Alapon

১৪ই ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী কারা?



.
১৯৭১ সালে নিহতদের মধ্যে যারা বুদ্ধিজীবী হিসেবে চিহ্নিত এরকম আছেন প্রায় ৩৬ জন। এদের মধ্যে আঠার জন ১৪ই ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেছেন। বাকীরা এর আগেই মৃত্যুবরণ করেছেন। আর এর পরে বাহাত্তরের ত্রিশে জানুয়ারী হারিয়ে যান জহির রায়হান
.
বাংলাদেশে ঘটা করে পালন করা হয় শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। অথচ এই দিন যারা নিহত হলেন তারা কেন নিহত হলেন? কি তাদের রাজনৈতিক পরিচয়? এই খবর আমরা কেউ রাখছি না।

তাদের কে হত্যা করেছে এটা বলার আগে আমি যারা বাংলাদেশের ইতিহাস রচনা করেছেন তাদের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন রাখতে চাই,

১. ১৪ই ডিসেম্বর যারা নিহত হলেন মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ নয় মাস তাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ভূমিকা কি ছিল?

২. তারা কি তাদের কর্মস্থলে নিয়মিত গিয়েছিল?

৩. ঢাকা শহর পাকিস্তানীদের নিয়ন্ত্রণে যতদিন ছিল ততদিন কি তারা ঢাকায় লুকিয়ে বা আত্মগোপনে থাকতেন?

৪. তারা ১৪ ই ডিসেম্বরের আগে কি কোন জিজ্ঞাসাবাদ বা গ্রেফতারের মুখোমুখি হয়েছেন?
৫. তাদের রাজনৈতিক পরিচয় কি ছিল?

যারা সত্যের মুখোমুখি হতে চায় না, তারা কখনো এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে যাবেন না। তারা একটা গথবাঁধা গল্প বলবেন। এবং দাবী করবেন এদের আল বদর বাহিনীর সহযোগিতায় পাকিস্তানীরা হত্যা করেছিল।

১ নং প্রশ্নের উত্তর হল, যারা সেদিন নিহত হলেন তারা সবাই পাকিস্তান সমর্থক ছিলেন। অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী নেতৃত্বে ৫৫ জন একটি বিবৃতিতে পাকিস্তানের ঐক্যের পক্ষে তাদের দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেন।


তথ্যসূত্র:

১. একাত্তরের ঘাতক ও দালালেরা কে কোথায়?- মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশ কেন্দ্র, ফিফথ এডিশান

২. চরমপত্র- এম আর আখতার মুকুল।

২য় প্রশ্নের উত্তর হল তারা নিয়মিত তাদের কর্মস্থলে গিয়েছেন। প্রবাসী সরকারের ১৮ দফা নির্দেশনামার ১ম দফাই তারা অমান্য করেছেন। এটা শুধু যারা নিহত হয়েছেন তারা নয়, ঢাকা ভার্সিটির সব টিচারই এই নির্দেশ অমান্য করেছেন কারণ তারা সবাই পাকিস্তানপন্থী ছিলেন।

তথ্যসূত্র :
১. দুঃসময়ের কথাচিত্র সরাসরি, ড. মাহবুবুল্লাহ ও আফতাব আহমেদ
২. চরমপত্র- এম আর আখতার মুকুল।

৩. প্রধানমন্ত্রী হত্যার ষড়যন্ত্র- কাদের সিদ্দিকী, আমার দেশ ২৭/৯/১১ এবং ১১/১০/১১
৩ নং প্রশ্নের উত্তর হল, যেহেতু তারা প্রতিদিন নিজ নিজ কর্মস্থলে গিয়ে পাকিস্তান সরকারের সেবা করতেন সুতরাং তাদের আত্মগোপনে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না।

৪ নং প্রশ্নের উত্তর হল, তারা ১৪ই ডিসেম্বরের আগে গ্রেফতার কিংবা জিজ্ঞাসাবাদ হওয়ার কোন ঘটনা কেউ কোন গ্রন্থে উল্লেখ করেন নি। তাই আমরা ধরে নিতে পারি তারা এরকম ঘটনার মুখোমুখি হন নি। আর যেহেতু তারা পাকিস্তান সমর্থক ছিলেন তাই তারা গ্রেফতার হওয়ার কোন সম্ভাবনা নাই। যুক্তি অন্তত তাই বলে।

৫ নং প্রশ্নের উত্তর, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় হল তারা সবাই পিকিংপন্থী বাম। এর মধ্যে শহীদুল্লাহ কায়সার, মুনীর চৌধুরী নেতাগোছের ছিলেন। পিকিং বা চীনপন্থী বামরা ছিল পাকিস্তানপন্থী।

তথ্যসুত্র:
১. একাত্তরের ঘাতক ও দালালেরা কে কোথায়?- মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশ কেন্দ্র, ফিফথ এডিশান
২. চরমপত্র এবং
৩. বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ- এম আই হোসেন।
এবার আসুন তাদের কে হত্যা করেছে তা নিয়ে আলোচনায় আসা যাক।
সিপিবি ৩১.০৮.৭১ তারিখে তাদের রাজনৈতিক যে শত্রুর তালিকা করেছে সেখানে বলেছে “মনে রাখতে হইবে চীনের নেতারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করিতেছে ও আমাদের শত্রুদের সাহায্য করিতেছে। দেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী এসব চীনপন্থীদের সম্পর্কে হুশিয়ার থাকিতে হইবে।”

তথ্যসূত্র :
বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ- এম আই হোসেন।
যশোর কুষ্টিয়া অঞ্চলে পিকিংপন্থী কমরেড আব্দুল হক, কমরেড সত্যেন মিত্র, কমরেড বিমল বিশ্বাস ও কমরেড জীবন মুখার্জীর নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর বিপক্ষে যুদ্ধ করেন।


তথ্যসূত্র :
আমি বিজয় দেখেছি, এম আর আখতার মুকুল।
কমিউনিস্টদের মটিভেশন ক্লাসে এরকমও বলা হতো, একজন রাজাকারকে যদি তোমরা ধর, তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে, তাকে নানাভাবে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করবে। বারবার করবে এরকম। এতেও যদি কাজ না হয়, প্রয়োজনে শারীরিক নির্যাতনও করবে। যত পারো তথ্য সংগ্রহ করবে এবং পরে কারাগারে নিক্ষেপ করবে। আর যদি কোন চীনপন্থীকে ধর তাহলে সাথে সাথে প্রাণসংহার করবে।

তথ্যসূত্র :
দুঃসময়ের কথাচিত্র সরাসরি, ড. মাহবুবুল্লাহ ও আফতাব আহমেদ।
কাজী জাফর ও রাশেদ খান মেননের দল সহ পিকিংপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা ও কর্মীদের নিধন করা হবে বলে মুজিব বাহিনীর কর্মীরা হুমকি দিয়েছে। এই কারণে তারা পালিয়ে থাকতেন।

তথ্যসূত্র:

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ- ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া।
আমি এখানে যে তথ্যগুলো উপস্থাপন করেছি তাতে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে, যারা নিহত হয়েছেন তাদের পরিচয় ও যারা তাদের শত্রু তাদের পরিচয়। সুতরাং পাকিস্তানীরা তাদের কেন হত্যা করবে এটা আমার মাথায় আসছে না। আমি মনে করি কোন সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের মাথায় তা আসতে পারে না।

আর ১৪ই ডিসেম্বর ঢাকার নিয়ন্ত্রণ কোনভাবেই পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হাতে ছিল না। রাজাকাররা তো আরো আগেই পালিয়েছে। ১২ ডিসেম্বরের মধ্যেই ঢাকার পুরো নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় ভারতীয় সেনাবাহিনী। ১৩ তারিখ আত্মসমর্পনের সিদ্ধান্ত হয়। সহজেই অনুমেয়, ১৪ই ডিসেম্বরের কোন হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত হওয়ার ক্ষমতাই ছিল না পাকিস্তানী হানাদারদের।

সমীকরণ খুবই সোজা। “র” নিয়ন্ত্রিত বাহিনীই সংঘটিত করেছে এই নিষ্ঠুর হত্যাকান্ডের। পাকিস্তানের সমর্থক ও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী ঐসব বুদ্ধিজীবী বামপন্থী নেতাদের হত্যা করতে সহযোগীতা করেছে রুশপন্থী বামেরা। এখানেই শেষ নয়। একে একে সকল পাকিস্তানপন্থীদের তারা হত্যা করে।তারা গণহত্যা চালায় বিহারী ক্যম্পে ও মসজিদে মসজিদে। পরে এই বাহিনীর সাথে ধ্বংসযজ্ঞে যোগ দেয় কাদের সিদ্দীকী।


তথ্যসূত্র:
১. দ্যা ডেড রেকনিং, শর্মিলা বসু।

২. অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা, মেজর এম এ জলিল।

৩. বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ, এম আই হোসেন।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যাতে পিকিংপন্থী কম্যুনিজম এ দেশে প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে সে পরিকল্পনা আগেই প্রণয়ন করে এক ঢিলে দুই পাখি মেরেছে।
অর্থাৎ প্রথমত পিকিংপন্থী বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে মাওবাদী কম্যুনিজমের উত্থানকে রোধ করেছে ।
দ্বিতীয়ত, সম্ভাব্য ভারত বিরোধী বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে শুধু দালাল বুদ্ধিজীবীদের বাঁচিয়ে রেখেছে ভবিষ্যতের ভারতীয় লুটপাট নিষ্কণ্টক করেছে ।

পঠিত : ৩৯৬ বার

মন্তব্য: ০