।

আমি নিজের অজান্তেই কেমন শান্তি বোধ করছি। পানিতে নিজের হাত ডুবিয়ে দিলাম, ঠান্ডায় যেন হাত জমে যাচ্ছে তার পরেও বের করতে ইচ্ছা করছে না! সত্যিই আজকে মানুষের জীবন আর সুখের সংজ্ঞাটা প্রকৃতপক্ষে অনুধাবন করতে পেরেছি আলহামদুলিল্লাহ!

- অরিন খান

পঠিত : ৫৯ বার

ads

মন্তব্য: ০