Alapon

কলকাতা-বাংলাদেশ: ধর্মমগ্নতা ও ধর্মহীনতা |


বাংলা ভাষার সাহিত্য ও শিল্প চর্চার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও কলকাতার লেখক ও কবিদের কিছু বিষয় আলাদা। ভাষা ও শব্দের ব্যবহারগত নানারকম পার্থক্য থাকলেও ধর্মগত বিষয়টা অধিক সুস্পষ্ট। কলকাতার প্রায় সব লেখকই তাদের সংস্কৃতি ও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা ও শব্দ ব্যবহার করেন দ্বিধাহীন। তাদের লেখায় হিন্দু ধর্মীয় পরিভাষাগুলো স্বাভাবিকভাবেই আসে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ইতিবাচক ভঙ্গিতে ব্যবহৃত হয় সেইসব শব্দ।

শব্দ ও ভাষার সঙ্গে সঙ্গে সেখানকার লেখক, কবি ও বুদ্ধিজীবীরা তাদের বারো মাসের তেরো পার্বণেও অংশগ্রহণ করেন নিয়মিত। যাপনের মধ্যে ধর্মীয় সংস্কৃতিকে ধারণ করতে তাদের কখনোই হীনম্মন্য হতে দেখা যায় না। নিজের ধর্মপরিচয় লুকানোর চেষ্টা তাদের মধ্যে নেই বললেই চলে। ধুতি পরতেও তাদের অনেকেই সাবলীল থাকেন। কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের হিন্দু না বাঙালি—এই দোলাচলে দুলতে দেখা যায় না সাধারণত। এমনকি তাদের পাঠকেরাও সচেতন। পাঠকের জন্যই তারা নিজেদের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও কৃষ্টি-কালচার থেকে বিচ্যুত হন না।

তারা দেদার ভগবান, ঈশ্বর, মাসি-পিসি, পুজো, মন্দির, ঠাকুরঘর, দুর্গা, স্বরস্বতি, দেবতা, ব্রহ্মা, রাম ইত্যাদি সিম্বলিক ধর্মীয় শব্দ নিজেদের লেখায় ব্যবহার করেন। তাদের নাটক-সিনেমায় ভগবান-নির্ভরতা, ভগবানের সাহায্য, দেবতার ক্ষোভ, দেবতার প্রতিশোধ এবং ধর্মীয় মিথগুলো সরবেই উপস্থাপিত হয়। মহাভারত নিয়ে তাদের একাধিক ভিজ্যুয়াল কাজ হয়। নাটক-সিনেমায় বিপদ্গ্রস্তকে উদ্ধার করতে দেবতার ভিজ্যুয়ালাইজ করা হয়। এইসবে তাদের নির্মাতা, লেখক, বুদ্ধিজীবী ও ভোক্তাদের সাধারণত কোনো আপত্তি থাকে না।

ওখানে রামায়ন, মহাভারত, ভগবদ্গীতার মিথ ও কাহিনি নিয়ে সিনেমা-সিরিয়াল হয়। সাধারণত ধর্মীয় ভাবাবেগ থেকেই সেসব হয়ে থাকে। কলকাতার সব সাহিত্য ও আর্টে একটা ঐতিহ্য ও ধর্মীয় আবহ থেকেই যায়। তাদের কখনোই বাংলাদেশের পাঠক ধরার চেষ্টা করতে হয় না। বাংলাদেশের পাঠকের জন্য তাদের চিন্তাচেতনা-ভাবাদর্শে ছাড় দিতে হয় না। যতদূর দেখি, তারা এই দেশের এক-দুজন নবীন কবি ও গল্পকারকে পিঠ চাপড়ে দিলেই কেল্লা ফতে!

ওদিকে আমাদের লেখকরা অধিকাংশই সারাক্ষণ তটস্থ থাকেন—কখন জানি তার প্রগতিশীলতার পিরহান খসে পড়ে! সেক্যুলারিজম আর প্রগতিশীলতার প্রতি তাদের ভাবালুতা লাইলি-মজনুর এশকের চেয়ে তীব্রতা নিয়ে হাজির হয় প্রতিনিয়ত। এরা পোশাকে, মননে, ভাবে-ভাষায়, এমনকি যাপনেও এই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠদের কৃষ্টি-কালচার, ইতিহাস-ঐতিহ্য, ধর্মীয় বোধ-ভাবাবেগ, ধর্মীয় জমায়েত, পোশাকসহ সব ধরণের ইসলাম ধর্মীয় চিহ্ন এড়িয়ে চলেন। কখনো ভুল করে কোনো ইসলামি পরিবেশে পৌঁছে গেলে, তাদের প্রগতিশীলতা, সেক্যুলারিজম আর ঊণজানা ধর্মজ্ঞান জাহিরের পাশাপাশি সবক দিতে ভুল করেন না।

এইখানের তর্কবিতর্কে, পথে-বৈঠকে, ভার্চুয়ালি সোশ্যাল নেটওয়ার্কে বিদ্যমান একজন ধার্মিককে নিয়মিত—‘আপনি মুসলিম না বাঙালি!’ অথবা ‘আগে ধার্মিক না মানুষ’—এই ধরণের বালখিল্য ও মেরিটলেস প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। এই প্রশ্নগুলোর কোনো ভালো উদ্দেশ্য থাকে না। উদ্দেশ্য থাকে—একজন ধার্মিককে ভাষা ও বাক্যের ফাঁদে ফেলে তাকে ডিমোটিভেট অথবা ডিহিউমেনাইজ করা। সেই সঙ্গে তার ধর্মপরিচয়ের স্বাধীনতাকে খর্ব করা। আরেকটা উদ্দেশ্য অবশ্য একটু সূক্ষ্ম; তবে স্পষ্ট যে, তারা এইসব প্রশ্নের মাধ্যমে একজন ধার্মিক, সচেতন মুসলিমকে দেশবিরোধী হিসেবে দেখাতে চায়। তাদের বক্তব্যের শেষটা হয়—‘মানুষই যদি হতে না পারলেন, তাহলে ধর্ম দিয়ে কী করবেন? ধর্মের জন্য তো মানুষ না; বরং মানুষের জন্যই তো ধর্ম’—এই এক কমন প্যারাডক্স দিয়ে। অথচ প্রতিটা হাইওয়ানে নাতেক (মানুষ) মানুষ হিসেবেই জন্ম নেয়। তার ধর্মবোধ তাকে নৈতিক মূল্যবোধ ও উন্নত চরিত্রের মানুষে রূপান্তর করে।

এই দেশের শাহবাগে বা একটা ‘সাহিত্যিক পরিবেশে’ ‘আপনি কোন ধর্মাবলম্বী?’—এই প্রশ্ন কখনোই করতে পারবেন না। এইটা করলেই আপনি সাম্প্রদায়িক হয়ে যাবেন। অথচ কলকাতাওয়ালারা ‘কাস্ট’ জিজ্ঞেস করে নিতে পারেন। তাদের এতে কোনো সমস্যা হয় না। সমস্যাটা হয় নিজের আত্মপরিচয় বিকিয়ে দেওয়া আমাদের কিছু মানুষের। কিন্তু সেই মানুষগুলোই আবার ইসলামের দৃষ্টিতে তাদের সকল না-জায়েজ কাজকে ইসলামি ব্যক্তিত্বগণ যেন জায়েজের ফতোয়া দেন, সেই আশা করেন। কখনো আবার কৌশলে বাধ্যও করতে চান। আমরা দেখি—নারীর চাকরি, ভাস্কর্য ও পর্দা ইস্যুতে তাদের বর্ণচোরা মুখোশ উদোম হয়ে যায় আমাদের সামনে।

আমাদের অধিকাংশ লেখক নিজেদের লেখায় ইসলামের পরিভাষা তো দূর কি বাত; আরবি ফার্সি থেকে আত্মীকৃত বাংলা শব্দই ব্যবহার করতে চান না। যারা ব্যবহার করেন, তাদেরকে পর্যন্ত একঘরে করার চেষ্টা অব্যাহতভাবে করা হয়। এরা ইসলামের ইতিহাসের ইতিবাচক কোনো ঘটনাকে নিয়ে নাটক-সিনেমা বানাতে আগ্রহ পান না; বরং তাদের নাটক-সিনেমায় ইসলামি চিহ্ন ও ইসলামি ব্যক্তিত্বদেরকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করতে সুখ পান।

মসজিদ, নামাজ, এবাদত, নবি-রাসুল না লিখে উপাসনালয়, প্রার্থনা বা প্রেয়ার, উপাসনা, প্রফেট ইত্যাদি বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। আল্লাহ না লিখে সৃষ্টিকর্তা লিখে আরাম পান। এই দেশের পাঠকদের খুশি না করে কলকাতার দাদাদের সন্তুষ্টি তাদের কাছে বড় হয়ে যায়।

আবার আমাদের পাঠকদের মধ্যেও এক ধরণের নিধর্মিক উদারতা জায়গা করে নিয়েছে। ফলে ‘ভূতের বাচ্চা সুলায়মান’—এর মতো নাম এই দেশের লেখক দিতে পারেন। আবার এই নামের পক্ষে প্রতিবাদ হলে সাফাইয়ের জন্য বহুজন উদারতার ভাণ্ড নিয়ে হাজির হন। অথচ ‘ভূতের বাচ্চা গণেশ’—এই নামের ব্যবহার-উপস্থিতি পুরো বাংলা কম্যুনিটিতে প্রায় অসম্ভব।

আমাদের লেখক কিংবা বুদ্ধিজীবীরা সাধারণত কুরআন-হাদিস নিয়ে কথা বলেন না। উদ্ধৃতিও খুব একটা ব্যবহার করেন না। কিন্তু যখনই এই দেশে আলেম সমাজের বিপক্ষে ব্যবহারযোগ্য কোনো আয়াত-হাদিস তারা পেয়ে যান; তখন সেটা ব্যবহার করতে সামান্য কৃপণতা করতেও দেখা যায় না তাদের।

আমাদের বুদ্ধিজীবীদের সম্পর্কে হুমায়ুন আহমেদ একটি সাক্ষাৎকারে অভিনেতা ও সাংবাদিক মাহফুজ আহমেদের একটি প্রশ্নে (‘এ-দেশের বুদ্ধিজীবীদের ও মুক্তবুদ্ধির চর্চা ভূমিকা সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?’) বলেছিলেন: “আমাদের বুদ্ধিজীবী সমাজে যাঁরা আছেন, তাদের কার্যক্রম খুব একটা পরিষ্কার না। এরা কেন জানি ইসলাম ধর্মকে খুব ছোট করে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন।

হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান অন্য যেকোনো ধর্মের প্রায় সব উৎসবে আমাদের বুদ্ধিজীবীরা উপস্থিত থাকেন, বক্তৃতা করেন, বাণী দেন; কিন্তু ইসলামি কোনো জলসায় কেউ উপস্থিত থেকেছেন বলে শোনা যায় না। তাদের মতে—ইসলামি জলসায় কেউ উপস্থিত থাকা মানে তার বুদ্ধিবৃত্তিও নিম্নমানের। সে একজন প্রতিক্রিয়াশীল, সাম্প্রদায়িক লোক। আমাদের বুদ্ধিজীবীদের কাছে হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিষ্টানদের কোনো অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার অর্থ—মুক্তবুদ্ধির চর্চা করা, প্রগতির চর্চা করা, সংস্কারমুক্ত হওয়া ইত্যাদি।

প্রফেসর সালাম ঢাকায় এসে যখন বক্তৃতার শুরুতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ বললেন, তখন আমাদের বুদ্ধিজীবীরা হকচকিয়ে গেলেন। কারণ তাদের কাছে প্রগতিশীল হওয়া, বুদ্ধিজীবী হওয়া, মুক্তবুদ্ধির চর্চা করা মানেই ইসলামবিরোধী হতে হবে। তাদের কাছে রামকৃষ্ণের বাণী, যিশুর বাণী—সবই গ্রহণীয়। এসব তারা উদাহরণ হিসেবেও ব্যবহার করেন; কিন্তু হজরত মোহাম্মদের বাণী কখনো তাদের মুখ থেকে শোনা যায় না। তাদের কাছে হজরত মোহাম্মদের বাণী গ্রহণযোগ্য নয়।

আমার মতে, পৃথিবীর তাবৎ ঔপন্যাসিক যাঁর কোটের পকেট থেকে বেরিয়ে এসেছেন, তার নাম দস্তয়ভস্কি। আরেকজন আছেন মহামতি টলস্টয়। এক রেলস্টেশনে যখন টলস্টয় মারা গেলেন, তখন তাঁর ওভারকোটের পকেটে একটি বই পাওয়া গেছে। বইটি ছিল টলস্টয়ের খুব প্রিয়। সব সময় সঙ্গে রাখতেন। সময় পেলেই পড়তেন। বইটিতে হজরত মোহাম্মদ সা:-এর বিভিন্ন সময়ে বলা ইন্টারেস্টিং কথাগুলো নিয়ে গ্রন্থিত।

আমি বিনয়ের সঙ্গে আমাদের বুদ্ধিজীবীদের কাছে জানতে চাইছি, আপনাদের ক’জন বইটি পড়েছেন? টলস্টয় যে বইটি পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন, সেই বই আমাদের প্রত্যেকের একবার কি পড়া উচিত নয়? আমার মতে, প্রতিটি শিক্ষিত ছেলেমেয়ের বইটি পড়া উচিত।”

এই হুমায়ুন আহমেদই কলকাতার লেখকদের প্রায় জনের বাড়িতেই একটি ‘ঠাকুর ঘর’ থাকে দেখে তিনিও নিজের নুহাশপল্লীতে একটি মসজিদ নির্মাণ করেছেন।

পৃথিবীর সব ধর্মের মানুষ যখন নিজেদের আদর্শ, জাতীয়তাবাদ, স্বার্থ, দেশ ও জাতির প্রশ্নে কট্টর ও আত্মকেন্দ্রিক হচ্ছে, তখনো আমাদের বুদ্ধিজীবী ও লেখকেরা মুসলমানদের উদার হতে বলছেন। সেই উদারতার ফলাফল হচ্ছে—ইসলাম থেকে বিচ্যুত হওয়া।

যখন কলকাতায় চাইলে একজন মুসলিম গরুর গোশত দিয়ে হোটেলে খাবার খেতে পারেন; তখন বাংলাদেশের প্রায় সবগুলো বড় শহরের অভিজাত হোটেলগুলোতে লেখা দেখা যায় ‘নো বিফ’। এই ‘নো বিফে’র পলিটিক্স এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এই সেদিনও বাংলাদেশের হাইকোর্ট অঞ্চলে গরুর গোশতের বিপক্ষে হাঙ্গামা হয়েছে।

আবুল মনসুর আহমদ মুসলমানদের জন্য অলাদা ভাষার কথা বলায় তার ছেলেরা প্রগতিশীলতার ঝান্ডাবাহী হলেও তাকে সাধারণত কেউ স্মরণ করে না। ওদিকে নজরুল, ফররুখ, গোলাম মোস্তফা, আল মাহমুদ অনালোচিত থাকেন ইসলামের কথা বলার কারণে। অপরদিকে উল্লিখিত কবিদের তুলনায় থার্ডক্লাস বহু কবি কলকাতা থেকে এসে এই দেশে মুরুব্বিয়ানা ভাব করেন।

এই স্ববিরোধ আর আত্মপরিচয়ের সংকট নিরসন না করলে বাংলাদেশের সাহিত্য আন্তর্জাতিকতা কখনোই পাবে না। আর এ-জিনিসটা থেকে বাংলাদেশের সাহিত্যকে বঞ্চিত করার যে-পলিটিক্স; সেই পলিটিক্সের পালে আমাদের লেখক, কবি আর বুদ্ধিজীবীরাই প্রতিদিন হাওয়া দিয়ে যাচ্ছেন।

সবার সুমতি হোক। বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্য আন্তর্জাতিকতা পাক।

—সাইফ সিরাজ
কবি ও বিশ্লেষক

পঠিত : ৩৯৫ বার

মন্তব্য: ০