Alapon

ইসলামের বিরুদ্ধে বই লিখতে গিয়ে নেদারল্যান্ডসের এমপির ইসলাম গ্রহণ



সারাটা জীবন তিনি ইসলামের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন, 'এন্টি-ইসলাম' ছিলো তার রাজনৈতিক মটো। নেদারল্যান্ডসের এমপিও হন তিনি। অবশেষে লেখা শুরু করেন ইসলামের বিরুদ্ধে একটি বই।

তার নাম জরাম ভেন ক্লেভারেন। খ্রিস্টান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। খ্রিস্টিয়ানিটির নানান আকীদা নিয়ে তার মনে প্রশ্ন ছিলো। তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ট্রিনিটি। এটা বুঝার জন্য চেষ্টা করতেন, বুঝতে পারতেন না। বাইবেল পড়ে দেখতেন এক, খ্রিস্টানদের বিশ্বাসে পেতেন আরেক।

যাইহোক, তিনি প্রথম যেদিন কলেজে যান, সেই দিনটি ছিলো ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। নাইন ইলিভেন। আমেরিকার টুইন টাওয়ারের ঘটনাটি পশ্চিমা বিশ্বে মুসলিম সম্পর্কে নেটিজেনদের নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে। জরামের ক্ষেত্রেও সেটা ঘটে।

সেদিনের পর থেকে তিনি মুসলিমদেরকে তার প্রধান শত্রুতে পরিণত করেন। রাজনীতিতে যোগদান করার পর মুসলিম বিদ্বেষ, ইসলামফোবিয়াকে কাজে লাগান। যারা মুসলিমদের অপছন্দ করে, তারা ছিলো তার ভোটার।

২০১০ সালে প্রথমবারের মতো নেদারল্যান্ডসের এমপি হন। নানান কারণে তার মধ্যকার মুসলিম বিদ্বেষ বাড়তে থাকে। সেটাকে জানান দিতে একটি বই লেখার পরিকল্পনা করেন।

বই লিখতে গেলে তো পড়াশোনা করতে হয়। পড়াশোনা শুরু করেন, ইসলামের বিষয়গুলো ভালোভাবে জানতে অমুসলিমদের লেখা পড়েন এবং মুসলিম লেখকদের ইসলাম সম্পর্কিত লেখা পড়তে থাকেন।

সহযোগিতা নেন ক্যামব্রিজের প্রফেসর আব্দুল হাকিম মুরাদের। প্রফেসরকে তো বলেননি যে তিনি ইসলামের বিরুদ্ধে লিখতে যাচ্ছেন, তিনি শুধু মেইল করতেন- এই বিষয়ে জানতে চাই, কিভাবে জানবো?

প্রফেসর আব্দুল হাকিম মুরাদ ফিরতি মেইলে তাকে কিছু সাইট, বইয়ের নাম দিতেন।

জরাম ভেন ক্লেভারেন অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন, অমুসলিমরা ইসলাম নিয়ে লেখার সময় ইসলামের টেক্সটগুলো বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছে। তার খটকা লাগে। ইসলাম নিয়ে বিস্তারিত পড়াশোনা শুরু করেন।

শৈশবে তার মনে প্রশ্ন জেগেছিলো ট্রিনিটি নিয়ে। ইসলাম নিয়ে পড়তে গিয়ে দেখলেন কুরআনে এই ব্যাপারে চমৎকার সমাধান দেয়া আছে। আবার বাইবেল পড়া শুরু করলেন। দেখলেন আকীদার এই মৌলিক বিষয়ে কুরআন-বাইবেলের পার্থক্য নেই!

শৈশবের লালিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাব পান। নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনী পড়া শুরু করেন। ইংরেজি ভাষায় সবচেয়ে বিখ্যাত জীবনীগ্রন্থ মার্টিন লিংসের জীবনী পড়ে নবিজীর ব্যক্তিত্ব দেখে মুগ্ধ করেন।

কয়েকটি ঘটনা তাকে চমকে দেয়।

তারমধ্যে একটি হলো হিন্দের ঘটনা। যেই হিন্দ বিনতে উতবা নবিজীর চাচার হত্যার জন্য দায়ী, চাচার অঙ্গচ্ছেদ করেছিলো, সেই হিন্দের সাথে নবিজী পলিটিক্যাল পাওয়ারফুল হবার পর এমন আচরণ করেন, যা জরাম ভেন ক্লেভারেনের নবিজী সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দেয়।

ইসলাম বিদ্বেষী লেখকগণ নবিজীকে যেভাবে নির্দয়, নৃশংস, হত্যাকারী আকারে উপস্থাপন করেছেন, জরাম ভেন ক্লেভারেন নবিজীর জীবনী পড়ে দেখেন তার বিপরীত চিত্র।

একদিন বুক সেল্ফে বই রাখতে গিয়ে তার মনে হয়, তিনি তো ইসলামের 'শাহাদাহ'র খুব নিকটবর্তী। মুখে উচ্চারণ করেননি, কিন্তু সার্বিকভাবে তো মেনে নিয়েছেন।

যিনি সারাজীবন ইসলামের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন, যার রাজনৈতিক সমর্থক প্রায় সবাই ইসলাম বিরোধী, তিনি যদি ইসলাম গ্রহণ করেন, তাকে কেমন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে?

ইসলাম তার সামনে পরিষ্কার হওয়া সত্ত্বেও তিনি প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণে ভয় পাচ্ছিলেন।

তখন লাইব্রেরির উপরের তাক থেকে একটি বই পড়ে যায়। সেটা মাটি থেকে তুলে হাতে নেন। সেটা ছিলো কুরআন।

র‍্যান্ডমলি কুরআনের একটি আয়াত তার চোখে পড়ে। আয়াতটি হলো:

"চোখ তো অন্ধ হয় না, বরং অন্ধ হচ্ছে বক্ষস্থিত হৃদয়।"

কুরআনের আয়াতটি পড়ে জরাম ভেন ক্লেভারেনের চক্ষু চড়কগাছ। এ যেন তার নিজের ব্যাপারে বলা হচ্ছে!

তিনি আল্লাহর কাছে দু'আ করেন, আল্লাহ যেন তাকে একটি নিদর্শন দেখান।

রাতে ঘুমালেন। ঘুম ভাঙ্গার পর মনের মধ্যে এমন শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ হচ্ছিলো, যা তার জীবনে কখনো হয়নি। 'ইসলাম' -এর একটা অর্থও হলো শান্তি ও নিরাপত্তা।

যেই জরাম ভেন ক্লেভারেনের সারাজীবন ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান ছিলো, যিনি ইসলামের বিরুদ্ধে বই লিখতে চেয়েছিলেন, অবশেষে তিনি ২০১৯ সালে ইসলাম গ্রহণ করেন। হাফিজাহুল্লাহ।

ইসলাম গ্রহণের জার্নি তুলে ধরেন তার আত্মজীবনী 'Apostate: From Christianity to Islam in Times of Secularisation and Terror'।

ইসলাম গ্রহণের পর জরাম তার পূর্বের সমর্থকদের মধ্যে প্রায় ২০০০ জন তাকে মৃত্যুর হুমকি দেন। যাদের নেতা ছিলেন ইসলাম বিদ্বেষী, তিনি যদি ইসলাম গ্রহণ করেন তাহলে কী হবে?

পঠিত : ২২১ বার

মন্তব্য: ০