Alapon

ইসলামী সমাজ বিপ্লবের ধারা



সাইয়েদ কুতুব রহ.। জীবনের একটা বড় অংশজুড়ে তিনি ছিলেন কারাগারে। ১৯৬৪ সালে তার একটি বই প্রকাশিত হয়। বইটির নাম ছিল معالم فى الطريق (মা'আলিম ফিত তারিক্ব)। এই কথাটার অর্থ হতে পারে পথনির্দেশক। সাইয়েদ কুতুব এখানে মূলত আমাদের করণীয় কী হবে তা উল্লেখ করেছেন। তাঁর এই বইটি ছিল মুসলিমদের করণীয় বিষয়ক গাইড বুক।

সেই সময় মিশরের জালিম, তাগুত ও স্বৈরাচারী সরকারের প্রধান ছিল জামাল আব্দুন নাসের। সে তার সরকারের জন্য এই বইটিকে হুমকি হিসেবে দেখেছে। উনিশ শ’পয়ষট্টি সালে কর্নেল নাসের মস্কো সফরে থাকাকালে এক বিবৃতিতে ঘোষণা করে যে, ইখওয়ানুল মুসলিমুন সাইয়েদ কুতুবের নেতৃত্বে তাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করেছিল। আর এই ঘোষণার সাথে সাথেই সারা মিসরে ইখওয়ান নেতা ও কর্মীদের ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হয়। আবারো গ্রেপ্তার হন সাইয়েদ কুতুব।

মা'আলিম ফিত তারিক্ব বইটি লিখে নাসেরকে হত্যার হুমকি দেওয়ার অপরাধে(!) ১৯৬৬ সালের ২৯ আগস্ট আমাদের নেতা সাইয়েদ কুতুব শহীদ রহ.-কে ফাঁসী দিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর বইটি সারা পৃথিবীতে হটকেক হয়ে যায়। হয়তো আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছেই ছিল এমন। আল্লাহ তায়ালা এই শহীদকে দিয়ে শুধু মিসর নয়, সারা পৃথিবীতে দাওয়াতী কাজ করাবেন।

এই বইটি দিয়ে এখনো দাওয়াতী কাজ করছেন, পথ নির্দেশ করছেন আমাদের নেতা, আমাদের সাইয়েদ। আল্লাহ তায়ালা যথার্থই বলেছেন, শহীদেরা মরে না, তাদের মৃত বলো না। আমি তাদের রিজিক দেই।

মা'আলিম ফিত তারিক্ব বইটি পৃথিবীর প্রায় সব প্রধান ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। ইংরেজিতে অনুবাদ হয়েছে 'মাইলস্টোন' নামে। বাংলায় অনুবাদ হয়েছে 'ইসলামী সমাজ বিপ্লবের ধারা' নামে। বইটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন মুহাম্মাদ আব্দুল খালেক।

বইটি মোট ১২ টি অধ্যায়ে লেখা। বইয়ের ভূমিকাতে লেখক সারা পৃথিবীর মতবাদগুলো নিয়ে আলোচনা করে দেখিয়েছেন মানবরচিত মতবাদের ফলে মানবতা দুরবস্থার মধ্যে রয়েছে। এর বিপরীতে ইসলামী আদর্শ তথা আল্লাহ প্রদত্ত বিধানই মানবতাকে রক্ষা করতে পারে। এছাড়াও তিনি ভূমিকাতে বিশ্ব নেতৃত্বের জন্যে প্রয়োজনীয় গুণাবলী, আধুনিক যুগের জাহেলিয়াত, ইসলাম ও জাহেলিয়াতের পার্থক্য ও ইসলামী সমাজের পুনরুজ্জীবন এসব পয়েন্টে কথা বলেছেন।

১ম অধ্যায়ে হাফেজ সাইয়েদ কুতুব কুরআনের কর্মীদের দল নিয়ে আলোচনা করেন। সাহাবীদের মতো কেন আমাদের ডেডিকেশন নেই অথবা আমরা কেন মান হারিয়েছি তা নিয়ে আলোচনা করেছেন।

২য় অধ্যায় লেখক শুরু করেছেন মাক্কী যুগে মুহাম্মদ সা. ও সাহাবারা কীভাবে দাওয়াতী কাজ করেছেন, কুরবানীর নজরানা দিয়েছে সেই প্রসঙ্গ দিয়ে। সাহাবাদের জীবন বিধান সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ/ তারবিয়াত ও সংগঠনিক কর্মকান্ড আলোচনা করেছেন। একই অধ্যায়ে তিনি বিপ্লব বলতে কী বুঝায় ও বিপ্লব কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। ২য় অধ্যায়ে তিনি আরো আলোচনা করেছেন দ্বীন প্রতিষ্ঠার সঠিক উপায় ও এই বিষয়ে আল্লাহ প্রদত্ত কর্মসূচি নিয়ে।

৩য় অধ্যায় মুফাসসির সাইয়েদ কুতুব শুরু করেছেন ইসলামী সমাজের বৈশিষ্ট্য ও সমাজ গঠনের উপায় নিয়ে আলোচনা দিয়ে। তিনি এই অধ্যায়ে ইসলামী সমজের আদর্শিক ভিত্তি ও জাহেলী পরিবেশে ইসলামী পুনর্জাগরণের পন্থা কী হতে পারে নিয়ে আলোচনা করেছেন। তার এই আলোচনার বেসিক হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলল্লাহ' তথা কালিমাতুত তাওহীদের অর্থ বুঝে আল্লাহর কর্তৃত্ব ও সার্বভৌমত্ব মেনে নেওয়া এবং মুহাম্মদ সা.-কে আদর্শ হিসেবে অনুসরণ করা।

৪র্থ অধ্যায়ে মাওলানা সাইয়েদ কুতুব শহীদ আলোচনা করেছেন জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ নিয়ে। তিনি প্রথমে জিহাদের স্তর, জিহাদের বিপ্লবী ঘোষণা ও আল্লাহর শাসন প্রতিষ্ঠার উপায় নিয়ে কথা বলেছেন। এরপর শুধু আত্মরক্ষার নাম জিহাদ নয়, এটাও ক্লিয়ার করেছেন। মাক্কী জীবনে জিহাদ নিষিদ্ধ থাকার কারণ ও প্রেক্ষাপট উল্লেখ করেছেন। সর্বশেষ মাওলানা কুতুব ইসলাম, দেশরক্ষা ও হিহাদের দাবি নিয়ে আলোচনা করেছেন। একইসাথে জিহাদ সম্পর্কিত কিছু ভুল ধারণার অপনোদন করেছেন।

৫ম অধ্যায় ছিল ইসলামী জীবন বিধান নিয়ে। এখানেও কালেমাতুত তাওহীদ নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। ইসলামী সমাজের বৈশিষ্ট্য, ইসলামী সমাজ গঠনের উপায়, জাহেলিয়াত ও তার প্রতিকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন। বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থার অসারতা ও মুসলিম হিসেবে এই ব্যবস্থাকে মেনে নেওয়াকে কুফরি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

৬ষ্ঠ অধ্যায়ে ইসলামী আদর্শই যে বিশ্বজনীন জীবনাদর্শ তা নিয়ে আলোচনা করেন। মানুষের জৈবিক অংশ যে অন্যান্য সৃষ্টির মতো আল্লাহর বিধান পূর্ণরূপে মান্য করে তা নিয়েও বিশদ আলোচনা করেন। ইসলামের বিধান ত্যাগ অথবা ইসলাম থেকে বিচ্যুতির ফলে মানবতার যে অস্থিরতা তা এই অধ্যায়ের শেষে আলোচনা করেন।

৭ম অধ্যায়ের আলোচনার বিষয় ছিল সভ্যতা। কাকে আমরা সভ্যতা বলতে পারি আর কোনটা অসভ্যতা এই নিয়েই এই অধ্যায়ের শুরু। ইসলাম ও জাহিলী সমাজের মৌলিক পার্থক্য ও সভ্যতার প্রকৃত মানদণ্ড কী হতে পারে তা নিয়েও আলোচনা করেন। এই অধ্যায়ের শেষে শহীদ কুতুব ইসলামী সমাজের ক্রমবিকাশ ও ইসলামী সভ্যতা যে সকল ধর্মের মানুষের জন্যই কল্যাণকর তা নিয়ে ব্যখ্যা করেন।

৮ম অধ্যায়ে আমাদের সাইয়েদের আলোচনার বিষয় ছিল সংস্কৃতি/ কৃষ্টি। এই অধ্যায়ে লেখক ইসলাম, কৃষ্টি ও এই ব্যাপারে ইসলামের সীমারেখা নিয়ে দারুণ আলোচনা করেছেন। এখানে তিনি বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও এর প্রয়োজনীয়তা নিয়েও বিস্তর আলোচনা করেছেন।

৯ম অধ্যায় ছিল লেখকের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের একটি। এখানে তিনি আলোচনা করেছে মুসলিমদের জাতীয়তা কী হবে? কীসের ওপর ভিত্তি করে করে আমাদের জাতীয়তা নির্ধারণ হবে? ঈমানই হবে আমাদের জাতীয়তার পরিচয় ও ঐক্যের ভিত্তি। এরপর তিনি মধ্যপন্থী উম্মাহ'র ব্যবচ্ছেদ করেছেন। দারুল ইসলাম ও দারুল হারব নিয়ে আলোচনা করেছেন।

লেখক বলেন, দ্বীনের প্রতি আহবানকারীদের অন্তরে ইসলাম ও জাহেলিয়াত এবং দারুল ইসলাম ও দারুল হরবের প্রকৃতি ও পরিচয় সম্পর্কে বিন্দুমাত্র সংশয় থাকা উচিত নয়। কারণ সন্দেহের পথ ধরেই বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। যে দেশে ইসলামের প্রধাণ্য নেই, যেখানে ইসলামী শরীয়াত বাস্তবায়িত হয়নি এবং যে ভূখণ্ডের আইন-কানুন ইসলাম নয়। ঈমানের বহির্ভূত যা কিছু আছে তাই কুফর এবং ইসলামের বাইরে যা আছে তা শুধুই জাহেলিয়াত এবং সত্যের বিপরীত সবকিছুই মিথ্যা ছাড়া কিছুই নয়।

১০ম অধ্যায় শহীদ কুতুব যারা ইসলামী রাষ্ট্রের দাওয়াত দিবে তাদের উদ্দেশ্যে লিখেছেন। কীভাবে দাওয়াত দিতে হবে, কীভাবে আপোষহীন থাকতে হবে, আমাদের প্রকৃত লক্ষ্য, কীসে আমাদের সাফল্য তা উল্লেখ করেছেন।

তিনি নসিহত করে বলেন, দ্বীনের প্রতি আহবানকারীদের কোন প্রকারেই জাহেলিয়াতের সাথে খাপ খাইয়ে চলার নীতি গ্রহণ সম্ভব নয়। জাহেলিয়াতের কোন একটি মতবাদ, কোন রীতিনীতি অথবা তার সামাজিক কাঠামোর কোন একটি মতবাদ, কোন রীতিনীতি অথবা তার সামাজিক কাঠামোর কোন একটির সাথেও আপোষ করা আমাদের জন্যে অসম্ভব। এ জন্যে জাহেলিয়াতের ধারক-বাহকগণ যদি আমাদের উপর অত্যাচারের স্টিমরোলারও চালিয়ে দেয় তবু আমরা বিন্দুমাত্র নতি স্বীকার করতে রাজি নই।

১১শ অধ্যায়ে আলোচনার বিষয় ছিল ঈমান ও আকিদা। ঈমান আনার পর একজন মানুষের আচরণ ও চরিত কী রকম হওয়া উচিত তা নিয়েও আলোচনা করেন। মূলত এই অধ্যায়ে একজন মুমিনের চালচলন ও আচার আচরণ কীরূপ হবে তা বর্ণনা করা হয়েছে।

১২শ অধ্যায়ের নাম রক্তে রঞ্জিত পথ। লেখক বলেন ইসলামী সমাজ কায়েম তথা ঈমানের পথে চলা সহজ কাজ নয়। এর জন্য বহু ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। তিনি শুরুতে সূরা বুরুজে বর্ণিত ঘটনার উদাহরণ দিয়েছেন।

আমাদের নেতা সাইয়েদ কুতুব বলেন, কাহিনী বর্ণনার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা ঈমানদারদের চলার পথে যেসব বাধা বিপত্তি আসতে পারে তা উল্লেখ করেছেন এবং সম্ভাব্য সকল প্রকার বিপদ-আপদ ও দুঃখ-কষ্টকে বরণ করে নেয়ার জন্যে উৎসাহ দিয়েছেন।

একজন মুসলিমের জন্য এই বইটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের জন্য এটা পাঠ্য। এই বইটি আপনাকে পথ দেখাবে। কুরআন ও রাসূল সা.-এর সীরাত বুঝতে আপনাকে সহায়তা করতে। আপনাকে আপনার করণীয় সম্পর্কে সঠিক নির্দেশনা দিবে।

বইটি আমাদের সকলের পড়া উচিত। যারা পড়েন নাই তারা তো অবশ্যই পড়বেন, যারা পড়েছেন তারাও পুনরায় পড়বেন। আপনার ঈমান তাজা হবে ইনশাআল্লাহ।

#বুক_রিভিউ
বই : ইসলামী সমাজ বিপ্লবের ধারা
লেখক : সাইয়েদ কুতুব শহীদ
অনুবাদক : মুহাম্মদ আব্দুল খালেক
প্রকাশনী : আধুনিক প্রকাশনী
পৃষ্ঠা : ২১৬
মুদ্রিত মূল্য : ১৬৪
জনরা : রাজনীতি

পঠিত : ১১৬ বার

ads

মন্তব্য: ০