Alapon

আল্লাহর উপর ভরসা



ফূলটাইম চাকরি শুরু করি ১৯৯৯ ইং সন থেকে। বেতন ৬ হাজার টাকা, ছয় মাস পর ৮ হাজার হয়। ১ বছরের দিকে আরেকটা চাকরি হয়। বেতন এক ধাক্কায় সোজা ২২ হাজার টাকা। কিন্তু একটা অদ্ভুত অনুভূতি আল্লাহ্‌ দিলেন আমার ভেতর। তখন আমি মাত্র ১ বছরের অভিজ্ঞ, তার উপর এমন প্রোফেশনে ছিলাম যা তখন বাংলাদেশেই একদম নতুন। তাতেই ৮ হতে সোজা ২২ হাজার হবার প্রশ্নই আসে না!

আমার চিন্তায় আসে যে, ঠিক যেই মাসে আমি এই চাকরি পাই, তার আগের মাসেই আব্বুর চাকরি চলে যায়। আমার অনুভূতি হয় যে, নতুন একটা লাইনে মাত্র ১ বছরের অভিজ্ঞ হওয়া স্বত্বেও ৮ হাজার থেকে ২২ হাজার টাকার বেতন পাবার যোগ্যতা আসলে আমার নেই। বরং পরিবারের একটা ইনকাম সোর্স আপাতত বন্ধ হয়েছে বলেই আল্লাহ্‌ আমার মাধ্যমে সেই কমতি কিছুটা পূরণ করাবার জন্যই হঠাৎ এমন বেতনে বৃদ্ধি করলেন।

আর এই অনুভূতি আসার সাথে সাথে প্রথম মাস থেকেই সামান্য কিছু হাতখরচ রেখে বাকি টাকা আম্মিকে দিয়ে দিতাম। এভাবে প্রায় ১৪ মাস পরে আব্বু আবার চাকরি পান। আম্মিও আমার কাছ থেকে টাকা নেয়া বন্ধ করে দিলেন। বলেছিলেন, সঞ্চয় করো। সঞ্চয় করতে করতে বিয়ের সময় হয়ে যায়। সম্পূর্ণ নিজ খরচে বিয়ে করার ইচ্ছে ছিলো। ইচ্ছেটা এতোটাই স্পষ্ট করে আল্লাহ্‌ পূরণ করবেন বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। বলতে গেলে সমস্ত সঞ্চয় শেষ হয় আমার বিয়েতে। কি অবাক!

ঠিক পরের মাসেই ছিলো performance increment-এর সময়। বেশ ভালো একটা রেইজ পেলাম। আবার আল্লাহ্‌ অনুভূতি দিলেন যে, যেহেতু বিয়ে করেছি নিজের হালাল উপার্জন দিয়ে, আমার বউ এর রিজিকটা আমার ইনকামে যুক্ত হয়ে বেড়ে গেলো। শুধু তাই নয়, কিছু মাস পরে আবার নতুন একটা চাকরী পেলাম, মানে বেতন আরো একটু বাড়ল, আল্‌হাম্‌দুলিল্লাহ্‌।

নতুন এই কোম্পানিতে থাকা অবস্থায় আল্লাহ্‌ আমাদেরকে যমজ দুটি মেয়ে উপহার দিলেন। চারজনের সংসার শুরু হয়ে যায়। ওদের দুজনের ওজন কম ছিলো, নানা রকমের অসুস্থতা লেগেই থাকতো। সম্ভবত গড়ে প্রতি ২ সপ্তাহে ডক্টর ভিজিট করতেই হতো দু'জনকে নিয়েই। ডবল ডক্টর ভিজিট, ডবল ঔষধ, ডবল ডায়পার, ডবল কৌটার দুধ (বুকের দুধ পায়নি) ছিলো নিয়মিত খরচ। কিন্তু বিন্দুমাত্র বিচলিত ছিলাম না। কি অদ্ভুত যে, এবার চাকরি খুঁজিনি। বরং চাকরিই খুঁজে নেয় আমাদের চারজনকে, আল্‌হাম্‌দুলিল্লাহ্‌।

খুব মনে আছে, সকাল সকাল বাচ্চা-দুটোকে নিয়ে হাসপাতালের টিকেট কেটে অপেক্ষা করছিলাম। একজন মেয়ে আমার কোলে, আরেকজন বউয়ের কোলে। ফোন আসে, আমার এক্স-কলিগ চাকরীর খবর দেন। বেতনটাও আনুমানিক জানালেন। কি আশ্চর্য, মেডিকেল বেনিফিটও আছে! তাও আবার শুধু আমার একার জন্য নয়, পুরো পরিবারের জন্য মেডিকেল বেনিফিট! আমিতো মহা খুশী, আল্‌হাম্‌দুলিল্লাহ্‌। বাচ্চা জন্মের সপ্তম মাসেই নুতন চাকরিতে join করি। আবার অনুভূতি পাই, নতুন চাকরি, মেডিকেল বেনিফিট আমার যোগ্যতায় নয়। বরং আমার মেয়ে দুটোর রিযিক আল্লাহ্‌ আমার বেতনে যুক্ত করেছেন।

আমি আজও মনে করি আল্লাহ্‌ আমাকে যেই কর্ম দক্ষতা দিয়েছেন তার বাজার মূল্য ৬ থেকে ৮ হাজার টাকাই মাত্র। বাকি একটি অংশ আমার মা-বাবার জন্য বরাদ্দ, আরেকটা অংশ আমার স্ত্রীর জন্য বরাদ্দ, আরেকটা বড় অংশ আমার মেয়ে-দুটোর জন্য। হিসাব করে দেখলাম, আমার ইনকামের বড় একটা অংশ আসে আমার মেয়ে-দুটোর রিজিক হতে। ওদিকে আল্লাহ্‌ ওয়াদা করে রেখেছেন:
“তোমাদের সন্তানদের দারিদ্র্যের আশংকায় হত্যা করো না। আমিই তাদেরকে রিযিক দেই এবং তোমাদেরকেও। (১৭:৩১)”

আমার এই লেখাটা সেই সকল মুসলিম বাবাদের অন্তরে ও চিন্তায় আঘাত করার জন্য যারা মনে করছেন তার বৃদ্ধা মা, অবসর নেয়া বাবা আর স্ত্রী-সন্তানরা শুধু বসে বসে তার কামাই খায় আর তিনি একাই সম্পূর্ন নিজ যোগ্যতায় সকলের জন্য প্রচুর পরিশ্রম করে উপার্জন করছেন।

আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বিষয়গুলো অন্তর দিয়ে উপলব্দি করার তৌফিক দান করুন এবং সব বাবা-মাকে ভালো রাখুন, আমীন।

— সংগৃহীত।

পঠিত : ৩১৫ বার

মন্তব্য: ০