Alapon

ইতিহাসের অন্ধকারে নিজাম-ই হায়দারাবাদ...



উপনিবেশ থেকে মুক্তির আনন্দ বেশি দিন থাকল না। সুদূরের বাংলা গেছে পাকিস্তানে। ভয়-ভীতি আর লোভ-লালসা দেখিয়ে প্রতিবেশী ছোট ছোট দেশীয় রাজ্যগুলোকে (প্রিন্সলি স্টেট) ইতোমধ্যেই গলধকরণ সম্পন্ন করেছে ভারত। এর মধ্যে ত্রিবাঙ্কুর, যোধপুর, ভূপালসহ বেশ কিছু রাজ্য ১৫ আগস্টের মধ্যেই গিলে ফেলা গেছে। এরপর জুনাগড়। বৃহৎ রাষ্ট্র ভারতের বিপক্ষে স্বাধীনতার পতাকা উচ্চকিত রাখা তাদের পক্ষে ছিলো অসম্ভব। আর তখন থেকেই জ্বলছে কাশ্মীর।

ওই বছরই ভারত বেশ কিছু অঘটন সংগঠনের কোশেশ করেছিল। তবে নিজাম তা কোনমতে সামাল দিয়েছিলেন। নভেম্বরে ভারত হায়দারাবাদের সাথে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়। এরপর কিছুদিন স্বস্তির নিশ্বাস হয়তো ফেলেছিলো হায়দারাবাদ।

কিন্তু এরই মধ্যে দাঙ্গার ডামাডোল। কংগ্রেসের ও ভারতপন্থী অন্যান্য সংগঠনগুলোর উস্কানিতে এর সূত্রপাত। পার্শ্ববর্তী ভারতীয় রাজ্যগুলো থেকে প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকরা হায়দারাবাদে অনুপ্রবেশ করে দাঙ্গার তীব্রতা বাড়িয়ে তোলে। এর মধ্য দিয়ে দেশটির কংগ্রেস নেতা স্বামী রামানন্দ তীর্থ ভারতভুক্তির দাবিতে আইন অমান্য আন্দোলন শুরু করলেন। তাদের কেউ কেউ ভারতে পালিয়ে গিয়ে অ্যাকশন কমিটি গঠন করলেন। যা ভারতের উগ্র সন্ত্রাসীদের আরও উস্কে তোলে। হাজার হাজার ভারতীয় বর্গীরা হায়দারাবাদে অনুপ্রবেশ করে দেশটিকে ছিন্নভিন্ন করতে লাগলো।

দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব ও হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি রক্ষায় বাহাদুর ইয়ার জং গড়ে তুললেন ‘ইত্তেহাদুল মুসলিমিন’। প্রথমদিকে স্রেফ প্রচার-প্রচারণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল দলটি। ‘ভারত রুখো, বাঁচাও হায়দারাবাদ’ স্লোগানে জনগণকে একত্র করতে চেয়েছিলেন তিনি। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর পর তরুণ কাশেম রিজভী এর হাল ধরেন।

এর মধ্যেই, এই ঘোলা জলেই মাছ শিকারে নামলেন কংগ্রেসের উচ্ছিষ্টে হৃষ্টপুষ্ট কম্যুনিস্টরা। জনজীবন যখন বিপন্ন, তখন রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এক মহান ব্রত নিয়ে সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হলেন (মনে মনে বিপ্লবী অথচ) কংগ্রেসের এই দাবার ঘুঁটিরা। ইতিহাসে এটি ‘তেলেঙ্গানা বিদ্রোহ’ হিসাবে চিহ্নিত হয়। তারা প্যারালাল সরকার গঠন করে। খাজনা আদায় করতে থাকে জনগণের থেকে। হায়দারাবাদ সরকার বিদ্রোহ দমনে সেনাবাহিনী তলব করতে বাধ্য হয়। ভারতের মদদপুষ্ট ভারি অস্ত্রে সুসজ্জিত কম্যুনিস্ট সন্ত্রাসীদের দমনে ময়দানে যখন হিমশিম খাচ্ছিল সেনাবাহিনী, মিডিয়া তখন মজে উঠেছিলো ফৌজের চেহারায় কালিমা লেপণের খেলায়।

পরিস্থিতি সামাল দিতে ইত্তেহাদের তরুণ নেতা কাশেম রিজভী এগিয়ে এলেন। ইত্তেহাদের সামরিক শাখা গড়ে তুললেন তিনি— ‘রাজাকার’। অবশেষে জনগণ সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়ে দাঙ্গা ও বিদ্রোহ দমন করলো। এর মধ্য দিয়ে হায়দারাবাদের সাথে আরেক দফা চুক্তি করতে বাধ্য হয় ভারত।

কিন্তু কিছু দিনের মধ্যে পাকিস্তানের যখন দুর্দিন, যে দুর্দিনের উৎস ভারত (ভাগাভাগির অংশ হিসাবে কেন্দ্রীয় রিজার্ভ ব্যাংক থেকে পাকিস্তানের ৫০ কোটি পাওনা ছিলো। যা ভারত দেয়নি।); তখন নিজাম পাকিস্তানকে ২০ কোটি টাকা ঋণ দিয়ে সাহায্য করে। এই বাহানায় চুক্তি ভঙ্গ হয়েছে বলে হায়দারাবাদের ওপর সর্বাত্মক অবরোধ করে ভারত।

ভারতের সাথে আলাপ-সালাপের পথ যখন শেষ, ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ভারতীয় রাডার ফাঁকি দিয়ে করাচি হয়ে কোয়েটায় জিন্নাহর কাছে ছুটে গেলেন হায়দারাবাদের প্রধানমন্ত্রী মীর লায়েক আলী। কিন্তু কায়েদে আযম তখন মৃত্যুশয্যায়। দেখা করা সম্ভব হলো না লায়েক আলীর। হতাশ হয়ে ফিরলেন মাতৃভূমিতে। তবে পাকিস্তানে গোয়েন্দা রিপোর্টে জানতে পারলেন ভারত ২২ সেপ্টেম্বর হায়দারাবাদের উদ্দেশে ফৌজ প্রেরণ করবে।

কিন্তু হায়দারাবাদে যেন বজ্রপাত হলো ১১ সেপ্টেম্বর। পাকিস্তানের গভর্নর কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ইন্তিকাল করেছেন! এই সুযোগে পরিকল্পনাও এগিয়ে নিলো ভারত। ১৩ সেপ্টেম্বর আকস্মিক আক্রমণ করে বসলো হায়দারাবাদকে। মাত্র পাঁচ দিনের ‘পুলিশ অ্যাকশনে’ হায়দারাবাদকে ধ্বংস করে অখণ্ড ভারতের দিকে আরেকধাপ এগিয়ে যায় ‘ভারতভাগ্যবিধাতা’। এর সাংকেতিক নাম ছিলো ‘অপারেশন পলো’।

অভিযান ও এর পর পরিচালিত হয় ভয়াবহ গণহত্যা। মার্কিন ঐতিহাসিক উইলিয়াম ডালরিম্পল তাঁর দ্য এজ অব কলি গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, নেহরু নিজামবিরোধী দু’জন মুসলমান এবং হিন্দু পণ্ডিত সুন্দরলালের নেতৃত্বে একটি বেসরকারি তদন্ত কমিশন গঠন করেন। সে রিপোর্টে মোট দুই লাখ মুসলমানকে হত্যার কথা উল্লেখ করা হয়। মুসলিম মহিলাদের ধর্ষণ ও গণধর্ষণের বিবরণও পেশ করা হয় রিপোর্টে। অধ্যাপক উইলফ্রেড কার্টওয়েল স্মিথও একইরকম উল্লেখ করেছিলেন। সে রিপোর্ট সোজা পথে কখনও আলোর মুখ না দেখলেও এক সময়ে ফাঁস হয়ে যায়। বিবিসি এই ঘটনাকে ‘India's Hidden Massacre’ নামে উল্লেখ করেছে। তবে সুন্দরলাল রিপোর্টের বরাত দিয়ে বিবিসি বলছে অন্তত ২৭ হাজার থেকে ৪০ হাজার মুসলমান সে সময় গণহত্যার শিকার হয়েছে।
হায়দারাবাদ দখলের পর ভারত সামরিক শাসন কায়েম করে। মীর লায়েক আলী ও কাশেম রিজভীকে বন্দি করা হয়। পরে বিভিন্ন সময়ে উভয়েই পাকিস্তানে চলে যান। এক প্রকার গৃহবন্দী অবস্থায়, পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে নিজাম মীর ওসমান আলী খান মারা যান ১৯৬৭ সালে। হায়দারাবাদকে ভারত এখন কয়েক টুকরা করে অন্ধ্র প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু প্রভৃতি রাজ্যে ভাগ করে দিয়েছে।

হায়দারাবাদের তরফে ইতিহাস কমই লেখা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মীর লায়েক আলী লিখেছেন ‘The Tragedy of Hyderabad’। বইটিতে হায়দারাবাদের পতনের নানা দিক আলোচনার সাথে ‘Before The Security Council’ শিরোনামে সে সময় জাতিসংঘের ভূমিকাও আলোচনা করেছেন তিনি।

তিনি পাকিস্তান থেকে হতাশ হয়ে ফিরে গিয়েই ৯ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছিলেন। ২০ তারিখ নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করা হয়। কিন্তু ভারতের আগ্রাসনের তীব্রতা বাড়তে থাকলে এটি ১৭ অথবা ১৮ সেপ্টেম্বর এগিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু ১৭ সেপ্টেম্বরই হায়দারাবাদকে গিলে ফেলেছে ভারত। ক্ষমতা হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিকতা বাকি মাত্র। যা পরদিন সম্পন্ন হয়। এ খবরে জাতিসংঘের ওই অধিবেশন আর হয়নি। পরে বেশ কয়েকবার অধিবেশন হয়। তা গড়াতে গড়াতে পরের বছর ২৪ মে পর্যন্ত গড়ায়। তবে তাতেও কোন ফল হয়নি। অধিবেশনে হায়দারাবাদের পক্ষে পাকিস্তান জোরালো ভূমিকা রাখে। কিন্তু অন্যদের নির্লিপ্ততা...!

ওই দিনের সিকিউরিটি কাউন্সিলের বর্ণনা দিয়ে মীর লায়েক আলী লিখেছেন, 'When the representative of Pakistan had finished, a conspiracy of silence prevailed, and the meeting ended on an inconclusive note. Not a voice was raised to condemn the Indian aggression, or even to demand an inquiry into the real facts with a view to arriving at an equitable solution of the problem. The Council shirked its duty to come to grips with the question of Indian aggression even though India had openly challenged not merely the prestige but the authority of the United Nations. The Security Council thus failed to provide protection to a small state against the onslaught of its overwhelmingly bigger and stronger neighbour, and thereby encouraged India to plan and commit further aggressions. The solemn undertakings repeatedly given by India before the world body to determine the future status of Hyderabad in accordance with the will of the people have all gone over-board. Progressively, the State has been dismembered and the whole of it, in parts, has been annexed to the various provinces of India. The Nizam lives a virtual prisoner, stripped of all his authority and most of his belongings, counting the remaining days of his life but, the Security Council of the United Nations continues to remain seized of the Hyderabad question!!!'

আফসোস! হায়দারাবাদেরও একজন মীর জাফর ছিলেন— আল ইদ্রুস। সেনাপ্রধান আল ইদ্রুসের ওপর বড় ভরসাই করেছিলেন নিজাম মীর ওসমান আলী খান আর হায়দারাবাদের অগণিত নির্যাতিত নিপীড়িত জনতা। এভাবেই ইতিহাসের অন্ধকারে হারিয়ে গেছে স্বাধীন সার্বভৌম হায়দারাবাদ। হারিয়ে গেছেন তখনকার দুনিয়ার শীর্ষ ধনী হায়দারাবাদের নিজাম বাহাদুর মীর ওসমান আলী খান আসফ জাঈ হাফতাম!

সূত্র:
• হারিয়ে যাওয়া হায়দারাবাদ- আবদুল হাই শিকদার
• হায়দারাবাদের ট্র‍্যাজেডি ও আজকের বাংলাদেশ - আরিফুল হক
• বিস্মৃতির অতলে হায়দারাবাদ (নিবন্ধ) - সাহাদত হোসেন খান
• Hyderabad 1948: India's hidden massacre
By Mike Thomson, BBC

নবাব আবদুর রহমান

পঠিত : ১০৬ বার

ads

মন্তব্য: ০