Alapon

গ্রামীণ জীবন কতোটা গ্রামীণ ? দ্বীন পালনের জন্যে কতোটা উপযোগী গ্রাম?



অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় 'গ্রামে ফিরে যাও' কথাটা বেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। প্রয়োজনে এমনটা করতেও হবে হয়তো, অথবা দাওয়াতি কাজের জন্য গ্রামে সেটেল হতেও হবে দাঈদের। কিন্তু গ্রামের নাম শুনেই যাদের কাছে 'ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়' মনে হচ্ছে, আসলে বসবাসের জন্য কিংবা দ্বীন পালনের জন্য গ্রামে থাকাটা মোটেও উত্তম মনে হয়না।

শহরের মানুষ যতটা না শহুরে, গ্রামের মানুষ আজকাল মানসিকতায় তারচে অনেক বেশি শহুরে হয়ে গেছে। আগে যাদের মাথা গোজার ঠাঁইটুকুও ছিলোনা, তারাই এখন ব্যবসা বানিজ্য করে কিংবা প্রবাসে গিয়ে বা সন্তানদের পাঠিয়ে দালান-কোঠা তুলে 'মুই কি হনুরে' হয়ে গেছে। আপনি ভালো কথা বলবেন কী, পদ-পদবী ছাড়া আপনার কথা শুনতেও আসবেনা কেউ। এই আমিই এখন গ্রামে যেতে ভয় পাই গ্রামের মানুষের প্রশ্নবাণে জর্জরিত হওয়ার ভয়ে:

- কয়টা ডিগ্রি নিসো?

- বিসিএস দিসো কিনা? কবে দিবা? (যেন বিসিএস না দিলে শিক্ষিতের কোটায়ই পড়েনা)

- কেন চাকরি করোনা?

- বাড়ি আছে কিনা? গাড়ি আছে কিনা? (ক্ষমতা আর শো-অফের তুমুল প্রতিযোগিতা এখন গ্রামে, অথচ শহরে যার যার তারতার হওয়াতে এই শো-অফের তেমন সুযোগ নেই)

আর গ্রামের মানুষকে আমরা যতটা সহজ সরল মনে করে থাকি, বাস্তবে পুরোটাই বিপরীত ৷ আমি খুব অবাক হয়ে খেয়াল করি যে, গ্রামের একটা ১০ বছরের বাচ্চা যে পরিমাণ নেগেটিভলি চিন্তা করে, আমরা ত্রিশের কোটায় এসেও অতটা নেগেটিভ হতে পারিনি ৷ আর হিংসা, বিদ্বেষ, গীবত, চোগলখুরি, মিথ্যাচার, গালাগালি এগুলোর কথা না-ই বা বললাম।

বিশ্বাস করেন, আমি নিজের গ্রামে কয়েকদিনের জন্য বেড়াতে গেলেও গ্রামের মানুষের দুনিয়াবি প্রতিযোগিতামূলক কথাবার্তায় এত দমবন্ধ লাগে যে, ফেইসবুকে ঢুকে তখন দু'একটা দ্বীনি লেখা পড়লে তখন ফেইসবুকটাকেও অনেক আপন মনে হয়।

ফেসবুকে নাসীহা গ্রুপে এক ভাইয়ের একটা কমেন্ট তুলে দিচ্ছি, যার সাথে আমি অনেকটাই একমত-
❝গ্রামেই বড় হয়েছি। তাই গ্রাম সম্পর্কে গ্রামে বড় হওয়া মানুষের চেয়ে বেশি শহুরেরা জানবেনা। যারা গুনাহ নিয়ে চিন্তিত, তাদের জন্য গ্রামে থাকা উপযোগী মোটেও না। ৫,৬ বছর যাবত শহরে আছি, দ্বীন বুঝার পর থেকে গ্রামের থাকতে গেলে কষ্ট হয়ে যায়। গীবত, পরনীন্দা, হিংসা, বিদ্বেষ, জায়গা জমি নিয়ে ঝগড়া, মারামারি, পরকীয়া, খোটা দিয়ে কথা বলা এগুলো একেবারে স্বাভাবিক বিষয়। গীবতের তো ছড়াছড়ি, আপনি চাইলেও এত সহজে এড়িয়ে যেতে পারবেননা। ১ বার ২ বার বা একাধিকবার কেউ বেচে যাওয়ার চেষ্টা করলো।কিন্তু পরিবেশের সাথে সাব-কনশাস মাইন্ড এডজাস্ট করে নেবে, এবং নিজের অজান্তেই যোগ দেয়া শুরু হবে গীবতের মজলিসে। মহিলাদের ক্ষেত্রে এসব আরও অনেক বেশি স্বাভাবিক বিষয়। দ্বীনের ক্ষেত্রে স্ট্রিক্ট থাকতে পারবেননা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা ১,২ বার বলার পর থেকে আপনার পেছনে লাগবে। আপনার সন্তান লাঞ্চিত হবে, অবহেলিত হবে। আপনি গ্রহনযোগ্যতা হারাবেন। আর এর ভেতর আপনি মানুষ হিসেবে কোনো ভুল কাজ করে ফেললে একেবারেই শেষ। এগুলো আমার ৩ বছরের কঠিন অভিজ্ঞতা। লকডাউনের সময় বাড়িতে ছিলাম লং টাইম। কখন যে এসবের সাথে এডজাস্ট হয়ে যাচ্ছি টের পাচ্ছিনা।

এজন্যই পরিবেশের কারনে ইসলামে হিজরতের বিধান আছে। কোথাও এক জায়গায় পড়েছি, সম্ভবত ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল বলেছেন যে, তোমরা গ্রামে বসবাস করোনা। কারণ হিসেবে আমি যেগুলো বলেছি সেগুলোই তিনি দেখিয়েছিলেন। তবে, যদি গ্রামে ঘরটা একেবারে একা হয়, পাশে আর কেউ না থাকে তাহলে অনেকটা বাচা সম্ভব। যদি আশেপাশে ঘর থাকে, যারা প্রতিনিয়ত আসা যাওয়া করবে আপনার বাসায়, তাহলে সম্ভব না।

আমার এই কথাগুলো লিখে রাখুন। গ্রামে যাওয়ার অন্তত ৫ বছর পর সবকিছু পয়েন্টে পয়েন্টে মিলিয়ে নেবেন ইন শা আল্লাহ। গ্রামে ঘরবাড়ি, জায়গাজমি করে রাখা উত্তম। থাকাটা উপযুক্ত না।❞

পঠিত : ১০৭৪ বার

মন্তব্য: ০