Alapon

খলিফা হারুনুর রশিদের শাসনকাল এবং কিছু কথা...



খলিফা হারুনর রশীদ। স্বর্ণাক্ষরে লিখা একটি নাম। আব্বাসী খিলাফতের ৫ম খলিফা।
খলিফা হারুনুর রশীদ বিখ্যাত আরব্য রজনীর প্রধান চরিত্র। যাতে বেশিরভাগই মুখরোচক ঘটনাবলির সমাবেশ।তিনি ৭৬৬ খ্রীস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। এবং উনার শাসনকাল ছিলো ৭৮৬-৮০৯ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত।

তিনি একাধারে সমরনায়ক, একজন ইতিহাসবেত্তা, অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ এবং বিভিন্ন গুণে গুণান্বিত ছিলেন।

খলিফা হারুনুর রশীদ ছিলেন আব্বাসী খিলাফতের ক্ষমতার শিখর বিশেষ। উনার শাসনামলে বাগদাদ ও ইসলামী সাম্রাজ্যের অন্যান্য নগরে এক বিরাট সাংস্কৃতিক রেনেসাঁর প্রারম্ভ ধরা হয়। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষকতা খলিফ হারুনুর রশীদ করতেনই, সেই সাথে ফিকহ অধ্যয়ন ও চর্চাকে তিনি উৎসাহিত করতেন। হাদিসের সংরক্ষণ এবং সংকলন করতেও তিনি উৎসাহিত করতেন। বলা চলে, উনার উদ্দেশ্যই ছিলো ইসলামী আইন বা শরীয়াহ এর একটি সুসংহত বিধিকোষ রচনায় সহায়তা করা।

খলিফা হারুনুর রশীদ এর শৈশব এবং কৈশোরের বেশিরভাগ সময় কেটেছিলো কোরান এবং হাদিসের অধ্যয়নে। এর পাশাপাশি অন্যান্য বিষয়েও উনার উচ্চতর দক্ষতা ছিলো। ইয়াহয়া ইবনে খালিদকে হারুনুর রশীদ এবং তার ভাই আল হাদির জন্য শিক্ষক হিসেবে নির্ধারণ করেন উনাদের মাতা।

উনাদের বাগদাদে দরবারে লালন-পালন করা হয় এবং সেখানেই কোরান, হাদিস, কবিতা, সঙ্গীত, প্রাথমিক ইসলামিক ইতিহাস এবং আইনী অনুশীলনে শিক্ষিত হন। খলিফা হারুনর রশিদের মাতার নাম ছিলো খায়জরান। খলিফা হারুনর রশীদ ক্ষমতায় আসীন হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি সচেতন এবং সুচতুর সিদ্ধান্তের মাধ্যমে উনার খলিফা হওয়ার পথ সুগম করেন। তিনি বেশ ক্ষমতাবান ছিলেন।

হারুনর রশিদের মাতা খায়জরান উনার সাড়ে ছয় কোটি দিরহাম মূল্যের সম্পদ গরীব ও দীন-দুঃখীদের মধ্যে বিলিয়ে দেন। হজ্বে থাকার সময়ও উনি প্রচুর অর্থ নানা কল্যান প্রকল্পে ব্যয় করেন।

৭৮০ এবং ৭৮২ সালে হারুন বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযানের নামমাত্র নেতা ছিলেন, যদিও সামরিক সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে তার সাথে থাকা অভিজ্ঞ সেনাপতিদের দ্বারা নেওয়া হয়েছিল। তাও উনার বুদ্ধিভিত্তিক পরামর্শের কারণে ৭৮২ সালের অভিযান কনস্টান্টিনোপলের বিপরীতে বসপোরাসে পৌঁছেছিল এবং যুদ্ধ মুসলমানদের অনুকূল শর্তে শান্তির মাধ্যমে সমাপ্ত হয়েছিল। এই সাফল্যের জন্য হারুন "সঠিক পথ অনুসরণকারী" তথা "আল-রশিদ" উপাধি পান।

হারুনুর রশীদের জীবনি থেকে বেশ ভালো ভালো শিক্ষনীয় ঘটনা পাওয়া যায়।
হারুনুর রশীদ উনার স্ত্রী জোবাইদার সাথে বাগানে প্রায়ই হাটতে যেতেন। একদা হাটতে বের হয়ে জোবাইদাকে পেছনে ফেলে উনি দ্রুত সামনে এগিয়ে গেলেন। এবং পথেই দেখা হলো বেহলুল নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে, যে ছিলো সাধু।

তো তিনি দেখতে পেলেন বেহলুল বালিতে গর্ত খুঁড়ে প্রাসাদের মতো বানাচ্ছে। তো হারুনুর রশীদ জিজ্ঞেস করলেনঃ বেহলুল! তুমি কি করছো?!

প্রতিউত্তরে বেহলুল বললোঃ আমি বালি দিয়ে এই প্রাসাদটি বানাচ্ছি, যদি আপনি এই প্রাসাদটি কিনেন, আমি আপনার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করবো। আল্লাহ যেনো আপনাকে জান্নাত দেন। হারুনুর রশীদ বললেন, এটা কত দিয়ে বিক্রি করবে? বেহলুল বললো ১ দিরহাম দিয়ে বিক্রি করবো। হারুনুর রশিদ একবার বালির প্রাসাদের দিকে তাকালেম একবার বেহলুলের দিকে তাকালেন। তারপর এক দিরহামের কথা চিন্তা করলেন। এরপর বললেন, তুমি পাগল। তাকে আর কোন গুরুত্ব না দিয়ে হারুনুর রশীদ সামনে অগ্রসর হলেন। এরপর জোবাইদা এসে পৌছুলো বেহলুলের কাছে এবং জিজ্ঞেস করলো সে কি করছে।

সে উত্তর দিলোঃ আমি বালি দিয়ে এ ঘরটি তৈরী করছি৷ আপনি কি এ ঘরটি কিনতে চান?!
জোবাইদা বললেন, যদি আমি এ ঘরটি কিনি, তাহলে তা থেকে আমি কি পাবো?!
প্রতিউত্তরে বেহলুল বললো, যদি আপনি এ ঘরটি কিনেন, আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করবো যেনো আপনাকে জান্নাত দেয়।
-দাম কত?!
-এক দিরহাম
তো জোবাইদা এক দিরহাম বের করে দিলেন বেহলুলকে। জোবাইদা বেহলুলকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি তাকে এক দিরহাম দিয়েই সামনে অগ্রসর হলেন।

সে রাতেই হারুনুর রশিদ খুব সুন্দর একটি স্বপ্ন দেখেন। তিনি নিজেকে খুজে পান খুব সুন্দর একটি বাগানের মাঝে। এবং সে বাগানে দেখতে পান একটি খুব সুন্দর বাড়ি। আরো দেখতে পান সে বাড়ির দরজায় জোবায়দা দাঁড়ানো।

তো রক্ষিকে হারুনুর রশিদ বললেন, এটা আমার স্ত্রী জোবাইদার ঘর। এ ঘরে আমি প্রবেশ করতে চাই। রক্ষী প্রতিউত্তরে বললোঃ এ ঘরে শুধু তারাই ঢুকতে পারবে, যাদের নাম এই দরজায় লিখা আছে। আর দরজায় নাম লিখা আছে জোবাইদা তথা আপনার স্ত্রীর। উনারই দরজা খোলা লাগবে।

এরপরের দিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেই হারুনুর রশিদ বেহলুলের কাছে ছুটে গেলেন, গিয়ে দেখতে পেলেন বেহলুল বালি দিয়ে ঘর বানাচ্ছে।
তো হারুনুর রশীদ জিজ্ঞেস করলো, তুমি কি করছো?
বেহলুল বললঃ আমি বালি দিয়ে ঘর বানাচ্ছি। আপনি কি এটা কিনতে চান?
হারুনুর রশীদ বললেনঃ হ্যাঁ। এবং জিজ্ঞেস করলেন যদি এ ঘরটি আমি কিনি, এর বিনিময়ে কি পাবো আমি?
বেহলুল বললোঃ আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করবো আল্লাহ যেনো আপনাকে জান্নাত দেন।
হারুনুর রশিদ দাম জানতে চাইলেন। বেহলুল দাম হিসেবে বললোঃ আপনার পুরো রাজত্ব।
হারুনুর রশীদ জিজ্ঞেস করলেনঃ গতকাল এটি এক দিরহাম ছিলো, এখন পুরো রাজত্ব কেনো?!
বেহলুল বললোঃ গতকাল এটি গায়েব ছিলো, আজ সব কিছু আপনার জানা।
অর্থাৎ এখানে গায়েবের উপর ঈমান আনার বিষয়ে বুঝানো হয়েছে। আল্লাহকে না দেখেই আল্লাহর উপর ঈমান আনা। জান্নাত জাহান্নামের উপর ইমান আনা।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যারা ইয়াতিমের হক আত্মসাৎ করে, ইহজীবনে পেটে আগুনের অনুভুতি সে অনুভব করবেনা। পরকালের শুরুতেই পেটে আগুনের ঝলক তার অনুভুত হবে।
তাই না দেখেই বিশ্বাস করবে যে, তার জন্য রয়েছে পুরষ্কার। আর যে দুনিয়াতে ধন দৌলত যা আছে সব কিছুর বিনিময়েও যদি ঈমানের দৌলত পেতে চায়, পরকালে সেটি আর সম্ভম নয়।
Aal-e-Imran 3:91
إِنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُواۡ وَمَاتُواۡ وَهُمْ كُفَّارٌ فَلَن يُقْبَلَ مِنْ أَحَدِهِم مِّلْءُ ٱلْأَرْضِ ذَهَبًا وَلَوِ ٱفْتَدَىٰ بِهِۧٓۗ أُوۡلَٰٓئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ وَمَا لَهُم مِّن نَّٰصِرِينَ
Aal-e-Imran 3:92
لَن تَنَالُوا۟ ٱلْبِرَّ حَتَّىٰ تُنفِقُوا۟ مِمَّا تُحِبُّونَۚ وَمَا تُنفِقُوا۟ مِن شَىْءٍ فَإِنَّ ٱللَّهَ بِهِۦ عَلِيمٌ
যদি সারা পৃথিবী পরিমাণ স্বর্ণও তার পরিবর্তে দেয়া হয়, তবুও যারা কাফের হয়েছে এবং কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে তাদের তওবা কবুল করা হবে না। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব! পক্ষান্তরে তাদের কোনই সাহায্যকারী নেই।

কস্মিণকালেও কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যদি তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে তোমরা ব্যয় না কর। আর তোমরা যদি কিছু ব্যয় করবে আল্লাহ তা জানেন। খলিফা হারুনুর রশীদ সামরিক এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদারের পাশাপাশি জ্ঞান-বিজ্ঞান, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সর্বক্ষেত্রেই উন্নতি করেছেন উনার শাসনামলে। বিশেষত বায়তুল হিকমাহ প্রতিষ্ঠার কারণেও তিনি আলাদাভাবে বরিত হয়ে আছেন ইতিহাসের পাতায়। খলিফা হারুনুর রশিদ তাঁর শাসনামলে ইরাকের বাগদাদে বাইতুল হিকমাহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

বাইতুল হিকমাহ ছিলো একাধারে গ্রন্থাগার, অনুবাদকেন্দ্র এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যা সমকালীন বিশ্বে অভূতপূর্ব খ্যাতি অর্জন করেছিল। ইসলামি স্বর্ণযুগের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ইতিহাসে আজও জ্বলজ্বল করছে বাইতুল হিকমাহর নাম ও অবদান। খলিফা হারুনুর রশিদ তাঁর শাসনামলে ইরাকের বাগদাদে এটা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

তৎকালীন সময়ে গণিত, জোতির্বিদ্যা, চিকিৎসাবিজ্ঞান, রসায়ন, প্রাণিবিদ্যা, ভূগোল, মানচিত্র অঙ্কনবিদ্যা থেকে শুরু করে সমকালের প্রতিটা বিষয়ের ওপরই চর্চা হতো বাইতুল হিকমাহতে। একই সঙ্গে নানা ভাষায় রচিত গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বইয়ের আরবি অনুবাদও করা হতো এখানে।

দেশ-বিদেশের জ্ঞানপিপাসুরা এখানে এসে হাজির হতেন জ্ঞানার্জনের জন্য। চলতো বিভিন্ন রকমের গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরিক্ষা। যার ফলে আবিষ্কারও হতো অনেক কিছু। গণিতবিদ্যার অভূতপূর্ব কল্যাণসাধন, আলোকবিজ্ঞানের নতুন নতুন ধারার তৈরি এখান থেকেই হয়েছে।

বলা হয়ে থাকে বাগদাদের এ গবেষণাগার থেকেই পৃথিবীর সর্বপ্রাচীন প্রোগ্রামিং মেশিনের নমুনা তৈরি হয়েছিল।

চোখের রোগ নিয়ে বাইতুল হিকমাহর গবেষকেরা গুরুত্বপূর্ণ কাজ রেখে গেছেন। অস্ত্রোপচার ও রোগসংক্রমণ বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা ছিলো বেশ অনেক। পৃথিবীর প্রথম বিস্তৃত মানচিত্র তৈরি হয় বাইতুল হিকমায়। বাদশাহ হারুনুর রশিদ এ গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করে গেলেও এর চূড়ান্ত উৎকর্ষ সাধিত হয় তাঁর পুত্র আল-মামুনের শাসনামলে। প্রায় সাড়ে চারশত বছর সমকালীন দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ গবেষণাগার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে বাইতুল হিকমাহ অনন্য সব গবেষণা ও আবিষ্কার উপহার দেয় পৃথিবীকে।

১২৫৮ সালে বর্বর হালাকু খান বাগদাদ অবরোধ করে আব্বাসীয় খেলাফতের পতন ঘটায় এবং সেই সঙ্গে ধ্বংস করে জ্ঞান-বিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠ নগরী বাগদাদকে। ধ্বংস করে বায়তুল হিকমাহসহ অসংখ্য গবেষণাগার ও লাইব্রেরি।

ইতিহাসবিদরা বলেন, বাগদাদের বিভিন্ন লাইব্রেরি ও বাইতুল হিকমাহয় থাকা কয়েক লাখ বই হালাকু খানের বাহিনী আগুনে জ্বালিয়ে দেয়। আর বাকি সব বই ফেলে দেয় দজলা ও ফোরাতের জলে। যার ক্ষতি অপূরণীয়।

বাইতুল হিকমাহ কেবল গবেষণাগারই ছিল না, ছিল মুসলিম সভ্যতার প্রধান জ্ঞানকেন্দ্র। ইতিপূর্বে পৃথিবীর কোনো সভ্যতাই এমন জ্ঞানকেন্দ্রের নজির দেখাতে পারেনি। কিন্তু হালাকু খানের হাতে নির্মমভাবে তা ধ্বংস হবার পর আজ অব্দি এমন জ্ঞানকেন্দ্র মুসলিম সভ্যতা ওভাবে আর দাঁড় করাতে পারেনি। গত কয়েক শতাব্দী ধরে তো নেতৃত্ব হারাবার পাশাপাশি জাগতিক ও মানবিক জ্ঞানের চর্চাও অনেকটাই কমে গেছে মুসলমানদের।

প্রায় ২৩ বছর নিষ্ঠা ও দাপটের সঙ্গে শাসনকার্য পরিচালনা করে ২৪ মার্চ ৮০৯ খ্রিষ্টাব্দে তুস নগরীতে খলিফা হারুনুর রশীদ ইন্তেকাল করেন। আল্লাহ উনাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুক।

তিনি ছিলেন জ্ঞান বিজ্ঞানের আধার। বলা যায় ইসলামী সাংস্কৃতিক রেনেঁসার জনক। এ মহান পুরুষকে মুসলিম স্বর্ণযুগের অন্যতম হিসেবে সব সময়েই স্বরণ করা হবে।

- মোরসালিন ওসামা

পঠিত : ৭৯ বার

ads

মন্তব্য: ০